পর্ব-৪

নতুন প্রসঙ্গ
আজকাল কেউ পালপাড়া নামটা চিনবে না, জানবে না এটাই স্বাভাবিক; কারণ এই পালপাড়াটা আর নেই। এক সময় ছিল। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ছিল। আমার নিজের চোখে দেখা। কিন্তু একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের পর আহত মানুষরা যেমন মরে যায়, সরে যায়, পালিয়ে যায়, আশ্রয় নেয় অন্য কোথাও ঠিক তেমনি পালপাড়াও পালিয়ে যায়। তারপর পালপাড়া যে কোথায় গেলো কেউ বলতে পারবে না। ক'দিন ধরে পুড়ে যাওয়া ছাপরা ঘরগুলো থেকে ধোঁয়া উড়ছিল- কিন্তু এক সময় ধোঁয়া ওঠাও বন্ধ হয়ে যায়। ছাইয়ের মধ্যে কেউ বসবাস করে না, তাই পালপাড়া নিজেই একদিন গা-গতর উঠিয়ে মিলিয়ে গেল।
৫০ বছর আগে দেখা শহরের অভিজাত এলাকার প্রান্তে অবস্থিত ঝুপড়ির বস্তিটা আর নেই। ওই এলাকার পুরাতন বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসা করলে অবশ্য কোথায় তার ঠিকানা ছিল তা দেখিয়ে দেবে; কিন্তু এই প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা বেশ অদ্ভুত ঠেকে। একটা গোটা বস্তি মিলিয়ে যাওয়া কম কথা নয়। তাও আবার ঢাকা শহরের মধ্যখান থেকে। অবশ্য স্থান বা জায়গাটা এখনও আছে। মাটির যা স্বভাব, হারিয়ে যায় না। তবে তার নতুন পরিচিতি, নতুন চেহারা, স্বভাব তৈরি হয়।
একাত্তরে কত মানুষ যে নিখোঁজ হয়েছে তার শেষ নেই। যুদ্ধে গিয়ে মিলিয়ে যাওয়া এক বিষয়; কিন্তু আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে গিয়ে মানুষ হারিয়ে গেছে। কেউ কেউ ফেরেনি স্বেচ্ছায়। ফেরার কোনো ঠিকানা নেই বলে।
পালপাড়া হয়তো এখন বাস্তবে নেই কিন্তু আজ যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, ওটাই পালপাড়া ছিল ১৯৭১ সালে। ওই বস্তির বাসিন্দারা প্রায় সবাই নিম্নবর্গীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষ। ঢাকার ওই এলাকার আশপাশের মানুষের বাসায়, অফিসে এরা 'নিচু' জাতের কাজ করত। অর্থাৎ সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষ ছিল তারাই।
তারা কোনো রাজনীতি তো দূরের কথা পরিশ্রম ছাড়া তারা কিছুই করত না। কিন্তু ঢাকায় ওই রাতে পাকিস্তান আর্মির আক্রমণের ছকের দিকে তাকালে বোঝা যায় পালপাড়া সকল দিক থেকে ছিল সবচেয়ে বিপদে। এবং এর জন্য আলাদা করে তাদের কিছু করতে হয়নি। এটা একান্তই সেই পাকিস্তানি রাষ্ট্রে শত্রু-মিত্র চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ।
সে কারণে পালপাড়া আর কেবল অতিপ্রান্তিক গরিব মানুষের বাসস্থল থাকেনি। ১৯৪৭ থেকেই যে বাংলাদেশকে পাকিস্তান ঘৃণা করত কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই আবার যাকে ভয়ও পেতে শুরু করে- পালপাড়া যেন পাকিস্তানকে ভয় পাওয়ানো সেই বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। এবং সেই কারণেই হয়তো পালপাড়া তার জন্মের আগে থেকেই মাথার ওপরে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে এসেছিল। একই কপাল নিয়ে এসেছিল পাকিস্তান। ওইদিন ছিল জিন্নাহর পাকিস্তানেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন। কিন্তু পাকিস্তান সেটা বোঝেনি বা তাদের বোঝার ক্ষমতা ছিল না অথবা তাদের করার কিছু ছিল না। লুকোচুরি করে বানানো রাষ্ট্র টিকল মোটে ২৪ বছর। সেই দিক থেকে ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তান অনেক সফল। পঞ্চাশ পার হলো। কিন্তু ওই রাতে হন্তারক পাকিস্তান যে আত্মহত্যা করছে এটা তারা ঠাহর করতে পারেনি। এই নির্বুদ্ধিতার কারণ কি বলা যায় না, তবে যে রাষ্ট্রের সঙ্গে তার ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই তার টিকে থাকা কঠিন বা অসম্ভব। এ কারণে ওই রকম নিরীহ হতশ্রী পালপাড়াও তার চোখে শত্রু পরিণত হয়। ঠিক একই কারণে পালপাড়া নিশ্চিহ্ন হয়েছে এটা ঠিক কিন্তু ওই ক্ষুদ্র স্থানটি অনেক বড় প্রতিশোধ নেয়। সেটি হচ্ছে পালপাড়া পাকিস্তানকেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

অপারেশন সার্চলাইট। ২৫ মার্চ ১৯৭১

পাকিস্তানের শত্রু-মিত্ররা
ঢাকা শহরে কী ঘটতে যাচ্ছিল হয়তো অনেকের জানা ছিল। কিন্তু যা বোঝা যায় তারা ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ অথবা বড়সড় কেউ। তবে অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন কিছু একটা হবে। কী হবে সেটা পরিস্কার ধারণা বোধহয় কারও ছিল না।
একুশে টেলিভিশনের জন্য আমি ২০০০ সালে একটা সিরিজ করছিলাম '১৯৭১' নিয়ে, যেটা অসমাপ্ত রয়ে যায়। সেখানে প্রাক-নির্মাণ গবেষণায় কিছু তথ্য পেয়েছিলাম ওই রাত সম্পর্কে। আমাদের ইকবাল হল/সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের দারোয়ান জানায় যে, সেই রাতে হলে কেউ ছিল না। গোলাগুলিতে মারা যায় দুইজন; একজন দোকানদার, অন্যজন বহিরাগত। অবশ্য এটা তার ভাষ্য, তবে সাধারণভাবে এটাই ছিল চিত্র। হলগুলো খালি ছিল অনেকটাই। কিন্তু ইকবাল হল থাকলেও তাদের নজর ছিল অন্য একটি হলের দিকে- সেটি হলো জগন্নাথ হল। এইখানে ছাত্রদের দিকে কেবল তাদের দৃষ্টি ছিল না ছিল সকল অধিবাসীর দিকে। খুব সরলভাবে আমরা একটি ম্যাপ বানিয়েছিলাম পাকিস্তানিদের আক্রমণস্থলভিত্তিক। তার চিত্রটা এই রকম পাওয়া যায়:
ক. বিশেষ কিছু লক্ষ্যস্থল যেমন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মূল হোতা লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ইত্যাদি।
খ. যেখানে সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্ভাবনা ছিল যেমন পিলখানা (BDR), রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ইত্যাদি।
গ. রাস্তায় যেখান থেকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ তারা দেখেছিল; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসসমূহ।
ঘ. ঢাকার বস্তিসমূহ, কারণ তাদের মতে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এরাই ছিল রাস্তায় পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের প্রথম কাতারের জঙ্গি।
ঙ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আবাসিক হল, তবে সেখানকার বিশেষভাবে চিহ্নিত বাসস্থানগুলো।
চ. নির্বাচিত হিন্দু এলাকা বা স্থান বা বস্তি।
এই নিরিখে পালপাড়ার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম, যেহেতু এটা ছিল হিন্দুদের বস্তি, সকল দিক থেকে শত্রুপক্ষ।
পাকিস্তানের চোখে শত্রু কারা? যে সব এলাকায় তারা আক্রমণ করে তাদের মধ্যে প্রতিরোধকামী, প্রতিবাদী ও বিশেষ শত্রুর কথা বোঝা যায়। কিন্তু একটা নিরীহ গোষ্ঠীও তাদের আক্রমনের শিকার হয়। তারা হিন্দু জনগোষ্ঠী। পাকিস্তানিদের কাছে তারা ছিল অন্যতম প্রধান শত্রু। কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতেও তারা তেমন ছিল না। তাহলে তারা শত্রু হলো কীভাবে? ওই রতে যাদের তারা আক্রমণ করেছিল তাদের চেয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষ দেশে কম ছিল।
২০০০ সালে কিছু পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়, যখন UPL-এর মহিউদ্দিন ভাই, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও আমি পাকিস্তানে যাই। সেখানে প্রায় সকলের মুখে একই কথা শুনেছি। হিন্দুরা আমাদের নষ্ট করেছে, কারণ তারা ছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষক; আর ছোট বেলা থেকেই তারা সবাইকে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেপিয়ে তোলে। অতএব হিন্দুমুক্ত না করলে প্রকৃত পাকিস্তান গঠন সম্ভব নয়।

২৫ মার্চ ১৯৭১

এটা যতই উদ্ভট শোনাক না কেন- বহু পাকিস্তানিই এটা বিশ্বাস করে। অতএব হিন্দুদের হত্যা করা বা দেশ থেকে বের করে দেওয়া ছিল তাদের জাতীয় দায়িত্ব। তাহলে পাকিস্তানিদের চোখে হিন্দুদের পরিচয় কি? সেই পরিচয়টি হচ্ছে পাকিস্তানের জাতশত্রু-ভারতীয়। অর্থাৎ ভারত হচ্ছে তাদের শত্রু এবং শত্রু নিধন ফরজ। এই ভাবনা পাকিস্তানকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত কেবল রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে টিকিয়ে রাখেনি, এই ভাবনাপ্রসূত রাষ্ট্র ও যুদ্ধ পরিচালনা কৌশল তার মৃত্যুও ডেকে আনে।
পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র ছিল না বিভিন্ন কারণে, কিন্তু তার মধ্যে এই হিন্দু ঘৃণা ছিল ভারতের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ। সে নিজে রাষ্ট্র ছিল না, ছিল ভারতকে ঘৃণা করার জন্য একটি নির্মাণ। যার সূত্র প্রাক সাতচল্লিশে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক রেষারেষি। জিন্নাহ-নেহরুর যে বিবাদ তার ভিত্তিও একই বিষয়, সেটার বাইরে যেতে পারেনি। ১৯৪৭ সালে যে ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু সেই ভাবনার হাতে মৃত্যু ১৯৭১-এ এসে।
শহীদ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম
প্রায় বিস্মৃত, হারিয়ে যাওয়া মানুষ হচ্ছেন লে. কম. মোয়াজ্জেম হোসেন, যিনি ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি। তারা একদল সেনা, বিমান ও নৌ কর্মকর্তা মিলিত হয়ে দেশ স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেন। তাদের ওপর শেখ মুজিবের প্রভাব ছিল কিন্তু তিনি জড়িত ছিলেন না।
আগরতলা মামলা উঠে গেলে লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম কিছুদিন রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। এই সময় তিনি 'লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি' নামে একটি গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। ২৫ মার্চ রাতে একদল পাকিস্তানি আর্মি এসে তাকে হত্যা করে। তার স্ত্রীর সামনেই তাকে হত্যা করা হয়। এই নামটা আজকে অনেকেই ভুলতে বসেছে।
এটা থেকে আরও বোঝা যায় যে, স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র ছিল লাহোর প্রস্তাব। এটাই ছিল স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জনপরিকল্পনার ভিত্তি। জিন্নাহ এটাই অস্বীকার করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত দাম চুকিয়েছিল পাকিস্তানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
৬ দফা ও লাহোর প্রস্তাব
২৩ মার্চ ১৯৪০ লাহোর প্রস্তাব পাস হয়। তার ভৌগোলিক প্রস্তাব হচ্ছে স্বাধীন 'পূর্ব' ও 'পশ্চিম' পাকিস্তান।
১৮ মার্চ ১৯৬৬ পঠিত হয় ৬ দফা, যার প্রথম দফা হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন।
২৬ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার ভিত্তি হলো ৬ দফা প্রস্তাব, ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলন ও নির্বাচন।
অতএব, তিনটি ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় এক। ভাবনার দিক থেকে লাহোর প্রস্তাব, এগোনোর দিক থেকে স্বাধীনতা এবং ঘটনার দিক থেকে মার্চ মাস। জিন্নাহর জন্য যেমন লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করাটা ছিল রাজনৈতিক সুবিধার জন্য, তার পাকিস্তানের জন্য, তেমনি টিকে থাকার স্বার্থে সেই ৬ দফার বিরুদ্ধে লড়াই করাটা ছিল পাকিস্তানের প্রয়োজন।
৬ দফা আর কেন্দ্রভিত্তিক পাকিস্তান একসঙ্গে চলতে পারতো না কারণ, ৬ দফা কমবেশি একটি 'স্বাধীন' দেশের কাঠামো, বড়জোর ফেডারেশন। এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য একটি বড় সংকট তৈরি হয়। তারা নির্ভর করতো ক্ষমতার জন্য ভারতবিদ্বেষের ওপর। যদি ৬ দফা হয় তাহলে জিন্নাহর পাকিস্তান টিকবে না। কারণ বাংলাদেশের মানুষের মূল রাজনীতি ভারত বিদ্বেষ নয়। তাই শেখ মুজিবকে আগরতলা মামলায় জড়িত করা হয়।
গোটা পাকিস্তানে আন্দোলন হয় ১৯৬৮-৬৯ সালে, যার ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান জে. আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু তার বদলে আসেন জে. ইয়াহিয়া খান। তার ভুল ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষতার ও মেধার ওপর নির্ভর করা। তারা বুদ্ধি দিয়েছিল নির্বাচন করার এই ধারণা থেকে যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে না এককভাবে। কিন্তু নির্বাচন হবার পর আর কোনো সুযোগ রইলো না তাদের, কারণ ৬ দফা যদি বাস্তবায়ন হয় পাকিস্তানের ২৪ বছরের চরিত্র ও কাঠামো শেষ হয়ে যাবে। তাই নির্বাচনের পরপরই ক্র্যাকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাকি সব ছিল হাওয়াই মিঠাই। নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই সেনা রাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান তার জন্মসূত্র লাহোর প্রস্তাবের আঘাতেই শেষ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে সেটার রাজনৈতিক রূপ ছিল ৬ দফা।
দূর থেকে দেখা
দিনটা সকাল থেকে ভ্যাপসা ছিল। বাসাতেই ছিল সবাই। আমার ব্যাংক কর্মকর্তা বাবাকে পাকিস্তানে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল এই অভিযোগে যে, তিনি '৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিনা দায়িত্বে টাকা দিয়েছেন। তিনি এই ৯ মাস ঢাকাতেই ছিলেন। পাকিস্তান যাননি। বাবা ও অন্যান্য ব্যাংকারের সঙ্গে শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারি মাসে দেখা করেছিলেন। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হতে চলেছে। তৈরি থাকতে হবে। সেই রাতে বাবা খুব উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, শেখ মুজিবের কথা ুইব চৎবঢ়ধৎবফ রিঃয সবহ ধহফ সড়হবুচ্। স্বাধীনতা আসছে ভাবতাম, কী হবে জানতাম না। জানতাম না কত দাম চাইবে, কত দিতে হবে। রাতে শুতে গেলাম কিন্তু কোথাও ফুটফাট গুলির আওয়াজ হচ্ছিল। কোথাও কোথাও বেশ জোরে। আমরা তখন বিছানা ছেড়ে উঠে একসঙ্গে হয়েছি। ভয়, শঙ্কা ছিল মনে। ফার্মগেটের কাছে একটা ব্যাংক ছিল। তার ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করলাম। ততক্ষণে গোলাগুলির আওয়াজ বেড়েছে। এটা যে সেনাবাহিনীর কাজ আমরা নিশ্চিত। দারোয়ান ফোনটা ধরে ভয়ার্ত গলায় বললো, 'স্যার, ট্যাঙ্ক যাইতাছে শহরের দিকে।'
কয়টা ট্যাঙ্ক?
লোকটা প্রায় কেঁদে দিল। বলল, '১০০ পর্যন্ত গুনছি।'
আমরা সবাই দুইতলা ছেড়ে একতলায় নেমে এলাম। একটা ঘরের মধ্যে সবাই মেঝেতে বসা। কারও মুখে কথা নেই। আকাশটা লাল আগুনের রঙে, সম্ভবত ঋষধৎব এর আগুনে। আমার ভাবি আমাকে কান্না জড়ানো গলায় জিজ্ঞাসা করল, 'গুলি কখন থামবে?'
এক সময় আমি আর বড় ভাই বারান্দায় গেলাম। ঢাকায় এমন আকাশ দেখিনি কোনোদিন, পরেও না। এত লাল আকাশ, এত উজ্জ্বল! ট্রেসার বুলেট তার মধ্যে ছুটছে। ওই দৃশ্য দেখে সব ওলটপালট হয়ে যায়।
হঠাৎ বড় ভাইয়া বললো, চলো রেকর্ড করি। একটা সেকালের 'অকঅও্থ টেপরেকর্ডার দিয়ে আমরা রেকর্ড করতে লাগলাম।
আমার এই ভাইয়ের উৎসাহের শেষ ছিল না। বললো, 'চল, ছাদে যাই।' কাউকে না বলে আমাদের বাড়ির দুইতলার উপরের ছাদে উঠলাম। ওইখান থেকে তখন ময়মনসিংহ রোড সহজে দেখা যায়। দেখলাম আগুন জ্বলছে পালপাড়ায়। আর্মির গাড়িগুলো রাস্তায় দাঁড়ানো। আর বস্তি পুড়ছে। অতদূর থেকেও মানুষের দৌড়াদৌড়ি নজরে আসে। চিৎকার শোনা যায়। সবাই দৌড়াচ্ছে যেদিকে পারছে। ওই আগুনে পুড়ছে ঘর, বস্তি, জীবন। আমরা যখন নেমে আসি তখন আমাদের চেহারাটা পাল্টে গেছে। আমরা তখন একাত্তর দেখছি। আমাদের চোখে ওটাই গণহত্যা ও গণনির্যাতনের প্রথম দৃশ্য।
পরে কী হলো বলার প্রয়োজন নেই। মানুষগুলো সবই চলে যায় এক সময়। স্বাধীনতার পর এক সময় মাটি ভরাট করে দালানকোঠা ওঠে। পালপাড়া উধাও হয়ে যায়। কিন্তু সে তার প্রতিশোধ নিয়েছে। পালপাড়া হারিয়ে গেছে, মিলিয়ে গেছে, আর নেই। কিন্তু সেই পাকিস্তানও নেই।
পালপাড়া পাকিস্তানকে হত্যা করে। তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের আত্মহত্যাও ঘটে যায়। এর চেয়ে যথার্থ প্রতিশোধ আর হয় না।
[এই প্রসঙ্গ সমাপ্ত]

মন্তব্য করুন