ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

চার ঔপন্যাসিক, এক মহাসাগর

চার ঔপন্যাসিক, এক মহাসাগর

.

মূল : চার্ন ল্যাভেরি।। ভাষান্তর: শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:২৮

উপন্যাস বিশ্বকে নতুন আঙ্গিকে নির্মাণ করে। তা পাঠকের মনে কোনো জায়গার সজাগ অনুভূতি ও মনস্তাত্ত্বিক চিত্র অঙ্কন করে। উপন্যাসে বলা স্থানটি পাঠকরা ঠিক মানচিত্রের মতোই দেখতে পান।
প্রারম্ভিক উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যে উপন্যাসের জগৎ প্রধানত জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমিত ছিল। তা ছিল কোনো না কোনোভাবে জাতীয় প্রশ্নগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কখনও কখনও উপন্যাসের পুরো গল্পটিকে জাতির রূপক হিসেবে নেওয়া হতো। ভারত হোক বা তানজানিয়া, এটি উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাঝে। 
আমার নতুন গ্রন্থ ‘রাইটিং ওশান ওয়ার্ল্ডস’-এ চার ঔপন্যাসিকের উপন্যাসে অন্য ধরনের জগৎকে অন্বেষণ করা হয়েছে– গ্রাম বা জাতি নয়, ভারত মহাসাগরের বিশ্ব।
গ্রন্থটি একগুচ্ছ উপন্যাসকে বর্ণনা করে; যেখানে গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত মহাসাগর। এটি চার ঔপন্যাসিক– অমিতাভ ঘোষ, আবদুলরাজাক গুরনাহ, লিন্ডসে কোলেন ও জোসেফ কনরাডের ওপর আলোকপাত করে। অমিতাভ ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লেখক, যাঁর কাজ ভারত মহাসাগরের ঐতিহাসিক কথাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। গুরনাহ জাঞ্জিবারের ঔপন্যাসিক। তিনি ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কোলেন মরিশাসের লেখক। আর ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন জোসেফ কনরাড। এই চার লেখক তাদের বেশির ভাগ উপন্যাস ভারত মহাসাগরের বিশ্বকে কেন্দ্র করে লিখেছেন। তারা ভারত মহাসাগরের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে লেখায় নিয়ে এসেছেন– অমিতাভ ভারত মহাসাগরের পূর্বদিক; গুরনাহ পশ্চিমাংশ; কোলেন লিখেছেন ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে; আর কনরাড একটি সাম্রাজ্যের বহিরাগতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
এই লেখকরা সবাই খুব আলাদা– ঔপনিবেশিক ঝোঁক (কনরাড) থেকে আমূল পুঁজিবাদ বিরোধী (কোলেন); কিন্তু একই সঙ্গে তারা ভাষার তুলিতে ভারত মহাসাগরের এক বিস্তৃত ধারণাকে আঁকেন এবং আকার দেন। এই আন্তঃসংযুক্তি পাঠকের মনে ‘গ্লোবাল সাউথ’ ধারণাকে সজীব করে তোলে।
কেনিয়ার ঔপন্যাসিক ইভন আধিয়াম্বো বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে, বিশেষ করে আফ্রিকার আন্তঃসংযোগের আখ্যান আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর, উত্তর-ঔপনিবেশিক কল্পনায় হারিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।’ যেমনটা তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার একটা বড় অংশ সমুদ্রে লুকিয়ে আছে।’ আমার বইয়ের উদ্দেশ্য পাঠককে কল্পকাহিনিতে ডুব দিতে প্রলুব্ধ করা, যেখানে এটি পাওয়া যেতে পারে।
ভারত মহাসাগরের সংযোগ
পূর্ব আফ্রিকা, আরব উপকূল এবং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার উপকূলগুলোর মধ্যে খুব দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ বর্ণনা করতে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ ‘ভারত মহাসাগরীয় বিশ্ব’। এই সংযোগ ভারত মহাসাগরের ভূগোলের কারণেই সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্রপথে ভ্রমণ স্থলপথের তুলনায় অনেক সহজ ছিল, যার অর্থ হলো– নিকটবর্তী দ্বীপগুলোর চেয়েও দূরবর্তী বন্দর শহরগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে, আমরা এখন যাকে ‘বিশ্বায়ন’ বলি, 

প্রথম ভারত মহাসাগরেই তার দেখা মিলেছে। আমার গ্রন্থে (রাইটিং ওশান ওয়ার্ল্ডস) উপন্যাসগুলোর বিশ্লেষণে এই আন্তঃসংযুক্ত মহাসাগরীয় বিশ্বের কথা বলা হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যে ‘দ্য ইন্ডিয়ান ওশান লিটারেচার’ একটি ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য ধারা, যে ধারায় এমজি ভাসানজি, মাইকেল ওন্ডাটজে, রোমেশ গুনাসেকেরা এবং আরও অনেকের কাজ রয়েছে। এর অংশ হিসেবে অমিতাভ, গুরনাহ, কোলেন এবং এমনকি কনরাড এক ভিন্ন ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, ইংরেজি কথাসাহিত্যে যা সাধারণত পাওয়া যায় না। ইংরেজি সাহিত্যের বাস্তবতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। উপন্যাসে খ্রিষ্টধর্ম, শ্বেতাঙ্গদের কথাই আসত। উপন্যাসের পটভূমি রচিত হতো প্যারিস বা নিউইয়র্কের মতো কোনো জায়গায়।
চার ঔপন্যাসিকের গ্রন্থগুলো মূলত মালিন্দি, মোম্বাসা, এডেন, জাভা এবং বোম্বে বন্দরকে সংযুক্ত করে। গুরনাহর উপন্যাস ‘বাই দ্য সি’ উপন্যাস থেকে– 
জাঞ্জিবারের একজন শিক্ষক তাঁর তরুণ ছাত্রদের বিশ্বে তাদের অবস্থান দেখাচ্ছেন– তিনি মানচিত্রে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের চারপাশে ভারত পর্যন্ত এবং মালয় এবং ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন পর্যন্ত চারপাশে একটি দীর্ঘ একটানা রেখা এঁকেছেন। তিনি জাঞ্জিবার বরাবর গোল করে দাগ কাটলেন। বললেন, ‘আমরা এখানে আছি।’ 
ক্লাসরুমের ঠিক বাইরে:
বন্দরে পালতোলা জাহাজের ভিড়, তক্তা পর তক্তা পড়ে আছে... রাস্তায় সোমালি বা সুরি আরব বা সিন্ধিদের ভিড়, কেনা-বেচার এক অবোধগম্য যুদ্ধ; আর রাতে খোলা জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে কেউ গলা ছেড়ে গান ধরেছে; সেই সঙ্গে চলছে চা পান…
এটি ভারত মহাসাগরের বিশ্ব হয়ে ওঠার, মিশ্র সংস্কৃতির এক সুকল্পিত, সমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল চিত্র, যা গুরনাহ অসাধারণ অনুভূতির সঙ্গে প্রকাশ করেছেন।
আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব
কথাসাহিত্যে নাবিক ও ভ্রমণকারীরা সবাই ইউরোপীয় নয়। সেখানে আফ্রিকাকে একটি ‘হাইড্রোফোবিক’ মহাদেশ হিসেবে চিত্রিত করা হয় না, যা কেবল অনুসন্ধানকারীদের পাঠানোর পরিবর্তে গ্রহণ করে। আফ্রিকার পাশাপাশি ভারতীয় ও আরব চরিত্রগুলো হলো ব্যবসায়ী, নাখোদা (ধু জাহাজের অধিনায়ক), পলাতক, খলনায়ক, ধর্মপ্রচারক, সমাজকর্মী।
এর মানে এই নয় যে, ভারত মহাসাগরে আফ্রিকার খুব ভালো সময় কেটেছে। অভিবাসন প্রায়ই বলপ্রয়োগের একটি বিষয়। উপন্যাসে সমুদ্র পারি দেওয়াকে অ্যাডভেঞ্চারের পরিবর্তে বাস্তুচ্যুতি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে; যেখানে নারী স্বাধীনতা সীমিত রাখা হয়েছে; আরও রয়েছে ব্যাপক পরিসরে দাসপ্রথা। ভারত মহাসাগরের বিশ্বে আফ্রিকা অংশটি তার দীর্ঘ, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সক্রিয় ভূমিকায় এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

লেখক পরিচিতি
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়া ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘রাইটিং ওশান ওয়ার্ল্ডস: ইন্ডিয়ান ওশান ফিকশন ইন ইংলিশ’ গ্রন্থের লেখক।
    
দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে

আরও পড়ুন

×