ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

একজন কবির ব্যক্তিগত সাগর সংশোধন

সাগর সঙ্গমে

একজন কবির ব্যক্তিগত সাগর সংশোধন

সাগর সঙ্গমে

আলফ্রেড খোকন

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৩০

আমার একটি ব্যক্তিগত সাগর আছে; তার সঙ্গে আমি কখনও মৈথুনে লিপ্ত হই। কখনও রাগে-অনুরাগে বিরহী দিনরাত্রি যাপন করি, সংঘর্ষে যে জড়িত হই না, সে কথা অস্বীকার করি কেমন করে! সে কখনও প্রকাশ্য হতে চায় না। মিলনহীন প্রেমিকার ভাঁজ করা প্রেমপত্রের মতন। কখনও পাতা উল্টায়ে দেখতে যেয়ে না দেখার ভান করার মতন– এমন। এই সাগরের পাড়ে আমি কখনও দুঃখ হয়ে বসে থাকি। আনন্দ হয়ে ঢেউয়ের চূড়া ছুঁতে যাই, সাগরচিলের মতো। কখনও বেদনা হয়ে ডুবে যাই সূর্যাস্তের মতো। সাগর আমাকে দিয়ে নিজের অজান্তেই বালুতটের তীরে তার নাম লেখায়। সে নাম লেখার আনন্দের পর, যেমন ঢেউ এসে মুছে দেবে জেনেও– ভুল করে আমি তবু তার কাছে লিখতে যাই প্রিয়দের নামে খোলা চিঠি। খোলা চিঠি মানে সাগরের গর্জন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যাকেও একদিন সাগর ভেবে, তার বুকে ভাসতে ভাসতে লিখেছিলাম এক গোপন চিঠি। কিন্তু কে জানত সব নদী সাগরে মেশে না। সব সাগর নদীর কাছেও ফিরে আসে না! যে নদী সাগরে মিশে, আর যে সাগর নদীর কাছে সম্পর্ক নিয়েই সাগর হয়, তাকে আমার প্রিয় গ্রন্থ ভাবি, এমন গ্রন্থ অপার– যেখানে উত্থান-পতন আছে, মিলন-বিরহ আছে, জীবন উজাড় করা আছে। জোয়ার-ভাটার মতো ছন্দ আছে, দ্বন্দ্ব ও ধন্দ আছে, পতন-উত্থান আছে। 
কখনও বালুতে মুখ গুঁজে চুপ করে থাকি একটি বিপন্ন লাল কাঁকড়া যেমন। কখনও তার ঢেউয়ের ফেনায় নিজেকে ভিজিয়ে নিই হেমন্তের শিশিরের মতন। কখনও শান্ত নীল জল যেমন থির হয় সাগরের বুকে, আমার বুকেও সে সাগর থির হয়ে থাকে পৃথিবীর দিগন্তের মতো। আমিও তার মতো নীল হই। ক্লান্ত হই, অক্লান্ত হই। আবার যখন সে অশান্ত হয়, ঢেউ হয়ে ঝাঁপ দেয় নিজস্ব ঢেউয়ের ভেতরে– আমিও তার ঢেউ সমান আঘাতে নিজেকে জর্জরিত করি। সাগর কখনও আমাকে শিশুর মতন আহ্বান করে তার তীরের বালুতে। তখন শিশুর মতো বালু নিয়ে সাগরতীরে উঁচু উঁচু ঢিবি গড়ে তুলি, যে শিশু জানে না এই উঁচু ঢিবি মিলিয়ে দেবে মুহূর্তের আছড়ে পড়া ঢেউয়ে। সাগর যেমন বালুতটে প্রেমিকার নাম লিখতে বলে। আমি তার আশায় আমার মনের ভেতরে লুকানো গোপন নামটি লিখি– ঢেউ এসে মিলিয়ে দেয়। তখন আর তা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না। আমি যখন তাকে মনে করে সাগরকে জড়িয়ে ধরি পরাবাস্তব নিয়মে, তার ঢেউ এসে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এসব কুহক কেটে গেলে বুঝি, এরা সবাই পরাবাস্তব রীতি।    
সাগর আমার এক বন্ধুর নাম। আরেক বান্ধবীর নাম সাগরিকা। এরা কেউ কখনও সাগরে যায়নি, মহাসাগরেও। কিন্তু এরা দু’জন মিলেই এমন এক প্রেমময় সাগর রচনা করেছে, সেখানে আছে নীল জলরাশি, আছে ঢেউ। কিন্তু অনেক দিন পরে জানতে পারলাম, তারা সাগরকে ঘৃণা করে– কারণ ওই সাগরতীরে ওদের যৌথ-স্মৃতির সম্পর্কটি ভেসে গেছে– উদ্ধার করার ছিল না তো কেউ! তারপর থেকে ওদের কাছে সাগর মানে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের নাম। আমিও নিজেকে একদিন আবিষ্কার করলাম– ভেঙে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে এখনও আমি বসে আছি ব্যক্তিগত সাগর সংগমে।
এই যে এতক্ষণ ধরে ব্যক্তিগত সাগরের কথা বলছি, সাগর বিট্রে করে, যদি তার মন না বুঝি, সাগর পর করে, যদি তার ঢেউয়ের স্বরূপ না যুঝি। সাগর আপন করে না, যদি তার ছন্দ না বুঝি। আপনারা দেখবেন, যারা সাগরে গিয়েছেন– সাগরের ঢেউয়ের একটি ছন্দ আছে। সে ভাসায় এবং দোলায়, বুকে করে কোলে নেয়। আর এসবের কিছুই না বুঝলে সে আছড়ে ফেলে তীরে। তার স্পর্শ ও অভিব্যক্তি জুতমতো বুঝতে হয়। না হলে একজনের বুকে সাগরের ঢেউ আঘাত করে, আরেকজনের বুকে ঢেউ আলগোছে কার্পাসের মতো ওপরে তুলে ধরে। 

জলারাশির ঢেউ ইস্পাতের মতো কঠিনসম, আবার কার্পাসের মতনও নরম। সাগরের এই চরিত্র বুঝতে পারা মানে তার ভাষা জানা। প্রেমের প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও– একই সুষমা। সাগরের প্রেমে প্রস্তাবিত দেহ ভাসানোর ভাষা জানা হলে, সে ভাষা মাতৃভাষা হয়ে ওঠে। যে বাংলাভাষা জানে, আর ইংরেজি ভাষা জানে না, ব্যাপারটা এমনই। যে নদীতে সাঁতার করতে পারে, তার কাছে নদী এক মাতৃভাষা। কিন্তু সাগরে সাঁতার করতে না পারলে, সাগর তার কাছে বিদেশি ভাষা হয়ে যায়– মাতৃভাষা হতে পারে না। ধরা যাক, হিন্দি, ইংরেজি কিংবা হিব্রু ভাষা– যা আমি জানি না। এই না জানা আমার কাছে এক অজানা সাগর। যার তীরে যাইনি, যার গভীরেও যেতে পারিনি।  
সাগর বুঝতে হলে একটি মহাসাগরের দরকার হয়। কিন্তু মহাসাগর বুঝতে হলে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হবে। তার নাম ভূমধ্যসাগর। তার নাম আরব সাগর। তার নাম ভারত মহাসাগর– সেখানে এখন অনেক যুদ্ধজাহাজ ভিড় করে আছে। যে সাগর শুধু ডোবাবে তোমায়, ভাসাবে না কোনো মতে। আমি আরব সাগরে গিয়েছি। সেখানে ভেসেছি দিনরাত্রি। ভারত সাগরেও গিয়েছি, সেখানে আমি ঢেউয়ে ঢেউয়ে, বেদনা উজাড় করেছি। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে গেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বঙ্গোপসাগরেও গিয়ে ডুব দিয়েছি; 
তখন ১৯৮৮ সাল। বঙ্গোপসাগরের পাড় কুয়াকাটা। পাড়ে গিয়েই বালুতটে কান পেতে সাগরের গর্জন শুনেছি, শুনেছি আহ্বানও। শুধু তো গর্জন নয়, সে ছিল প্রেমময়। তার শিহরন ছিল রোমাঞ্চকর। বালুতটে কান পেতে শুনেছি সাগরের ঢেউয়ের আলাপ– সেই তিন দিন, দুই রাত বঙ্গোপসাগর আমার বন্ধু হয়েছিল, তার পাড়ে যেমন আছড়ে পড়া ঢেউ, কিনারে ছিল মিলন। তার মতো আর ছিল না কেউ। এখন সাগর বলতে যা জানি, তা হচ্ছে– ঢেউয়ে ঢেউয়ে পরাজিত প্রেম। অনেক প্রণালি। অনেক যুদ্ধরেখা। সাগর যে কেউ দখলে নিতে চায়, তখন তা জানা ছিল না। তখন সাগর সংগম মানে ঢেউয়ের ওপরে ঢেউ। ঢেউয়ের চূড়ায় নিজেকে সমর্পণ করা, মানে প্রেম। তখন সাগর মানে ছিল অনুরাগ, প্রণয় ও সংগম। আর এখন সাগর মানে রণতরীর নোঙর– যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। সাগর থেকে যুদ্ধজাহাজ উড়ে যায় কোনো ভূখণ্ডকে ধ্বংস করে দিতে, যেমন ভূমধ্যসাগর থেকে ইসরায়েলের বন্ধুদের রণতরী। 
ভূপেন হাজারিকার একটি গান মনে আসছে। (আমরা যেমন গীতিকারকে মনে রাখি না) যেমন এই গানের গীতিকবি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়,  যে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে বিসর্জন করেছিল। তাঁর গীতিকবিতার মতো– ‘সাগর সংগমে সাঁতার কেটেছি, কখনও তো হই নাই ক্লান্ত, তথাপি মনের মোর প্রশান্ত সাগরের/ ঊর্মিমালা অশান্ত ... মোর প্রশান্ত পারের কত মহাজীবনের শান্তি আজ আক্রান্ত/ নব নব সৃষ্টিকে দৈত্য-দানব করে নিষ্ঠুর আঘাত অবিশ্রান্ত।’ এ লেখা যখন লিখছি, তখন সাগর-মহাসাগের ভিড় করা কোনো যুদ্ধজাহাজ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার আকাশে উড়ে গিয়ে বোমা মেরে আসছে, নেহাত মানুষ মারার জন্য! যাতের হাতে যুদ্ধবিমান নেই। যাদের হাতে অস্ত্র হাজির নেই। এমনকি স্টেনগানের বিপরীতে একটি রক্তগোলাপ ফেলে দেওয়ার মতো গোলাপ ফুলের চাষযোগ্য কোনো জমিনও নেই। ফলে সাগরে আমার আর আগ্রহ নেই। সাগর এখন মানুষ নামক দৈত্য-দানবের দখলে, যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুর আঘাত চলে অবিশ্রান্ত!আমি যতগুলো সাগরতীরে গিয়েছি, সাগর বলেছে এসো, পারলে ঝাঁপ দেও, নাহলে তীরে যেয়ে দাঁড়াও– দেখবে একটি লাল পিঁপড়া ছটফট করছে বালুর ভেতরে, তখন তুমি বুঝতে পারবে যতগুলো গোলাপ-জাহাজ ভিড়েছে ভূমধ্যসাগর তীরে, সেসব আসলে যুদ্ধের জন্য, মানুষকে কামড়ে দেওয়ার জন্য নোঙর করেছে সাগরে। 
আমার বন্ধু সাগর যেমন তার প্রেমের সাগরে আজ ক্লান্ত, পর্যুদস্ত। হাল ভেঙে হারানো নাবিকের মতো দিশা। আমারও– সাগর সম্পর্কে জন্মেছে কিছুটা বিবমিষা। সাগর এখন আর জ্যোৎস্নার পরিভাষা নয়। সাগর এখন আর কারও ব্যক্তিগত অনুভূতিপর্ব নয়। সাগর এখন যুদ্ধের মেটাফোর। সাগর এখন পুরোপুরি ধ্বংসের কারিগর। যে সাগরকে আমি এত অভিসম্পাত দিচ্ছি, সাগরের কী দোষ? মানুষ সাগর রচনা করেছে। মানুষ সাগরকে যুদ্ধে নামিয়েছে। এক মানুষ সাগরের জল খেয়ে বাঁচে। আরেক মানুষ সাগরে জল খেতে না পেরে মরে। আরেক মানুষ সাগরে জল খাবার জন্য তাড়ি খায়, যাতে অধিকাংশ মানুষ জলবিহীন তৃষ্ণায় মরতে পারে। সেজন্য সে সাগরে রণতরী পাঠায়। কিন্তু সাগর মরে না, মানুষের সাগর মরে যায়– এই নির্মম কথাটি বলার জন্য, হয়তো এখনও কবির একটি ব্যক্তিগত সাগরের জন্ম হয়। 

আরও পড়ুন

×