ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

আমি দেখে এলাম তারে

সাগর সঙ্গমে

আমি দেখে এলাম তারে

সাগর সঙ্গমে

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৩১

মানুষের জগৎ অমরাবতী। তার যা সত্য ঐশ্বর্য, তা দেশে কালে পরিমিত নয়। নিজের জন্য নিয়ত মানুষ এই যে অমরলোক সৃষ্টি করছে তার মূলে আছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা করবার অসীম সাহস। আমরা শৈশবে কৈশোরে, এমনকি স্কুল-কলেজের সীমানা ছাড়িয়ে যখন পড়ালেখা করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখনও বারবার মনে হয়েছে, একদিন সমুদ্রের স্বাদ নিতে হবে। যেতে হবে তার হৃদয় দুয়ারে। শুনতে হবে তার হৃদয়ের কথোপকথন। তার হাতছানিতে সাড়া দিতে গিয়েছিলাম কক্সবাজারে। হাতছানি উপেক্ষা করতে পারিনি। সত্তর দশকের মাঝামাঝি গিয়েছিলাম সমুদ্র দর্শনে।  
নেমেছিলাম সমুদ্রে আরও জনাকয়েকের সঙ্গে বুকপানিতে। প্রচণ্ড ঢেউ বেশিদূর এগোতে দেয়নি। দিলেও যেতাম না। সফরসঙ্গী দুইজন ছিলেন আমার কলেজের সহপাঠী। কক্সবাজার সমুদ্রতট অথবা সি বিচ যা-ই বলি না কেন, এত দীর্ঘ যে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই বলে জেনেছিলাম। সি বিচে গিয়ে উত্তর-দক্ষিণ যেদিকে দৃষ্টি ফেরাই, শুধু দেখি সমুদ্রের ঢেউ নেচেগেয়ে চলেছে আপন অঙ্গনে। আলয়ে। ভ্রামণিকদের ভেতরে দেখলাম মাত্র জনাকয়েক বিদেশি। যারা সমুদ্রকে একাধিকবার দেশে-বিদেশে দেখেছে কিন্তু সেদিন সমুদ্র স্নানে জনাকয়েক তরুণী স্বল্পবসনে সমুদ্রে নামার আগেই দেখলাম স্থানীয় যুবকরা একভাবে তাকিয়ে আছে। এককথায় বলা যেতে পারে আমাদের কক্সবাজার কিংবা অন্য জেলার ছেলেরা, যেভাবে তাকিয়ে দেখছিল সেটি দৃষ্টিকটু। 
পড়ালেখা শেষ করে কিছুদিন খণ্ডকালীন কাজ করেছিলাম একটি দৈনিক পত্রিকায়। এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ বেতারে কিছু ম্যানিউস্ক্রিপ্ট লিখে পেতাম ২৫ টাকা। সাল ১৯৭২ এবং ১৯৭৩, ১৯৭৪ সালে একটি প্রাইভেট ফার্মে যোগ দিয়েছিলাম, সেখানে কয়েক বছর চাকরি করে ১৯৮০ সালে চাকরি পেলাম বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থায়। জনসংযোগ নির্বাহী পদে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা সংক্ষেপে বিসিক। সেই বিসিকে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবার আগে আমার প্রকাশিত গল্প এবং কবিতার কাটিং নিয়ে গিয়েছিলাম, উপরন্তু সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরীর একটি প্রশংসাপত্র। বিসিকের চেয়ারম্যান ছিলেন মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন (সিএসপি)। তিনি এবং বোর্ডের অন্য পরিচালকগণ, আমার লেখালেখির সঙ্গে কমবেশি পরিচিত ছিলেন বিধায় জনসংযোগ নির্বাহীর চাকরিটা জুটে গেল। 
প্রায় দশ মাস পরে নেদারল্যান্ডস সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৮১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে চলে গেলাম ফিলিপাইনে, ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণসংযোগ’ বিষয়ক লেখাপড়ার জন্য। বেশ কয়েক মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, বিদেশি এবং স্বদেশি ছেলেমেয়ে নিয়ে ম্যানিলা থেকে ৩০০-৩৫০ কিলোমিটার দূরে, ৭ অক্টোবর বুধবার আমরা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বাগিও সিটিতে যাব। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৪০০ পেসো হাত খরচ দিল। বাগিওতে নিয়ে পাইনস হোটেলে আশ্রয় পেলাম। অদূরেই সুলু সাগর। হোটেল থেকেই সমুদ্রের গর্জন শোনা যেত। 
দিন তিনেক পরে লা ইউনিয়ন গেলাম সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে– বাগিও থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে। গিয়ে দেখি হাজার হাজার নারী-পুরুষ। কেউ কাউকে লক্ষ্য করছে না, কেউ কেউ বক্ষবন্ধনী না পরেই সমুদ্রে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। ইতোমধ্যে আমার বান্ধবী মিরসা জিন অ্যাবন ইচ্ছাকৃতভাবে তার এক মাস্তি স্যান্ডেল সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আমাকে অনুরোধ করল, আমি যেন স্যান্ডেলটি এনে দেই, আমি যাব কি যাব না যখন ভাবছিলাম, ঠিক তখন আমাকেই জোর করে সমুদ্রে নামতে বাধ্য করল। বান্ধবীর হাত ছাড়াতে পারলাম না। বেশ অনেকক্ষণ দুজনাই সমুদ্রের উষ্ণ পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করতে করতে কখন যেন মিরসা জিনের স্যান্ডেল অনেক দূরে, দৃষ্টির অন্তরালে চলে যাবার ফলে জিন অ্যাবন স্বল্প বসনেই তীরে ওঠে, আর একখানি স্যান্ডেল নিজেই সুলু সাগরে ফেলে দিয়ে আমাকে একটি উষ্ণ চুম্বন দিয়ে জানাল, তোমাকে এবং তোমার বন্ধু নেপালের যুবরাজকে নিয়ে আমরা সমুদ্রপথে জাহাজে চড়ে যাব মিন্দানাও আমাদের বাড়িতে। 


মিন্দানাও মালয়েশিয়ার বর্ডারে। বাগিও থেকে একদিন আমরা তিনজন সমুদ্রপথে মিন্দানাও গেলাম, নেপালের যুবরাজ দুঃখ করে বলল আমাদের নেপালে তেমন কোনো বড় নদী নেই, সমুদ্র তো দূরের কথা। মিন্দানাও পৌঁছাতে প্রায় ১৫ ঘণ্টা সমুদ্রের ভেতরে থাকতে হলো আমাদের। মিরসা আগেই জানিয়েছিল তার পিতামাতাকে আমাদের যাবার কথা। জাহাজঘাটে দেখলাম এবং পরিচিত হলাম মিরসার বাবার এবং বড় ভাইয়ের সঙ্গে। মিরসারা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাদের আচার-আচরণে আমার ও যুবরাজের খুব ভালো লেগেছিল। মিন্দানাও মুসলিম অধ্যুষিত হলেও দুই সম্প্রদায়ের ভেতর কোনো প্রকার রেষারেষি নেই বলেই আমার মনে হয়েছিল। মিরসা একটি মুসলিম ছেলেকে ডেকে এনে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে জানাল– ও হবে ভবিষ্যতে ... পরের কথাটুকু না বললেও আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। ছেলেটি স্থানীয় একটি কলেজের অধ্যাপক। দিনকয়েক ভালোই কাটানোর পরে আবার ফিরে এলাম বাগিওতে। বাগিওতে হোটেল পাইনসে পরিচয় হয়েছিল একজন ফরাসি মহিলার সাথে, সঙ্গে তাঁর স্বামীও ছিলেন। যখন জানতে চাইলেন আমি কোন দেশের– বললাম বাংলাদেশের। স্বামী ভদ্রলোক জানালেন, তোমাদের দেশে ১০ বছর আগে যুদ্ধ হয়েছিল, তোমরা পাকিস্তানিদের পরাজিত করেছিলে। তোমাদের জাতির পিতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের আর্মিরা। তিনি থামতেই আমি জানতে চাইলাম, আপনার পেশা কী, তিনি জানালেন সাংবাদিকতা এবং ফরাসি দেশে একটি টিভি চ্যানেল আছে। যথারীতি বাগিওতে যে কয়দিন ছিলাম, সেই পাইনস হোটেলে অধিকাংশ রাতেই আমাকে যেতে হতো ‘ডিসকো’ পার্টিতে। সেই পার্টিতে দেখলাম অনেক বিদেশি জাহাজের নাবিকদের। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে পীত সাগর পাড়ি দিয়ে ম্যানিলায় দিনকয়েক থেকেই ছুটে আসতেন বাগিও সিটিতে। ম্যানিলার চেয়ে এখানে সবকিছুই লভ্য এবং বেশ সস্তা। হোটেল সুল্তে পার্টি দিল বিশ্ববিদ্যালয়।
ম্যানিলায় যাবার মাত্র ২৫ দিন আগে আগস্ট মাসের ৭ তারিখে বিয়ে হয়েছিল আমার। দেখতে দেখতে বেশ অনেকগুলো মাস কেটে গেল। দেশে ফিরলাম ডিসেম্বর ১৯৮১ সালের শেষ সপ্তাহে। বেশ হইচই করেই সময় কাটছিল বিশেষত, জনসংযোগ বিভাগের নির্বাহী থাকার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকরা আমার রুমে এসে আড্ডা জমাতেন, বিশেষত ঐ সকল সাংবাদিকের অনেকেই ছিলেন বন্ধু। ১৯৮৪ সালে বিসিক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনকে অন্যত্র বদলি করলেন। পরিবর্তে এলেন আরেক সিএসপি মুশফিকুর রহমান। রেডিও-টেলিভিশনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকায়, চেয়ারম্যান মহোদয় একদিন বললেন– টেলিভিশন নিয়ে কক্সবাজারে যেতে হবে। সেখান থেকে যাবেন কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ইসলামপুর, মগনামা। ঐ সকল এলাকায় লবণ চাষের একটি সচিত্র প্রতিবেদন বিটিভিতে প্রচার করতে হবে। পারবেন? জি স্যার পারব।
নিজের রুমে ফিরে এসে বিটিভির নিউজ বিভাগের প্রধান কবি ফারুক আলমগীরকে ফোন করে তাঁকে অনুরোধ করলাম, আপনাদের চট্টগ্রামের যে টিভি ইউনিট আছে, সেই ইউনিটের ক্যামেরাম্যান ও ক্যামেরা নিয়ে আমার সাথে যেতে হবে কক্সবাজার। সেখান থেকে যাব বিসিকের লবণ প্রকল্পে। কুতুবদিয়া, বিসিকের নিজস্ব স্পিডবোটে যাওয়া-আসা। ফারুক ভাই সব শুনে শেষে বললেন, আমিও যাব। 
ফারুক ভাই তাঁর প্রিয় বন্ধু কবি রফিক আজাদকে, চট্টগ্রাম কক্সবাজারে যাবার কথা শুনে তিনি আমাকে ফোনে জানালেন, তুই আর ফারুক নাকি কক্সবাজারে যাচ্ছিস। আমি তোদের সাথে যাব, আমি রফিক ভাইকে বললাম, সে তো খুশির কথা। অমুক দিন দুপুরের ট্রেনে আমরা কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠব। আপনি যথারীতি স্টেশনে থাকবেন। তিনি তখন ছিলেন সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকার সম্পাদক। যথারীতি ট্রেনে আমরা রাত ৯টার দিকে গিয়ে নামলাম চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে। চট্টগ্রাম অফিসকে বলা ছিল। যথারীতি স্টেশনে জিপ পেয়ে গেলাম এবং চট্টগ্রাম বিসিকের তৃতীয় তলার দুটি ভিআইপি সিটে ফারুক ভাই এবং রফিক ভাইয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল আর চট্টগ্রামের বিটিভি ক্যামেরাম্যান তাঁর সহকারী আমরা তিনজন অন্য আলাদা দুটি রুমে রাত যাপন করলাম। পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরেই আমরা বিসিকের নতুন একটি জিপে কক্সবাজার পৌঁছালাম। পরের দিন সাতসকালে আমি বিটিভি ক্যামেরাম্যান এবং তাঁর সহকারী কুতুবদিয়ার লবণ প্রকল্পের কাজ শেষ করে সন্ধ্যার আগে কক্সবাজার ফিরে এসেই আমাদের প্রকল্পের প্রটোকল অফিসারের হাতে এক হাজার টাকা দিয়ে বললাম ভালো একট হুইস্কি নিয়ে এসো। যথারীতি রাতের খাবার শেষ করেই রফিক ভাই ফারুক ভাই আর আমাকে বললেন— আজ সমুদ্রপাড়ে বসে এই জোসনারাতে হুইস্কি খাব তোরা আমার সঙ্গে চল। রাত ১০টার পরে ড্রাইভারসহ গেলাম সি বিচে। চারদিক ফুটফুটে জোছনা সাগরের ঢেউয়ের সাথে নাচতে নাচতে চলে এলো এবং চলে গেল, আবার এলো। দৃশ্যটি ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। রাত যত বাড়তে লাগল, সেই রফিক ভাইয়ের উন্মত্ততা বাড়তে লাগল। এক পর্যায়ে সমস্ত জামাকাপড় খুলে তিনি জনাকয়েক কবিকে গালাগালি শেষে বললেন, আমি সমুদ্রে ভেসে যাব, কথা বলেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সমুদ্রে। আমি, ফারুক ভাই, আমার ড্রাইভার কোনো রকমে টেনে তুললাম জিপের পেছনে। আরও অনেক গালাগালি সহ্য করতে হলো, কেন তাঁকে আমরা টেনে ওঠালাম, যা হোক, সমুদ্রের স্বাদ যদি কেউ পেতে চান– তাঁকে আমি অনুরোধ করব– তিনি আরনেস্ট হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান ইন দ্য সি’ উপন্যাস পাঠ করলে জানবেন সমুদ্রের নানা কাহিনি। 

আরও পড়ুন

×