আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত; প্রতি বছরের ১ মে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১ মে জাতীয় ছুটির দিন।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকের কথা। শ্রমিকরা তখনও শোষিত, সপ্তাহে ছয় দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রম করতেন, কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগণ্য মজুরি। অনিরাপদ পরিবেশে রোগব্যাধি, আঘাত, মৃত্যুই ছিল তাদের নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে বলার মতো কেউ ছিল না তখন। ১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানান। কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এ দাবি জোরালো করা সম্ভব হয়নি। ১৮৮৬ সালের ৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হন। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এদিন পালিত হয় না। পরে ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে ১ মে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনে সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে শ্রমিকদের হতাহতের আশঙ্কা না থাকলে বিশ্বজুড়ে সব শ্রমিক সংগঠন ১ মে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ রকম শ্রমিক আন্দোলন হয়। শ্রম আইন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষের জের ধরে ফ্রান্সে আন্দোলন করেছেন শ্রমিকরা। গত অক্টোবরে এ ধর্মঘট ক্রমে ক্রমে শক্তি অর্জন করে। একপর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে শামিল হয় ছাত্র ও তরুণরা, যা শাসকদের ষাটের দশকের মে অভ্যুত্থানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি তেল শোধনাগারের শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছিলেন ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নতুন চুক্তির সঙ্গে একমত হতে না পেরে শ্রমিক সংগঠন ইউনাইটেড স্টিলওয়ার্কার্স ইউনিয়নের (ইউএসডব্লিউ) ডাকে এ ধর্মঘট পালিত হয়েছিল। ১৯৮০ সালের পর এ খাতে এটিই যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় ধরনের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট। তখন ধর্মঘট ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না বলে দাবি করেছিল শ্রমিক সংগঠনটি।

এ ধর্মঘট তেলের অস্বাভাবিক কম দামের কারণে বিপদে থাকা তেল কোম্পানির জন্য বিষফোড়ার মতো। ইউএনডব্লিউ যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫টি শোধনাগারের শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। এ শোধনাগারে দেশটির মোট তেলের প্রায় ৬৪ শতাংশ উৎপাদন করা হয়। এর আগে ১৯৮০ সালে এ খাতে তিন মাস ধর্মঘট চলেছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্লাটিনাম উৎপাদনকারী কোম্পানির অ্যাংলো আমেরিকা প্লাটিনামের খনি শ্রমিকরা ২০১২ সালে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে তিন সপ্তাহ ধরে অনানুষ্ঠানিক ধর্মঘট পালন করেছিলেন। এরই জের ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার ১২ হাজার খনি শ্রমিককে বরখাস্ত করে কোম্পানিটি। ওই কোম্পানির কর্তৃপক্ষ বলেছিল, শৃঙ্খলা রক্ষার শুনানিতে হাজির হতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে একই বছরের আগস্ট মাসে ধর্মঘটরত প্লাটিনাম খনি শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি করলে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিহত হন। স্পেন ও পর্তুগালে ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর পালিত হয়েছিল সাধারণ ধর্মঘট। কর্মবিরতি পালন করেছিলেন গ্রিস ও ইতালির শ্রমিকরা। চার দেশের শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছিল বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। এতে বিভিন্ন দেশের শিল্পকারখানা অচল হয়ে পড়ে। বাতিল হয়েছিল ইউরোপের সাত শতাধিক ফ্লাইট। ২৩টি দেশের প্রায় ৪০টি সংগঠন আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। চার দেশে একযোগে ধর্মঘট পালনের ঘটনা ইউরোপে এটিই ছিল প্রথম।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সংহতি রেখে নূ্যনতম মাসিক মজুরি ১৮ হাজার রুপি করা এবং শিল্পকারখানা বেসরকারীকরণ ঠেকানোসহ ১৪ দফা দাবিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট পালন করেছেন সেবা খাতের লাখ লাখ শ্রমিক। দেশটির অন্যতম ১০টি শ্রমিক সংগঠনের ডাকে এ কর্মসূচি পালিত হয়। ১৫ কোটির বেশি শ্রমিক এ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে সংগঠনগুলোর দাবি। এবারের মে দিবসও করোনাদুর্যোগের মধ্যে এসেছে। প্রেক্ষাপট যাই হোক- আমরা প্রত্যাশা করব, সব স্তরের শ্রমিকের জীবন হোক সুন্দর এবং তাদের শ্রমে-ঘামে যে সম্পদের সৃষ্টি এর বণ্টন হোক ন্যায়ভিত্তিক।
গণসংগীতশিল্পী

বিষয় : শ্রমজীবীর গল্প

মন্তব্য করুন