- ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একটি ঘটনার কথা আমি বলতে পারি। প্রথমটা হলো আমরা তখন গ্রামে পালাচ্ছি, আমাদের বাড়িটা ছিল রাস্তার পাশে। আমার এক চাচাতো ভাই মুক্তিযুদ্ধে যায়। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে একবার গ্রেনেড মারতে গিয়ে ধরা পড়ে। সেদিন রাতে আমরা জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলাম। ধরা পড়ে সে মা মা করে চিৎকার করছিল আর পাকিস্তানি আর্মি তাকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাচ্ছিল। তাঁর মা-বাবাও ছিল সেখানে; কিন্তু আমরা কোনো কথা বলতে পারিনি। আমাদের চুপ করে থাকতে হয়েছিল। এই ঘটনাটি আমাকে এখনও তাড়িত করে।
- প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
প্রথম বই প্রকাশ হয় ১৯৭৭ সালে, একটি গবেষণামূলক বই। এ বইটি প্রকাশের পর আমি প্রভূত আনন্দ পেয়েছিলাম। বই প্রকাশ, বই লেখা- এগুলো যে এত আনন্দ দেয় মানুষকে, আমি প্রফুল্ল অনুভব করি এবং সংকল্প করি আমি লিখব।
- কোন বই বারবার পড়েন? কেন?
আমার লেখা রবীন্দ্রনাথের 'ব্রহ্মভাবনা' বইটি আমি বারবার পড়ি। এটি প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার পেয়েছিল। এটি বারবার পড়ার কারণ হলো রবীন্দ্রনাথের বাস্তবিক, বস্তুবাদী, দাম্ভিক দর্শনের আলোকে আমি ব্রহ্মকে ব্যাখ্যা করেছি এবং পাঠক এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেছে।
- এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
প্রাচ্য নন্দনতত্ত্ব নিয়ে একটা নতুন ধরনের বই লেখার পরিকল্পনা আছে। আমরা তো সাধারণত পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্বের বই পড়ি। আসলে এটা হবে আমাদের বাংলা সাহিত্যের কোনো নন্দনতত্ত্ব আছে কিনা থাকলেও তার অবস্থাটা কী, সেটা কী রূপ ধারণ করে আছে তা আবিস্কারের প্রচেষ্টা। আরেকটা পরিকল্পনা হলো বাংলা কবিতার ধারাবাহিক খণ্ড খণ্ড আকারে নির্বাচিত সংগ্রহ প্রকাশ করা। প্রাচীন যুগ থেকে একুশ শতক পর্যন্ত। একশ/দেড়শ পৃষ্ঠার বই হবে। একটা সিরিজ বই হিসেবে যাবে। এছাড়া একুশ শতকে কথাশিল্পের দুই দশক কেটে গেছে। কথাশিল্প নিয়ে আমার একটা জাজমেন্ট দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
- ব্যক্তিজীবনের এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধতা তেমন নেই; তবে আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু- আমার পাঁচ ভাইবোন মারা গেছে, এগুলো আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমি কিন্তু মাতৃহারা মেয়ে। খুব ছোটবেলায় মা হারিয়েছি, আমার মায়ের কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। নিজেকে একধরনের অন্তঃনিঃস্ব মনে করি আমি, যখন একাকী থাকি, নিজেকে খুব একলা এবং ছন্নছাড়া মনে হয়। এটা আমাকে খুব ধাবিত করে। আমি আসলে মানুষ হিসেবে খুব অন্তর্মুখী এবং একলা।
- আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
শক্তিশালী দিক হলো আমার পরিশ্রম এবং সততা। আমি এ দুটিকেই আমার জীবনের শক্তি হিসেবে মনে করি। আমি যে কাজই করি না কেন, আমি সততার সাথে করার চেষ্টা করি।
- নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?
আমি অন্তর্মুখী বলতে বুঝিয়েছি আমি নিজের মধ্যে নিজের সাথে অন্তর্মুখী, যখন সামাজিকভাবে থাকি, তখন সবার সাথে আন্তরিকভাবে মুক্ত মনে মিশি। দেখা যা যে, আমি কথা বলছি এবং পরিবেশের সাথে আমি যুক্ত থাকছি, সেখানে আমি অন্তর্মুখী নই। তবে আমার সম্পর্কে অভিযোগ তেমন শুনিনি। আমি মানুষকে বিশ্বাস করি এটা লোকে বলে। বিশ্বাস করে ঠকি; কিন্তু আমি বিশ্বাস করি।
- নিজের সম্পর্কে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসাবাক্য কোনটি?
প্রশংসা বাক্যের মধ্যে একটি হলো অনেকে বলে আমি পুরুষের মতো গদ্য লিখি। আমি বলি- না, আমি লেখকের মতো গদ্য লিখি। আরেকটা হলো মননশীল ধারায় যে লেখালেখি করি এটি খুব প্রশংসিত লেখকদের দ্বারা। আমি কিন্তু শুরুতে সৃজনশীল ধারায় ছিলাম। কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস এগুলো লিখতাম। যখন গবেষণা ধারায় আসি, তখন থেকে আমার প্রকাশিত সকল লেখা হচ্ছে মননশীল ধারার। এর জন্য আমি প্রশংসা পাই।
- কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
আমি শিক্ষকই হতে চেয়েছিলাম। এটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। আমি অন্যসব চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতায় যোগদান করেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আমার চিন্তা-চেতনা, দেশ-জাতি-সমাজ-মানুষের জীবন নিয়ে যে ভাবনাগুলো আছে, সেগুলো আমি ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। সাহিত্যের মাধ্যমেই এটি সম্ভব। সাহিত্য এমন একটি বিষয় যা সবকিছুকে ধারণ করে। এখানে সমাজনীতি আছে, নাট্যনীতি, ধর্ম আছে, ইতিহাস আছে। জীবনের একটা সার্বিক বিষয় না জানলে সাহিত্য পড়া যেত না। এবং সাহিত্য বোধ যদি দশজন ছাত্রের মধ্যে জাগাতে পারি, সেই দশজন শিক্ষকতায় গিয়ে আরও দশজনের মাঝে জাগাবে, এভাবে সমাজে আমাদের চেতনশীল, সংবেদনশীল মানুষের সংখ্যা বাড়বে- এটাই আমার লক্ষ্য ছিল। আমি আমার লক্ষ্য পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সততার সঙ্গে।
- আপনার প্রিয় উদ্ধুতি কোনটি?
রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের কথা মনে আসে। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি হচ্ছে- 'জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণা ধারায় এসো'
আর জীবনানন্দের পঙ্‌ক্তি হচ্ছে- সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়?' এ দুটি উদ্ৃব্দতি আমার মাথায় ঘোরাফেরা করে।
- জীবনকে কেমন মনে হয়?
জীবন আমার কাছে মধুর। সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা মিলিয়ে জীবন খুব অপূর্ব। জীবন আমরা একবারই পাই এবং এই জীবনের প্রতি ভালোবাসা, এই জীবনের প্রতি প্রগাঢ় মমতা আমি খুব বেশি অনুভব করি। এবং অন্যের জীবনকে আমি খুঁটিয়ে দেখি। জীবনকে কতটা মমতা, কতটা সততা দিয়ে, মাধুর্য দিয়ে ভরিয়ে তোলা যায়- সেটিই আমার উদ্দেশ্য। জীবন আমার কাছে মধুর।

বিষয় : আপন দর্পণ

মন্তব্য করুন