-ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
-- আমি মিথুন রাশির আদর্শ জাতক। কোনো বিশেষ ঘটনায় আটকে পড়ার চরিত্র আমার নয়। আমি বায়ুর মতো অস্থিতিশীল। আমার অভিভূতি ক্ষণস্থায়ী। কোনো অখণ্ড পাথর কেটে নয়, বরং অনেকানেক নুড়ি-পাথরের জোড়াতালিতে আমার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে।
-আত্মপ্রকাশলগ্নে কেন প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে?
--সর্বার্থে আমি একজন 'মাইনর' লেখক। একজন মাইনর লেখকের আত্মপ্রকাশের কীইবা প্রতিবন্ধকতা! বরং প্রকাশের যত সুযোগ আমার জন্য অবারিত ছিল ও আছে, সে তুলনায় আমার লেখালিখির পরিমাণ সামান্যমাত্র। অনেকে আমাকে কর্মবীর হিসেবে আখ্যায়িত করেন; তাদের মুখে ফুলচন্দন পড়ূক। আমি প্রকৃতপক্ষে আলস্যে আক্রান্ত মুখোশধারী মানুষ।
-প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
--প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ আমার সম্পাদিত 'জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র'। তখন বুঝতে পারিনি ১৯৯০-এর বইমেলায় প্রকাশিত এই গ্রন্থ আমাকে সারাজীবনের জন্য জীবনানন্দ-গবেষণায় আটকে ফেলবে। তবে জানবেন, সমকাল পত্রিকার ঈদসংখ্যায় (২০২১) আমার প্রথম উপন্যাস 'দুর্দানা খানের চিঠি' প্রকাশিত হওয়া আমার জন্য রোমহর্ষক ঘটনা।
-কোন বই বারবার পড়েন- কেন?
--শিবনারায়ণ রায়ের 'কবির নির্বাসন ও অন্যান্য ভাবনা' গ্রন্থটি আমাকে বাংলায় আন্তর্জাতিক মানের প্রবন্ধ লিখতে শিখিয়েছে। ১৯৭৮-এ ঢাকার নীলক্ষেত থেকে ১০ টাকায় কেনা এ গ্রন্থটি আমি জীবনে অসংখ্যবার পড়েছি। এখনও পড়ি মাঝে মধ্যে। আমার গদ্যের সুর ঠিক রাখতে এ বইটি সাহায্য করে। আহমদ ছফার ফাউস্ট-এর অনুবাদ পড়ি। অভিভূত হই। বারবার অভিভূত হই। কী অসাধারণ একটি কাজ!
-এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
--কোনো বাংলা অভিধানে নেই অথচ গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধে আছে এ রকম ১ হাজার শব্দের একটি শব্দসংকলনের চূড়ান্ত সম্পাদনা করছি। আরও চার-পাঁচ মাস লেগে যাবে। অতিসম্প্রতি দ্বিতীয় একটি উপন্যাসের গোড়াপত্তন হয়েছে; তিন-চারটি গল্পের বীজ মাথায় ঘুরছে।
-ব্যক্তিজীবনের এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
--২০০১ সাল পর্যন্ত তোতলামির কারণে আমি জনসমক্ষে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সক্ষম ছিলাম না। ফলে আমাকে নিশ্চুপ থাকতে হয়েছে; এর ফলে আমার স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন হ্রাস পেয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দুর্বলতার কথা আজ প্রথম স্বীকার করছি। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ বা কোনো বন্ধু বা অন্য কেউ এই সীমাবদ্ধতার কথা জানে না। অন্য যা যা এখনও কষ্ট দেয় তা হলো দ্রুত অভীষ্ট বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, স্মৃতিশক্তিহীনতা।
-আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
--অপার কৌতূহল, বিশ্নেষণী শক্তি, যে কোনো সমস্যার মূল কারণ নিরূপণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সেই সঙ্গে উদ্যম আমাকে পদে পদে সাহায্য করেছে। আমি কম সময়ে বেশি কাজ করতে সক্ষম হয়েছি।
-নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?
--আমি রাগী স্বভাবের মানুষ; রগচটা বললে অন্যায় হবে না। মানুষের গর্দভজাতীয় কর্মকাণ্ড আমাকে রাগিয়ে দেয়। রাগ সহজে ক্রোধে রূপান্তরিত হয়। ক্রোধ মানুষের কর্মদক্ষতা হ্রাস করে। কেউ কেউ আমাকে অহংকারী বলেন। কিন্তু সেটা অভিনয় মাত্র। বাগাড়ম্বর করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে মজা পাই মাত্র।
-নিজের সম্পর্কে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসা বাক্য কোনটি?
--এ ক্ষেত্রে আমি সৌভাগ্যবান। প্রিয়জনরা প্রশংসা করে আমার অধঃপতন ত্বরান্বিত করতে চাননি। অনেক মানুষ আমাকে সহমর্মী ও করুণাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করেছেন; তারা দূরের মানুষ।
-কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
--আমি পরিবেশের প্রতি রিয়্যাক্ট করে করে, প্রতিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে অগ্রসর হয়েছি। জীবন নিয়ে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কোনো আশা বা উচ্চাশা আমার জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেনি। সুযোগ এসে গেলে তার সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি মাত্র। উচ্চাশা না থাকায় অচরিতার্থতার গ্লানি তেমন কিছু নেই। বিচিত্র সব কাজে জীবন কেটে গেল। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বেঁচে থাকলে নতুন কী করব অনুমান করতে পারছি না।
-আপনার প্রিয় উদ্ধৃতি কোনটি?
--রবীন্দ্রনাথের 'এই যে পৃথিবী চেয়ে বসে আছে ইহারো মাধুরী বাড়াও হে', এই উপদেশ আমি প্রায়ই উচ্চারণ করি।
-জীবনকে কেমন মনে হয়?
--জীবন যদি একটি দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, তবে এর শেষ প্রান্তে লাল ফিতা অপেক্ষমাণ। ৬৫-এর কাছাকাছি বয়সে আমি এখন সেই লাল ফিতার আভাস দেখতে পাই। আমার সব অক্ষমতা ও অচরিতার্থতা, পাপ ও স্খলনের জন্য আমি দুঃখ বোধ করি। তবে দোকানের ঝাপ ফেলে দেওয়ার প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন করে এনেছি। এ কথা বলতেই হবে জীবনকে আমি উপভোগ করেছি যতভাবে সম্ভব। এতে সময়ের ও শক্তির অপচয় হয়েছে অনেক, যার জন্য আমি তিরস্কারের যোগ্য। দেরিতে হলেও আমার আত্মোপলব্ধি হলো- 'সময় নষ্ট করা মহাপাপ'।
গ্রন্থনা ::গোলাম কিবরিয়া

বিষয় : আপন দর্পণ ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

মন্তব্য করুন