বিশাল এক কাঠের হাতুড়ি কাঠের গজালে দুম দুম বাড়ি মারছে। তৈরি হচ্ছে দোতলা বাড়ির ফ্রেম। পঞ্চাশজন জনখাটা শ্রমিক ভারী লোহাকাঠের কাঠামোকে মোটা কাছি দড়ি দিয়ে বেঁধে দাঁড় করাবে। এর পর এটায় একে একে বসবে দরজা-জানালা, পাটাতন, বেড়া। বাড়ির ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে নাওয়া-খাওয়ার সময়টুকু বাদে সারাদিন ঘর তৈরির কাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িজুড়ে শুধু একটা শব্দই স্পষ্ট শোনা যায়- কাঠের গজালে কাঠের হাতুড়ির শব্দ দুম-দুম-দুম-দুম।
চমকে উঠে বসলাম। মোবাইলে মাত্র ছয়টা। দরজায় দুম-দুম শব্দ। আমি বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলাম। নানাবাড়ির দোতলা ঘর বানানোর স্মৃতি মার কাছ থেকে ধার করা। মা তখন মাত্র সাত বছরের। দুই বেণি দোলানো লাল ফ্রক পরা খুকি। অবশ্য নানাবাড়ি যখন গেছি, প্রাচীন দোতলা কাঠের বাড়িটা দেখেছি। বাড়ির পিছনের দিকে আম-জাম-কাঁঠালের বাগানের ভিতর একতলা ও দোতলায় আটটা বড় বড় ঘরসহ টিনের চালার বাড়িটা অতীতকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওপরতলার সব ঘর প্রায় বন্ধ থাকে। নিচতলায় একটা ঘরে নানা-নানি, অন্য একটা ঘরে ছোটো মামা থাকে। ছোটো মামা কবি। তাই হয়তো সদর রাস্তার পাশের তিনতলা টাইলস বসানো বাড়িটার নিজের অংশের ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে কাঠের ঘরেই থাকতে পছন্দ করেন।
আমি বিছানা থেকে নামতে নামতে পাশের খাটে রুমমেট ইলার দিকে তাকালাম। ঘুমবিভোর রক্তজবা চোখে তাকিয়ে ইলা অস্ম্ফুটে বলল, 'তুই খোল দরজা; নিশ্চিত অপু নিচে দাঁড়িয়ে আছে।'
আমার বুকের ভিতর শিরশিরানি শুরু হলো। আহ্‌! প্রায় সাত বছর পরে এই শিরশিরানি বোধ হয় বুকের মাঝে আজকাল। নিজেকে তখন কেমন অস্তিত্বময় মনে হয়। নরম হাতে ছিটকিনি খুললাম। দরজার সামনে হোস্টেলের সুইপার শেফালি খালা, তার এক হাতে ঝাড়ূ আরেক হাতে একটা স্লিপ। ইলার ধারণা ঠিক। আমার প্রত্যাশাও। মোবাইলে ফোন না দিয়ে স্লিপ পাঠানো অপুর অভ্যাস। শেফালি খালা বিপন্ন মুখে হড়বড় করে বললো, 'গেট দিয়া ঢুকতাছি, দারোয়ান স্লিপ দিয়া কইল, সিক্স-বি এর রিমি আপাকে দেও গিয়া; আমার কুনো দোষ নাই আপা। আমি ঘুম ভাঙাই নাই।'
আমি টেবিলের পার্স থেকে পঞ্চাশটা টাকা বের করে খালার হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, 'কোনো দোষ হয় নাই। তুমি কাজ করো গিয়ে।'
ইলা চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু চোখের তারা নড়ছে।
এখন ওকে পাত্তা দিলে খোঁচাতেই থাকবে। দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় এলাম ব্রাশ নিয়ে। সিক্স-সি এর সামনে স্টিলের খাঁচায় লাভবার্ডগুলো ডাকাডাকি করছে। খিদে পেয়েছে। সিক্স-ডি এর সামনে গাদাগাদি করে রাখা পাঁচটা টবে পাঁচ রঙের গোলাপ ফুলগাছ। আমাদের রুমের ডান দিকের সিক্স-এ এর বারান্দায় চারটা অর্কিড ঝোলানো বেগুনি লাল সাদা ফুল ঝুলে আছে। দেয়ালে ছবি। ওদের রুমের দু'জনেই চারুকলার ছাত্রী ছিলো; এখন একই ফার্মে কাজ করে। কানাঘুষা শোনা যায়- ওরা লেসবিয়ান। আমাদের রুমের সামনেটাই ছন্নছাড়া, শ্রীহীন। ইলার জানালার বাইরে একটা কাচঢাকা জুতার বাক্স। ওর খুব জুতার শখ। প্রায় বিশ জোড়া জুতা আছে তালাবদ্ধ বাক্সটায়। আমার জানালার বাইরে হোস্টেলের মালিককে অনুরোধ করে বড়সড় একটা আয়না আর বেসিন বসিয়েছি। আমাদের বাথরুমেও আয়না আছে। কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায় খোলা বহুবর্ণের আকাশের আলোর নিচে কংক্রিটের জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটির স্বস্তি আলাদা। বিশেষ করে ছুটির দুপুরে যখন সবাই নিকটাত্মীয়দের কাছে অথবা ডেটিংয়ে যায়; গভীর রাতে যখন সব ঘরের আলো নিভে যায়। পানির ঝাপটা দিয়ে গত রাতের শুস্ক অশ্রুর রেখা তোয়ালে ঘষে ঘষে মুছে ফেললাম। মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে চুল খোঁপা করে কাত হয়ে শুয়ে থাকা ইলার হাতে আলতো থাবড়া দিয়ে বললাম, 'বক্স ধুয়ে রেখেছি; দুপুরের লাঞ্চ এনে রাখিস কষ্ট করে। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।'
ইলা চমকে উঠে বসার অভিনয় করে বললো, 'কে? কে? ওহ্‌ তুই? কী ব্যাপার! এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস?'
ওর কথার রেশ কানে গুঞ্জরিত হতে হতে আমি পৌঁছে গেছি লিফটের কাছে।

অপু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। চোখ বসে গেছে। দশ দিন আগে শেষ দেখা হয়েছিলো। এর মধ্যে বোধহয় শেভ করেনি। দূর থেকেই লক্ষ্য করলাম। কাছে এসে ভালো করে তাকাই না। লাই পেয়ে যাবে। এমনিতেই যখন তখন ডাক দেয়। আমি সাড়াও দিই। এটাও এক ধরনের প্রশ্রয়। নিজের ব্যক্তিত্বহীনতাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছি যেন। কোনো অভিবাদন বা প্রিয় সম্ভাষণ নয়,
'কী রে, খুব ঘুমাচ্ছিলি?'
'আমি তোর মতো নিশাচর না, খেটে খেতে হয়।'
'সবাই-ই খাটে, খালি ধরনটা আলাদা।'
এখন কথা বললে অনেক কিছুই বলা যায়। দিন শেষ করে ফেলা যায়। একসময় এমন দিন পার করেছি, চোখের পলকের মতো দিন ফুরিয়ে গেছে, অন্য কোথাও, অন্য কারো সঙ্গে দাঁড়িয়ে। এখন বড় হয়েছি। দুর্ঘটনা বোধহয় মানুষকে বড় করে তোলে। কথা বাড়ালাম না। সকালে উঠে খুব একটা মন্দ হয়নি। শীত শীত বাতাস লাগছে। ঝরঝরে স্বচ্ছন্দ মনে হচ্ছে শরীর মন দুটোই। নাকি ওর কাছাকাছি থাকার স্বস্তি এটা! বুঝতে পারি না, ঘোরগ্রস্তের মতো ওর সঙ্গে হাঁটতে থাকি। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ও মৃদুস্বরে বলে, 'তোর চুলগুলো পোঁটলা পাকিয়ে রাখিস কেন?'
আমি এবার বিরক্ত চোখে তাকালাম, বুঝল ও। বলল, 'মানে বলতে চাইছিলাম, ছেড়েটেড়ে রাখতে পারিস। সুন্দর চুল তোর। অনেকের তো এই একটুখানি চুলেও কত স্টাইল করে!' ও ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ছোটো একটা রিং তৈরি করে দেখাল।
আমি বিদ্রুপের সুরে বললাম, 'তুই আজকাল আবার মেয়েদের চুল দেখাও শুরু করেছিস নাকি?' কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল ও। প্রসঙ্গ পাল্টে তাড়াতাড়ি বলল, 'আজ আমি তোকে নাশতা খাওয়াবো।' কোথাও সম্মানী পেয়েছে বোধহয়। এবার মুখ জ্বলজ্বল করছে আত্মবিশ্বাসে। কিছু মানুষ কত অল্পে খুশি হয়! 'তার আগে তোকে একটা জিনিস দেবো।' কিছুদূর এগিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে ও রাস্তার পাশের একটা নিমগাছে উঠে পড়ল। পকেট থেকে একটা অ্যান্টিকাটার বের করে দুটো ছোটো ডাল কেটে হাতে করে নামল। ডাল দুটোর ডগা থেকে ফুলসহ পাতা ভেঙে আমার হাতে দিয়ে বলল, 'শুঁকে দেখ, নিমফুলের গন্ধ কিন্তু তিতা না; মিষ্টি। অবশ্য রাতের বেলা বেশি টের পাওয়া যায়। আর দু-একটা ফুলে ভালো বোঝাও যায় না।'
ও ডাকলেই যে আমি সময় বের করে বেরিয়ে পড়ি, এটা বোধ হয় একটা কারণ। সারাদিন ব্যাংকে টাকাপয়সার হিসাব নিয়ে পড়ে থাকি রাত ৯টা পর্যন্ত। ইচ্ছে করে। তাড়াতাড়ি হোস্টেলে ফিরে করবোই বা কী! আমার দীর্ঘ অবসর মোটেই শেষ হতে চায় না। কাজের ভিতর থাকলে সময়ের কাঁটা দ্রুত ঘুরতে থাকে। আর আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি পরদিন ঘুম থেকে জেগে। যাক। আরেকটা দীর্ঘ দিন কেটে গেল। পরদিন আবারো সেই সময়ের শ্নথ গতিকে সামনে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা। শুক্রবারও সকালটা ভালো যায়। ধোয়া-কাচা, বাজারঘাট করা, বই কেনা। কিন্তু দুপুর বিকেল সন্ধ্যায় যেন কচ্ছপের পিঠে উঠে বসে থাকে সময়। আমার চোখ পানি ফেলতে ফেলতে শুকিয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বুক খালি হয়ে যায়। বারান্দায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি আকাশে একটা করে কালো পোঁচ পড়ে আর অন্ধকার গাঢ় হয়। পুরো অন্ধকার হবার আগেই কংক্রিটের জঙ্গলে ফুটে ওঠে শত শত আলোর ফুল। অন্যরা নিজেদের কাজ সেরে হোস্টেলে না ফেরা পর্যন্ত আমি ভূতগ্রস্তের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
অপু ডাকলেই মনে হয়, সময়ের পিঠে প্রজাপতির রঙিন পাখা লেগেছে। একটা অলিখিত ছুটির আহ্বান এসেছে অলৌকিক কোনো জগৎ থেকে। একটু প্রিয় ঘ্রাণ, শীতল হাওয়া।
ও আমার পাশে হাঁটতে হাঁটতেই অ্যান্টিকাটার দিয়ে চার টুকরো করলো ডালগুলো। একটা আমার হাতে দিয়ে বললো,
'এটা দিয়ে মাঝে মাঝে দাঁত মাজিস।'
'এটা দিয়ে! কী করে?' ছোটোবেলায় নানাকে দেখেছি নিমের দাঁতন ব্যবহার করতে। কিন্তু আমার কাছে এখনো এটা বিস্ময়- কী করে একটা শক্ত গাছের ডালকে কেউ মুখে পুরে দাঁতে ঘষতে পারে!
'প্রথমে ডালটার যে কোনো একটা দিক দাঁত দিয়ে ভালোভাবে চিবিয়ে নিবি, ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসবে।' অসম্ভব একটা প্রক্রিয়া, আমার দ্বারা সম্ভব নয়। কিন্তু ডালটা আমি হাতে নিলাম। ও আবার বলল, 'আমি চিবিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু থুথু লেগে যাবে।' ওর চোখ নামানো মাটির দিকে।
রাস্তার পাশের একটা টং হোটেলে ঢুকলো ও। ছোটো টেবিলের সামনে ছোটো একটা বেঞ্চ। পাশাপাশি বসলে হাঁটুতে লেগে যাবে। আমি উল্টোদিকের বেঞ্চিতে বসলাম। ও রাস্তার দিকে মুখ করে বসল। আমি এবার কথা শুরু করলাম, 'কাজটা কী করবি?'
এর আগেরবার যখন দেখা হবার সময় বলেছিল, একটা মাসিক পত্রিকায় কাজের কথা চলছে, মনস্থির করতে পারছে না। আমার চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, 'না রে, এই টিউশনি আর ফ্রিল্যান্সিংই ভালো। ওসব জায়গায় এত কম্প্রোমাইজ করতে হয়!'
ওর চোখের কোথাও একরত্তি লোভ নেই- না আমার শরীরের প্রতি, অথবা আমার রোজগারের প্রতি। এই জন্যই নিঃসংশয়ে ওর সঙ্গে বেরিয়ে পড়া যায়। সবসময় নিরাপত্তার মানসিক চাপ নিয়ে কারো সঙ্গে মেশা যায় না।
আমি খানিকটা সহানুভূতির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম, 'বাড়ি গিয়েছিলি এর মধ্যে?'
এবার ও বিরক্তিকর চোখে তাকাল। বলল, 'বাদ দে।'
আমিও আশ্চর্য হলাম। এসব কী বলছি আমি! ওদের দুই ভাইয়ের মধ্যে অপু ছোটো। বড় ভাই জেলা শহরের স্থানীয় একটা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। ইন্টার থেকেই ঢাকা শহরে, টিউশনি করে করে পড়াশোনা শেষ করেছে। ওর সঙ্গের অনেকেই নানা কায়দা করে এই বয়সেই প্রচুর টাকাপয়সার মালিক হয়েছে। রকম-সকম পাল্টেছে। কিন্তু গত ছয় বছর আগে ওকে যেমন দেখেছি, এখনও প্রায় তেমন নির্ভার, সাদাসিধা। শুধু ওর মুখের প্রথম যৌবনের আলতো লাবণ্য ঝরে গিয়ে মুখটা আরও পুরুষালি হয়ে উঠেছে। শুধু কথা বলার জন্য কথা বলা তো আমি ছেড়ে দিয়েছি সাত বছর আগে। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ছয় মাস আগে শাশ্বত রহমান যে ঝড় আমাকে দিয়ে গিয়েছিলো, তিন মাসের সেই ঝড়ে যেন শুকনো ডাল আর বয়সী পাতার মতো আমার সব প্রগলভতা, বিশ্বাস, সরলতা দুমড়েমুচড়ে ভেঙেচুরে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। আমার মানসিক দেউলিয়াত্বের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক ব্যালান্সও একেবারে শূন্য করে দিয়েছিলো শাশ্বত। আজ পিছনে তাকালে ভাবি, কী করে আমার শরীরটা বেঁচে গিয়েছিলো শাশ্বতের লোভের হাত থেকে! হয়তো মাদারীপুরের এক ছোটো শহরের আজন্ম সংস্কার আমাকে বড় বাঁচা বাঁচিয়েছিলো। হয়তো পরীক্ষার ফলাফলে প্রথম দিকে থাকার অবচেতন তাড়না আমাকে শুধু অনার্স ফাইনাল বা মাস্টার্স পরীক্ষা নয়; চাকরির পরীক্ষা পাসেরও কঠিন সিঁড়ি উতরে দিয়েছে। অপুও কম কথা বলে। তাই আমরা চুপ করেই থাকি বেশিটা সময়।
হোটেল থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটতে থাকলাম দু'জনে। প্রায় এক ঘণ্টা। এর মধ্যে ও আমাকে তিনটা কবিতা শোনালো। গত দশ দিনে লিখেছে। ওর প্রায় সব কবিতার প্রথম শ্রোতা আমি। মতামত তেমন দিই না। ও যেন নিজের সঙ্গে কথা বলে যায়। এসময় ওর মুখটাকে অপার্থিব লাগে।
'তোকে হোস্টেলের গেট পর্যন্ত ছেড়ে দিই, তোর ব্যাংকে যাবার সময় হয়ে গেল প্রায়।'
ওর চোখের কোণে হাসি চিকচিক করছে। আমি গেটে থামলাম। ও আমাকে পেরিয়ে এগিয়ে গেলো। আমার বুকটা হঠাৎ খুব খালি খালি লাগলো। এ রকম হয়। যতবার ও আমাকে হোস্টেলের গেটে ছেড়ে যায়, এ রকমই হয়।


আমি রিমিকে হোস্টেলের গেটে ছেড়ে দিয়ে একবারও পিছনে ফিরে তাকাইনি। অনেক ইচ্ছে করছিলো। তাকাইনি। রিমির অ্যাকাউন্টিং মাস্টার্স শেষ সেমিস্টারে আমার সঙ্গে পরিচয়। আশফাকের মাধ্যমে। আশফাক রিমির ক্লাসমেট। আমি তখন চারুকলায় অনার্স ফাইনালে। এরপর গত ছয় বছর আমরা অনেক পথ একসঙ্গে হেঁটেছি। কিন্তু কখনো ওর হাত ধরার সাহস হয়নি। একবার মানুষের বিশ্বাস ভেঙে গেলে সেই বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করা খুব কষ্টকর। ওকে বিশ্বাসে ভালোবাসায় ফিরিয়ে আনা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ।
বাড়িতে মায়ের জন্য নিমডাল পেড়ে দিতাম, গাছে উঠে। নিম পাতার বড়া করে দিতেন মা, কখনো নিম-বেগুন। রিমি বোধহয় কখনো নিম-বেগুন খায়নি।
নিজের হাত দুটোর দিকে তাকাই। কী অপদার্থ এই হাত দুটো! কখনো ওর হাত নিজের মুঠোয় চেপে ধরিনি। কখনো ওর ফোলা ফোলা আঙুল মুখে নিয়ে চুষিনি। এমনকি কখনো ওর মসৃণ ঘাড়ের দিকে ভালো করে তাকাইনি পর্যন্ত। যদি আমার চোখে একরত্তি কামনা দেখে, তখন থেকে ও আর আমার সঙ্গে দেখা করবে না, যোগাযোগ রাখবে না। তাই আমি এক খেলা বের করেছি। কয়েক দিন পরপর হঠাৎ করে ডেকে পাঠাই। কখনো সকালে, কখনো দুপুরে, কখনো বিকেলে। ও আসে। এটা যে আমার দিক থেকে একটা সচেতন খামখেয়ালি, তা ও বুঝতে পারে না। ও ভাবে, আমি সত্যিই এমন আগোছালো উদ্দেশ্যহীন। আমি ইচ্ছে করে এটা খেলি না। যদি রিমি এতটুকু আনুগত্য বা নিয়মের চিহ্ন পায়, সঙ্গে সঙ্গে আমার জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। সে জন্য অনেক ভেবেচিন্তে এতসব ছক কাটতে হয় আমাকে। আমি যখন ওকে হোস্টেলের গেটে ছেড়ে আসি, ওর চোখে না তাকিয়েও আমি দেখতে পাই ও আমার দিকে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছে- মুগ্ধ, বিস্মিত। ওর সেই মুগ্ধতার রেশ দশ দিন, বারো দিন, পনেরো দিন আমাকে ছুঁয়ে থাকে। আমার আর কখনো সত্যি সত্যি ওর আঙুল ছোঁয়া হয় না।