দুপুরটা ভীষণ কড়া। ঝাঁ ঝাঁ দুপুর। রোদের তাপেই কি যে যার মতো ছায়া খুঁজে ফিরছে? এরকম দুপুর যদি ডাকে, সেই ডাক ফেরানো যায় না। আমিও পারিনি। তাই মাটির দেয়াল দিয়ে তৈরি মামাবাড়ির উঠোন পেরিয়ে, আগুন-আগুন রোদ পেরিয়ে ঢুকে পড়ি বাগানে। শিশুবাগান। আরও কত রকম গাছ। গাছের জঙ্গল। এই জঙ্গল-গাছের দুপুর আমাকে ডাক দিল যেই, আমি চলে এসেছি। একটা রহস্যঘন বাস্তবতার মধ্যে পড়ে থাকা দিন ছিল আমার। অবশ্য, তখন আমি খুব ছোট, বড় হচ্ছিলাম মামাবাড়িতে। তো সেই জঙ্গল দুপুরের ডাক আমার ভালো লাগত। আমি হয়তো অপেক্ষাই করতাম, কখন দুপুর হবে, কখন দুপুর আমাকে ডাকবে জঙ্গল থেকে? সেই জঙ্গলে সারাদুপুর একলা আমার ভয় করত না? করত। একটু আধটু ভয়ই তো আমাদের ভালোই লাগে। ভয়ের একটা রাজ্য আছে। ভয় পেলে সেই রাজ্যের বাসিন্দা হওয়া যায়। ভয় পেলেই তো সাহসের দরকার হয়। তখন সাহসী হতেই ভালো লাগে। এখনও ভালো একটা দুপুর দেখলেই আমার মনে পড়ে, ঠিক এরকম একটা ছোটবেলা আমার সংগ্রহে আছে। দুপুরের কাছে আমি ঋণী হয়ে যাই। এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।
ঋণ কি আর শোধ করা যায়? প্রথম ঋণ তো আমার বাবা-মায়ের প্রতি। জন্ম দিয়েছেন। কত কষ্টে বড় করে তুললেন। সন্তানের সুখের জন্য বাবা-মা কী করতে পারেন, তার সঙ্গে জগতের আর কোনো কিছু করতে পারার তুলনা আছে? মা যে কী করেন তার সন্তানের জন্য, সন্তানের পক্ষে কোনোকালেও সম্ভব নয় সেই ঋণ পরিশোধ করার। পরিবারে ভাই বা বোনের যে ত্যাগ থাকে, সেই ত্যাগের বিপরীতে আমি অন্তত কিছুই করতে পারি না। অর্থাৎ, ঋণ আর পরিশোধ হয় না। দাদির কাছে যে মমতা, যে ভালোবাসা, অপত্য স্নেহ-আদর, যে ঋণ, তা আমি কীভাবে শুধরাব? নানির কাছে যে মমতা, যে ভালোবাসা, অপত্য স্নেহ-আদর, যে ঋণ, তা শুধরানো সম্ভব? মামাদের কাছে যে আদর, যে ঋণ, কোথায় পাব আর? ছোট কাকার কাছে যে স্বাধীনতার আনন্দ, তা আর কেউ দেয়নি তখন!
বাড়ির সামনে যে কুমার নদ, আমার অনেক ঋণ আছে কুমারের জলের কাছে। মধুপুরের মাঠের কাছে। গাড়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে, ঋণ আছে বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে। স্কুল বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে ঋণ নেই? শিক্ষকদের কাছে যে ঋণ, অল্প বেতনের চাকরি করতেন তারা, পড়াতেন, যাতে তাদের ছাত্ররা একদিন অনেক বেশি বেতনের চাকরি পায়। এ তো ত্যাগ। যদিও বাংলাদেশের মতো দেশে এই ত্যাগের মূল্যায়ন হয়তো হয়ই না, তবু শিক্ষকদের ত্যাগের কথা তো ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঋণ পরিশোধ করতে না পারি, সম্মান দেখতে পারি।
ঝিনাইদহ সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন শহীদুর রহমান। তিনি ষাটের দশকে 'বিড়াল' নামে একটা পরাবাস্তবধর্মী গল্প লিখেই বন্ধুমহলে খ্যাত হয়েছিলেন। শহীদ স্যার আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমি তার একজন ছাত্র, এটা ভাবতেও আমার ভালো লাগে। শহীদ স্যারের বন্ধুরা সব থাকেন ঢাকায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আহমদ ছফা, ফারুক আলমগীর, আবুল কাসেম ফজলুল হক, ইম্‌রুল চৌধুরী বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে বাংলা বিভাগ থেকে বের হওয়া ছাত্রছাত্রী সবাই। আমি কলেজে পড়ার সময় শহীদ স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি। সেই ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা আমার আছে?
উঠতি বয়সে খুব শৈলকূপায় যেতাম। কবি সুনীল শর্মাচার্যের কাছে আমার অনেক ঋণ আছে। সুনীল দা পরে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন, যেভাবে এদেশের অনেক অনেক মানুষ তার ভিটেবাড়ি ছেড়ে গেছেন। কবি দাউদ আল হাফিজের কাছে আমার ঋণ আছে। ঋণ আছে 'একবিংশ' সম্পাদক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কাছে। তিনি আমার নবীন বয়সের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা ছাপাতেন তার সুসম্পাদিত কবি ও কবিতার কাগজ 'একবিংশ'তে। দাউদ আল হাফিজ ছিলেন 'একবিংশ'র প্রথম দিকের সহযোগী সম্পাদক। খোন্দকার আশরাফ হোসেন ও দাউদ আল গাহিজ প্রয়াত হয়েছেন। সুনীল শর্মাচার্যওকে ফেসবুকে খুঁজে পেয়েছি। শহীদুর রহমান প্রয়াত হয়েছেন ১৯৯২ সালে।
যশোরে থাকতেন কবি আজিজুল হক। তার কবিতা আমার ভালো লাগত। আবুল হাসানের কবিতা ভালো লাগত খুব। তাদের কাছে ঋণ আছে আমার। নড়াইলে যেতাম সুলতান কাকুর বাড়িতে। এত বড় শিল্পী তিনি, তার সান্নিধ্য পেয়েছি সেই অল্প বয়সে, হয়তো আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলাম বলেই। আমার খুলনা আর্ট কলেজের শিক্ষকদের কাছে ঋণ রয়ে গেছে। ঋণ রয়ে গেছে ঢাকা চারুকলার শিক্ষকদের কাছে। কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান, বুলবন ওসমান, শওকাতুজ্জামান, আবুল বারক আলভীসহ দেশের সব নামকরা শিল্পী আমার শিক্ষক। কিম্বিরা স্যার বা সফিউদ্দিন স্যারের ক্লাস পাইনি কিন্তু তাদের দেখতাম চারুকলায়। কত বড় শিল্পী। এত কাছে থেকে এসব শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছি- এর ঋণ নেই?
আমাদের চারুকলার বকুলতলার কাছেই মনে হয় আমার অনেক ঋণ রয়ে গেছে। ঋণ রয়ে গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাছে, যাকে আমাদের প্রজন্ম জেনেছে স্বাধীনতা উদ্যান। আর শাহবাগ। শাহবাগ আমাদের কবিতার তরুণ রাজধানী। শাহবাগ এভিনিউয়ের কাছে ঋণী আছি হাজার বছর। পরীবাগের আহমদ ছফা রোডের কাছে আমি আজও ঋণী থাকি। সত্যি, মনীষী ছফার সঙ্গে তার জীবনের শেষ এক যুগ কি নিত্যদিনের মেশামেশিতে ছিলাম। ছফার কথা শুনতাম। তর্কও করতাম। শিখতাম। সেই ঋণ কোনোদিন পরিশোধ করতে পারব? ফরহাদ ভাইয়ের কাছে যেতাম। সঙ্গে থাকত কিছু তর্ক। কবি ফরহাদ মজহারের কাছে যাওয়া বা কিছু শেখার যে ঋণ আছে আমার, কীভাবে তা শোধ করি আর? সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে কত সময় কেটেছে আমার, তার জীবনের শেষ যুগে, তার হিসাব নেই। লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে বা সৈয়দ হকের কাছে আমার যে ঋণ, সেই মনে হয় পারিবারিক, চাইলেও শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। শিল্পী রফিকুন নবী আমাকে সিনেমা 'কাঁটা'র ফান্ডের জন্য একটা চিত্রকর্ম দিয়েছেন, যা আমরা বিক্রি করে শুটিংয়ে গেছি। অবশ্য কাঁটা সংক্রান্ত ঋণের কথা আমি এখানে তুলব না। পরে তা বিস্তারিত লিখব, ছবি মুক্তির সময়। সে সময় আশা করি আসন্ন। করোনা তো অনেক কিছুই আটকে রেখেছে। শিল্পী জামাল আহমেদ, শিল্পী শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, রণজিৎ দাশ, আবুল মোমেন মিল্টনের কাছে ঋণী হয়ে আছি আমি!
ঋণ কতরকম হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতা বা ভ্যানগগের ক্যানভাসের হলুদ স্ট্রোকের কাছে ঋণী আছি। চর্যাপদের কাছে আমি ঋণী আছি। বলতেই পারি, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছি। মাথাটা কোথায় রাখি?
ঋণ এমন যে, সব ঋণদাতাকে সবসময় মনেও পড়ে না। আবার হয়তো অন্য সময় মনে পড়ে। আবার হয়তো মনে পড়ে, রাঙামটিতে একবার ট্র্যাভেল শো শুট করতে গয়ে আদিবাসী ছেলেদের আক্রমণের শিকার হই আমরা। সন্ধ্যার পর আমরা মৌসুমি চাকমাকে ফেরত দিতে গেছি তাদের বাড়িতে। মৌসুমি আমাদের ট্র্যাভেল শোতে কাজ করছিল সারাদিন। আমাদের মাইক্রো বাসের সামনে দাঁড়াল একদল চাকমা ছেলে। গাড়ি বন্ধ হলো। গাড়ির হেডলাইট অফ করতে নির্দেশ দিল ছেলেরা। তারপর আমাদের ১১ জনকে মাইক্রোবাস থেকে নামানো হলো। আবার গাড়ির হেডলাইট জ্বালাতে নির্দেশ দিল পাহাড়ি ছেলেরা। সেই হেডলাইটের আলোর সামনে দাঁড় করানো হলো। আবার হেডলাইট অফ। এর পরেই এলো তাদের হাতের কাজ, হাতে থাকা বাঁশের কাজ। পিটানো হচ্ছে দমাদম। পাহাড়ি ছেলেরা মারছে, চুপচাপ নতমুখে দাঁড়িয়ে সেই সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে শুটিং করতে যাওয়া বাঙালি ছেলেরা মাইর খাচ্ছে। দারুণ ব্যাপার। আমিও সেই মাইর খাওয়াদের দলে। কী ভয়! কী জীবন বাঁচানোর মতো মুহূর্ত সেটি। মৌসুমি আমাদের বাঁচানোর জন্য সেদিন নিজে মাইর খেয়েছিল স্বগোত্রের ছেলেদের হাতে। হয়তো সেই দলে মৌসুমিকে পছন্দ করত, এমন পাহাড়ি ছেলে ছিল। সেই তার বন্ধুদের ডেকে এনে ঝাল মেটাচ্ছে। এটা তার অধিকার। এবং সেখানে আমাদের অকাতরে মাইর খাওয়াও আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে কিনা, পরে একদিন আলোচনা তুলব।
সেই সন্ধ্যায় মৌসুমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের বাঁচানোর জন্য যা করেছে, আমরা ১১ জন ঢাকা থেকে শুটিং করতে যাওয়া বাঙালি বিস্মৃত হবো কখনও? মৌসুমির কাছে যে ঋণ আমাদের, ভাত খাওয়া বুদ্ধির ১১ জনের, সেই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। শোধ করতে চাইও না। তাহলে কী ঘটেছিল সেই সন্ধ্যায়, রাঙামাটির দেবাশীষ নগরে?
না, সেসব এখানে জানাচ্ছি না। সব কথা সবসময় জানানোর দরকার কী? না জানালে সে কথা এখানে একটুআধটু লেখার দরকার কি?
তাও ঠিক। লেখার দরকার নেই। কিংবা লেখার দরকার আছে। কিসের যে দরকার আছে আর কিসের দরকার নেই, এই কথা নির্ণয় করবে কে? যেমন আপনি চাইলে পড়বেন, না চাইলে পড়বেন না, চাইলে পড়তে পড়তে চাইর লাইন পড়েই ভাবতে পারেন, এ পড়বার দরকার কি? তাই আপনি আর পড়লেন না। আপনার ইচ্ছা, তাই পড়লেন না। আপনার ইচ্ছাকে তো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। সেইভাবে, আমার লেখা, না লেখা বা একটু আধটু লেখাও আমার ইচ্ছা। আপনি কন্ট্রোল করতে পারবে না। দরকার হইলে আপনি পড়বেনই না। কে ঠেকায় আপনাকে?
ঠেকায়। কখনও কখনও পাঠকও চলে আসে মাথায়। সেই পাঠকই তো মানে আপনি বা তুমি, তুমিই তো আমাকে লিখতে বাধ্য করো কখনো কখনো। তুমি জেনারেল ফ্রাঙ্কো। তুমিই এঁকেছ 'গোয়ের্নিকা' থপিকাসো সে কথা নিজেই বলেছেন। তাই তোমার কাছে ঋণ আছে আমাদের, জেনারেল ফ্রাঙ্কো, সে তুমি যেখানেই থাকো ঢাকায় কিংবা স্পেনে। লিখতে লিখতে লেখক, পড়তে পড়তে পাঠক, দুটিই বহুদিন ধরে তৈরি হতে থাকে। একসময় লেখক ও পাঠকের মধ্যে একটি সাঁকো তৈরি হয়। সেই সাঁকো কি বাঁশের সাঁকো? বাঁশের সাঁকোর ওপরে বসে আছে এক ঝাঁক শালিক। শালিক, না কবুতর? নাকি ঘুঘু? চড়ুই থাকতে পারে, যারাই থাকুক না কেন, এসব পাখির কাছে আমার অনেক ঋণ আছে। মানে, রচনায় আমি আবার ঋণে ফিরে এলাম। যদিও ঋণের কোনো শেষ নেই, শুধরানোর চেষ্টা বৃথা তাই। তাই? তা না হলে চার্বাক কেন বললেন, ঋণ করে হলেও ঘি খাও!
অর্থনৈতিকভাবে ঋণের কথা এলে, এ ব্যাপারে আমার লেখার কিছু নেই। গ্রামীণ ব্যাংকের ডক্টর ইউনূস বা পাড়ার মুদি দোকানির চেয়ে তো আমি বেশি ধারণা রাখি না; ফলত, আমি ঋণ হিসেবে বেশি পাত্তা দিচ্ছি তোমাকে, যাকে আমি সামনে দেখি না কিন্তু দেখতে চাই, এই চাওয়া থেকেই কত কবিতা লিখেছি। এ কি ঋণ নয়? এ কি তোমার কোলে আমার আবার শিশু হয়ে বেঁচে থাকার সাধ নয়? অথচ এই ঋণ নিয়ে আমার লেখা হয় না।
তুমি যে অনন্ত নিঃসঙ্গতা দান করেছ আমায়, সেই নিঃসঙ্গতার কাছেও ঋণী থেকে যাচ্ছি। প্রতিটি প্রাপ্তির কাছে ঋণী আমি, ঋণী অপ্রাপ্তির কাছেও। যে দিয়েছে, ঋণী তার কাছে, যে দেয়নি, দিতে চেয়েও দেয়নি, তার কাছেও ঋণী থাকছি। কেউ খুব ঠকাল আমাকে, আমি মানুষ সম্পর্কে বা তার সম্পর্কে একটা ভালো ধারণায় পৌঁছলাম, সেখানে কি ঋণ থাকে না? তোমাকে খুব বিশ্বাস করেছি, তুমি কী নিপুণভাবে বিশ্বাস চূর্ণ চূর্ণ করলে, নিশ্চয়ই আমার ঋণ আছে এই পর্বে, তোমাকে এমনভাবে তো আমি আগে চিনতাম না! তোমার গলা কি জিরাফের মতো? তোমার চোখ কি শেয়ালের মতো? নাকি তুমি ঘুণপোকা? তুমি প্রতারণা শিল্পে অনেকদূর যাবে- এই ভেবে আমি ঋণ রচনার প্রান্তে চলে এসেছি।
এখন প্রশ্ন করো না, এই তুমিটা কে? কোথায় থাকে নাকি কোথাও থাকেই না? কাউকে না পেলে এই তুমি ধরো আমিই। আমিই আমাকে চিনে উঠছি আর এর থেকে ঋণটিন লিখতে লিখতে এখন দুপুর, আবার সেই রহস্যজঙ্গলের ডাক শুনতে পাচ্ছি। অতএব, রচনা লেখার চেয়ে দুপুর-জঙ্গলে গিয়ে চুপচাপ থাকাই উত্তম। বাই বাই।

মন্তব্য করুন