আমার আপনার তো অনেক ঋণ! তাই তো? ওই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
দিনে দিনে বাড়িয়াছে দেনা।
ঋণের কত নাম! কর্জ, দেনা, ধার, হাওলাত। বিশেষণও তৈরি হয় অনেক- ঋণী, ঋণগ্রস্ত, ঋণগ্রহীতা, ঋণগ্রহিত্রী, ঋণজাল, ঋণদাতা, ঋণদাস, ঋণমুক্ত, ঋণশোধ। বাংলা ভাষায় 'ঋণিতা' বলেও একটা শব্দ আছে, যার অর্থ ঋণগ্রস্ত অবস্থা।
'ঋ'- বাংলা ভাষার সপ্তম স্বরবর্ণ। এই বর্ণটি দিয়ে বাংলা ভাষায় খুব বেশি যে শব্দ আছে, এমন নয়। যেমন ধরুন ঋক্‌, ঋক্‌থ, ঋক্ষ, ঋজু, ঋণ তো আছেই। আর আছে ঋত, ঋতানৃত, ঋতি, ঋতু, ঋত্বিক, ঋদ্ধ, ঋভু, ঋষভ, ঋষি, ঋষ্ট, ঋষ্টি, ঋষ্য- এসব। সবগুলোর অর্থ আমার জানা ছিল না।
এই যে আমাদের জীবনে এত ঋণ, কিছু শোধ করা গেছে, কিছু শোধ করা যায়নি। কেন শোধ করা যায়নি? ওসব ঋণ শোধ করা যায় না বলেই শোধ করা হয়নি। গোলমেলে ঠেকছে? ঋণ শোধ করতে চাইলে শোধ করা যাবে না কেন? আন্তরিকতা থাকলে সব ঋণই তো শোধ করা যায়! না না, আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওসব ঋণ শোধ করা যায় না। ও ঋণ যে অপরিশোধ্য!

ঠিকঠাক মতো বোঝা যাচ্ছে না আমার কথা? বুঝিয়ে বলব একটু? ঘরটা যখন তৈরি করি, বেশ কিছু টাকার দরকার হয়ে পড়ল হঠাৎ। কার কাছে যাই! হঠাৎ মনে পড়ল স্বপনদার কথা। আরে, স্বপনদা থাকতে চিন্তা কীসে? লাখ দুয়েক টাকা ধার নিলাম স্বপনদার কাছ থেকে। মাস চারেকের মধ্যে সেই টাকা শোধও করে দিলাম। ওই যে গগনকার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিলেন আপনি, ঘর ভাড়ার টাকাটা কম পড়ল বলে, পরের মাসে সেই ঋণ শোধ করলেন আপনি। আর বাড়ির পাশের জাকেরের মুদির দোকান থেকে আমি-আপনি বাকিতে সংসার চালাবার চাল-ডাল-নুন-তেল কিনি, তাও মাসপহেলা বেতন পেলে শোধ করে দিই। এ তো হরহামেশাই হচ্ছে আমাদের জীবনে। ঋণ করি, আবার সময়ান্তরে সেই ঋণ পরিশোধ করে তৃপ্তির শ্বাস ফেলি।
কিন্তু মানুষের জীবনে এমন ঋণও আছে, যা সময়ান্তরে নয়, যুগান্তরেও শোধ করা যায় না। গোটা জীবন ধরে হাজার-লক্ষবার চেষ্টার পরও সেই ঋণ অপরিশোধ্য থেকে যায়। কী সেই ঋণ- জানতে ইচ্ছে করছে তো? উত্তর না দিয়ে একটা গল্পই বলি আপনাদের।
এ আমার কিশোরজীবনে শোনা গল্প। মায়ের মুখ থেকে শোনা। আমার মা-টি লেখাপড়া জানত না। খুব যে বুদ্ধিমতী ছিল মা তা-ও নয়। গ্রামের আনপড়া সহজসরল মায়েরা যেমন হয়, আমার মা-টি ছিল ঠিক সে রকমই। মা শুকতারার বাড়তি একটা গুণ ছিল। কম কথা বলার অভ্যেস ছিল মায়ের। তবে যা বলত, চিন্তা করেই বলত। সেই মিতভাষী মায়ের একদিন কী হলো কে জানে, কাছে ডাকল আমায়। বিকেলটা গড়িয়ে গেছে তখন।
মা বলল, 'তোকে একটা গল্প বলি বাছা।' মা আমাকে নাম ধরে ডাকত না। বলত- বাছা।
আমি মায়ের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। মা-তো কখনও গল্প বলে না! এই যে আমার এতটুকু বয়স হলো, কোনোদিন মা আমাকে বা আমার ভাইবোনদের কাউকে গল্প শুনিয়েছে বলে মনে পড়ে না।
মা বলল, 'কী, শুনবি তো বাছা গল্পটা?'
ওই বিস্মিত অবস্থাতেই আমি ডানদিকে মাথাটা কাত করেছিলাম।
মা বলা শুরু করেছিল গল্পটা-
এক দেশে খুব বড় একজন জমিদার ছিলেন। তাঁর হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। পুকুরভরা মাছ, গোলা ভরা ধান। জমিদার বাড়ি গমগম। শয়ে শয়ে চাকরবাকর-কর্মচারী। টাকার কোনো অভাব নেই জমিদারের।
জমিদারের বুড়ো মা-টি তখনও জীবিত। বিধবা মা-টি ঈশ্বর ঈশ্বর করে দিন কাটান। রাধাগোবিন্দ তাঁর প্রধান আরাধ্য। জপ-পুজোতে মা-জননী জীবন সায়াহ্নে খোঁজেন। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিতে একটা মন্দির আছে বটে, তবে তা বহুদিনের পুরোনো হওয়ায় স্থানে স্থানে খসে পড়ছে। বুড়ো মা-টির মনে বড় ইচ্ছে জাগল- রাধাগোবিন্দজির একটা মন্দির গড়ার।
ছেলেকে বললেনও একদিন মা। বললেন, 'বাবা নগেন্দ্র, আমার মনে বড় বাসনা।'
- 'কী বাসনা মা?' আগ্রহে জানতে চাইলেন জমিদার নগেন্দ্র নারায়ণ।
মা বললেন, 'আমার বড় সাধ বাবা, তুমি রাধাগোবিন্দজির নামে একটা মন্দির গড়। মন্দিরটি বেশ বড় হবে বাবা। সামনে বিশাল এক দিঘি থাকবে, দিঘিতে শান বাঁধানো ঘাট। ও হ্যাঁ, মন্দিরের বেদিতে রাধাগোবিন্দের যুগলমূর্তি জ্বলজ্বল করবে বাবা।'
মায়ের কথা শুনে জমিদারের মন পুলকিত হয়ে উঠল। মাকে বললেন, 'মা, তোমার বাসনা পূরণ করব আমি।'
পরে দু'বছরে অনেক অর্থের বিনিময়ে জমিদার নগেন্দ্র নারায়ণ মন্দিরটি নির্মাণ করলেন। এর রূপৈশ্বর্য দেখে চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল।
রাধাগোবিন্দজির মূর্তি বেদিতে উপস্থাপনের দিনটি এলো। মন্দিরের ভেতরে-বাইরে বহু মানুষের সমাগম। জমিদার মাকে পাশে নিয়ে সূচনাপূজা করতে বসেছেন। মায়ের চোখেমুখে অপার তৃপ্তি। সেই তৃপ্তি জমিদারের মনে সঞ্চারিত হলো। মা বলছেন তখন, 'বাবা নগেন, মরার আগে আমার বাসনা পূরণ করলে তুমি!'
তৃপ্তি, প্রাচুর্য এবং প্রশংসা মানুষকে অহংকারী করে তোলে কখনও কখনও। জমিদারকেও মায়ের কথাটি আত্মম্ভরী করে তুলল।
বামুন ঠাকুর তখন মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন- ওঁ নমঃ, ওঁ নমঃ।
বামুনের মন্ত্রকে ছাপিয়ে জমিদারের কণ্ঠস্বর সবার কানে এলো তখন। জমিদার রাধাগোবিন্দের যুগলমূর্তিটির দিকে দু'হাত বাড়িয়ে উঁচু গলায় বলছেন তখন, 'হে ঠাকুর, হে রাধাগোবিন্দ! আজ আমি ধন্য। মায়ের কথায় এই মন্দিরটি তৈরি করেছি আমি। মায়ের কথা রাখতে পেরেছি আজ আমি। হে ঠাকুর, আজকে আমি আমার মাতৃঋণ শোধ করে দিতে পারলাম প্রভু।'
'জমিদারের মুখ থেকে এই কথাটি বের হতে না হতেই সেই বিশাল মন্দিরটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল বাছা।' গল্পের শেষের দিকে মা আবার বলেছিল।
অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল মা। আমি আমার কিশোর মন দিয়ে ভাবছিলাম, আহা, এত টাকার মন্দিরটি ভেঙে পড়ল!
মা জিজ্ঞেস করছিল, 'কী শিখলে বাছা এই গল্প থেকে?'
আমি যে হাঁ, সেই হাঁ-হয়েই রইলাম।
মা বলল, ' আর কারও কর্জ শোধ করা গেলেও মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না বাছা।'
মায়ের এই গল্পের মধ্যে হয়তো অলৌকিকতা আছে, আছে হয়তো অতি সারলিক ঘটনাপ্রবাহ। কিন্তু গল্পটির একটা মাহাত্ম্য তো আছেই। অনেক ঋণ শোধ করা গেলেও কিছু ঋণ পরিশোধীয় নয়। মাতৃঋণ, পিতৃঋণ, শিক্ষকঋণ, দেশমাতৃতার ঋণ- এসবের কি শোধ দেওয়া যায়?
ওই যে তরুণ বয়সে যে তরুণীটি আমার প্রেমিকা ছিল, আমার মধ্যে কিছু একটার খামতি দেখে অন্য একজনের সঙ্গে হৃদয় মিলাল, তার বিরুদ্ধে মনের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বহুদিন। কিন্তু এখন, এই বয়সে এসে তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার! কেননা, তার কাছে যে আমি ঋণী। ও যে ওই সময়ে আমাকে রবীন্দ্রগানের অনুরাগী করে তুলেছিল। এখনও যে আমি সুখে-সন্তাপে ওই রবীন্দ্রসংগীতই শুনি!
আর আমার বাবার পড়ালেখার যে অভ্যেস, সে তো বিপীনকাকুই তৈরি করে দিয়েছিল। ওই বিপীনকাকু পরে আমাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল। বিপীনকাকু ছিল হিন্দুপাড়ার লেখাপড়া জানা মানুষ। কোর্ট-কাছারিতেও যোগাযোগ ছিল তার। সাতকানি জমির বছর বছরের খাজনা ওই বিপীনকাকুর হাতে দিয়ে আসত ঠাকুমা। ঠাকুমার অকৃত্রিম বিশ্বাস ছিল বিপীনকাকুর ওপর। ওই বিপীনকাকুই বহু বছরের খাজনা বাকি রেখে দিয়েছিল। নিলাম হয়েছিল ওই সাতকানি জমির। বিপীনকাকুই নিলামে ওই জমি কিনে নিয়েছিল।
আমি মনে মনে বিপীনকাকুকে ঘেন্না করলেও কৃতজ্ঞতার অবধি নেই তার প্রতি। বাবাকে বিপীনকাকু পড়ালেখায় মগ্ন করেছিল বলেই তো বাবা আমাকে পড়াল। নইলে যে সারাজীবন আনপড়াই থেকে যেতাম আমি। এ ঋণ কি শোধের? বলুন!
অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন আহমদের 'ধার' নামের একটা চটি বই আছে। আজকাল আসহাবউদ্দিন আহমদের নাম ক'জনে জানে, কে জানে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখালেখি করে গেছেন ওই অধ্যাপক মশাই।
তো 'ধার' বইটি ২৩ পৃষ্ঠার। ১৯৫০-এ লিখেছেন তিনি এই বইটি। ঋণ বা ধার নিয়ে এত চমৎকার বই আর চোখে পড়েনি আমার। তেইশ অধ্যায়ের এই বইটিতে তিনি মানবজীবনের নানা ঘটনা রঙ্গরসে উপস্থাপন করে গেছেন। নৈর্ব্যক্তিক এই লেখাটিতে বারবারই তিনি ব্যক্তিকে টেনে এনেছেন। পাঠককে করেছেন বাহিনীর কুশীলব।
তিনি লিখেছেন, এক ভদ্রলোক (আসলে তিনি নিজে) মাসের শেষে সংসার চালানোর জন্য বউয়ের কাছে ধার চাইলেন। গিন্নি ভদ্রলোককে ফিরালেন না। কিন্তু দেওয়ার সময় বললেন, 'মাসপয়লা বেতন পেলে কিন্তু ঋণটা শোধ করে দিতে হবে।'
কী আর করা। ভদ্রলোক তাতেই রাজি।
মাস শেষ হলো। মাইনেও পেলেন ভদ্রলোক। তার পরের কথাগুলো আসহাবউদ্দীনের ভাষাতেই না হয় পড়া যাক।
আসহাবউদ্দীন লিখেছেন, 'আর মাইনের টাকাটা পকেটে করে যেই ঘরে ঢুকলেন, অমনি অন্য পাওনাদার আসার আগেই আঁচলখানি না টেনে, আলুথান বেশে, অনম্র নেত্রপাতে, অকম্পবক্ষে, বিনাদ্বিধায়, ক্ষিপ্র পদে, ক্রূর হাসি হেসে, গৃহপ্রান্ত থেকে স্বয়ং গৃহিণী এসে হাজির। মশাই বুঝলেন তো! বাইরের ধার যেমন তেমন, ঘরের ধার আরও সাংঘাতিক একেবারে এটমিক।'
লেখাটা লিখতে গিয়ে শেকসপিয়রের কথা মনে পড়ে গেল আমার। নাটক লিখে বেশকিছু পয়সা কামিয়ে ফেলেছেন তখন তিনি। দু'মহলা বাড়ির মালিকও হয়ে গেছেন। তিনি তখন হরিণ চুরির পলাতক আসামি নন। হালে-চালে জমিদার জমিদার ভাব তখন তাঁর। অভাবগ্রস্ত প্রতিবেশীরা ছাড়বে কেন তাকে! সকাল-বিকাল খালি তাঁর কাছে অর্থ ঋণ চায়। ঋণ দিলে সেই ঋণ যে শোধ হবে না, জানেন শেকসপিয়র। অতিষ্ঠ হয়ে একটা নাটকে ঋণ ও ঋণ শোধের ব্যাপারটি লিখে ফেললেন তিনি।
‘Hamlet’ নাটকে (Act 1, Scene iii) পলিনিয়সকে দিয়ে বলালেন-
Neither a borrower non a lender be,
For loan off loses both it self and friend,
And borrowing dulfs the edge of husbandry.

সব ঋণ আবার মন্দ নয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশি সাহিত্য থেকে ধার না নিলে আমরা অমিত্রাক্ষর ছন্দ পেতাম কোথায়? 'মেঘনাদ বধ কাব্য'টিও যে বাঙালির অধরা থেকে যেত! তবে মধুসূদন শেষ জীবনে হলেও 'ধার' নিয়ে একটা সনেট লিখতে পারতেন। ওই সনেটের প্রথম আট লাইনে গৌড়জনের কাছে ধার চাইতে পারতেন। শেষের ছয় লাইনের প্রথম তিনটিতে বিদ্যাসাগর মশাইয়ের হাতে ঋণের টাকাটা গুনে দেওয়ার কথা থাকত। শেষ তিন লাইনে আশার ছলনে ভুলি যে পাশ্চাত্যের ভান্ডারে হাত পেতেছিলেন, সেখানে যে ব্যর্থ হয়েছেন, তার বয়ান থাকতে পারত।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও কিন্তু ঋণ-ধারের ব্যাপারে খুব বেশি সংকোচ বোধ করতেন না। তবে ধারকরা বিষয়-পরিপ্রেক্ষিত নিজের মতো করে গুছিয়ে-গাছিয়ে পরিবেশন করতেন। কাজী নজরুল ইসলামও কিন্তু আরবি-ফার্সি থেকে দেদার ঋণ গ্রহণ করে গেছেন। তাতে যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে এমন নয়। উপরন্তু ওই ধারদেনার কারণে বাঙালি জীবনের মহাভারতটা শ্রেয়তর হয়ে উঠেছে।
লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি। এবার রাশ টানা দরকার। ঋণ শোধের একটা গল্প বলে লেখাটা শেষ করব। না না, এটা নিছক গল্প নয় কিন্তু। সত্য বৃত্তান্ত।
দেবেন্দ্রলাল দে আমার শিক্ষক ছিলেন, আমার উঠান-ইস্কুলের শিক্ষক। তাঁর কাছেই আমার বর্ণমালা শেখা। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়া আমার তাঁরই কাছে।
সচ্ছল পরিবার তাঁর। উত্তর পতেঙ্গার হিন্দুপাড়ার বনেদি মানুষদের একজন। চৌচালা বাড়ি। মস্তবড় উঠান। ওপাশে বেশ বড় উঁচুমতন জমি। ওতে রবিশস্যের চাষ। জেলেপাড়া ঘেঁষে কানি কানি ধানি জমি। দু'দুটো পুকুর, পুকুরে নানা মাছ। পাড়জুড়ে নানা ফল-ফলাদির বৃক্ষসকল। গোয়ালের গরুর কথা নাই-বা লিখলাম। এরকম লোকের শিক্ষকতা করার দরকার নেই। তারপরও ছাত্রছাত্রী পড়াতেন তিনি। উঠানে ছালা বিছিয়ে। কারণ ওই পড়ানোতেই তার যত আনন্দ! তাহলে কি দেবেন্দ্র স্যারের জীবনে নিরানন্দ ছিল না? ছিল। পুত্রসন্তান ছিল না তাঁর। ছেলের আশায় আশায় কন্যার চাষ করে গেছেন স্যার, সংসারবাগানে। সাত-সাতজন মেয়ে তাঁর। আমি যখন তাঁর কাছে প্রথম পড়তে যাই, পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন তখন। একজন ছাড়া অন্য সব কন্যার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। সবার বিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। ছোট মেয়ে বেণু তাঁর সঙ্গে।
উনিশশ আটষট্টি সালের দিকে আকাল নেমে এলো দেবেন স্যারের জীবনে। স্ত্রী মারা গেলেন। পাকিস্তান সরকার হিন্দুপাড়াটি অ্যাকোয়ার করে বসল। অনেক হিন্দু ভারতে চলে গেল, দেবেন্দ্র স্যার গেলেন না। মাটি আঁকড়ে থেকে গেলেন উত্তর পতেঙ্গায়। আড়াইগণ্ডা জায়গা কিনে বাড়ি তুললেন। ছয়-ছয়জন মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে অনেক আগেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন তিনি। এখন ওই বাড়িটিই সম্বল, আর ছাত্র পড়ানোই ভরসা। বেণু বড় হলো। দেবেন স্যার বুড়ো হলেন। মা ছিল না বলে বাবার অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে বেণু বেয়াড়া ধরনের হয়ে গিয়েছিল।
বেণুকে বিয়ে দিয়েছিলেন দেবেন স্যার। জামাইটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। একটা সময়ে সন্তানাদিও হয়ে গেল বেণুর। জামাই পাশের কারখানায় মধ্যমগোছের চাকরিও পেয়েছিল।
বয়সের ভারে এখন আর ছাত্রছাত্রী পড়াতে পারেন না দেবেন্দ্র লাল দে। মেয়ের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন স্যার। মেয়ে খেতে দিলে খাওয়া, না দিলে উপোস থাকা- এরকম অবস্থা হয়ে দাঁড়াল স্যারের। বেণু নানাভাবে পিতাকে গঞ্জনা দিতে শুরু করল- বসে বসে খাচ্ছ, আয়-ইনকামের ধারেকাছে নেই, বসে বসে পিণ্ডিগেলা, একটা ঘরজুড়ে বসে আছ, কোথাও থেকে বেরিয়ে আসতে পার না?
আমি তখন নানা জেলায় চাকরি করে বেড়াচ্ছি। দেবেন স্যারের গঞ্জনার কথা বন্ধু নেপালের কাছ থেকে পাই। নেপালও দেবেন্দ্র স্যারের ছাত্র ছিল। এখন স্যারের প্রতিবেশী সে।
সেবার পূজার ছুটিতে বাড়িতে আসি। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে নেপালের ভাই ভূপাল ছুটে এলো বাড়িতে। বলল, 'দাদা এখনই আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে বলেছে।' বন্ধু নেপালের কোনো বিপদ হয়েছে ভেবে তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম।
পৌঁছে দেখলাম, ঘাটার আগায় নেপাল দাঁড়িয়ে। বুকের কাছে দেবেন স্যার- নির্জীব, নিথর।
বললাম, 'কী হয়েছে?'
নেপাল বলল, 'একটু আগে বেণু স্যারকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে এখান পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। বলেছে, আমার ঘরে (বাড়িটা তো দেবেন স্যারেরই) জায়গা নেই ওই বুড়ার। মরেও না। বসে বসে খবরদারি করা। আমি প্রতিবাদ করায় বলেছে, ঘাটের মড়াটার ভাত জোগাতে পারব না আমি।'
মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার। স্যারের হাত ধরে বেণুর কাছে উপস্থিত হলাম। বললাম, 'এ কী কথা বেণু! বাবার গায়ে হাত। এত সম্মানিত মানুষের এরকম অপমান! স্যার কি তোমার বাবা নন? তাঁকে খাওয়ানোর দায়িত্ব কি তোমার নয়? সমাজে-শাস্ত্রে পিতৃঋণ বলে তো কথা আছে একটা!'
বেণু এবার ঝাঁজিয়ে উঠল। বলল, 'ওসব পিতৃঋণটিন আমি মানি না। শাস্ত্রে যদি ওই ঋণের কথা লেখাও থাকে, তাহলে ওই ঋণ আমি অনেক আগেই শোধ করে ফেলেছি।'
'কীভাবে!' কথাটা আমি অথবা নেপালের গলা থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
উত্তরটা তৎক্ষণাৎই দিয়েছিল বেণু, 'এতদিন বসিয়ে বসিয়ে যে খাইয়েছি, জামাকাপড় কিনে দিয়েছি, মাথার তেল, গায়ের সাবান জুগিয়েছি, তাতেই আমার পিতৃঋণ শোধ হয়ে গেছে।'
বেণুর স্বামীটি তখন ঘরে ছিল না। বেণুর বাচ্চা দুটো করুণ চোখে নানুদা দেবেন স্যারের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমার স্যার নেপালের কথা জানতে চাইছেন? ওই মুহূর্তে কী করছিলাম? নাই-বা জানালেন তা!

মন্তব্য করুন