অতি বিনয়কে অনেক সময় মানুষ যেভাবে সন্দেহের চোখে দেখেন, কাব্যসমাজে বিনয় মজুমদারের অতিরঞ্জিত আলোচনাকেও এক সময় তেমনি সন্দেহের চোখে দেখেছি আমি এবং আমার কোনো কোনো সাহিত্যিক বন্ধু। শুধু তাই নয় বিনয় মজুমদারের কবিতার সমগ্র খনন করে আমরা প্রায়শই তেমন কোনো কিছু, তেমন কোনো তুলনামূলক অবিস্মরণীয় পঙ্‌ক্তির সন্ধান পেতাম না। তাই বলে বিনয় মজুমদারের জনপ্রিয়তা, তাকে নিয়ে আলাপ, তার সাহিত্যকর্মের রসাস্বাদন থেমে থাকেনি, থেমে নেই। তার জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরেও উত্তরোত্তর সেসব বৃদ্ধিই পেয়েছে বরং- বলা যায় যতটা সাহিত্য, তার চাইতে তার জীবনের আকর্ষণ ও খনন চলেছে এবং চলছে আজও। যার ভেতর দিয়ে কবি বিনয় মজুমদার হয়ে উঠেছেন জীবনশিল্পের এক অকৃত্রিম প্রতিমা।
বিনয় মজুমদারকে নিয়ে সেই খননকার্যেরই সাম্প্রতিক এবং অনন্য নমুনা 'এক আশ্চর্য ফুল বিনয় মজুমদার'। বিনয় মজুমদারের জীবন ও কর্ম নিয়ে দুই বাংলার বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যক্তিত্বের কথামালা, স্মৃতি-বিস্মৃতি ও বিশ্নেষণ নিয়ে প্রকাশিত এই সংকলনটিকে বলা যায় বিনয় মজুমদারকে নিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বৃহৎ প্রকাশনা। বাংলাদেশের কবি ও সম্পাদক এহসান হায়দার এবং পশ্চিমবঙ্গের স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তীর যৌথ সম্পাদনায় নির্মিত এ আয়োজনটি সংগ্রহবৈচিত্র্য এবং সম্পাদনাশৈলী উভয় দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ একটি সংকলন।
কাব্যমানে বিনয় মজুমদারের অবস্থান, তার কবিতায় জীবনানন্দ কিংবা অপরাপর কবির কবিতার প্রভাব এবং কবিতায় যৌনতা, অশ্নীলতা ইত্যাদি নানান বিতর্ক এই কবিকে ঘিরে সবসময়ই ছিল- সেইসঙ্গে সমানতালে এগিয়ে গেছে ব্যক্তি বিনয় ও তার কবিতার প্রতি ভালোবাসাও। কবি বিনয় মজুমদারকে সেই ভালোবাসার এবং দেখার নানান ভঙ্গি ও প্রত্যক্ষ বিনয়সঙ্গের বিচিত্র কথকতা আছে এই সংকলনটিতে।
উৎপলকুমার বসু লিখেছেন, 'আমরা ষাট পেরিয়েছি। সুতরাং ত্রিশ-চল্লিশ বছর কাটল মাত্র। মনে হয় কত হিমযুগ, কত পর্বত নিক্ষেপ, কত জীবাশ্মের স্তরীভবন দেখলুম যেন। মানচিত্র পাল্টাচ্ছে এবং মহাদেশগুলো নতুনভাবে, নব সমুদ্রচিহ্নে, অপরিণত ভূগোলে এবং সদ্য-আবিস্কৃত মরু-মেরু-অরণ্যে চিহ্নিত হচ্ছে। বিনয় মজুমদার বাংলা কবিতায় তেমনই এক অস্থির ভূপ্রকৃতির অংশ।' বাংলা কবিতায় সত্যিই তিনি কী তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা থাকলেও কবির এ অস্থিরতা তার জীবনজুড়েই বিরাজমান। এ কথা তার প্রেমিকমাত্রই জানেন। এবং তার এই অস্থির জীবনকে তারা ভালোবাসেন।
বিনয় মজুমদারকে নিয়ে শামসুর রাহমানের যে রচনাটি এ সংকলনে স্থান পেয়েছে- 'মেধাবী ব্যক্তি, অসামান্য কবি বিনয় মজুমদার' শিরোনামের নাতিদীর্ঘ সে রচনাতেও বিনয়ের কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে দ্ব্যর্থবোধক নানা কথা রয়েছে। কবির 'আমিই গণিতের শূন্য' কাব্যগ্রন্থের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শামসুর রাহমান বলছেন, 'এই বইয়ের কবিতাগুলো অনেকের কাছে কবিতা হিসেবে গ্রাহ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু আমি তাঁদের সুরের সঙ্গে সুর মেলাতে নারাজ।' তারপর ওই কাব্যগ্রন্থেরই 'প্রদীপ এসেছে ঘরে' শীর্ষক কবিতার উদ্ৃব্দতি দিয়ে শামসুর রাহমান বলছেন, "পঙ্‌ক্তি ক'টি পড়লে মনে হতে পারে যেন আমরা একটি বিবৃতি পড়ছি। কিন্তু কোনো কোনো বিবৃতিও কবিতা হতে পারে, যেমন বিনয়ের এই পঙ্‌ক্তিমালায় কবিতার স্বাদ রয়ে গেছে।" বিনয় মজুমদারের কবিতা সম্পর্কে আলোচনায় এই সংশয় এবং উত্তরের বাস্তবতা অহরহই টের পাওয়া যায়। তবে চমৎকারিত্ব পাওয়া যায় তার জীবনে। আসলে বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে কবির জীবনের চেয়ে কবিতাকে আলাদা করে দেখা যায় না যেন- কারণ কবিতাই তার জীবনের শিল্প, জীবনই তার কবিতার অলংকার। কবির সেই জীবনের অনেকখানিই স্থান পেয়েছে এই অসাধারণ বাঁধাই ও অলংকরণ সমৃদ্ধ সংকলনের শুরুতে। সংকলনটির উদ্বোধনই হয়েছে কবির জীবনকথা বা 'বিনয়জীবনী' দিয়ে। চমৎকার এই শ্রমসাধ্য ৬৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ রচনায় পর্বে পর্বে উঠে এসেছে কবির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। এ যেন একটি আখ্যান নয়, উপন্যাস। সংকলনে তার পরেই স্তরে স্তরে সাজানো হয়েছে বিনয় কথকতা। এখানে উৎপলকুমার বসু ও শামসুর রাহমান ছাড়াও স্থান পেয়েছে জয় গোস্বামী, ঋত্বিক ঘটক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আহমদ ছফাসহ বর্তমান প্রজন্মের বহু কবি ও কথাশিল্পীর বিনয়খনন। আছে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের 'কবিতার নিজস্ব পুরুষ', মীনাক্ষী দত্তের 'দীর্ঘদিন বিনয়ের সাথে'। এ সময়ের সাহিত্যিকদের মধ্যে রয়েছে রবিশংকর বল, রিফাত চৌধুরী, অমিতাভ পাল, মৃদুল দাশগুপ্ত প্রমুখের রচনা।
শিবেন মজুমদার এবং হাসির মল্লিক লিখেছেন স্মৃতিগদ্য। বিনয় মজুমদারকে নিয়ে লেখা বেশকিছু কবিতা সংকলনটিতে ভিন্নমাত্রায় সংযোজিত হয়েছে। রয়েছে বিনয়কে নিয়ে নুরুল আলম আতিকের 'গায়ত্রী সন্ধ্যায়'-এর চিত্রনাট্য। কবির তিনটি আকর্ষণীয় সাক্ষাৎকার আছে। আছে আরও তিনটি 'আলাপচার'। যেখানে স্থান পেয়েছে কবিকে নিয়ে বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে সম্পাদক এহসান হায়দারের আলাপচারিতা 'প্রকৃত কবিতা তোমায় আপনাতেই টানবে'।
সংকলনে স্থান পাওয়া কবির আত্মকথনমূলক পাঁচটি গদ্য-রচনা পাঠককে মুগ্ধ করবে। যেমন বিস্মিত করতে পারে বিনয় মজুমদারের অপ্রকাশিত গল্প, গদ্য, কবিতা, ছড়া, লিমেরিক, চিঠি, জ্যামিতি ও বীজগণিত এবং তার নিজের আঁকা ছবিগুলো। এই সবকিছু মিলে সংকলনটি হয়ে উঠেছে বিনয় মজুমদারের জীবনশিল্পের অনন্য সমগ্র। যা পড়ে মাসের পর মাস আবিস্কারে ও রোমাঞ্চে কাটিয়ে দিতে পারবেন যে কোনো পাঠক। ৮১৭ পৃষ্ঠার এ সংকলনটি পাওয়া যাবে ঢাকায় তক্ষশীলা, বিদিত, পড়ূয়া ও দ্যু প্রকাশনী; রংপুরে বইতরঙ্গ এবং রাজশাহীর বিদ্যাসাগরে।

মন্তব্য করুন