'ধর, তোর-আমার এই যে সম্পর্ক, সেটা শেষ হবে বিচ্ছেদে।'
'আর মিলন?'
'ধুর, সে তো গল্প জমানোর কায়দা, আলগা মধু। মিলনে কি শেষ হয় নাকি? সব হলো মানুষকে বোকা বানানোর ধান্ধা। বিচ্ছেদে শেষ, বুঝলি। মৃত্যু আর বিরহে।'
এই কথাগুলো আমার না। মোড়ের চায়ের দোকানে বসে পাড়ার সাজু মামা আর তার বন্ধু আলোচনা করছিল। আমি শুনেছি। আমার পনেরো বছর বয়সে আমি তা কতটুকু বুঝেছি, জানি না। তবে আমি কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারি যে, এসব বিচ্ছেদের আগে পর্যন্ত যা ঘটবে, তার সবটুকুই জীবন। এবং আমার এ বয়সে, আমি জীবন ঘিরেই বাঁচি। জীবন ছাড়া আমি আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
আমার জীবনে এই মুহূর্তে যা যা থাকা দরকার আছে। পাঁচ ভাই বোন, মা-বাবা, পরিবার। হালকা প্রেম রোমাঞ্চও আছে পাড়ার এক ছেলের সাথে। ঢুলে ঢুলে মুখস্থবিদ্যায় পড়াশোনা করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করার ব্রত আছে। আর আছে এক গল্প। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে, সবাই কেমন রক্তলাল লাটিমের মতন বন বন করে ঘুরছে গল্পের সাথে সাথে।
লোকমুখে শোনা যায়, আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একজন কুড়িয়ে পাওয়া। দত্তক। ওই যে ছোটবেলায় ভাইবোনেরা খুনসুটি করে যে, তোকে কিন্তু আমরা কাঁঠালগাছের নিচে কুড়িয়ে পেয়েছি। আমাদের পরিবারে এ খুনসুটি খেলা কেউ প্রকাশ্যে খেলে না। মানুষ তো খেলে মিথ্যা নিয়ে। সত্য নিজেই এত দাপুটে, তাকে নিয়ে খেলবে কে? তাই আমরা ভাইবোনেরা কখনো প্রকাশ্যে কেউ কাউকে বলি না, 'তুই কিন্তু কুড়িয়ে পাওয়া।'
আমরা থাকি টিকাটুলি, সেই যে হলুদ উঁচু পুরোনো একটা দালান আছে ইলিশিয়াম নামে, তার পাশের চিকন রাস্তা ধরে গেলে ডান দিকের তিন নম্বর গলির শেষ মাথার একতলা বাড়িটাই আমাদের। আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বড় রাজু, তার পিঠাপিঠি এক বছরের ছোট আমি। এরপর আরো দুই ভাই আর এক বোন। আমি আর রাজু শেষের তিন ভাই বোনের জন্ম নিজের চোখের সামনে দেখেছি। আমাদের স্মৃতিতে তা আছে। আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীও দেখেছে সেই সময় আমার ভরা পেটের মাকে। তাই আমি এবং রাজু নিশ্চিত, আমাদের দু'জনের একজন- কুড়িয়ে পাওয়া।
আমার যখন সাত আর রাজুর আট বছর, তখন আমরা প্রথম শুনি। মালতী চাচির বাড়ি গেলাম, রমজান মাসের ২৭ তারিখ, আম্মা ইফতারি পাঠিয়েছে। মালতী চাচিরা পূজায় আমাদের লুচি-লাবড়া করে পাঠায়। আর আমরা রোজায় ইফতারি। আমার হাতে পেঁয়াজি-বেগুনি-চপ আর ছোলা সাজানো এক থালা। রাজুর হাতে এক বাটি খাসির হালিম। চাচি বললো, 'তোরা কী লক্ষ্মী, সবাই কেমন নিজের ভাইবোনের মতন মিলেমিশে থাকিস। বোঝাই যায় না, একই মায়ের পেটের ভাইবোন না সবাই।'
এ দিয়ে শুরু। তারপর ইতংবিতং নানা গল্পে, থালা খালি করে ধুয়ে দিতে দিতে, আম্মার হাতের হালিমের মতন আর কারও নয়- এমন প্রশংসা করতে করতে, চাচি জানিয়ে দিলো যে, আমাদের একজন কুড়িয়ে পাওয়া। আর আমি রাজুর হাত খামচে ধরে এমন হাসি চোখে সব শুনলাম, যেন আমি সব জানি। সব জানতে হলে, এমন নির্লিপ্ত অভিনয় করা ছাড়া উপায় নেই, সেদিন আমি শিখেছিলাম, একা একা। বেরিয়ে এসে রাজুর সে কী চোখ ভাসানো কান্না। বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের বড় হলে কী হবে, বুদ্ধিতে ঠনঠন। আমিই উলটো বড় বোনের মতন ওকে সামলাই। এসব কথা আব্বা-আম্মাকে একদম বলা যাবে না। কষ্ট পাবে। আর এসব কথা তো সত্যি না, বানিয়ে বলেছে। বড্ড খারাপ মানুষ চাচি। আম্মাকে আগেও বলতে শুনেছি।
রাজু পরদিনই ভুলে গেল। আমার ভুলতে দু-তিন দিন সময় লেগেছে। গলার কাছে কী যেন কুয়াশার মতন আটকে ছিল ক'দিন। কেমন ভয়। তারপর ঈদের দিন এলো, আম্মার হাতের মাখুনে মুরগি রোস্টের রানে কামড় দিতে দিতে আমিও ভুলে গিয়েছিলাম মালতী চাচির সেদিনের বানোয়াট কথা। কিন্তু সেদিনের সে নাছোড়বান্দা কথাগুলো আমাদের পিছু ছাড়েনি। আমরা বছরে বছরে বাড়ছি আর মালতী চাচির মতন টুকরো টুকরো করে আমাদের কানে ফিসফাস করে যাচ্ছে, কখনো স্কুলের বন্ধুর মা, কখনো পাড়ার রইস মোল্লা, শিবুলাল ময়লাওয়ালা। গল্প একটাই- আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে একজন কুড়িয়ে পাওয়া, দত্তক। কিন্তু কোনজন? কেউ জানে না। ঠিক করলাম, আব্বা-আম্মাকে বলে এটার বিহিত করতে হবে। আমার তখন প্রায় ৯ আর রাজু ১০ ছুঁই ছুঁই। এই বলছি বলবো করতে করতে আমরা ছুটি কাটাতে গেলাম দাদিবাড়ি, বাগেরহাট। দাদা বেঁচে নেই, দাদি আর বিধবা ফুপু দোতলা বাড়িজুড়ে থাকে। পশ্চিম দিকে মাছের ঘের। বাগদা চিংড়ির। এমন রাজবাহারি জীবন ছেড়ে দাদি আমাদের স্যাঁতসেঁতে টিকাটুলীর বাড়িতে এসে থাকে না। আমরাও বাগেরহাট গিয়েছি হাতে গোনা দুই-একবার, ছোটবেলায়। এর আরেক কারণ হলো, আমার আম্মাকে দাদি পছন্দ করে না তেমন। আম্মার গায়ের রং মিশমিশে জামকালো। আমার টুকটুকে পাকা পেয়ারার রঙের আব্বা পছন্দ করে আম্মাকে বিয়ে করেছে। দাদির সাথে বনে না। তবে এবার এসে বাগদা চিংড়ির ভুনা, আর এমন আয়েশী দূষণহীন জীবন চেখে চেটে দেখতে দেখতে এটা বুঝলাম যে, দাদি আমাকে আর রাজুকেও তেমন পছন্দ করে না।
প্রতিদিন রাতে দাদি ছোট তিন ভাইবোনকে নিয়ে ঘুমায়। গল্প শোনায়। আমাকে আর রাজুকে ডাকে না। মগজ ঠাসা বড় চিংড়ি আমার আর রাজুর পাতে পড়ে না। তাতেও আমরা আলাদা কিছু মনে করতাম না; কিন্তু রাজু সেদিন দাদিকে বলতে শুনলো, আব্বাকে বলছে- 'কোথাকার কোন অজাত কুজাত রক্তের বাচ্চা এনে মিলাইসোস আমার নাতিপুতির লগে। নিজের চারটা বাচ্চা তো হইসে, এখন পরের রক্তরে বিদায় কর। এতিমখানায় পাঠা, নাইলে কিন্তু একদিন দেখবি সব সয়সম্পত্তি ছিঁড়েখুঁড়ে ...'
রাজু ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কেমন অসহায় লতাপাতার মতন কাঁপছিল, আর আমি ছুটে এসে পেছন থেকে ওকে জাপ্টে নিয়েছিলাম। আব্বা দাদির ঘর থেকে বের হয়ে কেমন মরা সাদা চোখে আমাদের দিকে তাকালো। পরদিন ভোরে আব্বা আমাদের নিয়ে চলে আসছিল ঢাকায়, আমাদের টিকাটুলীর এই স্যাঁতসেঁতে বাড়িতে। সেদিন বিকেলে আব্বা আমার আর রাজুর জন্য একগাদা খেলনা কিনে আনল। আমাদের ছোট ভাইবোনেরা তার ভাগ পেলো না। আম্মা ক্যাঁচক্যাঁচ করলো, শুধু দুইজনের জন্য খেলনা ক্যান? বাকিরা কী দোষ করলো? আমি আর রাজু খেলি, আব্বা চুপ। একটা কাঠের পুতুলও এনেছিলো আব্বা। নীলের মধ্যে হলুদ নকশা করা। ট্রেন, বল সব বাদ দিয়ে আমি আর রাজু সেই পুতুলে মশগুল হলাম। এক হাত সমান কাঠের পুতুল, তার পেট থেকে খুলে ফেললে ছোট আরেকটা পুতুল, তার ভেতরে আরেকটা পুতুল। এমন করে বড় ছোট সাতটা কাঠের পুতুল, তারা একজনের পেটে আরেকজন থাকে। রাজু বললো, আমরা সাতজন, আব্বা আম্মা আর আমরা পাঁচজন। খেলা শেষ হলে একজনের পেটে আরেকজনকে ঢুকিয়ে গুছিয়ে আমরা রেখে দিই। আমরা তাদের আদুরে নাম দিলাম- সাত পেটে পুতুল। আমি আর রাজু আরেকটা খেলা শিখলাম, চুপ করে থাকার খেলা। সেদিনের দাদির সে কথা কিংবা মালতী চাচি আর পাড়া-প্রতিবেশীর কথা আমরা আর তুললাম না। সেদিনও না, আজও না। তার বদলে আব্বার চোখের দিকে তাকালে কাজ হয় বেশি। আবার চোখে সত্য গোপনের ছায়া, সেই ছায়ায় চোখ রাখলে মেলে সবকিছু। যা চাই তাই। আমি আর রাজু তাই প্রশ্ন তুলি না। আমরা শুধু প্রয়োজনে আব্বার চোখে চোখ রাখি।
কিন্তু আমি আর রাজু অন্য ভাইবোনদের ছাড়িয়ে আরো কাছে আসি। লোডশেডিংয়ের জোনাকি গুনগুন রাতে বাড়ির উঠোনে বসে আমরা মিলানোর চেষ্টা করি। পুরোনো অ্যালবাম ঘাঁটি, আয়নায় তাকিয়ে দেখি। অমিল খুঁজি চোখে নাকে ঠোঁটে। খুব কঠিন। আম্মা ওই যে মিশমিশে কালো। আব্বা টুকটুকে, একটু তাপে লাল হয়ে ওঠে মুখ। রাজু কালো। আমার শরীরের রং আব্বার মতন। চোখ নাক মুখে এমন কোনো অমিলও পাই না যাতে মনে হবে, আমাদের কাউকে জাপান কিংবা তুরস্ক থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে। সময় গড়িয়ে যেতে যেতে, আমরা কিছু তথ্য খুঁজে পাই। ট্রাঙ্কে, পুরোনো ফাইল ঘেঁটে, এর ওর মুখে শুনে। এই যে টিকাটুলীর বাড়ি, এখানে দাদার জমি ছিল। আম্মাকে বিয়ের পর বাগেরহাট থেকে এসে আব্বা এই জমিতে বাড়ি তোলে। দাদা-দাদির ম্যালা টাকা। আব্বার তাই টাকার অভাব হয়নি। এক বছর টিকাটুলীর শেরেবাংলা বালিকা বিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ানোর পর, হুট করে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে তালা মেরে আম্মাকে নিয়ে চলে গেল। এত জায়গা থাকতে গেল আলীকদম, বান্দরবান। এই গল্প আমরা আম্মার মুখে শুনেছি। ট্রাঙ্কের ভেতরে কাগজপত্র খুঁজে বের করেছি যে ঘটনা ঠিক। ট্রাঙ্কের ভেতর ছেঁড়া হলদে সেই সময়ের নিয়োগপত্র খুঁজে পেয়েছি আমরা। আলীকদমের মাধ্যমিক স্কুলে আব্বা ইতিহাস পড়াতো। তিন বছর পর ফিরে এসেছিল এখানে আব্বা আম্মা, সাথে ছিল দুই বাচ্চা। আমি আর রাজু। কিন্তু আলীকদমের কোনো এক পরিচিত আত্মীয়র সুবাদে এলাকার এক লোক জানলো, আমাদের মধ্যে এক বাচ্চা দত্তক। লোকমুখে ছড়ালো, আব্বা-আম্মা এই নিয়ে কোনো কথা বলে না। আব্বা মনিহারি দোকান দিলো, একটা লন্ড্রি, আমাদের অভাব নেই। আরো তিন ভাইবোন এলো পরিবারে। কিন্তু চারপাশের গুনগুন আগ্রহ এখনো থামেনি। কোনজন? আমি আর রাজু খুঁজে পাই না। তবে আমরা অমিল খোঁজার এ খেলা খেলি।
কোনোদিন রাজু ভাবে, সেই কুড়িয়ে পাওয়া। অন্য রক্তের স্রোত তার শরীরে। সেদিন তার মন খারাপ হয়, চোখ জলজ হয়, আব্বা বুঝতে পারে। কাছে এসে বলে, 'বল কী চাই?' আর আমার যেদিন মনে হয় আমি বোধহয় কুড়িয়ে পাওয়া, সেদিন আমি নির্বিকার। আমি পড়তে বসি, ভাইবোনদের সাথে এক্কা দোক্কা তেক্কার ছক কাটি। আব্বার দিকে তাকাই কোন এক ঠিক মুহূর্তে। আব্বা বুঝতে পারে, কাছে এসে বলে, 'বল কী চাই?' আর বাকি দিন আমরা সাত পেটে পুতুলগুলোর মতন সাধারণ দিন কাটাই।
পরিবারের বাইরে আমাকে আরেকজন বলে, 'বল কী চাই?' ওই যে পাড়ার সেই বড় ভাই, যার সাথে আমার টলটলে রোমাঞ্চকর সম্পর্ক। স্কুল ছেড়ে ক'দিন পর কলেজে যাবো। এমন সময়ে আমার বাকি বন্ধুরা যেমন টুকটাক প্রেম শিখছে, আমিও। আমি বরং একটু বেশিই পাই অন্যদের চেয়ে। স্কুলের গলির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা গল্প করি, আমার সদ্য কলেজ পাস প্রেম টলমল পাড়ার সেই বড় ভাইকে বলি, 'আমিই বুঝি সেই কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান আব্বা-আম্মার। সেদিন স্বপ্নেও দেখসি আমার আসল আব্বা-আম্মা আমাকে খুঁজে।' এর পর এক দীর্ঘশ্বাস। তারপরই সে বলে-
'আহারে আহারে, বল কী চাই? আমি তো আছি।' আমি কখনো আঙুল তুলে কাঠি আইসক্রিম চাই। কখনো তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, তার সবটুকু মনোযোগ আমার দিকে ঢেলে নেই। এমনকি যেদিন সে আবিস্কার করলো, আমি অঙ্ক কোচিং ক্লাসের এক ছেলের সাথেও ফোনে টুকটাক কথা চালাচ্ছি, তার আগুন রাগের সামনে আমি কেমন অসহায়। সেই পুরোনো শেখা চোখে চোখ রাখার খেলা খেললাম। কেটে কেটে বললাম, 'আমার স্বভাব খারাপ আসলে, আমার তো জন্মেরই ঠিক নাই, আমারেই মনে হয় আসলে কুড়ায় ...।' রাগে আগুন আমার সেই প্রেমিক কেমন গলে মোম হলো। 'আহারে আহারে, মন খারাপ করে না, আমি আছি, কী চাই তোমার?'
আমি আর রাজু মন খারাপের দিনগুলো বাদে বাকি দিনগুলোতে সবার সাথে মিলে কাটাই। রাজু আমাকে আঁকড়ে বাঁচে। আমিও রাজুর পেছন এসে ওকে জাপ্টে ধরি। এই যে আমার এক আধো মাখা প্রেম, রাজুর সাহায্যেই তো চলছে। বাড়িতে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম প্রেমিকের সাথে বিকেলে। সন্ধ্যেয় রাজু আমাকে নিয়ে এলো সিনেমা হল থেকে। ফিরে দেখি উঠোনে আব্বা দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যের পাতলা অন্ধকারের ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, দেখি, আব্বার রাগে থরথর মুখ। পাড়ার কে যেন জানিয়ে দিয়েছে, আমি আর রাজু সিনেমা হল থেকে ফিরছি। কী বেদম মার আব্বা রাজুকে দিলো, জীবনে এই প্রথমবার। 'এই বয়সে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যাস, নিজে নষ্ট হচ্ছিস, বোনকেও শেষ করতেছিস।' আমি কিচ্ছু বলি না। রাজুকে বাঁচাই না। সত্য ভাঙিনা। মারের চোটে রাজুর ঠোঁট কেটে যায়। আম্মা এসে থামায়। 'ছেড়ে দেন, আর মাইরেন না।'
আমি উঠোনে একা দাঁড়িয়ে থাকি। আব্বা আম্মা ঘরে ঢুকে গেলে রাজু এসে দাঁড়ায়। রক্তমাখা থুথু ফেলে পায়ের কাছে। 'শোন আজকে আমি নিশ্চিত কে পালক সন্তান। তুই। তোর রক্ত খারাপ। নাইলে তুই আমারে আজকে বিপদে ফেলে চুপ থাকতি না...'
আমি রাজুর দিকে তাকাই। রাজু কেমন চমকে ওঠে। এমন করে আমি তাকিয়ে ছিলাম, কয়েক বছর আগে একবারই।
তখন আমার বয়স প্রায় এগারো। সেদিন আমার জ্বর। আম্মা গেছে বাকি ভাইবোনদের নিয়ে মামার বাসায়। মামাতো বোনের জন্মদিন। আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলাম। আব্বা আমার সাথে বাসায় ছিল। উঠোন থেকে আব্বার কথা শোনা যাচ্ছিল। কে আসছে? আমার ঘরের জানালার ওপারে উঠোন। গ্রিলে মুখ লাগিয়ে দেখি- এক মহিলা, হলুদ প্রিন্টের শাড়ি, মাথায় ঘোমটা। সেই মুখ দেখে আমি চমকে উঠি। এই মুখ আমি আগে কই দেখেছি?
আব্বা বলে, 'তোমাকে তো বললাম, রাস্তায় দাঁড়াও, আমি আসতেসি। ঘরে আসলা ক্যান?'
'আপনি যে ফোনে বললেন বাসায় কেউ নাই।'
'আর কক্ষনো আসলে তোমারে টাকা দেয়া বন্ধ করে দিবো।'
'রাজুকে একবার দেখতাম।'
'আবার? মানা করসিনা?'
আমি মন দিয়ে দেখি, গ্রিলে কান চেপে শুনি। আমার আব্বার প্রেমিকা। প্রাক্তন নাকি বর্তমান? এই মহিলার জন্যই নাকি আব্বা আলীকদম যেয়ে তিন বছর থাকলো। রাজুর একটা ছবি হাতে নিয়ে সে কাঁদে। আব্বা অস্থির হয়। 'আমার বউ জানে রাজুরে এতিমখানা থেকে আনসি। তুমি ঝামেলা করলে টাকা দেয়া বন্ধ করবো, রাজুরে তোমার কাছে দিয়ে আসবো। তখন দেখি পোলা কেমনে মানুষ করো। যাও যাও।'
বিকেলের আলো সেদিন কেমন টাটকা। আমার জ্বরে পোড়া চোখ দুটো সেই আলোতে ঠিক চিনে নিলো, সেই মহিলার মুখ। বুঝলাম কেন এত চেনা লাগলো। ঠিক যেন রাজুর সেই চোখ, গায়ের কালো রং। আমার খুব আম্মার জন্য মন কেমন হলো। আহারে এই মহিলাও তো আমার আম্মার মতনই কালো। তাইলে আব্বা আম্মাকে ফেলে কেন এই মহিলার কাছে যায়? আহারে আম্মা। রাজুর আম্মা কেমন মাথা নিচু করে বিদায় নিলো। আহারে রাজুর আম্মাটা। রাজুর জন্য তার কেমন মন কাঁদে। আব্বা ঘুরে আমাকে গ্রিলের ওপারে দেখেছিল। আব্বা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, আহারে কি অসহায়। আমি গ্রিলের ফাঁক গলে আমার জ্বরে পোড়া চোখ দিয়ে আব্বার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কতক্ষণ আমার মনে নাই। কিন্তু আমি আব্বার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
খেলা আব্বা শুরু করেছে। আমি সেই খেলা শিখে ফেলেছি। আমিও খেলছি আব্বার সাথে, রাজুর সাথে, প্রেমের সাথে, নিজের সাথে, সাত পেটে পুতুলের এ সংসারে। খেলে যাবো জীবন যতদিন। খেলে যাবো বিচ্ছেদ অবধি।

বিষয় : প্রচ্ছদ কিযী তাহ্‌নিন

মন্তব্য করুন