আমাদের শৈশব-কৈশোরে পুতুল খেলা দেখানোর দল থাকত। তারা স্কুলে বা কলেজে গিয়ে স্যারদের সঙ্গে কথা বলত। স্যাররা আমাদের বলতেন, তোমাদের এক ঘণ্টার ছুটি দেওয়া হলো, মাঠে যাও, সেখানে পুতুলনাচ দেখানো হবে। পুতুলনাচের সঙ্গে তারা ম্যাজিকও দেখাত। তারা পুতুল নিয়ে নানা ধরনের খেলা দেখাত। ম্যাজিশিয়ানরাও আসত, তারাও নানা জাদু দেখাত। আরেকটা ছিল টকি। টকি কী জিনিস সেটা এই সময়কার অনেকেই হয়তো জানে না। একটা তেপায়া টেবিলের মতো, ঘাড়ে করে নিয়ে আসতেন এক ভদ্রলোক। টেবিলের ওপর বসানো লম্বা ঘরের মতন, পাশে গোল গোল কাচ। সেখানে চোখ রাখতে হতো। ওই মানুষটি সেগুলো বদলাত আর নানা দৃশ্য ফুটে উঠত সেখানে। তিনি বলতেন, এই যে দিল্লি দেখুন, দিল্লি! এই যে এবার কার্জন হল দেখুন, কার্জন হল! তাজমহল দেখা যায়, তাজমহল দেখুন! এবার দেখুন কলকাতা, কলকাতা! এভাবে টকি শো দেখাত। শো দেখানোর জন্য সামান্যই পয়সা নিত, এক পয়সা, দু'পয়সা, যে যা দিত। আরেকটা ছিল সাপের খেলা। বেদেরা আসত মাথায় সাপের ঝাঁপি নিয়ে। তারা খেলা দেখাত আবার সাপও ধরে নিয়ে যেত। আমাদের ওই দিকে গ্রীষ্ফ্মকালে প্রচণ্ড গরম থাকত। মাঠের দিকে গিয়ে গর্তের মধ্যে থেকে সাপ ধরত। গর্ত দেখে তারা ঠিকই বুঝত, কোন গর্তে ইঁদুর আছে, কোন গর্তে আছে সাপ। বিরাট বিরাট সাপ ধরতে দেখেছি তাদের। সাপের ঠিক গলার নিচে ধরত আর সাপ বড় হা করত। তখন ছোট্ট একটা বোতলে সাপের দাঁত বসিয়ে বিষ টেনে নিত। তখন শুনেছি, সাপের বিষের নাকি অনেক দাম, কারণ এ দিয়ে নানান ধরনের ওষুধ তৈরি হয়! আবার ভালুকের খেলা দেখাতেও আসত কেউ কেউ। বানরের খেলা দেখাতেও আসত প্রায়ই। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলত, 'বানরের নাচ দেখবে গো, বানরের নাচ!' মা-বাবারা তখন মানা করত, কারণ বানরের খেলা দেখতে প্রচুর মানুষের ভিড় জমে যেত। যারা খেলা দেখতে আসত, তারা দু-এক পয়সা করে দিত, কারণ খেলা দেখাতে আসত যারা তাদের কোনো চাহিদা ছিল না, যা পেত তা-ই দিয়ে চলে যেত।
পুতুলের খেলা বা নাচ দেখানো বিষয়টা গ্রামের মতো শহরেও চালু ছিল। বর্তমানে অনেক গবেষণা আছে পুতুলনাচ নিয়ে। অনেক আধুনিকায়ন হয়েছে। আমাদের সময় দেখতাম, চিকন দড়ি বেঁধে দেখাত খেলা। যারা দেখাত তারা জানত কোন দড়িটা টানলে পুতুল হাত ছুড়বে, পা ছুড়বে। তারা পেছনে দাঁড়িয়ে কলকাঠি নাড়ত, আর সামনে বসে সবাই পুতুল খেলা দেখত। আমাদের ছেলেবেলার এসব পুতুল খেলা, বাজিকর, টকি শো, বানরের খেলা কোথায় চলে গিয়েছে, শহরে তো নেই-ই, গ্রামেও নেই এখন আর এসবের চল। গ্রাম থেকে যে শুধু এসব উঠে গিয়েছে এমনটাও নয়, আমাদের সময়ে হতো কাবাডি, হাডুডু, ডাংগুলি খেলা, বিনে পয়সার এই খেলাগুলোও তেমন খেলে না কেউ। আমাদের সময় আরেকটা খেলা ছিল লাট্টু বা লাটিম খেলা। দু-এক আনায় পাওয়া যেত লাট্টু। চারপাশে দড়ি পেঁচিয়ে জোর করে মারলে ঘুরতে থাকা কার লাট্টুতে কত দম, কার লাট্টু বেশি সময় ধরে ঘুরত, আবার মাটিতে গোলাকার বৃত্ত দিয়ে দেওয়া হতো, যেন লাটিম এর বাইরে বের না হয়, এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো, অল্প পয়সায় বাজি হতো।
পুতুল খেলার বিষয়টি বেশ প্রতীকীও বটে। এ নিয়ে বলতে গিয়ে মনে পড়ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসটি। এত অসাধারণ একটি উপন্যাস, যার কথা অল্পতে বলে শেষ করা যায় না। পুতুল খেলার কোনো বিষয়ই এখানে নেই। কিন্তু ভাগ্যের হাতে-দুর্ভাগ্যের হাতে আমরা যে খেলার পুতুল, পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের যে তখন কিছু করার থাকে না। অবদমিত প্রেম, অবদমিত ভালোবাসা, অবদমিত ঘৃণা- এসব তো আমরা প্রকাশ করতে পারি না। এই ধরাধামে আমরা যে স্রেফ পুতুল, এসবই উঠে এসেছে উপন্যাসজুড়ে।
পুতুলের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল, আমাদের গ্রামে হিন্দু বিবাহিত নারীরা তারা এমন করে মাথায় ঘোমটা টানত, কিছুই দেখা যেত না, কপালের ওপর থেকে লম্বা সিঁদুরের দাগ ছাড়া। দিন শেষে তারা দল বেঁধে গ্রামের বাইরে একটা পুকুর ছিল সেখানে স্নান করতে যেত। স্নান শেষে তারা সেখানে কাপড় ছাড়ত না, একই কাপড়ে তারা বাড়ি ফিরে আসত। এসে তারপর শুকনো কাপড় পরতো। একসঙ্গে তারা যখন যেত, তাদের দেখতে পুতুলের মতোই লাগত। বলা যায়, তাদের কোনো ব্যক্তিত্ব ছিল না, সেই বয়সেই এদের আমার পুরুষদের হাতের পুতুল মনে হতো।
কেউ কি বলতে পারবে, আমি জীবন্ত পুতুল নাচ দেখেছি! প্রশ্ন উঠবে, পুতুল আবার জীবন্ত হয় কী করে, সে আবার নাচবে! কিন্তু জীবন্ত পুতুলনাচ আমি দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের পথ ধরে আমি একদিন যাচ্ছিলাম। দেখলাম, একজন অতিশয় সুন্দরী নারী, অনেক লম্বা, তার দুই পায়ে ঘুঙুর বাঁধা। তার পাশেই আছে একজন, তার হাতে একটা হুইসেলের মতো। ওই লোক ভঙ্গিমা করে বলছে, আপনারা কি জীবন্ত পুতুলনাচ দেখবেন, জীবন্ত পুতুলনাচ! এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওই নারী নাচতে শুরু করল। নাচ বলতে দুই পায়ে লাফানোর মতো অঙ্গভঙ্গি। নাচ শেষ হলো, এবার ওই নারীর সঙ্গী লোকটি উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলল- আপনারা কেউ যদি এই পুতুলকে এক ঘণ্টার জন্য নিজের কাছে রাখতে চান, তাহলে পাঁচটি ডলার দিতে হবে! বুঝতে পারলাম এটা ওই নারীকে নিয়ে বাণিজ্য করার একটা কৌশল। মেলবোর্নের মতো এমন পুতুলনাচ আমি দেখিনি। গ্রেট ব্রিটেনেও নয়, তবে জার্মানিতে গিয়ে দেখেছি এমন পুতুলনাচ। আমাদের দেশে যেমন মেলার সময় মাঠের মাঝখানে আসর জমিয়ে গোল হয়ে বসে পুতুলনাচ দেখানো হতো, জার্মানিতেও তেমনটা হতো। আসর জমিয়ে কখনও একদল মেয়ে, কখনও একজন মেয়েকে নানা রকম দেহভঙ্গিমা করে নাচতে দেখেছি। ভারতীয় অসাধারণ এক অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রেখা। রেখা অভিনীত 'উমরাও জান' সিনেমায় 'দিল চিজ কেয়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে' গানের সঙ্গে নেচেছিলেন। গানের সঙ্গে বসা অবস্থায় একটা পা ঠুকে ঠুকে মুদ্রা তুলছেন, তারপর দাঁড়িয়ে বিভিন্ন মুদ্রা, কোমর নাচানো- সেটা সত্যিই অসাধারণ ব্যাপার। তখন মনে হয়েছে গান যেমন শিল্প, নৃত্যকলাও তেমন অসাধারণ শিল্পকলার মধ্যে পড়ে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা' যখন পড়ি, তখন আমার মনে হয়, এই বিশাল ভুবনে মানুষ নামক একটা জীব, যারা কিনা দুপায়ে হাঁটে আর দু'হাতে কাজকর্ম করে। এভাবে একটা সময় পরলোকে চলে যায় তারা। মানিক খুব চাপা লেখক, খুলে লেখেননি কিছুই, অনেকটা ইঙ্গিতবাহী। কিন্তু কী অসাধারণ প্রেমের উপন্যাস এটি। অথচ প্রেমের কোনো বর্ণনাই সেখানে নেই। এই উপন্যাসকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা একটি উপন্যাস বলে আমি মনে করি। তার 'পদ্মা নদীর মাঝি' হয়তো বেশি পরিচিত কিন্তু এটির সাহিত্যিক মানে 'পুতুলনাচের ইতিকথা'র ধারেকাছেও নেই। এখন আর 'পুতুলনাচের ইতিকথা' বলা যাবে না, এখন যদি বলা হয়, তবে বলতে হবে- এই পৃথিবীতে মানুষ নামক এক ধরনের পুতুল আছে, যাদের সংখ্যা কয়েক কোটি হইবে। তাহাদের কে নাচাইতেছে, তা আমরা বলিতে পারি না। শোনা যায়, উপরে ঈশ্বর, গড বা আল্লাহ আছেন। তিনিই এই পুতুলনাচ নাচাইতেছেন।
আমি মনে করি, পুতুলনাচ পৃথিবীজুড়েই হচ্ছে। মানুষ এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। সকাল বেলায় থাকছে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে লন্ডন শহরে, বিকেলেই চলে আসছে প্রচণ্ড গরমের শহর কলকাতা বা ঢাকায়। এটা কি ভাবা যেত আগে। রেল হওয়ার পর মনে হয়েছিল গতি অনেক বাড়ল কিন্তু বিমান আবিস্কারের পর কি গতির সংজ্ঞাই পাল্টে গেল। বোমারু বিমান নিয়ে মানুষ যা খুশি তাই করছে। মানুষ একেকটা নগর ধ্বংস করে ফেলছে। জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমায় যে দুটো আণবিক বোমা পড়েছিল, দুটো শহরই সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। তখন মানুষকে তো পুতুল না বলেও উপায় থাকছে না। পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে, প্রকৃতি বদলাচ্ছে, মানুষের পরিবর্তন হচ্ছে, মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। একদিক থেকে তো আমরা পুতুলই। মানব ভাগ্য এক বিরাট পুতুলের খেলা বৈ আর কী। কে যে খেলাচ্ছে তাকে তাকে দেখতে পাচ্ছি না। কার নির্দেশে খেলছি, ভালো খেলছি না মন্দ খেলছি, সেটিও জানার জন্য কেউ নেই।

মন্তব্য করুন