পর্ব-১১
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
চুয়ান্নর নির্বাচনের নেতৃত্বে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর মওলানা ভাসানী। নির্বাচনকে ঘিরে তারা একটা আন্দোলন তৈরি করতে পেরেছিলেন, যে আন্দোলনটা ছিল খুব সবল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে এটা একটা নবপর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। যুক্তফ্রন্টে সকলেই জড়িত ছিল; নেজামে ইসলাম, খেলাফতে রাব্বানী, গণতন্ত্রী দল থেকে আরম্ভ করে আরও বহু সংগঠন যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। কমিউনিস্টরা যদিও স্বাধীনভাবে নির্বাচন করেনি কিন্তু তারা গণতন্ত্রী দল এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে থেকে নির্বাচন করে বেশ কিছু সংখ্যক আসন তারা পায়। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগে একটা বড় বাম প্রভাব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দলে প্রধান প্রভাব ছিল সোহরাওয়ার্দীর।
আবুল হাশিমের খেলাফতে রাব্বানীও ভূমিকা পালন করেছিল। আবুল হাশিম যিনি প্রথম থেকেই স্বাধীন পূর্ববঙ্গের কথা বলে আসছিলেন। তিনি ১৯৫০ সালের দিকে পাকিস্তানে আসেন এবং পরে নিজের আলাদা দল করেন। তিনি তখন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন না। আবার তার প্রধান বিরোধ ছিল সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। সে কারণে আলাদা দল খেলাফতে রাব্বানীর মাধ্যমেও আবার সেই স্বাধীনতার কথা বলছেন।
আমাদের দেশের ইতিহাসবিদরা একটা ক্ষতি করেছেন তৎকালীন রাজনীতিতে এই স্বাধীনতার আন্দোলনের ধারাবাহিকতার বিষয়টি না তুলে। অর্থাৎ ইতিহাসের ধারায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের কথা এসেছে, কিন্তু এটা যে ধারাবাহিকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এসেছে, সে কথাগুলো তেমনভাবে তারা আনেননি। এর ফলে আমাদের দেশে যারা ইতিহাস পড়ছেন, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মানুষরা- তাদের ধারণা হচ্ছে যে, হঠাৎ হঠাৎ করেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এটা যে দীর্ঘ ধারাবহিকতার অংশ হিসেবে এসেছে এবং কোনোদিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের বিষয়টি বন্ধ হয়নি- সে কথাগুলো তখন তারা আর স্মরণে রাখতে পারছেন না।
তখন যে রাজনীতিটা চলছিল- তাতে পাকিস্তান সহজভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে, এটা আলাদা বা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার লক্ষণ; অথবা পূর্ব পাকিস্তান বলে যেটা বোঝাত সেটাকে পাকিস্তান কোনোদিনই মেনে নেয়নি। সে কারণে তখনই পাকিস্তান আঘাত করল, এবং বলল, যুক্তফ্রন্টের প্রধান এ কে ফজলুল হক দেশ স্বাধীন করার কথা ভাবছেন। বাঙালি আর অবাঙালিদের মধ্যে সে সময় দাঙ্গা লাগল। দাঙ্গা আসলে কখনও জাতি পরিচয়ের কারণে লাগে না, দাঙ্গা লাগে রাজনৈতিক সুবিধার কারণে। দাঙ্গাটা কেউ না কেউ বাধায়। তা না হলে গরিব মানুষের কি এমন ঠেকা পড়েছে দাঙ্গা করার! কেউ এই মানুষদের উস্কে দেয়। প্রতিটা দাঙ্গারই এই চরিত্র। এই অবস্থাতেই পাকিস্তান সরকার বলল, ফজলুল হক নাকি আলাদা হয়ে যাবার কথা অর্থাৎ স্বাধীনতার কথা বলেছে। আমেরিকান সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারেও এ কথা উঠেছে। এসব নিয়ে তখন নতুন করে বিবাদ শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যেই দাঙ্গাটাও হলো। সেই সুযোগে পাকিস্তান সরকার ৯২(ক) ধারা দিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল ঘোষণা করে দিলো। এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করলো।
যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল ঘোষণা করার ঘটনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল ঘোষণা করা মানেই হচ্ছে- এ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের যেই একত্রিত রূপ পাকিস্তানিরা দেখতে পেয়েছিল সেটাই বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক চেহারা। যাকে হজম করার ক্ষমতা পাকিস্তান সরকারের ছিল না। সে বিষয়টা শুরুতেই বোঝা গেল যখন তারা স্বাধীনতার কথা বলে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত সরকারকে ভেঙে দিলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে জিনিসটা আবার প্রতিষ্ঠিত হলো, তা হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই রাজনীতিতে ফজলুল হক তার নিজের কৃষক শ্রমিক পার্টি নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। ঠিক যেভাবে ছেচল্লিশে তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে মিলেমিশে, তেমনিভাবে তিনি এবার পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন।

চুয়ান্ন থেকে আটান্ন খুব অস্থির একটা সময়। আজকে এ ক্ষমতায় আসে তো কালকে সে ক্ষমতায় আসে। কালকে সে ক্ষমতায় আসে তো পরশু অন্যজন আসে ক্ষমতায়। এসব করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়ালো, যখন সংকটটা আওয়ামী লীগের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল। ১৯৫৬ সালে সোহরাওয়ার্দী সেই একই রাজনৈতিক খেলার মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বেশ মার্কিন ঘেঁষা মানুষ। ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই তিনি বললেন, এই যে এতদিন ধরে যে সংগ্রামটা চলেছে, অর্থাৎ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য এসব আন্দোলন-সংগ্রাম- এর সব নাকি সমাধান হয়ে গেছে! এই যে তিনি অসততার কাজটি করলেন, যার ফলে দলের ভেতরেই সংকট তৈরি হয়ে গেল। এক হচ্ছে, মওলানা ভাসানী এটা মেনে নিলেন না। আরেক হচ্ছে, দলের যে তরুণ অংশ তারাও মেনে নেয়নি। আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলে বামপন্থি যারা ছিলেন তারাও প্রতিবাদ করলেন। ১৯৫৭ সালে গিয়ে আরেকটি সাংঘর্ষিক অবস্থার তৈরি হলো। মওলানা ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দুই প্রধান নেতা একে অন্যের মুখোমুখি হলেন কাগমারী সম্মেলনে।
কাগমারীতে বামপন্থিরা মওলানা ভাসানীর স্বায়ত্তশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতি মত দিলেও একইসঙ্গে বামদের চাপটা ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির। যেটা আমরা পরবর্তীতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দেখতে পাই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুয়ান্নর নির্বাচনের মাধ্যমে এই যে বামদের উত্থানটা হয়েছিল; আওয়ামী মুসলিম লীগের মাধ্যমে তারা যে উঠতে পেরেছিল, ১৯৫৭ সালে গিয়ে সেটা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাজনীতিতে মিলল না, তারা আলাদা হয়ে গেল। যার ফলে তারা ক্ষমতটা হারাল। বামরা বের হয়ে এসে পাকিস্তান ভিত্তিক দল 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)' গঠন করল, এর মধ্যে ওয়ালী খান, আফজাল বাঙ্গাস প্রমুখ কৃষক-শ্রমিক নেতারাও ছিলেন। কিন্তু বিষয়টা হলো পাকিস্তানে আদর্শবাদী রাজনীতির পরিসরটা বাস্তবে ছিলো কিনা সেটা দেখা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংগ্রামটা সবসময়ই ছিল নিজের স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই ক্ষেত্রে ন্যাপ গঠন করে স্বাধীনতার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি ততটা। যেহেতু ন্যাপ ছিল পাকিস্তান ভিত্তিক দল। ১৯৪৭ থেকে '৫৭ সাল পর্যন্ত বামদের এই যে স্বর্ণযুগটা ছিল, এর পরে সেটাও শেষ হয়ে যায়। কাগমারীতে যখন তারা 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' গঠন করল, সেই পার্টি কোনোদিন মূল রাজনীতিতেও আসতে পারেনি, তারা নিজেরাও মূল ধারা হয়ে উঠতে পারেনি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্নতার ক্ষতিটা ব্যক্তি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি হয়েছে মওলানা ভাসানীর। কারণ তিনি যে দলের নেতৃত্ব দিতে পারতেন সেই দলটি আর তার রইল না। অনেকেই বলেন শেখ সাহেব সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন করেছিলেন। এটা ঠিক, কিন্তু শেখ মুজিবের যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- তা মওলানা ভাসানী বা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে বেশি ছিল। আমি মনে করি শেখ মুজিব সেইদিন আওয়ামী লীগ ত্যাগ না করে যেই রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন যার ফল আমরা সবচেয়ে বেশি পেয়েছি। মূলত ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই আওয়ামী লীগ নামক সংগঠনটির বিশালতা এবং সাবল্য তৈরি হয়েছিল কাগমারীতে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের চলে না যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই দলই বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সোহরাওয়ার্দী নিজেও বলেছিলেন, শেখ মুজিব আমার প্রধান সহযোগী- এটা ঠিক আছে কিন্তু সে পাকিস্তানে বিশ্বাস করে না। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন। শেখ মুজিবের তা ছিল না। তার কাছে সেদিন রাজনৈতিক দিক থেকে, সাংগঠনিক দিক থেকে আওয়ামী লীগ ছিলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। সে জায়গায় মওলানা ভাসানী সাংগঠনিক দিক থেকে ততটা সফল ছিলেন না। মওলানা ভাসানী সেইদিন যে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তবে ভাসানীর এ দুর্বলতা আমি মনে করি অনেক বেশি সাংগঠনিক- কিন্তু স্বাধীনতার বা নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো সমস্যা ছিল না।

১৯৫৭ সালের পরে তারা আলাদা হয়ে গেলেন, মওলানা ভাসানী তখন কিছুটা হলেও প্রান্তিক হয়ে যেতে শুরু করলেন। তিনি তখন বামদের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে গেলেন। তার দল আর প্রধান দল থাকল না। ইতিহাসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে না যে, ন্যাপ কোনোদিন প্রধান দলের মর্যাদা অর্জন করতে পেরেছিল। এই বিষয়টি খুব লক্ষণীয় যে, মূল ধারাটাই রাজনীতিকে পরিচালিত করেছে। এবং মূল ধারার নেতৃত্বে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তার পরে শেখ মুজিবুর রহমান। সেই নেতৃত্বের ধারাতেই আওয়ামী লীগ প্রশ্নাতীতভাবে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে। এই সোহরাওয়ার্দীই ছেচল্লিশের একক পাকিস্তানের প্রস্তাবে জিন্নাহকে সহায়তা করেছিলেন। তবু তার সঙ্গেই কিন্তু মওলানা ভাসানীসহ সবাই রাজনীতি করেছে। সাংগঠনিক প্রয়োজনেই সেটা করা হয়েছে। এই সাংগঠনিক প্রয়োজনের বিষয়টা শেখ মুজিব মওলানা ভাসানীর চেয়ে বেশি বুঝেছিলেন। বুঝেছেন বলেই ইতিহাসের দীর্ঘ মাত্রায় গিয়ে তিনি সফল হয়েছিলেন। হয়তো, ভাসানী সাংগঠনিক নেতা নন, ভাসানী গণমানুষের নেতা, সমাজের নেতা- আর শেখ মুজিব রাষ্ট্র গঠনের নেতা। তবে দু'জনের কেউ কারও চেয়ে ছোটও নয়, কেউ কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বেও নেই।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান যে মার্শাল ল নিয়ে এসেছিলেন, তার ওপর মার্কিন প্রভাব ছিল বিশাল। বস্তুতপক্ষে আমি মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে যেসব দলিলাদি দেখেছি, তাতে দেখা যাচ্ছে মার্কিনিরা প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের একটা ভয় ছিল যে, এখানে একটা বাম অবস্থান তৈরি হবে। সেদিক থেকে বামদের অবস্থানটা ঠিকই ছিল। তারা বামদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে পেরেছিল- কিন্তু অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী যদিও মার্কিনঘেঁষা লোক ছিলেন, তবু সোহরাওয়ার্দী এক সময় পাকিস্তান সরকারের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের মামলা করা হয়েছে তখন। অতএব বোঝা যাচ্ছে, কেবলমাত্র মার্কিনঘেঁষা হলেই পাকিস্তানের বন্ধু হওয়া হচ্ছে না। যে যুক্তিটা অনেক সময় দেখানো হয় যে, অনেক সময় মার্কিনঘেঁষা বলে সোহরাওয়ার্দী খারাপ লোক ছিলেন ইত্যাদি- সেই যুক্তিটা টেকে না। কারণ সোহরাওয়ার্দী মার্কিনঘেঁষা হয়েও আইয়ুব খানের তিনি শত্রু ছিলেন। অন্য দিকে পাকিস্তান সরকার পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিল যে, যদিও মওলানা ভাসানী বড় শত্রু, শেখ মুজিবুর রহমান তার চাইতে বড় শত্রু। এবং দলিলপত্রে আছে পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন জায়গায় বলছে- এই দু'জনকে আমাদের সামাল দিতে হবে। যদিও শেখ মুজিব তখনও প্রধান নেতা নন, কিন্তু পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, সে-ই প্রধান নেতা হতে যাচ্ছেন। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে যখন সোহরাওয়ার্দী মারা গেলেন, ততদিনে ইতিহাসে ভূমিকা রাখার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তুত হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার যে, বিশাল শক্তি নিয়েও মওলানা ভাসানী কিন্তু এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সক্ষম হননি। আরেকটা বিষয় হলো, মওলানা ভাসানী বামপন্থি ছিলেন না, তিনি ইনসাফপন্থি মানুষ ছিলেন। সেই হিসেবেই তিনি বামপন্থিদের সঙ্গে ছিলেন। তবে পরবর্তীকালের রাজনীতি থেকে বোঝা যায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের মূল ধারার রাজনীতির অংশ হিসেবে রাজনীতি করতেই অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিব এবং তার মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল- যার মাধ্যমে তিনি রাস্তায় আন্দোলনটা করেছেন; সেখানে যদিও তিনি জানতেন যে, এ আন্দোলনটা তৈরি হয়েছে ছয় দফা বিরোধী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে- তবু তিনি এটাকে মেনে নিয়েছেন। ঠিক একইভাবে '৭০-এর নির্বাচনে তিনি মেনে নিয়েছেন যে, তিনি সেখানে প্রধান থাকছেন না। মেনে নেওয়ার এই মহত্ত্বটা মওলানা ভাসানীর। সেই সম্মান তার প্রাপ্য এবং সেটা আমাদের তাকে দেওয়া উচিত।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে যে কথাটা বলার চেষ্টা হয়- মওলানা ভাসানী বড় না শেখ মুজিব বড়; বাস্তবে এ কথার আসলে কোনো মানে হয় না। দু'জন তো দুটি আলাদা পরিসরের রাজনীতি করেছেন। সেই আলাদা পরিসরের রাজনীতিতে দু'জনেই সফল। একজন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেছেন। আরেকজন সমাজ গঠনের চেষ্টা করে গেছেন। তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো বৈরী মনোভাব ছিল না। এবং ১৯৬৮-'৬৯ সালে আইয়ুব খানকে তাড়াতে দু'জনে সমঝোতার মাধ্যমে একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন।
যা হোক, এবার মূল বিষয়ের উপসংহার দিয়েই রচনাটির শেষ করতে চাই, তা হলো- ইতিহাসের ধারাবাহিকতার চর্চায় ঘাটতির কারণেই হোক বা 'অকস্মাৎবাদের' চর্চার কারণেই হোক- আমরা চুয়ান্নকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার প্রয়াস চালাই যে, অকস্মাৎ চুয়ান্ন ঘটল, তারপর আটান্ন এলো। আসলে তো তা নয়, এর ভেতরে রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। পাকিস্তানিরা এই ধারাবাহিকতাটা বুঝতে পেরেছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই ধারাবাহিকতাকে যদি আমরা আঘাত না করি- তাহলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। যে কারণে ১৯৫৮ সালে তারা এই যুক্তির অবতারণা করল যে, দেশের অবস্থা অস্থিতিশীল। দেশের অবস্থার অস্থিরতার কথা বলে তারা তখন মার্শাল ল জারি করল। এবং তার মাধ্যমে তখনও যতটুকু পাকিস্তান বাকি ছিল, তার পতনের দিন শুরু হয়ে গেল বা পতন হয়ে গেল। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যতগুলো গোপনে চলছিল, তার সবগুলো আরও বিস্তৃত এবং একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করে ফেলল।
[এ বিষয় সমাপ্ত]

বিষয় : বাংলাদেশের একাত্তর আফসান চৌধুরী

মন্তব্য করুন