- ব্যক্তিগত জীবনে বিশেষ ঘটনা
-- আমাদের মতো মানুষ যারা '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, '৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যা- এগুলো দেখে বৃদ্ধ হয়েছে, তাদের জীবনে প্রতিটা মুহূর্তই বিশেষ। এর চেয়ে বিশেষ ঘটনার কথা আমি বলতে পারব না। কারণ কতকগুলো জাতীয় ঘটনা আমাদের ব্যক্তিজীবনে এসে হানা দিয়েছে প্রতিটা ঘটনাই বিশেষ ঘটনা আমাদের জীবনে। ব্যক্তিগত বিশেষ ঘটনা যদি বলি, কবি সৈয়দ শামসুল হকের মতো একজনের সঙ্গে তরুণ বয়সে আমার আলাপ হয়েছে, তা পরে একটি ব্যক্তিজীবনে রূপ নিয়েছে- এটি একটি বিশেষ ঘটনা আমার মতো মানুষের জীবনে। আর অন্যান্য প্রভাবের কথা যদি বলি- ব্যক্তিক, রাষ্ট্রিক, সামগ্রিকভাবে আমরা যে একটা নতুন দেশের মুখ দেখেছি, এটি বিশাল একটি ঘটনা। এ ঘটনা ক'জন মানুষের জীবনে ঘটে? বাংলাদেশের মুখ দেখা আমার জীবনের বিশেষ ঘটনা। ভোরবেলা উঠে লাল সবুজের ঝান্ডা ওড়ানো দেখা প্রতিটি বাঙালির জীবনকে প্রভাবিত করেছে। একক নয়, সমষ্টিগত জীবনে এটি একটি বিশেষ ঘটনা। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভোরবেলা দেখলাম আকাশে রোদ ঝলমল করছে, লাল সবুজের পতাকা উড়ছে- এটি একটি বিশেষ ঘটনা। এর মতো ঘটনা এই মুহূর্তে কোনো মানুষের জীবনে ঘটতে পারে বলে আমার মনে হয় না।
- প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
-- প্রথম বই প্রকাশ হয়েছিল আমার 'ছানার নানা বাড়ি' তখন খুব সম্ভব আমি বিদেশে ছিলাম। এটা একটা খুশি, তবে বই বালিশের নিচে রাখা ওরকম কিছু ছিল না, বরং বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ওই বই আমাকে বেশি আলোড়িত করেনি কারণ এর পেছনে আমার খুব একটা কাজ ছিল না, প্রচ্ছদ পছন্দ ছিল না। তবে তৃষিতার প্রচ্ছদ আমার খুব পছন্দ ছিল, এটিই আমার বড়দের জন্য প্রথম বই আর ছোটদের জন্য প্রথম ছিল 'ছানার নানা বাড়ি'।
- কোন বই বারবার পড়েন, কেন?
-- আমি বিভিন্ন বই, যখন যেটা সামনে পাই পড়ি। বিশেষ কোনো বই নেই, তবে আমার তরুণ বয়সে আমাকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল যে বইটি, তা হলো- এরিক মারিয়া রেমার্কের 'থ্রি কমরেডস'। আর আমাকে যেসব বই প্রভাবিত করেছিল তার মাঝে উল্লেখযোগ্য রাশিয়ান লিটারেচার। আমাদের উঠতি বয়সকে রাশিয়ান লিটারেচার এত সুন্দর করে গড়ে দিয়েছিল, এখনকার ছেলেমেয়েদের জীবনে এই সাহিত্য আসে কিনা জানি না তবে আমরা রাশিয়ান সাহিত্যের কাছে ঋণী, কৃতজ্ঞ।
- ব্যক্তিজীবনের যে সীমাবদ্ধতা কষ্ট দেয়-
-- ব্যক্তিগত জীবনে আমার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। আমি সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাসই করি না এবং আমি সৈয়দ হককে কখনও বাধা দিইনি। সে যা করতে চেয়েছে করেছে, আমি যা করতে চেয়েছি সেও করতে দিয়েছে। আমাকেও সে বাধা দেয়নি, আমিও তাকে বাধা দিইনি। আমরা মুক্তজীবনে বিশ্বাস করি তবে পরিবারকে কখনও অবমূল্যায়ন করি না। পরিবারকে আমরা সবসময় প্রাধান্য দিই, শ্রদ্ধা করি।
- কী হতে চেয়েছিলেন কী হলেন?
-- আমি যা হতে চেয়েছিলাম আমি তাই হয়েছি। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম আমি লেখক হয়েছি, আমি বড় একজন ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, আমি তাই হয়েছি। আমি নিজের একটা বাড়িতে থাকতে চেয়েছিলাম, তা-ই থাকছি। আর কী চাই জীবনে! তবে এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে বলব অতিরিক্ত পরিশ্রম, পরিশ্রম আর পরিশ্রম। পরিশ্রম ছাড়া কখনও এতদূর এগোতে পারতাম না।
- আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে মনে করেন?
ষষ আমি কখনও হাল ছেড়ে দিই না। এটি আমার চরিত্রের একটি শক্তিশালী দিক বলা যায়। আমার যা হতাশা- সবকিছু সৈয়দ হকের কাছে। তাছাড়া বাইরের কোনো লোক বলতে পারবে না যে, আমি হতাশ হচ্ছি।
- নিজের সম্পর্কে শোনা অভিযোগ?
-- নিজের সম্পর্কে শোনা অভিযোগ হচ্ছে, আমি স্পষ্ট করে সব বলে দিই, আমি সৈয়দ হকের মতো ডিপেল্গাম্যাটিক নই, মাথা ঠান্ডা নই। কিন্তু আমি যা আমি তাই। দুই বিপরীত মেরুর সংঘর্ষের পরিবর্তে যে ভালোবাসা হতে পারে, তা-ই আমরা। তাঁর নেচার হচ্ছে অসম্ভব ধৈর্য, আমার তা নয়, আমার সবকিছুই তাড়াহুড়া।
- প্রিয় উদ্ধৃতি?
-- সৈয়দ হক বলতেন, 'আমার যুদ্ধ হচ্ছে মহাকালের সঙ্গে'। লোকে যখন তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করত তিনি বলতেন, 'আমি কিছু মনে করি না'। কিন্তু, আমার যুদ্ধ মহাকালের সঙ্গে নয়, আমার যুদ্ধ হচ্ছে প্রতিদিনের সঙ্গে, বেঁচে থাকার সঙ্গে, মাথা উঁচু করে বাঁচার সঙ্গে। আমার নির্দিষ্ট কোনো উদ্ধৃতি নেই, আমি মনে করি- যে উদ্ধৃতি মানুষকে প্রভাবিত করে, সতেজ করে; চলার পথে সাহস জোগায়- সেসব উদ্ধৃতিই আমার উদ্ধৃতি।
- জীবনকে নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
-- জীবনকে নিয়ে আমার ভাবনা এই যে, মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা স্বপ্নের মতো কেটে গেল। যখন যৌবনে ছিলাম বুঝিনি এটা যৌবন, মধ্যবয়সে থাকাকালীনও বুঝিনি এটা মধ্যবয়স, এখন শেষ বয়সে এসেও মনে হচ্ছে শেষ বয়স আসেনি। আমার কাছে মনে হয় জীবনের কোনো শুরু নেই শেষ নেই। ইট ইজ আ কন্টিনিউয়াস প্রসেস অব লাইফ। জীবনের রূপান্তর আছে কিন্তু এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বয়সে আমি যেমন উজ্জীবিত বোধ করি, ২৫ বছর বয়সেও আমি ঠিক এই রকমই উজ্জীবিত বোধ করতাম। হয়তো আমার শরীর পারমিট করে না, কিন্তু আমার মন এখনও ওরকমই উজ্জীবিত হয়।

বিষয় : আনোয়ারা সৈয়দ হক আপন দর্পণ

মন্তব্য করুন