আষাঢ়স্য প্রথম দিবস।
লুলাপ রঙের আকাশ সকাল থেকে কি না বলতে পারব না। জ্যৈষ্ঠ মাস রাত ৩টার পর ঘুমিয়ে আমি ঘুম থেকে উঠেছি আষাঢ় মাসের দুপুর ১২টার পরে। উঠে দেখি আকাশ লুলাপ রঙের।
লুলাপ রঙ আবার কী রং?
মহিষ রং।
তবে লুলাপ রং বলা কেন?
রাতে মাত্র অবগত হয়েছি শব্দটা। মহিষের আরেক নাম লুলাপ। ঋজ্ঞ্বেদে উল্লেখ আছে। শিবকালী ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন। 'চিরঞ্জীব বনৌষধি'র শিবকালী ভট্টাচার্য। ছোট একটা দারুণ বই আছে তাঁর। 'জীবজন্তুর নামরহস্য'। ২১ পৃষ্ঠার লুলাপ মনে থেকে গেছে। ভুলে যাওয়ার কথা। অতিমারির কাল। বেজন্মা কোভিড-১৯ এর আগ্রাসন চলছে। কাতারে মানুষ মরছে পৃথিবীর। টকটো এবং ইয়াস নামধারী দুই ঘূর্ণিঝড় হয়ে গেছে এর মধ্যে। ঘূর্ণিঝড় কী? হাওয়ার তাণ্ডব! অক্সিজেনের তাণ্ডব। মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মরছে। যারা মরছে না, থেকে যাচ্ছে, যারা আরও কিছুদিন পরে বা বহুদিন পরে মরবে, তারা কেমন আছে এই সংকটে?
কেউ ভালো নেই। চিনি শুনি যাদের।
অবসাদ মৌলিক।
অর্থকষ্টজনিত শঙ্কা।
শর্ট টার্ম মেমরি লস হচ্ছে খুব মানুষের।
৭-৮ ঘণ্টা কী ৭-৮ মিনিট পরও এখন আর মনে থাকে না কিছু। ছাপোষাদের। ছা না পোষা ছাপোষাদেরও। কতক্ষণে ভুলব?
তুমুল বৃষ্টিপাত হয়েছে সকালে। গলি জমে আছে পানিতে। পানি জমে নেই, খলবলাচ্ছে।
লুলাপ মেঘদল আরও লুলাপ হচ্ছে। হোক। আবার বৃষ্টি নামুক। গলি ডুবে যাক। ঘরদোর জলের নিচের জলরং হয়ে যাক। আষাঢ়ের প্রথম দিন আজ। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন না।
বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল ফুটে ঝরে গেছে কিছুদিন আগে। অরণি দেখে বলেছেন, 'বড়বাবা আমি কদমফুল দেখছি।'
'দেখছো। খুব ভালো করছো। মাস্ক পরে দেখছো?'
'হ্যাঁ-এ-এ, মাস্ক পরে দেখছি। স্যানিটাইজার দিয়া হাতও ধুইছি।'
'খুব ভালো। তোমার মতো বুঝদার মানুষ হয় না।'
বুঝদার মানুষের বয়স ৪ হলো সবে।
কোভিড-১৯ বোঝে অরণি? বাপের কোলে চড়ে এক পাড়া থেকে এক পাড়ায় গিয়েছিল কদমফুল দেখতে। অথচ কদমগাছ ছিল আমাদের বাসাতেই। আর আমাদের শহরে কত যে! নীপবীথির টাউন বলার মতো।
অতিমারীকালীন তৎপরতা। ঘুম থেকে উঠে কর্তব্য মর্মে আমি কল করি দুই ব্যক্তিকে। একজনকে বলি, বেঁচে আছি, একজনকে বলি, বেঁচে আছেন?
চিন্তা না করতে একজন, বুলবুল ভাই কলিং...।
'কী বুলবুল ভাই?'
'আইবেন না মিয়া?'
'আসব। মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম।'
'কখন আইবেন মিয়া? আমারে কি ছাইড়া দিছেন নি?'
জীবনের বেশ-অর্ধেক এই একজন মানুষের সঙ্গে কাটিয়ে দিলাম। বুলবুল ভাই। বুলবুল চৌধুরী। কথাসাহিত্যিক। আমার একজন মানুষ। কর্কট রোগ ধরেছে। তাঁকে দেখতে এক মেয়ে গিয়েছিল বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল নিয়ে। অকুস্থলে সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম পরে। বুলবুল ভাইয়ের চোখ মুখ দেখি ঝলমল করছে।
'কী হইছে?'
'সিনথি আইছিল মিয়া। মাত্র গেল।'
'অ। ওরে বাবা! কদম ফুল আবার কে দিয়া গেল আপনারে।'
'ও।'
'সিনথিয়া?'
'হ্যাঁ। বলল বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল। আর কাউকে সে কখনও দেয়নি।'
প্রেমভাব উঠলে সর্বদা প্রমিত বুলবুল ভাই। খাইছি গেছি মার্কা কথা বলেন না। কয়েকদিন আগে, হয়তো রবিবারে আমি তাকে বলেছি, 'আর্টিস্টের আঙুল নিয়া জন্ম নিছেন, লেখক হয়ে দিন পার করলেন।'
আর্টিস্টের আঙুল আবার কী? লম্বা আঙুল। বুলবুল ভাইয়ের হাতের পায়ের আঙুল লম্বা। তবে আর্টিস্ট হলে হয়েছিল আর কি। তাঁর একটা বই আছে, 'চৈতার বউ গো'। ছোটগল্পের বই। প্রচ্ছদ দেখে আমি হতভম্ব। এ কী!
'আর্টিস্টরে এই আইডিয়া আপনি দিছেন?'
'হ মিয়া। ক্যান? ভালো হয় নাই?'
'ভালো! খারাপের চূড়ান্ত হইছে! পরাখা হইছে।'
'পরাখা কী মিয়া?'
'খারাপের উল্টা। এত খারাপ হইছে যে বানান উল্টে গেছে।'
ধরা যাক দালি আঁকছেন। প্রথম কদম ফুল, বুলবুল চৌধুরী এবং সিনথিয়াকে। আরেক 'স্মৃতির ঐকান্তিকতা।'
ধরা যাক কামু লিখছেন। প্রথম কদম ফুল, বুলবুল চৌধুরী এবং সিনথিয়াকে নিয়ে। আরেকটা 'আউটসাইডার'।
'আউট সাইডার' পেপারব্যাক সংস্করণ। বহু আগের। মলাট ছিঁড়ে গেছে। বিকল্প মলাট কদম ফুলের ছবি! ফুটপাতের পুরান বই বিক্রেতার আইডিয়া। দশ টাকা দিয়ে এক আউটসাইডার কিনেছে, কোনকালে তার সংশয় যাবে না, দশ টাকা দিয়ে সে কী কিনল? আউটসাইডার না কদম ফুলের ছবি? প্রথম কদম ফুল?
বাদল দিনের প্রথম কদমফুল কেন?
শীতের দিনের প্রথম কদম ফুল নয় কেন?
শীতকালে কদম ফুল ফোটে না?
ফোটে। বৃক্ষদাদা সাক্ষী! বৃক্ষদাদা লেখক বিপ্রদাশ বড়ূয়া। বৃক্ষদাদা এবং গোত্রপিতা পুনর্জন্মগ্রহণকারী কিছু নিওলিথ যুগের মানুষের। গোত্রপিতা কী বলেন শুনি।
'কদম বর্ষার ফুল।'
'শীতে ফোটে না দাদা?'
'ফুটবে না কেন? প্রকৃতি কি সবসময় ব্যাকরণ মানে? আসলে কি জানো, কদম ফুল ফোটার জন্য দরকার বৃষ্টি। বর্ষাকাল। বর্ষার ফুল বলেছি তো, তবে শীতে তার ফুটতে আপত্তি কোথায়? বৃষ্টি শীতেও হয়। কখনও কখনও ওরা তখন ফোটে।'
'শীতের দিনের প্রথম কদম ফুলও হতে পারে তবে?'
'হতেই পারে।'
হোক তবে। এই শীতকালে পৃথিবীর একটা কদমগাছে একটা মাত্র কদম ফুল ফুটুক। শীতের দিনের প্রথম কদম ফুল। কে পাবে সেই ফুলটা? আমি যদি পাই?
কলবেল বাজল।
দুর!
মেঘলা দিনে কেউ প্রার্থিত না। প্রত্যাশিত না। মেঘলা দিন একার। লুলাপ রঙের দিন। এছাড়া এই লেখাটা শেষ করতে হবে। মাহবুব (মাহবুব আজীজ) ফোন করেছিল দুপুরে। বলেছি কাল সকালে দেব। বাবুকে বলেছি রাতের মধ্যে কম্পোজ করে দিতে। বাবুর কম্পোজ ভুল হয় না। যে এসেছে অন্তত সে উইয়ের ঢিবি থেকে উঠে আসা না হোক। রামকাণ্ড শোনার সময় নেই এখন। রাম ভান্ড থাকলে বরং খুলে বসা যেত।
লুলাপ রং কখন চলে গেছে আকাশের? আশ্চর্য! কোনদিকে গেছে? কলাতিয়ার দিকে। মিথুন ফোন করেছিল কখন। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে তাদের ওদিকে। মিথুন হরিৎ কলাতিয়ার বাসিন্দা।
'আকাশের রং কী রকম মিথুন?'
'কালো, দাদা।'
'কী রকম কালো? মইষের রঙের মতো?'
'এক্কেরে।'
কলাতিয়ায় এক্কেরে মইষের রঙের আর... রোদমরা আকাশ অত্র। নাশপাতি রঙের।
আবার কলবেল।
অসহ্য তো! কামিং... কামিং...।
দরজা খুলে যে মানুষটাকে দেখলাম, প্রত্যাশিত সে? প্রার্থিত কেউ? সবুজ রঙের শাড়ি পরে আছে। চুল দুই বিনুনি করেছে। পার্পল রিবন। গ্লোসি মেজেন্টা লিপস্টিক। চোখে কাজল দিয়েছে এবং কাজলের টিপ পরেছে। মুখ সস্তা পাউডারে লেপটানো। মাস্ক পরেনি।
কতদিন পর দেখলাম?
সাত-আট বছর আগে আমি একটা অ্যান্টিক বাসায় ভাড়া থাকতাম। তখন আসত। আমি তাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম কেন? বিনু পিসির কথা মনে করে? আমাদের শহরের বিনু পিসি। ছোট থেকে আমরা তাঁকে দেখেছি। টাউনের এর তার ঘরে অবাধ যাতায়াত। রঙিন শাড়ি পরে, চুল বিনুনি করে, স্নো পাউডার লিপস্টিক টিপ পরে, গলার স্বর কেবল পুরুষালি খানিক। তাতে কী? পালা পার্বণে ডাকে বউ-ঝিরা, বিনু পিসি নাচে, গান গায়। যাদের ঘরে নিত্য আনাগোনা তার, তারা কেউ কখনোই মনে নেয় না যে সে আরেক রকমের একজন মানুষ। এখনও নেয় না।

বয়স হয়ে গেছে বিনু পিসির। আমাদের শহরে সে আছে এখনও। পুরান চেনা ঘরদোরে যায়। অশক্ত হয়ে গেছে শরীর। লকডাউনের আগে ভিডিওতে দেখেছি। বিনু পিসি তাদের ঘরে এসেছিল, আমার ভাই ডিউক ভিডিও করেছে। দেড়-দুই মিনিটের ভিডিও। হাওয়াই মিঠাই রঙের শাড়ি, লম্বা বিনুনি, লম্বা লম্বা 'কাইকে' বিনু পিসি নাচছে। গান করছে।

হুব বে, হুব বে,
আইলাম রে আইলাম রে,
আইলামরে ধনী বাড়ি,
কিইন্যা আনলাম কলার ছড়ি,
কলার ছড়ি লড়বড়,
মাইল্যানিরে চুর ধর,
চুর ধরিতে ছিক্কা লড়ে,
ছিক্কা বাইয়া টেকা পড়ে,
এত টেকা পাইলাম রে,
বাইন্যা বাড়িত গেলাম রে,
বাইন্যা বাড়িত ঢুফির বাসা,
এক এক ঢুফির ন ন বাসা...

অভ্যাগত ঢাকার বিনুপিসি। তার নাম আমি বলতে পারব না। কখনও জিজ্ঞেস করিনি। এই বাসা সে কী করে চিনল? আগের বাসার দারোয়ান বলে দিয়েছে।
'অ। কেমন আছো তুমি? মাস্ক পরো নাই কেন?'
'পরি গো দাদা। যদি আপনি না চিনতারেন!'
'চিনতে পারছি। বসো। চা খাও।'
'না গো দাদা। আপনেরে দেখতে আইছিলাম। দেখছি অনে যাই গিয়া।'
'আচ্ছা, দাঁড়াও।'
টাকা পয়সা সে চায় না। কিছুই চায় না। কিন্তু সে বিনুপিসির মতো। আমাদের শহরের বিনুপিসি। আমি তাকে কিছু টাকা দিলাম। সে কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কাঁদল। সবসময় কাঁদে।
'আচ্ছা যাও। আবার আইসো!'
'আসবো গো দাদা। মিত্যু না খায়ে দিলে আসব।'
মিত্যু না খায়ে দিলে আসবে।
মৃত্যু কি মানুষকে খায়? খেয়ে ফেলে?
চলে গেল সে। লিফটে উঠল না।
কে তাকে উপেক্ষা করে?
শীতের দিনের প্রথম কদম ফুল পায় সে। া

বিষয় : প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ প্রথম কদম ফুল

মন্তব্য করুন