কবির ঘর কেমন হয়? প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণের ৭৬তম জন্মদিনের আগে আমি তা লিখে উঠতে চাই-
কবির ঘরটি কেমন? যারা লেখাটি পড়ছেন, আপনাদের মানসপটে হয়তো কবি নির্মলেন্দু গুণের ঘরটির একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে। দৃশ্যটা কেমন? রাজধানী ঢাকা শহরের বহুতল ভবনের বড় একটি ফ্ল্যাট। সেগুন কাঠের দরজা। দরজার পাশে কলিংবেল। দুটি বা তিনটি বেডরুম, একটি ডাইনিং ও বিশাল একটি ড্রয়িংরুম। ড্রয়িংরুমে দুই সেট সোফা। একটি বিশাল লেখার টেবিল, যেখানে কম্পিউটার, বই-কাগজ-কলম এবং ছড়ানো-ছিটানো কিছু বই। চার-পাঁচটি আলমিরা, র‌্যাক। ভেতরে যেখানে শত শত বই। বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যের হেন কোনো বই নেই যেটি নেই। দেয়ালে টাঙানো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ প্রমুখ কবির ছবি, দেশি-বিদেশি নানা শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম; সঙ্গে আছে নানা আলোকচিত্রীর তোলা নির্মলেন্দু গুণের কয়েকটি ছবিও।
আমি কি আপনাদের মানসপটে ভেসে ওঠা দৃশ্যটি ঠিকভাবে ধরতে পারলাম? হয়তো। কিন্তু আপনারা জেনে হয়তো অবাক হবেন, এই কল্পদৃশ্যের সঙ্গে নির্মলেন্দু গুণের ঘরের কোনো মিল নেই। একেবারেই না। থাকার কথা নয়। আমরা কবি বলতে যেমনটা বুঝি, নির্মলেন্দু গুণ তেমন কবি নন। তিনি আলাদা মানুষ। অন্য কারও সঙ্গে মেলানো যায় না। জীবনে ও শিল্পে তাঁর আছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তাঁর মতো বোহেমিয়ান জীবন আমাদের খুব কম কবিই কাটিয়েছেন। এক সময় তিনি ভাবতেন বড় হয়ে সন্ন্যাসী হবেন। তার জ্যাঠামশাই সন্ন্যাসব্রত নিয়েছিলেন। তিনি কেন সন্ন্যাসী হয়েছিলেন খুব জানার ইচ্ছে ছিল তাঁর। জ্যাঠার সেই বৈরাগ্য বা সন্ন্যাসের কারণ না জানলেও কবিতাকে আশ্রয় করে তিনিও এক প্রকার সন্ন্যাসীই হয়ে ওঠেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার নিভৃত গ্রাম কাশতলা। সেখানে তাঁর বাড়ি আছে, ঘর আছে; তবু তিনি জীবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়েছেন গৃহহীন। সেই গৃহহীন জীবনের দিনগুলোর কথা আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, তবু সংক্ষেপে বলি।
স্কুলে পড়ার সময়ই নির্মলেন্দু গুণের ওপর ভর করেছিল কাব্যলক্ষ্মী, লিখেছিলেন কবিতা, শুনে অবাক হয়েছিলেন তাঁর শিক্ষক। ষাটের দশকে নিবিষ্ট হন কব্যচর্চায়। তখন সম্পাদনা করেছিলেন 'সূর্য ফসল' নামের একটি কাব্যসংকলন, যেটিতে আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন কবি সিকান্‌দার আবু জাফর। সংকলনটিতে কবিতার মাধ্যমে শোষকশ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষকে ডাক দেওয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন কবিতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বিদ্রোহ। দেশে তো তখন পাকিস্তানিদের শাসন। বিদ্রোহ তো কোনো শাসকেরই পছন্দ নয়। বাঙালি কবির বিদ্রোহ তো তাদের জন্য বড় হুমকি। সংকলকের বিরুদ্ধে দায়ের করা হলো মামলা। জারি হয় হুলিয়া। পরে অবশ্য মামলাটি প্রত্যাহার করা হলেও নির্মলেন্দু গুণকে করা হয় ডাকাতি মামলার আসামি। আবার হুলিয়া জারি। আবার ফেরারি জীবন। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে দিন কাটছিল তাঁর। কখনো গৌরীপুর, কখনো শ্যামপুর, কখনো জারিয়া আর কখনো ঝাঞ্ছাইল। ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় চলে এলেন ঢাকায়। কিন্তু ঢাকায় তো তাঁর কোনো ঘর নেই, থাকবেন কোথায়? বর্তমানের খ্যাতিমান নাট্যকার মামুনুর রশীদ তখন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। থাকতেন হোস্টেলে। নির্মলেন্দু গুণ থাকতে শুরু করলেন তাঁর সঙ্গে। কাজ শুরু করলেন বিশিষ্ট সংগঠক ও সাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের 'কণ্ঠস্বর' পত্রিকায়। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে। পড়ালেখার উদ্দেশ্যে নয়, ভর্তি হলেন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব অর্জনের জন্য। এসময় তুলে নেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি। তখনও ঢাকা শহরে তাঁর নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না। একজন ঠিকানাহীন মানুষ তিনি। কবিতা লিখছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কবি আবুল হাসান ও অন্য কবিবন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, প্রকাশকদের বইয়ের প্রুফ দেখছেন। আর টাকা পেলে নিয়মিত চলে যেতেন ঠাঠারী বাজারের হাক্কার জুয়ার আসরে। সেই গৃহহীন, ঠিকানাহীন দিনগুলোর কথা আমরা পাই তাঁর 'মানুষ' কবিতায় :
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।
আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো। অবাক লাগে।
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো।
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো।

স্থান সংকুলান হবে না বলে পুরো কবিতাটি দিলাম না। এই কবিতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি একজন গৃহহীন কবির আক্ষেপ। আক্ষেপ করে তিনি নিজের মানুষ পরিচয় নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করছেন। মানুষ হলে তো তার একটি গোছালো জীবন থাকত, সুন্দর একটি ঘর থাকত, ঘরের মধ্যে নারীও থাকত। এই গৃহহীন বোহেমিয়ান জীবন থেকে কবে তিনি ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করেছিলেন সেই তথ্য আমার কাছে নেই। যতটা মনে পড়ে তাঁর আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থ 'আমার কণ্ঠস্বরে'ও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু লেখা নেই। এই শতকের শেষের দিকে আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন বন্ধুদের কাছে শুনতাম কবি নির্মলেন্দু গুণ আজিমপুরে থাকেন। কিন্তু আজিমপুরের কোথায়? আমার মধ্যে তখন বড় কবি হওয়ার স্বপ্ন। ততদিনে পড়ে ফেলেছি নির্মলেন্দু গুণের 'আমার কণ্ঠস্বর', 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই' বই দুটি। কবির সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে। আজিমপুর তো বড় জায়গা। তিনি কোথায় থাকতেন নির্দিষ্ট ঠিকানা জানতাম না। জানলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আজিমপুরের বাসায় চলে যেতাম। আজিমপুরের যে বাসায় তিনি থাকতেন সে বাসাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে লেখাটি শুরু করার আগে কবিকে ফোন দিলাম। তিনি তো চিরকালের রসিক। বললেন, 'করোনার দিনে এসব লিখে কী হবে? বাদ দাও।' আমি কি আর বাদ দিই? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তথ্য বের করতে লাগলাম। তিনি তথ্য দেবেন না তো দেবেনই না। একটা সময় তাঁর বুঝি দয়া হলো। বললেন, 'শোনো, দশ-বারো বছর আগে কবি সরকার আমিন আমার ওপর একটা ডকুমেন্টারি করেছিল। ওটা দেখলে আজিমপুরের বাসা সম্পর্কে জানতে পারবে।'
গেলাম আমিন ভাইয়ের কাছে। চাইলাম সেই ডকুমেন্টারি। আমিন ভাইর ফেসবুক পেজেই ছিল সেটি। আমাকে মেনশন করে দিলেন। সেই ডকুমেন্টারি দেখে জানলাম কবি নির্মলেন্দু গুণ চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় বাস করেছেন ঢাকার পুরোনো এলাকা আজিমপুরে। দেখলাম তাঁর সেই ভাড়া বাসাটি। একটা সরু গলির ভেতরে একটি দালানবাড়ি। টিনের চাল। লাল রং করা কাঠের পুরোনো দরজা। দরজার ওপরে নানা স্টিকার সাঁটা। নীল ফুলওয়ালা একটি সাদা পর্দা। ছোট্ট একটি কামরা। ভেতরে বড় একটা স্টিলের আলমিরা, ছোট্ট একটা খাট। খাটে তোশক ও লাল বিছানার চাদর। পাশেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার একটি প্লাস্টিকের র‌্যাক, একটা লেখার টেবিল, পুরোনো একটা কম্পিউটার, একটি পুরোনো টিভি, দুটি বইয়ের র‌্যাক, অল্প কিছু বই, দুটি চেয়ার। দেয়ালগুলোতে ফাটল, পলেস্তারা ও চুনকাম খসে পড়ছে। এক দেয়ালে ঝুলছে সরকারি ছুটির একটি ক্যালেন্ডার, আরেক দেয়ালে একটা ঘড়ি ও রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি। জানালার পর্দাগুলো পুরোনো, কুঁচকে যাওয়া। আমি আজিমপুরের বাসাটির যে দৃশ্য কল্পনায় এঁকেছিলাম, তার সঙ্গে বাসাটির কোনো মিল নেই। দেখেই মনে হচ্ছে বাসাটি একজন বোহেমিয়ান কবির, কবিতাই যাঁর সাধনা, জীবনের আর সবকিছু নিয়ে যিনি উদাসীন, আর সবকিছুকে যিনি তুচ্ছ জ্ঞান করেন। মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে পড়া নির্মলেন্দু গুণের 'ভাড়া বাড়ির গল্প' শীর্ষক কবিতাটি। আজিমপুরের এই বাসা নিয়েই তিনি লিখেছিলেন :\হ
১.
মৃত্যু আর জীবনের মাঝের দেয়াল
ছুঁয়ে ছুঁয়ে একটু এগোলেই
আজিমপুরের পুরোনো কবর,
কিনু গোয়ালার গলি- গ্রীন লেন।
ঘরের পাশেই তিনতলা ফ্ল্যাট।
রোদ্দুরে শুকোতে দেয়া সে-বাড়ির
শাড়ি ও ব্লাউজ কালেভদ্রে খ'সে পড়লে
যে-ঘরের ছাদ ধন্য হয়
গত পাঁচ বছর ধরেই
আমি সেই ঘরের ভাড়াটে।
'৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে
বিশ টাকা ভাড়ায় ঢুকেছিলুম,
স্বাধীনতার বদৌলতে সেই ভাড়া বৃদ্ধির
উত্তপ্ত পারদ এসে ঠেকেছে পঞ্চাশে।
অথচ বাড়ির পাশের নোংরা ডোবা
কিম্বা পেছনের সংলগ্ন কবর- এ দুয়ের
কোনোটাই উঠে যায়নি।
পাকিস্তানীরা চলে গেলে
ইরানী গোরস্তানের এক ইটের
দেয়াল ভেঙেছে বটে,
আমার অবস্থা তথৈবচঃ।
না আসছে আলো, না আসছে হাওয়া।
শুধু টিনের চাল থেকে চুঁইয়ে পড়া
বৃষ্টির জল অবিরল ধারায় নেমেছে,
কোনদিন আমাকে ফাঁকি দেয়নি, এই যা।
আরশোলা, মাছিমশা কিম্বা প্রকৃতির
নতুন পতঙ্গের আনাগোনা
ইতিমধ্যে চতুর্গুণ বৃদ্ধি পেলেও
পাশের ফ্লাটের শাড়িগুলো আপাততঃ
অনর্থক খ'সে পড়া স্থগিত রেখেছে।
যেন আমি আজকাল এইসব পছন্দ করি না।
যেন আমি শাড়ি নয়, নারী নয়,
মশা তাড়াতেই বেশি ভালবাসি।
যেন মশা তাড়ানোর জন্যই আমার জন্ম,
আমার বড় হওয়া।

২.
অতঃপর পাশের ফ্লাটের সেই মেয়েটির
ধুমধাম করে সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে গেলে
লালপাড় শাড়ির বিপ্লব একদিন
চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলো।
তখন মৃত্যু আর জীবনের মাঝের দেয়াল
কেঁপে উঠলো,
খসে পড়লো ইটের গাঁথুনি,
এক
দুই
তিন ক'রে
ঘরের ভিতরে উঠে এলো সংলগ্ন কবর। হাড়গোড়।
ঘরময় তখন শুধু পাগলা শেয়ালের ছুটাছুটি,
মানুষের পচা মাংসের হুলুস্থুল
লাল কাফনের শাড়ি দিয়ে বাঁধা মৃত্যু আর
মৃত্যু
শুধু মৃত্যু
শুধু বাসা বদলের পালা, শুধু পাগলা শেয়ালের ছুটোছুটি।
৩.
আমি এখন একটি নতুন একতলা ঘর খুঁজছি
কিনু গোয়ালার গলির ভিতরে হোক
ক্ষতি নেই। আমি চাই,
শুধু পাশে একটি তিনতলা ফ্ল্যাট থাকবে।
আমার ঘরের মধ্যে আলো না আসুক
হাওয়া না আসুক ক্ষতি নেই,
রৌদ্রে শুকোতে দেয়া পাশের ফ্লাটের
শাড়িগুলো কালেভদ্রে
আমার ঘরের চালে খসে পড়ে
আমাকে জানিয়ে দেবে
নারী আছে, আজও আছে।
আমি সেই স্বপ্নের শাড়ি মুগ্ধ হাতে তুলে এনে
লাল বকুলের মালা গাঁথবো, আর
আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চিৎকার ক'রে ডাকবো
রীণা, উল্টোপাল্টা বাতাসে
তোমার শাড়ি উড়ে গিয়েছিল
আমি পেয়েছি।
কবি নির্মলেন্দু গুণের বর্তমান ঠিকানা কামরাঙ্গীর চরের নয়াগাঁও। আজিমপুর থেকে এখানে এসেছেন বেশিদিন হয়নি। চার-পাঁচ বছর। বুড়িগঙ্গার তীরে পৌনে এক কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করেছেন একটি তিনতলা বাড়ি। যখন বাড়িটি নির্মাণ করছিলেন, নিজের প্রায় সবটুকু সময় এই নির্মাণযজ্ঞের পেছনে দিয়েছেন তিনি। কবিতার মতোই বাড়ি নির্মাণ ছিল তাঁর মগজজুড়ে। সেটাই ছিল তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান। ছোট একখণ্ড জায়গায় তিনি নির্মাণ করেছেন একটি নান্দনিক বাড়ি। বাড়িটি নির্মাণের সময় তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন :

"বুড়িগঙ্গা নদীতীরে, কামরাঙ্গীর চরের নয়াগাঁও-এ নির্মাণাধীন এই দ্বিতল বাড়িটি সমাপ্তির পথে। আমাকে দিয়ে জগতের কত অসাধ্য, কত অভাবনীয় কাজ যে সম্পন্ন হয়েছে, হচ্ছে এবং আরও হবে, ভেবে অবাক মানি। অচিরেই এই বাড়িটিতে আশ্রয় পাবে এমন কিছু মানুষ, যাদের ঢাকায় তো নয়ই, গ্রামেও কোনো নিজগৃহ ছিল না। অনেকের অর্থ সাহায্যে এই অবিশ্বাস্য কর্ম আমার দ্বারা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার আর বড় কবি হওয়ার সাধ নেই, সাধ্যও নেই হয়তো। আমি যেন বাকি জীবন দুঃখী মানুষের কল্যাণে, তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি, আমার জন্য সেটাই হবে সংগত প্রার্থনা।

নয়াগাঁও
৫/১১/১৫"

তখনও বাড়িটির কাজটি শেষ হয়নি। একদিন নির্মলেন্দু গুণ ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন একটি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয়ে। সঙ্গে নেবেন কবি মাসুদ পথিক ও আমাকে। তাঁকে বাসা থেকে আনার জন্য আমরা একটি মাইক্রোবাস নিয়ে নয়াগাঁও গেলাম। সেদিন প্রথমবারের মতো দেখলাম তাঁর সেই বাড়ি। ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম বুড়িগঙ্গা নদী। প্রচণ্ড রোদ, তবু যেন একটা প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছিল। ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা কয়েকটি ছবি তুললাম। তারপর গেলাম ঘরের ভেতরে। ঘরে প্রয়োজনের বাইরে একটা জিনিসও নেই। বইপুস্তকও বেশি নেই। এখন তিনি বইপুস্তক নিজের সংগ্রহে রাখেন না। নেত্রকোণায় প্রতিষ্ঠা করেছেন 'কবিতাকুঞ্জ'। সরকারের কাছ থেকে আট শতাংশ খাস জমি পঞ্চাশ হাজার টাকায় বরাদ্দ নিয়ে মালনী গ্রামে মগরা নদীর তীরে গড়ে তুলেছেন কবিতাকুঞ্জ, যেটিকে তিনি বলেন বিশ্বকবিতার বাসগৃহ। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতাতেও উঠে আসছে কবিতাকুঞ্জের প্রসঙ্গ :

...আর আমি? আমার গন্তব্যের কথা তো আমি
আগেই বলেছি। আমি চলে যাবো চাঁদের নদীর
তীরে তৈরি করা আমার কবিতাকুঞ্জে। সেখানে
আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে কবিতার মতো
এক চন্দ্রমুখী নারী।
তিনি এখন বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিশ্বের সকল ভাষার, সকল কালজয়ী কাব্যসমূহকে এই কবিতাকুঞ্জে একত্রিত করার কাজ করছেন। তাই নয়াগাঁওয়ের ঘরে খুব বেশি বই-পুস্তক রাখেন না। দোতলার একটি কামরায় থাকেন তিনি। কামরাটিতে আছে একটি খাট। আর আছে একটি বইয়ের র‌্যাক, যেখানে রয়েছে তাঁর রচিত বইগুলো। আর আছে একটি স্টিলের আলমিরা। সেই অর্থে এই ঘরে তাঁর লেখার কোনো টেবিল নেই। সাধারণত বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইলে কবিতা লেখেন তিনি। পাশের রুমটিতে থাকে মিঠু। তিনতলায় থাকে তাঁর ভাগিনা শান্ত ইমন। ছোটবেলা থেকেই ইমন তাঁর সঙ্গে থাকে। ইমন এখন তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। কোথাও গেলে তাকে সঙ্গে নিয়ে যান। নিচতলায় থাকে ইমনের মা গীতা, ইমনের খালা বেবি এবং তার স্বামী হাজং সুবল ও ছেলে অর্জুন হাজং। কন্যা মৃত্তিকা গুণের বাসা ঢাকার পরিবাগে। মাঝেমধ্যে যান মেয়ের বাসায়। মেয়েও মাঝে মধ্যে আসেন বাবাকে দেখতে। এই লেখাটি লেখার আগে গুণদার সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, 'এই বাড়িতে এখন যারা আছে আমার মৃত্যুর পর তারাই হবে এ বাড়ির মালিক।' কথা হলো ইমনের সঙ্গেও। সে বলল, 'মামার (নির্মলেন্দু গুণ) অবর্তমানে দোতলার পুরোটাই হবে তাঁর স্মৃতি জাদুঘর।'
নির্মলেন্দু গুণের আরেকটি ঘর আছে বারহাট্টার কাশতলা গ্রামে। পৈতৃক আমলের টিনের ঘরটি এখনো আছে। আছে সেই পুকুরটি, যে 'পুকুরের জলে শব্দ উঠল মাছের, আবার জিভ দেখাল সাপ।' শত বছরের পুরোনো পুকুর। বাড়ির ভেতর নানা প্রজাতির গাছগুলোর গোড়ায় সাদা চুন লাগিয়ে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। বছর পাঁচেক আগে আমি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক গিয়েছিলাম এই বাড়িতে। আমার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে যাওয়া সেই অশোক, গ্রামে ফিরে হাঁটতে হাঁটতে কবি সেদিন যে গাছের তলায় থমকে দাঁড়িয়েছিলেন, যে গাছটা ভীষণ ছায়া দিত একদিন, বাসন্তীকে নিয়ে যে গাছের ছায়ায় কবি ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু না, গাছটাকে আবিস্কার করতে পারলাম না। কবি তাঁর এই বাড়িটির নাম দিয়েছেন 'কাশবন'। ইট-সিমেন্টে তৈরি বাড়ির গেটে 'কাশবন' লেখা। গেট দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানদিকে শহিদবেদি। বেদির স্তম্ভে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ ৭ মার্চের ভাষণের কালজয়ী সেই উক্তিটি লেখা :'এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।' বেদির ডানদিকে 'সুখেন্দু-শুভেন্দু সরোবর' নামে সেই পুকুর। উঠোনের দক্ষিণে 'বীরচরণ মঞ্চ'। মাঝেমধ্যে এখানে নাটক, কীর্তন ইত্যাদি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। মঞ্চের পাশে 'রামসুন্দর পাঠাগার'। ২০০৯ সালে পিতামহের নামে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন নির্মলেন্দু গুণ। ভেতরে চার-পাঁচটি আলমিরায় বিস্তর বই সাজানো। উঠোনের এক কোণে ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীর তৈরি রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য। বাঁশের বেড়ায় চারদিক ঘেরা। রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্যও। বাড়ির পেছনে সেই প্রাচীন পুকুরটির পাড়ে 'বীণাপাণি-চারুবালা' সংগ্রহশালা। বীণাপাণি কবির মা এবং চারুবালা বিমাতা। সংগ্রহশালাটির ভেতরে কবির সংগৃহীত নানা ছবি, পুরস্কারের ক্রেস্ট ইত্যাদি সংরক্ষিত। পুকুরের দক্ষিণপাড়ে ভাস্কর মনিন্দ্র কুমার পালের তৈরি মাইকেল মধুসূদন দত্তের একটি অনিন্দ্য ভাস্কর্য। ঠিক পেছনে 'সারদা-বাসুদেব চিত্রশালা'। সারদা রায় একজন শিল্পী। বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তিনি কবির দূরসম্পর্কের আত্মীয়। কবির পিতামহ রামসুন্দর গুণের একটি পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন তিনি। আর বাসুদেব হচ্ছেন কবির বাবা। এ দুজনের নামে চিত্রশালাটির নামকরণ করেছেন তিনি। ভেতরে কবির সংগৃহীত বিভিন্ন চিত্রকর্ম সংরক্ষিত। বাড়িটি ঘুরে দেখলেই বোঝা যায় এটি সত্যিকার অর্থেই একজন কবির বাড়ি। নিজের কবিতার মতো বাড়িটিকেও মনের মতোই সাজিয়েছেন তিনি।\হশুভ জন্মদিন, প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। া

বিষয় : জন্মদিন স্বকৃত নোমান নির্মলেন্দু গুণ

মন্তব্য করুন