মনোজিৎ ঘুম থেকে ওঠে ছয়টায়।
আধঘণ্টা প্রাতর্ভ্রমণ করে।
আজ জানালাই খুলতে পারেনি। ঘুম থেকে উঠে দেখে-বৃষ্টি। আষাঢ়ের বর্ষণ। অবাধ, অঝোর। আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। আবার উঠেছে ঠিক সাতটায়। বৃষ্টি ফুরায়নি। তবে অঝোর ধারায় পড়ছে না আর। ঝিপঝিপ ঝুপঝুপ করে পড়ছে।
জানালা খুলে সুনসান গার্লস স্কুল রোড দেখল মনোজিৎ। ভেজা। এখনও ঘরের বার হয়নি মানুষজন। না, হয়েছে। একজনকে দেখা গেল। নীল শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ, সবুজ ছাতা। ভেজা চরাচরের মাঝখানে ঝিকোচ্ছে। খোকনের বউ বিভা। উপজেলা মৎস্য অফিসার খোকনের। আরেক খোকন আছে তাদের। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। দুইটাই থাকে মড়ার টিলা রোডে। দুইটারই দুইটা করে বাচ্চা। এত সকালে একা কোথায় যায় বিভা?
মন চনমন হলো মনোজিতের।
মনোজিৎ বসাক মনা।
মৃত কমরেড মণিলাল বসাকের তিন ছেলে ব্যাংকার, এক ছেলে পৌরসভা নির্বাহী কর্মকর্তা, এক ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা এবং মনা দর্শনের অধ্যাপক। বেসরকারি কলেজে পড়ায়। বিয়ে করেছিল। বউ থাকে নাই। ছেলেপিলে হয় নাই, মুক্তকচ্ছ জীবন। সাংঘাতিক নিয়মনিষ্ঠ। কলেজ খোলা থাকলে বাসা থেকে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নয়টায় বার হয়। তার আগে আটটা থেকে নয়টা প্রাইভেট পড়ায় কিছু ছেলেমেয়েকে। বিকালেও পড়ায়। সন্ধ্যায় ইরাবের আহমদ ফার্মেসির সামনে জমা হয় তারা। দেশ উদ্ধার করে, জাতি উদ্ধার করে। মনা, শামীম, দুই খোকন, রোমেন, রাজিব, নাসের, মসরু এরা। ইরাব ফার্মেসি থেকে বার হয়ে এক-আধবার উদ্ধার কার্যক্রমে যোগ দেয়।
সন্ধ্যায় যদি বৃষ্টি না থাকে, আহমদ ফার্মেসির জমায়েতে আজ আলোচনার একটা ইস্যু হবে এটা, মৎস্য অফিসারের বউ বিভা যায় কোথায় এত সকালে। আবার বৃষ্টিতে।
ফোন বাজল।
কাকা কলিং...।
এত সকালে!
মনা ধরল, 'কী রে? এত সকালে উঠে পড়ছিস তুই?'
কাকা বলল, 'উঠি নাই। সারারাত ঘুমাই নাই।'
'অ। অ-অ।'
'ঘুম ধরে না। ওষুধ খাই তাও ধরে না। তবে ভালো। সম্পূর্ণ একটা সকাল হতে দেখা যায়। এখানে অবশ্য এখন বৃষ্টি। বৃষ্টির সকাল।'
'এখানেও। মাত্র ধরছে। ঘটনা শোন, মৎস্য অফিসারের বউরে মাত্র দেখলাম। খ্রিস্টান মিশনের দিকে গেল একলা।'
'একলা। খ্রিস্টান মিশনের দিকে। ন্যাথানিয়েল স্যারের কাছে পড়তে যায় নাই তো? হিসাব বিজ্ঞান?'
'তোর রে... মগজ বিকল হয়ে গেছে অঘুমায়। মৎস্য অফিসাররে কল দে তুই। জিগা এই সকালে তার বউ কই যায়। বৃষ্টি মানে না, রইদ মানে না।'
'রইদের দিনেও যায় নাকি?'
'তবে? কমলা রঙের শাড়ি পরে একদিন। নীল রঙের শাড়ি পরে একদিন। মৎস্য অফিসার মাসে তিনটা, বছরে চল্লিশটা শাড়ি কিনে দেয় বউকে। তিনটা কিনে দেয় দুর্গা পূজায়, একটা সরস্বতী পূজায়।'
'কী বলিস? আজ কী রঙের শাড়ি পরছে তার বউ?'
'নীল রঙের। হলুদ রঙের ব্লাউজ। সবুজ রঙের ছাতা।'
'তুই এত ভালো ভাবে দেখছিস?'
'ভালো ভাবে দেখছি মানে? ভালো ভাবে দেখার আবার কী আছে রে হারামজাদা? জানলা দিয়া দেখছি। রাস্তা দিয়া কেউ গেলে দেখব না?'
'তা তো দেখবিই। দেখা কর্তব্য। মৎস্য অফিসারের বউ তোর বইন শুনলাম, ভাই ফোঁটা দেয়।'
তা দেয়। মনোজিৎ লতায়পাতায় ভাই হয় বিভার। তাতে কী? বিভা যদি রাস্তা দিয়ে যায়, মনোজিৎ চোখে পড়লেও দেখবে না? তুই কাকা, তুই কি দেখতি না? তোর ইতিহাস জানে টাউনের মানুষ। পাপড়ির স্নান দেখতে গিয়া তুই লিচুগাছ ভেঙে দত্তদের পুকুরে পড়েছিলি। বাপি, বিশ্বজ্যোতি দত্ত, একুশ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, এখনও ফোন করে তোর ইতিহাস শোনায়। তোর বউ তোর সঙ্গে কেন থাকল না? বুয়া সমিতির উপদেষ্টা তুই। কিসের উপদেষ্টা দেশবাসী জানে। এহ্‌। মনে করিয়ে দিতে লেগেছে, মৎস্য অফিসারের বউ তোর বোন হয়। ভাইফোঁটা দেয়। তোকে দেয় রে?
নাহ্‌! তেতো করে দিল শালা সকালটা।
'তোর ঘুম হয় নাই, তুই ঘুমা।'
বলে মনোজিৎ ফোন রাখল।
নিচতলা থেকে মেজবৌদি ডাকল, 'মনা ভাই! ও মনা ভাই।'
'যাই বৌদি।'
তার এই আলাভোলা অধ্যাপক দেবরকে যথেষ্ট স্নেহ করে মেজবৌদি। মনোজিৎ তাদের সঙ্গে তিনবেলা খায়। মেজদা মেজবৌদির ছেলেপিলে নাই। বিয়ের মাস চারেক পরই মেজবৌদির ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। লাং-ক্যানসার, ফোর্থ স্টেজ। লোকাল ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। মেজবৌদি আর তিন মাস বাঁচবে। মেজদা পাগলমতো হয়ে গিয়েছিল। তারা এখন ভগবান মানে ইন্ডিয়ার ডাক্তার দেবী শেঠীকে। সাক্ষাৎ ভগবান। মেজবৌদি আছে এখনও। লোকাল জবাবের সেই তিন মাস গেছে আঠারো বছর আগে।
মুশকিল একটাই। শুভ্রাকে খুব পছন্দ মেজবৌদির। কিরা কেটেও কথা তুলবেই, 'তুমি তারে নিয়া আসো মনা ভাই।'
মেজবৌদির সঙ্গে ফ্রি মনা। রাখঢাক করে না, 'সে আর ফিরবে না বৌদি।'
'তুমি চাও না সে ফিরুক?'
'না।'
'কেন মনা ভাই?'
'বাদ দাও তো। আমি কি তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি? নাকি অচল? চলতে ফিরতে পারি না একা?'
'জয় বাবা লোকনাথ! জয় বাবা লোকনাথ! এইসব কী বলো তুমি মনা ভাই?'
'ওর কথা আর তবে বলবা না।'
'বলব না। কথা দিলাম।'
কতবার যে কথা দিয়েছে।
নিচে নেমে মেজদাকে দেখল না মনোজিৎ। মেজদা সরোজিৎ আওয়ামী লীগ নেতা। মেজবৌদি বলল, 'তোমার ভাই বেতপাড়া গেছে ভোর রাইতে।'
'এই বৃষ্টির মধ্যে?'
'কে খুন হইছে বলল-।'
'কে খুন হইছে? কী বলো? তোমারে আর ফোন দেয় নাই?'
'না।'
মন আকুল হলো মনোজিতের। আবার কে খুন হলো টাউনে? আকছার হচ্ছে। বদলে গেছে তাদের নিরালা দিনকাল, টাউনের রং ঢং। কাকার একটা কথা মানতে হয়। নদীতে ব্রিজ হচ্ছে শুনেই হাওয়াকল হয়ে গিয়েছিল কাকা, 'সর্বনাশের কিছু আর বাকি থাকল না।'
সর্বনাশই। চুরি ছিল, খুন ছিনতাই তাদের এই টাউনে ছিল না আগে কখনও। রাজনৈতিক মাস্তানি ছিল না। একটা ব্রিজ, অনাবশ্যক যোগাযোগ, খুন ছিনতাই মাস্তানির হাট বানিয়ে দিয়েছে একটা নিরালা মফস্বল টাউনকে।
মেজবৌদি আজ লুচি ভাজি করেছে। অমৃততুল্য স্বাদ গরম ভাজির। ছয়টা লুচি খেয়ে ফেলল মনোজিৎ। চা গরম নিয়ে তিনতলায় উঠল। কল দিল মৎস্য অফিসারের নাম্বারে। মৎস্য অফিসার একবারেই ধরল, 'কী রে দাদা?'
'টাউনে কে খুন হইছে রে?'
'খুন হইছে! কখন রে দাদা?'
'কে জানে? মেজবৌদি বলল। মেজদা ভোররাতে বেতপাড়ায় গেছে।'
'বেতপাড়ায়...অ...খুন না রে দাদা। রাইতে একটা শকুন ধরছে বেতপাড়ার পোলাপান। ফেসবুকে দিছে দেখলাম।'
'অ-অ-অ। আচ্ছা, কাকা কি ফোন করছিল তোরে?'
মৎস্য অফিসার হাসল, 'মাত্র ছাড়ল। তোমারে বলছে, সাতান্ন বছর বয়স্ক এক মহিলার প্রেমে পড়ছে সে? বিয়া নাকি করব?'
'করুক। শোন রে খোকন, একটা কথা বলি, এই টাউনের এক নম্বর অসচ্চরিত্র হলো মুস্তফা। দেড় নম্বর অসচ্চরিত্র হলো কাকা।'
কাকা মানে খলিল। ঢাকায় থাকে ছাব্বিশ সাতাশ বছর ধরে। টাউনে আসে কম। নাটক বানায়, সিনেমা বানায়, বিজ্ঞাপন বানায়, চটিবই লেখে। পর্নো বই না, ছোট সাইজের বই। ৪৮-৬৪ পৃষ্ঠার। ব্যক্তিগত জীবন নিজেই নরকতুল্য করে রেখেছে। বিয়ে করেছিল, বউকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কখন কার সঙ্গে থাকে ঠিক নাই। সাতান্ন বছর বয়স্ক কোন বুড়িকে আবার বিয়ে করবে সে? বিয়ে করে ভাইবোনের মতো থাকবে? বড় আপা এবং ছোট ভাই। তারা কিছু করবে না?
দেড় নম্বর অসচ্চরিত্র। মৎস্য অফিসার হা হা করে হাসল, 'এই কথাটা শুনলে কিন্তু কাকা বিরাট দুঃখ পাবে, ভাই। তুমি এমন একটা কথা তারে বলছো-।'
'দুঃখ পাইলেও কথা তো সত্য। তোর বউ এই সকালে কই গেল রে?'
'আমার বউ! কই রে দাদা। সে তো ঘরেই।'
'ঘরেই! হায় রে! তুই আর কত মিথ্যা কথা বলবি রে খোকন? একটু আগে ব্যাটা তোর বউরে দেখলাম খ্রিস্টান মিশনের দিকে গেল।'
'খ্রিস্টান মিশনের দিকে? ...না রে দাদা! এই তো পাশের ঘরে বাচ্চাদের পড়াইতেছে সে। চা বানিয়ে দিল দশ মিনিট আগে-।'
'এই দাঁড়া-!'
মনোজিৎ আবার বিভাকে দেখল। খ্রিস্টান মিশনের দিক থেকে ফিরছে। হলুদ শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, নীল ছাতা। মনোজিতের মনেও পড়ল না নীল শাড়ি হলুদ ব্লাউজ পরে ছিল বিভা। সবুজ ছাতা। মৎস্য অফিসার এদিকে ফোনে 'ও দাদা, ও দাদা' করছে। ভদ্রতা অভদ্রতার চিন্তা বাদ দিল মনোজিৎ, ডাক দিল, 'বিভা!'
বিভা দাঁড়াল। ঝুপঝুপ বৃষ্টি এখনও হচ্ছে।
'তুমি তার সাথে কথা বলবা দাদা? ধরো একটু-।' মৎস্য অফিসার বলল।
রাস্তা থেকে বিভা মনোজিৎকে দেখল। নমস্কার দিল এবং অল্প হাসল। ঝুম বৃষ্টির সুইচ আবার অন হলো।
মৎস্য অফিসার বলল, 'কথা বলো দাদা।'
বিভা বলল, 'মনাদা, নমস্কার।'
সত্যি সত্যি বিভা কথা বলছে।
রাস্তায় তবে কে?
তাকিয়ে বোকা হলো মনোজিৎ। অল্পক্ষণে এত ঘন এবং গাঢ় হয়ে গেল বৃষ্টি! গার্লস স্কুল দেখা যাচ্ছে না। সড়ক ল্যাম্পপোস্ট দেখা যাচ্ছে না। সব শাদা।
মনোজিৎ বিড়বিড় করে বলল, 'নমস্কার'।
কোন বিভাকে বলল?
মৎস্য অফিসারের বউ বিভা?
নাকি যে বিভা লীন হয়ে গেছে বৃষ্টিতে?
ঘোর আষাঢ়ে ব্যাপার।
ঘোরতর আষাঢ়ে।