বিস্ময় হারিয়ে ফেলা আনুষ্ঠানিক মানুষ সংখ্যায় অনেক বেশি। তাদের সুখ, দুঃখ, বিশেষ দিন ও মুহূর্ত মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে প্রতিষ্ঠান। প্রেম নিবেদন থেকে প্রেস কনফারেন্সের ভাষা, মাথা থেকে নামিয়ে রাখা হচ্ছে নোটবুকে।
এইসব মানুষের জন্য লেখা কবিতায় 'বিষণ্ণ সুন্দর' চুপচাপ বসে থাকে। সমাদরের আশা বাদ দিয়ে, উপেক্ষিত হবার জন্য শব্দে-ছন্দে, জীবনের গন্ধে খোদাই করে মানুষ ও মুখোশ। কবিতাকে উপেক্ষা করে, কবিকে প্রশ্ন করা হয়, মডার্ন যুগে কবি হবার স্বপ্ন দেখা কেন? চারপাশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি, এই প্রশ্ন প্রফেসর থেকে ডক্টর প্রায় সবাই করেন!
উভচর গোছের মানুষ, যারা রাতকে দিন বানিয়ে জেগে থাকে আর দিনকে রাত বানিয়ে ঘুমায়- তারা জ্ঞান দিতে দিতে বলে, কবিতা ছেড়ে আধুনিকতায় আসো। যারা সুখের হাসি হাসতে গিয়েও দাঁত আর ঠোঁটের মাপ ঠিক রাখার দিকে নজর দেয় কিংবা যারা দুঃখে সমবেদনা জানাতে গিয়ে ড্রেসকোড ঠিক রাখার দিকে বেশি মনোযোগী, তারাও এক একজন মহান উপদেষ্টা সাজেন।
'বেশ্যা কবি', 'কাক' কিংবা 'পাগল' কত রকম অভিধা!
কবিতা তবু এই সব মুখ পরম যত্নে তুলে আনে, কখনো ভালোবাসা পাবার জন্য-কখনো ভালোবাসা দেওয়ার আশায়। কবিতা আবিস্কার করে, ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে দেওয়া কঠিন। বরং ভালোবাসা নেওয়ার মানুষের খুব অভাব।
এই একই সময়ে 'জীবনানন্দ দাশ' কিন্তু উদ্‌যাপিত হচ্ছেন- নামে, কবিতায়, শ্রদ্ধায়, স্মরণে। তাহলে পাঠক কবিতাকে ভালোবাসে নাকি কোনো প্রতিষ্ঠান যেচে পাঠকের কাছে জীবনানন্দকে নিয়ে যায়! প্রশ্ন থাক। নাহলে ঐ প্রফেসর, ডক্টর এদেরকে আবার ডেকে ডেকে বলতে হবে- এই আপনি কবিতার ভাষা বোঝেন, শব্দ-তরঙ্গ বোঝেন, জীবনানন্দ বোঝেন- তাহলে কবিকে অপবাদ দেন কেন? তাও আবার অপঠিত কবিকে!
বর্ষা ছাপিয়ে আকাশ নীল করে শরৎ আসে। শরৎ উৎসবে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান বাতিল করে নতুন চমক খুঁজে বের করার দায়িত্ব পড়ে অনুষ্ঠান সহযোগীদের ওপর।
যে অনুষ্ঠান থেকে জন্ম হতে পারে এক বা একাধিক কবিতার। দেখা যাক-
বড় মঞ্চ, মাঝে একটি চেয়ার কিন্তু এই চেয়ারে সার্কাসের কোনো অভিনেতা অভিনেত্রী বসতে পারবেন না। এখানে বসবেন সার্কাসের সঞ্চালক। তিনি বললেন, ড্রিমল্যান্ড সার্কাসের পক্ষ থেকে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি 'ওয়ার্ল্ড'স আগলিয়েস্ট ওম্যান' পর্ব উপভোগ করার জন্য। সঞ্চালক দর্শকদের আগ্রহ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বললেন, আমরা আজ আপনাদের মেরি অ্যানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো।
-মেরি অ্যান! কোন মেরি অ্যান?
দর্শক সারিতে ফিসফিসানি শুরু হয় এই নাম নিয়ে।
সঞ্চালক কণ্ঠে জোর দিয়ে বলেন, মঞ্চে আসছেন "ওয়ার্ল্ড'স আগলিয়েস্ট ওম্যান" মেরি অ্যান। উপভোগ করুন কুৎসিত চেহারার এই নারীর দেহভঙ্গি ও চালচলন।
এই সঞ্চালক জানতেন না তার চাকরির মেয়াদ আজ শেষ হতে চলেছে। এদিন সঞ্চালনা করতে গিয়ে বরাবরের মতো উজ্জীবিত থাকতে পারছিলেন না। হঠাৎ বলে বসলেন, কুৎসিত চেহারার কাউকে দেখলেই যখন আমরা হাতে তালি দিই, হাত ফসকে জন্ম হয় মেরি অ্যানের।
দর্শক সারি থেকে কেউ একজন বলে উঠলো- শুয়োরের বাচ্চা।
সার্কাসের মালিক সঞ্চালককে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলেন। তিনি প্রথমবারের মতো সঞ্চালনার দায়িত্ব নিলেন। এই অল্প সময়ে নিজেকে অনেক বেশি যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে গিয়ে, কথার খেই হারাতে থাকলেন।
-অ্যা, অ্যা আপনারা বিদ্রুপ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান, যার যার থলিতে যে যে কদর্য ভাষা আছে, সেগুলো প্রস্তুত করুন, এই বিকৃত চেহারার মানুষগুলো দেখে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করুন। মঞ্চে আসছেন, মেরি অ্যান।
যিনি মঞ্চে এলেন তার নাম শাহিদা। সার্কাসের মালিক নাম পাল্টে দিয়েছে মেরি অ্যান। চল্লিশোর্ধ এই নারীর শরীর লোমশ। পুরো শরীর বড় বড় লোমে ঢাকা। মুখে লম্বা দাঁড়ি। তাকে দেখে দর্শকসারি থেকে কেউ বলে উঠলেন, এ তো 'গাই', 'খবিশ', 'খচ্চর'।
মেরির মুখ তখন ভাবলেশহীন। তার পরনের পোশাকটি রং ঝলমলে। যতটুকু ঝলমলে হলে পোশাকের ভেতরে থাকা মানুষটিকে আরও নিস্তরঙ্গ মনে হয়।
মজার ব্যাপার হলো, মেরি অ্যানকে দেখে দর্শকেরা বিদ্রুপ করলেও তিনি নিশ্চিত হতে পারেন, চাকরিটা আরও কিছুদিন থাকছে। দর্শকেরা মেরি অ্যানের চেহারায় একজন মমতাময়ী মায়ের উপস্থিতি দেখতে পান না।
কিন্তু কবিতা দেখতে পায়! এই মুখ পরম মমতায় স্থান পায় কবিতায়।
এ বিষণ্ণ সুন্দরের জীবনচিত্র মনের ভেতর যে আভা ফেলে, তার আলো দুই রকম। কবিতায় লেখা যায়-
'বিষণ্ণ সুন্দর বসে থাকে
বিদ্রুপের জাল
আটকে ফেলে নাক থেকে নাভি
বীভৎস চিৎকারের ভিড়
সৌন্দর্য দেখতে দেয় না সময়ের পরাগ
অর্থের উষ্ণতা বুকে নিয়ে
ঘরে ফেরে মমতাময়ী।'
দর্শক তবু এই মেরি অ্যানকে দেখে খুব খুশি হতে পারেন না। ফটোগ্রাফারদের সারি থেকে একজন বলে উঠলেন, উনি মেরি অ্যান নন। আরও বিকৃত কিছু চাইছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ-চাইছি।
মঞ্চে আবার নিস্তব্ধতা তৈরি হলো। যিনি এলেন তার দুই হাত নেই. দুই পা নেই। বড় মাথা বিশিষ্ট একজন। তাকে দুজন ধরে এনে মঞ্চের এক কোনায় শুইয়ে দিলেন, লোকটি মঞ্চে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন। সে গড়াগড়ি খায় দর্শকেরা আরও উচ্ছ্বল হয়, আনন্দিত হয়, লোকটিকে উদ্দেশ করে গালাগাল দেয়, লোকটির বাবা-মাকে উদ্দেশ করেও গালাগাল দিতে শুরু করে কেউ কেউ।
দর্শক এভাবে মজা করছে দেখে সার্কাসের মালিকের আনন্দ যেন ধরে না। তিনি এরপর এক শিশুকে মঞ্চে হাজির করলেন, শিশুটির উপরের ঠোঁট নেই, ছোট ছোট দাঁত বের হয়ে আছে। একটু পর তার বাবা এসে লম্বা বাঁশখণ্ডের মাথায় গামছা দিয়ে শিশুটিকে বেঁধে দেয় তারপর বাঁশটির গোড়ার দিক মুখের মধ্যে ধরে রাখে। শিশুটি ঝুলে থাকে উপরে।
মঞ্চ থেকে কেউ বলে ওঠে, উহ্‌হু, ইঁদুরের বাচ্চা! শিস বাজে, হাতে তালি দেয়।
হঠাৎ ধপাস। শব্দ হয়। ছিটকে পড়ে শিশুটি।
এই পড়ে যাওয়ার দৃশ্যও সার্কাসের অংশ হয়ে যায়, হাতে তালি থামে না।
কিছু সময় বাদে সার্কাসের মালিক দু'হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কারণ মঞ্চে আসার জন্য যারা তৈরি হয়ে আছেন তারা মঞ্চে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যেহেতু তাদের সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে, আজ তারা অন্যদের সুখের কারণ হবেন না। শিশুটি মারা গেছে। সার্কাস আজকের মতো এখানে শেষ।
সার্কাসের মালিক বলেন, বাকিদের পথে যেতে যেতে দেখে নেবেন। আমি তো এদের পথ, ঘাট, বাজার, পরিবার, সমাজ, সংঘ থেকেই সংগ্রহ করি। এই মৌসুমের জন্য ড্রিমল্যান্ড সার্কাসের সমাপ্তি ঘোষণা করছি।
দর্শকেরা কেউ ক্ষুব্ধ আর কেউ সামান্য মনোবেদনা নিয়ে ঘরে ফেরে। ঘরে ফেরার রাস্তা দিয়ে যেতে যেত গা সওয়া সুখের দৃশ্য, দুঃখের দৃশ্য তাদের খুব একটা চমকিত করে না। কবিতা, ওই মৃতশিশুটির সঙ্গে বাড়ি ফিরে মায়ের কান্না দেখে। তার দুঃখের নির্যাসটুকু তুলে নেয় বুকের ভেতর। কবিতা ভারী হয়ে ওঠে বেদনায়।
সেই যে লোমশ নারী, যে ঘরে ফিরে যায় সন্তানদের জন্য খাবার আর খেলনা কিনে তার চোখে দোল খায় পূর্ণিমার আলোর মতো আনন্দ। কবিতা এই আনন্দ সংগ্রহ করতে গিয়ে তার পেছনের দৃশ্য ভুলতে পারে না। তবু আনন্দ উপস্থাপন করে, প্রেম, প্রণয়ের ভাষা খুঁজতে গিয়ে কোথাও কোথাও প্রতিবাদ করে বসে। নাকচ করে দিতে চায় সমস্ত অনাচার।
'শরীর ধুয়ে-চিপে মেলে দাও বারান্দায়
শুকিয়ে ভাঁজ করে রাখো
একটু ন্যাপথলিনের ঘ্রাণ মেখে;
সকালের মঞ্চে-তোমাকে দেখার অপেক্ষা
তুমি ক্লান্ত
বাকিটা অগ্রহায়ণ শুধুই তোমার'
অথবা কবিতা হয়ে ওঠে এমন-
গোসলের উপলক্ষ আনে আষাঢ়-আষাঢ়।
শাওয়ারের অজুহাতে
টাওয়ালে মুছে নেয়া যোনির আতর
সুবাসে মেশে না-
ভং ধরা ভদ্রলোকের হাসি
পারফিউমের বাসি ঘ্রাণ।

কবিতা তুলে রাখে সঞ্চালকের চাকরি হারানোর বেদনা। শেষ দিন দর্শকদের সামনে তাকে চেয়ার থেকে তুলে দিয়েছিলেন সার্কাসের মালিক। এরপর নিজেই গ্রহণ করেছিলেন সঞ্চালনার দায়িত্ব। এই দুইয়ের মাঝে তৈরি হওয়া শূন্যতা, কবিতাকে শুরু থেকে শুরু করতে দেয় না। কবিতা মূলত শুরু থেকে দৃশ্যমান হতে ব্যর্থ, যে কোনো ঘটনাকে শূন্য ও শিয়রে রেখে তার পথচলা শুরু হয়। তারপর যেখানে কবিতা শেষ হয় সেখানেও শূন্যতা। ওই যে সঞ্চালক- যে শূন্যতা নিয়ে আবার অন্য চাকরি খুঁজতে লেগে যাবেন- সেই শূন্যতার মতো।
সঞ্চালক চাকরি হারালেন কেন? এই মৌসুমের পর ড্রিমল্যান্ড সার্কাসের প্রত্যেকে হেমন্তের ছুটিতে যাবেন। এই সময় সঞ্চালককে বাদ না দিলে তাকে অযথা বেতন দিতে হবে। তাকে তাড়ানোর রাস্তা তৈরি করলেন জনমত তৈরি করার মাধ্যমে। দর্শকরা তাকে সমর্থন জনাবেন না, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে, সবার সামনে তাকে চেয়ার থেকে তুলে চলে যাওয়ার পথ তৈরি করা হলো। 'অন ক্রাইম অ্যানাদার পানিশমেন্ট'- এই নীতিতে রাজবন্দির সংখ্যা শূন্যের কোটায় নেমে গেলেও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিতদের সংখ্যা ভয়ংকরভাবে বাড়ছে। তাহলে কি কেউ রাজবন্দি হবার মতো কোনো কাজ করছে না! কবিতা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়।
ওই যে মঞ্চে হাত-পা না থাকা একজন গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন, তিনি কিন্তু জন্ম থেকেই হাত পা হারাননি। তিনি হাত-পা হারিয়েছেন একটি হত্যা মামলার সাক্ষ্য দিতে চেয়ে। তার আর সাক্ষ্য দেওয়া হয়নি, মামলাটি ঝুলে আছে। মাথাপিছু গড় মামলা সম্পর্কে যখন কোনো জরিপ হয় না, কবিতা সেই হিসাবটি করতে থাকে। কবিতা ধারণ করে না এমন কিছু নেই। রাতের জলজ কিংবা স্থলজ ভাগ, মুখের আলো কিংবা অন্ধকার কবিতায় সব মুখ উঠে আসে অক্ষরে অক্ষরে। স্বেচ্ছায় ঘুম বরণ করার আগে কবিতার চাওয়া থাকে-
'দুষ্প্রাপ্য বিস্ময় মৌনতা ভেঙ্গে
মানুষের হৃদয় ভ্রমণ করুক'
বিস্ময় মানুষের মন, আলোচনা, সমালোচনা থেকে নিশ্চিহ্নপ্রায়। চুমুকে চুমুকে চা খাওয়ার মতো কত কত মৃত্যু, হত্যা, ধর্ষণের খবর আমরা দেখে যাই অনায়াসে। মানুষ এমন সহন ক্ষমতা পেলো কোথায়! কবিতার কাছে এই হলো বিস্ময়। ভাবনার ছায়া শব্দে শব্দে গাঁথা হয়।
সমাজসেবামূলক প্রকল্পের আওতায়
মানুষেরা নার্সারির গাছের মতো
গাদাগাদি করে বাঁচে।