পাতাবাহার
কবিতা লেখামাত্রই আমি সেই কবিতার মা
কয়েকদিন পর, নতুন আরেকটি কবিতা লেখামাত্রই
আমি সেই আগের কবিতার খালা
তারপর আরো কবিতা লেখা হলে অনেক আগের কবিতাকে
দূরের আত্মীয় মনে হয়
কবিতা যখন ছাপা হয়, অন্যেরা পাঠ করে
তখন তো সেই আগের কবিতা অনেকটা অচেনা হয়ে পড়ে
আমার পুরোনো কবিতাগুলো পড়তে গেলে মনে হয়
এরা সেই বাল্যবন্ধু, যাদের নামই প্রায় ভুলে গেছি
দেখলেও চিনতে কষ্ট হবে (কাউকে কাউকে তো চিনবই না)
তার মধ্যেও ঠিকই চিনে ফেলব, আমার কোন কবিতাটি খুব জেদি ছিল
কোন কবিতাটি সেই মেয়ে, ক্লাস নাইনে উঠেই যে-বিষ খেয়েছিল প্রেমে
যে-কখনো দশম শ্রেণিতে উঠবে না আর
হয়তো সেই কামরাঙা কবিতাটির নাম ছিল পাতাবাহার
সেকালে গ্রামে-গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে বা বলা যায় বাড়ির উঠোনেও দেখা যেত পাতাবাহার গাছ থাকত। শহরের বাড়িতেও পাতাবাহার থাকত। পাতাবাহার কি ফুলগাছ? এই গাছে ফুল ফোটে? আদতে পাতাবাহারের পাতায়-পাতায় ছিল নানারঙের ফুলের বাহার। ভাল্লাগতো। পাতাবাহার ছিল কোনও কোনও মেয়ের নাম। কিন্তু যে মেয়েটি বিষ খেলো, এক বরষার দিনে তার কবর হলো সেখপাড়া বাজার থেকে একটু ভেতরের একটা গ্রামে, চাপা চাপা হাহাকার নিয়ে অনেক লোক জমায়েত হয়েছিল। পনেরো বছর বয়সেই কবরে চলে যাওয়া সেই মেয়ের নাম কিন্তু কোনোভাবেই পাতাবাহার ছিল না। কিন্তু পাতাবাহার নাম নিয়েই সে একটি কবিতার মধ্যে ঢুকে গেল। কবিতা পড়েন খুব অল্প মানুষ, সেই অল্প মানুষের সকলে একজনের কবিতা পড়েন না। কেউ একজনের সব কবিতাও পড়েন, এমনটাও ভাবার সুযোগ কম। তাহলে 'পাতাবাহার' কবিতাটি ক'জন পড়েছেন? ক'জনের কাছে পৌঁছেছে মেয়েটির আত্মহত্যার কথা, যার মুখ একটি ইমেজ হয়েছে ঢুকে আছে বাংলা কবিতায়? কবিই বা কতখানি আঁকতে পেরেছেন তাকে, যে ভালোবেসে মরে গেল। ভালোবাসা মানে হয়তো মরে যাওয়া কিম্বা ভালোবাসা মানে হয়তো জন্ম নেওয়া! হতে পারে, ভালোবাসা মানে একটি কবিতা। আমি এতদিনে পাতাবাহারের কবরের মাটির ওপরে হয়তো কোনও বকুল ফুলের গাছ বড় হয়ে উঠেছে। ফুল ও ঘ্রাণ ঝরিয়ে যাওয়া ছাড়া বকুলের আর কাজ কী!

খ.
দুঃখবিড়াল
দুঃখকে বিড়াল বলে মনে হয়। কারণ, বস্তাবন্দি করে বিড়ালটিকে নদীর ওপারে রেখে আসার পরদিন সন্ধ্যায় দেখি, উঠোনের নিমগাছটা পেরিয়ে দুঃখবিড়াল ফের ঘরে উঠে পড়ছে।
দুঃখকে আশ্রিত-আত্মীয়ার মতো লাগে। তার হয়তো যাওয়ার জায়গাই নেই! কে দায়িত্ব নেবে তার, সারাদিন হয়তো কথা বলার লোকও নেই। এই অবস্থায় দূরাগতা আত্মীয়া যাবেই বা কোথায়? কার কাছে তার ভাল্লাগবে?
দুঃখকে কতভাবে দেখতে পাওয়া যায়। দুঃখ চিক চিক করে জ্বলে, নাকছাবিতেও। ব্যক্তিগতভাবে, দুঃখকে আমার পেতে ইচ্ছে করে। দুঃখ পেতে চেয়ে কতরাত ঘুমাইনি, বলো? দুঃখকে আমার দেখতে ইচ্ছে করে, দুঃখকে আমার পড়তে ইচ্ছে করে। দুঃখরা গান হয়ে যায়। দুঃখ কার কাছে যায়?
আয়নায় তাকিয়ে দেখি দুঃখ, হাসতে চেয়েও হাসতে পারছে না। দুঃখ নির্বাক যুগের চিত্রের মতো নিজে নিজেকে দেখছে। দুঃখের চোখের নিচে কালি, চারপাশে লোক তবু খালি খালি খালি... তারপরও দুঃখকে নিয়ে কথা বলি, কারণ, বিড়ালটিকে দেখলেই মনে হয় যে, আ-রে, একে তো আমি চিনি, নদীর ওপারে ফেলে এসেছিলাম, তবু সে পরদিনই চলে এসেছিল। সে এক রহস্য, এই বিড়াল এই দুঃখ আমার কীরকম আত্মীয়া, কীরকম পরিচিতা?
একদিন তোমাকে বলব, কোন প্রহরে রচিত প্রতিটি দুঃখই নিটোল কবিতা!
এই কবিতা কি দুঃখের কবিতা? এই কবিতায় কি বিড়ালের মুখ আঁকা হয়েছে? নাকি আশ্রিত-আত্মীয়ার অসহায় মুখ উঁকি দিচ্ছে? যার মুখ উঁকি দিচ্ছে, তার এখন বয়স কত? সত্তর, না আশি? তিনকুলে তার কেউ নেই বলেই তো সে আশ্রিতা! কেউ নেই মানে কি? কেউ ছিলও না? তা কীভাবে হয়? এক ভুবনডাঙায় কি একদিন ধানী গেরস্তের ঘরে তার জন্ম হয়নি? সেইখানে কি ছিল না ঘুংগুর নদীর জলে ভাসা হাঁসের কোলাহল? কী নাম ছিল বয়সিনী আত্মীয়ার? বিভূতিভূষণকে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, 'বুড়ির নাম রাখো ইন্দির ঠাকুরণ। তারপর হাতে একটা লাঠি আর ঘটিবাটি ধরিয়ে দাও, আর হ্যাঁ, চোখে দিও সেকালের দাদিনানিদের যা ছিলই, মায়া, ভালোবাসা।' কবিতায় তো লেখা হয়নি, কিশোরী একদিন কীভাবে দাদিমা হয়ে ওঠেন! কিশোরী সন্ধ্যায় হেঁটে গেছে কামিনী ফুলগাছটার পাশ দিয়ে। ঘরের জানলা দিয়ে আসা হাওয়ারা ফিসফিস করে। নারকেল গাছের চিরল চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না ঝরে উঠোন ছাড়িয়ে জোড়াদহের মাঠচরাচরে। আকাশকে মনে হয় নক্ষত্রদের গ্রাম। একদিন কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর তার নিজের বাড়ি হয়। হয় কি? ঘুংগুর নদীর ছন্দ জমা হয় এক দিঘির ঘাটের শ্যাওলায়। কিশোরী কি আর তখন কিশোরী থাকে? আমার মায়ের কথাই যদি বলি, মা'র ডাকনাম বুড়ি। মামাদের ছোটবোন। বুড়ির বিয়ে হয়েছিল স্রেফ চোদ্দতেই। তাঁর পেটে আমি, আমার দুই বোন। এখন সেই বুড়ি আর কিশোরী নেই! যেমন কিশোরী নেই দুঃখবিড়ালের দূরাগত আত্মীয়া। তবু তাঁর মুখ ধরতে চাওয়া হয়েছে কবিতায়। এই দুঃখ আমার কীরকম আত্মীয়া, কীরকম পরিচিতা? একদিন তোমাকে বলব, কোন প্রহরে রচিত প্রতিটি দুঃখই নিটোল কবিতা! মানে এটা লেখার চেয়ে মুখোমুখি তোমাকে বলার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে এখানে। লিখলে কেউ হয়তো পড়েন। বললে তোমার কানে পৌঁছুবে। না লিখলে, না বললে কি হয়? বেশিরভাগ মানুষের বেশিরভাগ অতলান্তের কথা লেখাও হয় না, বলাও হয় না। মানুষ মরে যায়। মানুষের কথারা মরে না? মানুষের কবর হয়। কথাদের কবর হয় না? কথারা কি শ্মশানের আগুনে পোড়ে?
গ.
খুব ভালো হতো
মনে করো সেই পার্বত্য কবিতাটি আমি বাংলায় লিখছি...
পাহাড়ি মেয়েটি ঝরনার পাশে বসে খুব ভয়ে ভয়ে কাঁদছে। উপত্যকার যৌবন আর্তনাদে আর্তনাদে ফুঁপিয়ে উঠছে। এ সময় মনে হয়, আত্মার অব্যক্ত বিলাপনই মর্মর কবিতা
কবিতার আগে রচিত হলো ঘটনা। যতদূর মনে পড়ে, ঘটনা সম্ভবত এরকম যে, পাহাড়ি ছেলেটি আলিঙ্গন ছিন্ন করে বলল, 'যেতে দাও, যাই?' মেয়েটি বলল, 'আর একটু উত্তাপ দিয়ে যাও, বুকের, না হয় আজ আর যেও না' তবু পাহাড়ি ছেলেটি মেয়েটিকে দীর্ঘ এক চুমু খেয়ে বলল, 'আসি?'
মেয়েটি কাঁদছে :সে আমাকে রেখে যখন চলে গেল, ঝিরিপথে প্রচুর নুড়ি থাকায় কিছুদূর যেতেই আমি তার পা'র গোড়ালি আর দেখতে পেলাম না। আমি তাকে পেছন থেকে এত করে ডাকলাম, তবু এই ঝরনার বিশ্রী শব্দে শব্দে সে আমার ডাক শুনতে পায়নি। কুয়াশাও চায়নি আমি তাকে বহুদূর পর্যন্ত দেখি, তাই আর কিছুদূর যেতেই সে আমার দৃষ্টিসীমানা ডিঙিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ওপারে চলে গেল
কিছুক্ষণ পর, উপত্যকায় গুলির শব্দ হলো। ছেলেটি আর ফিরল না। পাহাড়ি মেয়েটি তাই ঝরনার পাশে বসে খুব ভয়ে ভয়ে কাঁদছে যদি ঝরনাজলে ভেসে আসা এই রক্ত তার প্রণয়ের রক্ত না হতো, খুব ভালো হতো, খুব ভালো হতো, খুব ভালো হতো
কিন্তু খুব ভালো তো হয়নি। পাহাড়ি মেয়েটি তার প্রেমিককে হারিয়ে ফেলল কিনা, তার জন্য তাকে ঝরনাজলে ভেসে আসা রক্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রেমিক ফিরে না আসে, প্রেমিকের লাশ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ যেন বা ততদিন অপেক্ষা করতে হবে। প্রেমিক ছেলেটি নয়, পাহাড়ি মুখই আঁকানোর ইচ্ছে কাজ করেছে এই কবিতায়। দেশ-সীমান্ত রেখার জাঁতায় পড়ে প্রেম শেষ হয়ে যাবে? এইভাবে? যে গুলি করেছে, সেও কি কারও প্রেমিক বা স্বামী নয়? সে কি কারও বাবা নয়? গুলি করাই কি তার পেশা? পাহাড়ি ছেলেটি কি চেয়েছিল? পাহাড়ি মেয়েটি কী চায়? ভূপেন হাজারিকার গান শুনেছিলাম, 'নীলা নামের মেয়েটি কী চায়, কী চায়? যোগেনের সাথে যেতে মন চায় মন চায়।' কিন্তু তা হয়নি। খুব ভালো হয়নি। তাই খুব ভালো হতো বলে একটা অভিপ্রায় ঢুকেছে এই কবিতায়। ঢুকেছে রক্তপাত, হাহাকার, কান্না। কিন্তু এ জগতে কান্না আর কে শুনবে?
ঘ.
রাগ ভৈরবী
একটু আগেই কাক দিয়ে গেল ডাক
এখন, এই ভোরে গলি ফেরিওয়ালাদের
যেন আমাদের কী চাই, কী চাই
কোথাকার কোন জীবনপোড়ানো সুরে, মহিলা বিকোচ্ছে
ছাই নিবেননি ছাই, ছাই-ই-ই...
ইহাকে কি ভৈরবী বলা যায়, ভোরবেলা?
মার্গ সংগীতের যে কোনো সাধকই বলবেন, না, তা বলা যায় না। ছাই বিক্রি করা মহিলার ক্যানকেনে গলার ডাক কীভাবে রাগ ভৈরবী হয়? রাগসংগীত শিখতে দীর্ঘ সাধনা লাগে; ওস্তাদ লাগে। মিষ্টি গলা লাগে। যারা রাগসংগীতের শ্রোতা, তাঁরাও উঁচু শ্রেণির মানুষ। রাগসংগীতের জন্মকাল থেকেই এরকম রেওয়াজ। দরবারি ঘরানায় শ্রোতাগণ বসে রাগসংগীত শুনে থাকেন। আর যে মহিলার মুখ আঁকানো হয়েছে এই কবিতায়, তার গলা ঝাঁজালো, তার উচ্চারণধ্বনির মধ্যে বড়জোর ছাই বিক্রি করার বিজ্ঞাপন আছে। যে ছাই বাসার থালাবাসনের এঁটো পরিস্কার করার কাজে লাগবে। যদিও বিভিন্ন কোম্পানির গুঁড়ো সাবান বাজারে পাওয়া যায় সহজেই। তাহলে এই মহিলা কী করে রাগ সংগীত করছেন, যা এই কবিতায় বিধৃত করা হয়েছে? কোথাকার কোন মহিলা, তার জীবন পুড়েছে, সেই পোড়া সুর কি মার্গসুরধ্বনি? সেই মহিলাই বা কে? প্রভা আত্রেয়ী? সে কি বেগম আখতার? ছাই বিক্রি করা মহিলা কি রুনা লায়লা, না সাবিনা ইয়াসমিন?
ঙ.
ভাষা-সমস্যা
ভাষার সমস্যা আছে। সব কথা সে প্রকাশে সমর্থ নয়। যতই পণ্ডিতি করি, সান্ধ্যসুর ধরি, ঠিক যেন হলো নাথ আমার কি বলার ছিল? কী বলার মধ্যে আমি কী ভাব বোঝাতে চেয়েও, শেষ পর্যন্ত বাক্য যেন বাগে আসল না, বরং বিরাট বিট্রে করে বসল। কুয়োর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া চৈত্র মাসের মহাজোছনা যেন আমি আর তুলে আনতে পারলাম না। আর এদিকে পরিস্থিতি প্রতিদিন সূর্যাস্তের সঙ্গে ঝুপঝাপ আঁতাত শুরু করে দিল। এর ফলে, মাথার উপর দিয়ে ঝাঁক ঝাঁক গুলি উড়ে গেল। কারণ, এই কালপর্বের নাম যুদ্ধক্ষেত্র। আমাকে ক্রলিং করে, মাটিতে বুক বাঁধিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ভ্রম হচ্ছে, তবে কি আমার বুকপকেটে সেরকম কোনো চিঠি আছে- যার প্রেরক এক শহরের বাসিন্দা, প্রহেলিকা চৌধুরী?
কিন্তু ঐ যে বললাম, ভাষার সমস্যা! ভাষায় আমি জোছনা দেখাতে পারছি না, সূর্যাস্ত দেখাতে পারছি না, যুদ্ধ দেখাতে পারছি না, রক্ত কতটা লাল দেখাতে পারছি না, বাতাসের বেআদপ আচরণ দেখাতে পারছি না! এমনকি আমার মন কতখানি অবাধ্য এখন যে, সে আমার ঘরেই থাকে না, প্রত্যেকদিন একই রাস্তায় একই দিকে যায়- মনোগমনের এ বর্ণনা লিখে বোঝানো অসম্ভব! অ্যাবসার্ড!! কারণ, ভাষা শিল্পকে যতটা সমর্থন করে বা শিল্পীকেও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে পারে কিন্তু শিল্প ও শিল্পীর মধ্যে যেটুকু প্রচ্ছন্ন দূরত্ব, যতটা লৌহবেদনা- ভাষা তা কখনোই স্পর্শ করতে পারে না।
কতটা নির্মম, দুর্ভাগ্যপীড়িত, যদি বলো, এই ভাষাতেই আমাকে লিখে জানাতে হবে সেই প্রচ্ছন্ন দূরত্বের গল্প, লৌহবেদনার ইতিকথা? মন-আনমনা, বাক্য যেন ভাব বুঝল না, বাক্য বিরাট বিট্রে করে বসল। অথচ, কুয়োর মধ্যে চৈত্রমাসের মহাজোছনা গড়াগড়ি যায়...
যে ভাষাতেই কবিতা লিখে থাকি, সেই ভাষাও পুরোটা সমর্থ নয় ভাব ধরতে। তাহলে কাউকে মনে মনে এঁকে যখন কবিতা লিখেছি, হয়তো সে পড়েইনি আমার কবিতা। হয়তো বা কেউ পড়ল, কবিতাই যেহেতু পুরো সমর্থ নয় ভাবমাত্রা ধারণে, সে বুঝবে কি? হয়তো মনে মনে ধরে নিয়েছি, যার মুখ আঁকানোর জন্যে আমি নির্ঘুম থাকলাম, সে হয়তো পড়তে পারবে আমার দু'চোখ। চোখ তো সিম্বোলিক। মন। মন পড়তে পারবে। মন নিয়েই তো জ্বালা; ঘুমোতে দিল না বহুরাত, বহুবছর। শুধু মনের দাবি মেটাব বলেই পূর্ণিমায় হেঁটে গেছি মাঠের পরে মাঠ, অগ্নিময় তল্লাট। মন বলেছে, যাও, আবুল হাসানের কবরের মধ্যে বসে সারারাত কবিতা পড়ো, পড়েছি। আকণ্ঠ জলে নিমজ্জিত রাতের কবরস্থান বড় নির্জন। এক রাতে বনানীতে কবির কবরের মধ্যে বসে ভেবেছি, বন্ধুর সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছি। মন বলেছে, নিমজ্জিত হও চরাচরের স্তব্ধতায়, রুমা বাজার ছাড়িয়ে ঝিরিপথে হাঁটতে হাঁটতে দার্জিলিংপাড়ায় গিয়ে বসে থেকেছি। সেই মনই বলেছে, কবিতা লিখতে, লিখেছি। কিন্তু কবিতা লিখতে ভাষাজ্ঞান লাগে, ভাষাজ্ঞানেরও সীমানা আছে, টের পেয়েছি। উপলব্ধি তো করলাম, ভাষা শিল্পকে যতটা সমর্থন করে বা শিল্পীকেও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে পারে; কিন্তু শিল্প ও শিল্পীর মধ্যে যেটুকু প্রচ্ছন্ন দূরত্ব, যতটা লৌহবেদনা- ভাষা তা কখনোই স্পর্শ করতে পারে না।
চ.
তদন্ত রিপোর্ট
প্রজাপতিটা খুন হয়, ঘাসের উপরে, সন্ধ্যায়
তখন ওখানে কেউ ছিল?
ছিল
অপেক্ষা
রীতিমতো একটা গোয়েন্দা সাসপেনশন। একটা প্রজাপতি খুন হলো, সন্ধ্যায়, ঘাসের ওপরে, সেটা কি কোনো বিরাট কিছু? আর প্রজাপতি যখন খুন হয়, সেই সময় আকাশ কেমন ছিল, পুবপাড়ার মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছিল কিনা, কেউ কিছু জানে? বৃষ্টি ছিল? না, ছিল না। দুধসর গ্রামের হাওয়া মধুপুরের উপর দিয়ে কুমার নদ পার হয়ে গোকুলনগরের দিকে বইছিল কিনা, কোনো পরিস্কার ধারণা কেউ দিতে পারছে না। আর খুন হওয়া দেখেছে কে? অপেক্ষা। অপেক্ষা সাক্ষী দেবে পুলিশকে? অপেক্ষা কি শুধু অপেক্ষাই করে থাকবে? এই অপেক্ষার মধ্যে কার মুখ লুক্কায়িত? প্রজাপতি বলতে কবি এখানে কী বুঝাইয়াছেন- পরিস্কার করে জানাও। বুঝাইয়েছেন তো সাধুশব্দ। চলিত রীতির মধ্যে সাধুরীতি বাঞ্ছনীয় কি?
ছ.
অঘ্রানের দিন
যে কবিতা লেখাই হয়নি- তারই মুখোমুখি
বসে ভাবি, আধুনিক ছাপাখানা কতদূর?
সে কবিতা পড়োনি তুমি, পড়েনি পাঠক
সেই না-লেখা কবিতা কতটা সার্থক
কতখানি নতমুখ, বিষণ্ণ-মধুর
ঠাঁই, থমকে থাকে যেকোনো দুপুর
যেকোনো সন্ধের দিকে, যেকোনো জোনাকির কাছে
জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে- অলিখিত কবিতার মধ্যে
কার মুখ উঁকি দিয়ে বিন্দু বিন্দু আলো হয়ে ওঠে?
ব্যথা কীভাবে ছোট্ট গাছে ফুল হয়ে ফোটে?
যে কথা বলাই হয়নি- তা বলবার অভিপ্রায়ে
দেখি, কনকলতা তমালতরুকে জড়ায়ে ভালোবাসে
বাইরে হৈম হাওয়া- ভুরভুর করে
লেখার খাতায় পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ভরে
অঘ্রানের দিন আসে...
অলিখিত কবিতার মধ্যে কার মুখ উঁকি দিয়ে বিন্দু বিন্দু আলো হয়ে ওঠে? ব্যথা কীভাবে ছোট্ট গাছে ফুল হয়ে ফোটে? অঘ্রানের দিনে কবি এই প্রশ্ন করছেন কেন? কবি কি জানেন না, কার মুখ? নাকি যার মুখই হোক, তিনি জানেন তবু সরাসরি বলবেন না, নাম বললে কি কবিতার মাধুর্য কমে যাবে? কবি কুসুমকুমারী দাস্যার ছেলে কিন্তু ঠিকই বলে ফেললেন, 'কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ।' বা 'এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে, জানি না সে শুয়ে আছে কিনা!' বললেন, বনলতা সেন তাকে হাঁটিয়ে মেরেছে। অবতার বিনয় মজুমদার তো গায়ত্রী পথের দিকে চাকা চাকা করলেন আমৃত্যু! আল মাহমুদ কী অবলীলায় জানিয়ে দিলেন, 'ওপাড়ার সুন্দরী রোজেনা/সারা অঙ্গে ঢেউ তার/ তবু মেয়ে কবিতা বোঝে না।' কত কবিতায় কত কবি কার মুখ এঁকেছেন শব্দে-বাক্যে, তার কথা কেউ জানবে না।
জ.
ছোট্ট কবিতা
তুমি যেন ঠিক কার মতো?
একটি ছোট পাখির বাচ্চা
অথবা বাচ্চার মা'র মতো?
তুমি যেন ঠিক কার মতো?
যার মতো আর দেখিনি কাউকে
স্মরণী-কুসুম, তার মতো?
তুমি তবে ঠিক তার মতো?
কার মতো, কার মতো?
যার মতো আর দেখিনি আগুন
পুড়িয়ে বাঁচায়, তার মতো?
যার মতো আর ভাবিনি কাউকে
তার মতো, তার মতো?
যার বেশি কেউ দূরেরও নয়
তার মতো, তার মতো?
এই প্রশ্ন থেকে গেল। তুমি যেন ঠিক কার মতো? এই তুমিটাই হচ্ছো কবিতায় আঁকা মুখ। আঁকা যায়, আবার যায় না। লেখা হয়, তবু হয় না। এই তুমিই হচ্ছে ভালোবাসা। আমি বেঁচে থাকবার জন্যে ভালোবাসাকেই খাদ্য হিসেবে বুঝতে পেরেছি। তাই তুমি ভালোবাসলেই আমি বাঁচতে পারি- এই ইশতেহার তোমার অন্তরে পৌঁছুল তো?