আমার চিন্তাশক্তি কম, কিন্তু দুশ্চিন্তা করার বদভ্যাসটুকুতে কমতি নেই। এর ফলে, সহজসরল বিষয় নিয়ে ভাবতে গেলেও ফ্যাসাদে পড়ে যাই। নির্ধারিত এই যে বিষয়- 'কবিতায় আঁকা মুখ' কতো শ্রুতিমধুর, অনুপ্রয়াসময়, কতো রমণীয়! অথচ আমি কিনা শুরুতেই প্রশ্নবোধক সমস্যায় অস্থির। মনে মনে জানতে চাই- কেউ মুখ বা মুখশ্রী আঁকার জন্যে কবিতা লেখেন? সবাই তো জানেন- এর জন্যে আলাদা শিল্পমাধ্যম রয়েছে। আরও প্রশ্ন- মুখ কি শুধু মুখ, না সর্বাবয়বের প্রতিনিধি? মুখ কি শুধু মুখ, নাকি মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার অভিব্যক্তি?- দ্বিধাদ্বন্দ্ব!
২.
এ রকম স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে মনকে নানাভাবে বোঝাতে লাগলাম। কাব্যে রূপবর্ণনা নতুন কিছু নয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নায়িকার রূপ-বর্ণনার জন্যে আলাদা একটা অংশ থাকত। যেসব কবি দেবদেবীর প্রথাগত পূজা অর্চনার প্রতি দায়বদ্ধ, তাঁরা নায়িকার পদপ্রান্ত থেকে রূপের বন্দনা শুরু করতেন। ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়ে সেই বর্ণনা সিঁথিতে গিয়ে থামতো। যাঁরা অপৌত্তলিক কবি, তাঁদের রূপবর্ণনা শুরু হতো শিরোভাগ থেকে। সেই বর্ণনা ক্রমশ নিম্নগামী হয়ে পায়ের নখ পর্যন্ত গিয়ে থামতো।
রূপবর্ণনার শৈলী ছিল পুঙ্খানুপুঙ্খ, যাকে অহধঃড়সরপধষ-ও বলা যেতে পারে। রূপবর্ণনার বিশদ ও বিখ্যাত নমুনা আলাওলের 'পদ্মাবতী' কাব্য, ভারতচন্দ্রের 'বিদ্যাসুন্দর'। আধুনিক কালের কাব্যেও রূপবর্ণনা আছে, রবীন্দ্রকাব্যেও আছে। সংস্কৃত-কাব্য তথা কালিদাসের প্রভাব সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের প্রশংসনীয় কুশলতার একটি দিক হলে সংযমের সৌন্দর্য তথা পরিমিতি বোধ। নারীর নগ্ন-রূপ চিত্রিত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- 'পরিয়াছ সৌন্দর্যের নগ্ন আবরণ'। নারীদেহের অলংকারশোভিত প্রতিটি অংশের বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন। সেই বর্ণনা কেবল কাব্যালংকারশোভিত নয়, কেবল কাব্যরসের দ্বারা সুষমিতই নয়, একই সঙ্গে তা শিল্পরুচির দ্বারা সুশাসিত। কল্পনা কাব্যের 'স্বপ্ন' কবিতাটি এর অন্যতম উদাহরণ। জীবনানন্দ দাশও 'কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ' আঁকার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে এ কথাও বলা দরকার- কবি সেই মুখমণ্ডলেই আবদ্ধ হয়ে থাকেননি। অন্য কবিতায়, 'মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য' বলে বিশেষায়িত করলেও বনলতা সেনের সৌন্দর্যকে শেষ পর্যন্ত স্নিগ্ধ অন্ধকারে মিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দৃষ্টিকে উদ্বৃত্ত অন্ধকারে বিলীন করে দিয়েছেন। কেননা, 'বনলতা সেন' রূপান্বেষণের কবিতা নয়, আপেক্ষিক সম্পর্কযুক্ত নর-নারীর সত্তানুসন্ধানের কবিতা।
৩.
এবার আমাদের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। অর্থাৎ, কবিতার কথায়, আঁকাআঁকির কথায় এবং মুখের কাছে ফিরে আসি। বিষয়ের অভিঘাত এই যে আমি বিব্রত হলাম, আগে কিন্তু এমনটা হতো না। ১৯৬৮-৬৯ সালে 'সে তোমার মুখ', 'কতিপয় তরুণের মুখ'-এ রকম আরও কবিতা বিনা দ্বিধায় লিখে গেছি। আমার বইপত্র এবং কবিতার খাতাগুলো এখন অন্যত্র। তাই বলতে পারছি না- কী লিখেছি না-লিখেছি। তবে এটুকু বলতে পারি- কবিতাগুলো মুখসর্বস্ব ছিল না। আমি বিশ্বাস করি, অন্য কারও কবিতাও কেবল মুখের বর্ণনাতেই শেষ হয়ে যায় না- সেই মুখশ্রী যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন।

৪.
বয়ঃসন্ধিকালে, প্রকৃতিগত কারণেই ছেলেরা মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে- তাকায়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। ফলে, যখন যাকে দেখে ভালো লেগেছে মনে মনে তাকে আঁকতাম। একটা পর্যায়ে কাগজ-কলম-পেন্সিলও তুলে নিতাম। আঁকার চেষ্টা করতাম। কিছুই হতো না। তবু মনে মনে তৃপ্তি পেতাম। এখন বুঝি, শিল্পচর্চার এটাও অন্যতম সার্থকতা।
আমি প্রফেশনাল আর্টিস্ট নই। এ কারণে আমার কোনো কোনো ছবি বিভ্রান্ত হয়ে যেত। হয়তো আঁকতে চাইলাম কলকতার ইহুদি বান্ধবী এলেন যাসুজাকে। আঁকলামও। কিন্তু দেখা গেল, ছবিটা দেখতে প্রায় অকালপ্রয়াত অনুরাগী জুন ডি-সিলভার মতো। কখনও আবার একজনের চোখ, আরেকজনের নাক, আরেকজনের ঠোঁট- সব মিলিয়ে হয়ে গেল চতুর্থ এক নেপথ্যচারিণী, যাকে আমি দেখিনি।
৫.
আঁকাআঁকি প্রত্যক্ষ শিল্প। সে ক্ষেত্রে যদি এই রকম অবস্থা হয়, কবিতার ক্ষেত্রে তো আরও বেশি জট পাকানোর সম্ভাবনা। ধরা যাক, কোনো একজনকে নিয়ে কবিতা শুরু হলো; দেখা গেল আরও কিছু তাদের অধিকার নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রসঙ্গের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী তারা ঠিকই নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে। আমি বাধা দিতে পারি না, পারি না শিল্পের স্বার্থেই। এটা যে কেবল আমার ক্ষেত্রে হয় তা নয়। আমার তো মনে হয়, অধিকাংশ কবিই কোনো না কোনো সময় এই ঙাবৎষধঢ়রহম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এটাই স্বাভাবিক, তাই এটাকে সমস্যা মনে করাও উচিত হবে না। জট পাকানো এই অবস্থাটিকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন অনুজপ্রতিম কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। তিনি লিখেছেন, 'শত মুখ জড়ো করে একমুখ বালিকা বানাই'। [বালিকা আশ্রম]
৬.
দু'জাতের দুটো বিষয়; ধরা যাক তার মধ্যে একটি হলো মানবী, অন্যটি পাহাড়ি ঝর্ণা। দুটো আলাদা বিষয়কে একই বর্ণনায় দ্রবীভূত করা সম্ভব। কীভাবে তা খুলে বলি।
১৯৬৯ সাল থেকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করছি। কলাভবনের পেছন দিয়ে কিছুদূর গেলে দেখা যায় একটি পাহাড়ি ঝর্ণা। অনেকে সেটা দেখতে গেছে। কিন্তু আমার যাওয়া হয়নি। বছর তিরিশেক বাদে, ছাত্রছাত্রীদের আবদার সূত্রে সেই নিসর্গিক এলাকায় যাই। উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার ভাঁজ ধরে উচ্ছল ঝর্ণাটা দেখে সত্যিই মুগ্ধ হলাম, অনুপ্রাণিত হলাম। আশপাশে পাহাড়ের ঢেউ, নাম না জানা গাছগাছালি, জংলিফুল। ঝর্ণার জ্যামিতিক বিন্যাস, চঞ্চল বাঁক, স্রোতের কলতান- সব মিলিয়ে আমি যেন মনোরমা এক তন্বীকে দেখছি, যাকে নিয়ে কবিতা লেখা যায়।
আমাদের এক প্রতিবেশী ছিল। তাদের ফুটফুটে একটি মেয়ে ছিল, বয়স ছয়ের কাছাকাছি। মেয়েটি ইস্কিপিং খেলত আমাদের বাসার সামনে। একদিন ওরা ঢাকায় চলে গেল। দশ বারো বছর বাদে কমলাপুর স্টেশনে হঠাৎ সেই প্রতিবেশী ভাবির সঙ্গে দেখা। সহজেই পরস্পরকে চিনলাম। অদূরে দাঁড়ানো খুব সুন্দর একটি মেয়েকে দেখিয়ে বলল- 'বলেন তো মেয়েটা কে?' আমি অনুমান করলাম, কিন্তু নামটা মনে করতে পারছিলাম না। ভাবি বললেন, 'চিনলেন না তো! ওই আমাদের পিচ্চি ঝর্ণা'।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝর্ণা দেখতে দেখতে কেমন করে জানি কমলপুর প্ল্যাটফর্মের কথা মনে পড়ল। মনে মনে যে কবিতা সাজাচ্ছিলাম, তার চূড়ান্ত পঙ্‌ক্তিটাই আগে নাড়া দিল। আমার স্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কবিতার নাম দিলাম 'ঝর্ণার দেখা', যার শেষ পঙ্‌ক্তি- 'চোখের আড়ালে ঝর্ণা, কবে তুমি এতো বড়ো হলে।'
৭.
আমার একটি কবিতা আছে- 'কাকে ভালোবাসতে গিয়ে কাকে কাকে ফেলছি ভালোবেসে/ কাকে ভালোবাসা যায় বলে দাও তুমি কাছে এসে।' এর মানে একটা মুখ খুঁজতে গিয়ে একাধিক মুখশ্রীতে ডুবে যাওয়া। এমনও দেখা যায়- কারও কারও কিছু বৈশিষ্ট্য অন্য কারও কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। এটা হতেই পারে। এখন কথা হলো, সেই মিলে যাওয়া বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি একটি কবিতা লেখা হয়, সেটা তবে কাকে নিয়ে লেখা হলো- এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন।
প্রসঙ্গত, কোলাজধর্মী কবিতার কথায় আসি। এখন পর্যন্ত আমার দীর্ঘতম কবিতা 'মৃত্যুর জীবনীগ্রন্থ' [পলাতক পেণ্ডুলাম]। ওই কবিতা মূলত আমার কাব্য নায়িকা শ্যামলীকে নিয়ে লেখা। 'ভালোবাসি' সামান্য এই কথাটুকু যাকে কোনো দিন আমি বলতে পারিনি এবং বলতে পারবও না। এই জন্যে তাকে নিয়ে কবিতা লেখা শেষও হচ্ছে না।
শ্যামলীর মৃত্যুতে গিয়ে ওই কবিতা শেষ হলেও, তার আগে অনেক রকম মৃত্যুর কথা এসে গেছে- ব্যক্তিমানুষ, সমাজ, সভ্যতা-সংস্কৃতির মৃত্যু। প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি সম্পর্ক আমাকে দিয়ে গেছে ছোট ছোট অনেক উপমৃত্যু, আমাকে দিয়ে গেছে 'মৃত্যুর জীবনীগ্রন্থ' লেখার দুরূহ দায়িত্ব।
আমি তাদের সকলের কাছে অনেক ঋণী; সকলের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। এমনকি যাকে আমি অবহেলা করেছি, তাকে আমি সম্মান জানাই। 'পানপাত্র ওষ্ঠে নিয়ে তীব্রভাবে সামনে এসেছিলে/ তবুও তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিলাম।/ তবু কি পেরেছি আমি,/ তবুও নিজের কাছে পুরোপুরি ফিরে কি এলাম?'
৮.
প্রতিটি কবিতার মধ্যে যেমন ছবি থাকে, তেমনি প্রতিটি মুখের আড়ালে কবিতা থাকে। 'কবিতায় অনেকের রূপ এঁকেছি। কিন্তু শ্যমলীকে আমি কখনও রূপান্তরিত করতে চাইনি। তার অহংকারী ভাবমূর্তিই আমার সম্পদ, আমার সবকিছু। একটি তিল, একজোড়া ঠোঁট, ডান হাতের অস্পষ্ট তালুরেখা ছাড়া আর কিছুই আমি আঁকতে চাইনি। কেননা, রূপকে অতিক্রম করে স্বরূপ, স্বরূপকে অতিক্রম করে সত্তা। তাই ভাবমূর্তিগতভাবে শ্যামলীর সঙ্গে কমবেশি মিল যেখানে দেখেছি, সেখানেই থমকে দাঁড়িয়েছি; মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে- 'প্রেরণা'! 

-এই রচনায় ব্যবহূত ড্রয়িংগুলো ময়ুখ চৌধুরীর আঁকা