- ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
--বছরে বার দুই আমার বড়ো মামা কাজী মোতাহার হোসেন কুষ্টিয়া আসতেন। আত্মীয়তা সূত্রে আমাদের বাড়িতেই উঠতেন। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। লেখালেখির অভ্যেস তৈরি হয়েছে। আমার দুই-একটা গদ্য লেখা অনুরোধ করেছিলাম তাকে দেখে দিতে। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভাষা, বাক্য, বানান ঠিক করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, আমি তখন এইট-নাইনে পড়ি। তখন ভাষাজ্ঞান ততটা প্রখর ছিল না। তিনি সংশোধন করে দেওয়ার পর আমার ভাষা ও বানান জ্ঞান কিছুটা তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে আমার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
-আত্মপ্রকাশলগ্নে কেনো প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে?
--আত্মপ্রকাশলগ্নে সামাজিক বা পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার চাইতে আমার মানসিক দোলাচলের প্রতিবন্ধকতাই বেশি ছিল। আর সবার মতো আমি কবিতা দিয়েই আমার লেখালেখি শুরু করেছিলাম। কিন্তু একসময় আমার মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হলো- আমি পদ্য লিখবো নাকি গদ্য লিখবো! এই ধরনের এক মনোদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আমি গদ্য লেখার প্রতিই ঝুঁকে পড়ি। মননশীল রচনার দিকেই মনোনিবেশ করি। এভাবেই যে মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা একসময় কেটে যায়।
-প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
--১৯৭১ সালের ৩ মে আমি দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও মুক্তিযুদ্ধের কাজেই সম্পৃক্ত ছিলাম। যেমন 'স্বাধীন বাংলা' পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুতও শরণার্থী ক্যাম্পের বর্ডার স্লিপ ইস্যুর মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের সহকারী ছিলাম। সেসময় বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা শুরু করেছি। মূলত কবিতাই লিখতাম। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আমার প্রথম কবিতার বই 'স্বদেশ আমার বাঙলা' কলকাতা কবিকণ্ঠ প্রকাশনী থেকে ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়। তার ব্যাক কভারে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ এক ভূমিকা লিখে দেন। এই বই প্রকাশের পর কাগজে বেশ আলোচনাও হয়। এই ঘটনা আমার কাছে তখন বেশ স্বপ্নের মতো ছিল। ১৮-১৯ বছরের এক তরুণের বই ৫০ বছর আগে কলকাতা থেকে প্রকাশ তো একটি বড় ঘটনা বটে। এ ছিল আনন্দের ও অনুপ্রেরণার বিষয়।
-কোন বই বারবার পড়েন? কেন?
--যদি একটি বইয়ের কথায়ই বলতে হয়, বলব- মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু' বইটি। ইতিহাসের সূত্রে মানবিক ট্র্যাজেডি আর ঘটনার যে রূপায়ণ এই বইটিতে রয়েছে, তা আমাকে টানে। কাহিনির জন্য, ভাষার জন্য, ধ্রুপদি চেতনার জন্য 'বিষাদ সিন্ধু' বইটি আমার বড় প্রিয়।
- এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
--এখন আমার হাতে অনেকগুলো প্রবন্ধ লেখার কাজ রয়েছে। নানা স্মারকগ্রন্থের জন্য প্রবন্ধ লিখতে হচ্ছে। আমার অনেকগুলো বই একসঙ্গে বের হবে। আমাদের যে রেলের ইতিহাস তা আমাকে খুব টানে। দেড়শ বছর আগের রেল নিয়ে একটি দুষ্প্রাপ্য বই আছে। এই বইটি আমি উদ্ধার করেছি। সেই বইটি আমি সংকলন ও সম্পাদনা করছি। সব মিলিয়ে অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করতে হচ্ছে। বিদ্যাসাগর নিয়ে একটি বই বের হবে, একেবারে নতুন বিষয়।
- কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
--আমি সবসময় চেয়েছি আমার বই-পুস্তকগুলো যেন খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়। আমার বিশাল হলরুম আছে। এছাড়াও আমার অনেকগুলো ঘর আছে যেখানে বই সংরক্ষিত আছে। কিন্তু তবুও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবহেলায় অনেক বই, পা ুলিপি, চিঠিপত্র ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। যা জাতীয় সম্পদ বলা যায়। বলতেই যদি হয় তাহলে এটাই আমার সীমাবদ্ধতা।
- চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
--আমার চরিত্রের শক্তিশালী দিকটি হলো মানসিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা।
- নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?
--নিজের সম্পর্কে শোনা অভিযোগটা হচ্ছে অহংকারী। কথাটি অর্ধসত্য বলা যায়।
- প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসাবাক্য কোনটি?
--অনেকের কাছে শুনেছি আমি সাহিত্য-গবেষণার কাজে নিবিষ্ট, আন্তরিক ও মনোযোগী।
- কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
--আমি পেশাগত জীবনে শিক্ষকই হতে চেয়েছিলাম। তাই-ই হয়েছি আমি। শিক্ষক না হলে আমি সাংবাদিক হতে চাইতাম।
-আপনার প্রিয় উদ্ধৃতি কোনটি?
--তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসের 'জীবন এত ছোট কেনে'
- জীবনকে কেমন মনে হয়?
--দুঃখ-বেদনা, শোক, অপ্রাপ্তি এসব কিছু ছাপিয়েও জীবন ভারি মধুর, জীবন ভারি সুন্দর, জীবন ভারি অর্থবহ। এই জীবন যদিও নশ্বর, তাই এ কারণেই এ জীবনের প্রতি আমাদের এত আকর্ষণ। লালন ফকিরের একটি গান আছে, 'এমন মানব জনম আর কী হবে, মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।' জীবনকে আমি এই অর্থেই দেখি।