- ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
-- বহু ঘটনাই তো একটি জীবনকে প্রভাবিত করে। বিভিন্ন পর্যায়ে। আমার জীবনেও তাই। তবে ছোটবেলায় আমার বয়স যখন ১১ তখন আমার মা মারা যান। আমরা তখন ৭ ভাইবোন, সবার বড় বোন বয়স ১৫, সবার ছোট বোন বয়স ৩। এক ভয়ংকর শূন্যতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা নিক্ষিপ্ত হই। এই ঘটনা আমাদের জীবন-যাপন সবকিছুই পাল্টে দিয়েছিল। আমার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় অনিয়ম হতে থাকে, দড়িছাড়া ভাব আসে। এর তিন বছরের মধ্যে আসে মুক্তিযুদ্ধ, যা আমার মনোযোগ চিন্তা, আগ্রহ, পড়াশোনা, লেখালেখি সবই প্রভাবিত করেছে, বয়সও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
- প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
-- আমার প্রথম বই 'বিশ্ব পুঁজিবাদ ও বাংলাদেশের অনুন্নয়ন', প্রকাশের বছর ১৯৮৩, আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য শিক্ষক। খুব আগ্রহ নিয়ে এটি প্রকাশ করেছিলেন আমার এক সিনিয়র বন্ধু এনামুল করিম দীপু। তাঁর যে খুব অর্থবিত্ত ছিল তা নয়। ধারকর্জ করেই বইটা বের করেছিলেন, এখনও ভাবলে অবাক লাগে। এটাই তাঁর একমাত্র প্রকাশনা। তখন লেটার হেড প্রেস, কম্পিউটার তখনও অনেক দূর। দীপু ভাইসহ যেতাম পুরোনো ঢাকার প্রেসে। প্রুফ দেখা বড় নিউজপ্রিন্ট কাগজে, হাতে-কাপড়ে কালি মাখামাখি হতো। তখন প্রথম মুদ্রণই হতো ১২০০। প্রেস মালিক হেলাল ছিলেন খুবই সজ্জন মানুষ, প্রকাশনা ক্ষেত্রে খুবই নিবেদিতপ্রাণ। দু'জনের কেউই এখন বেঁচে নেই, অকালেই মারা গেছেন।
এই বই নিয়ে সে সময় বিভিন্ন সাময়িকীতে পর্যালোচনাও হয়েছিল বেশ কয়টি, এজন্য কাউকে কিছু বলতে হয়নি। তখনও গ্রন্থ পর্যালোচনার জন্য আগ্রহ ও সুযোগ ছিল বিভিন্ন মিডিয়ায়। এখন বোধহয় যোগাযোগ ও ধরাধরি বা প্রকাশকদের প্রভাব ছাড়া বই নিয়ে আলোচনা হয় না। কারণ, এরপর আমার আরও ৪০টি বই প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু গ্রন্থ পর্যালোচনা একটি/দুটি সামান্য কিছু ছাড়া সেভাবে কোনোটিরই হয়নি।
- কোন বই বারবার পড়েন? কেন?
-- কোনো বই বারবার পড়ার সুযোগ খুব কম। মাঝেমধ্যে দরকারে হয়তো দেখি। এতো বই আছে পড়ার যে তাতেই হিমশিম অবস্থা।
- প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা?
-- দেশে-বিদেশে অনেকেই আছেন। শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও অনেকে কাব্যক্ষমতা দিয়ে স্পর্শ করেন। আবার তরুণদের মধ্যেও প্রিয় কবি ও কবিতা খুঁজি। আমার স্মরণশক্তি খুব ভালো না, এতো নাম বলতে পারব না। একজনের নাম বলতে বললে বলব জীবনানন্দ দাশ।
- এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
-- এখন কয়েকটি বই লেখা নিয়ে কাজ করছি। 'অর্থশাস্ত্রের দর্শন' প্রায় শেষ, 'চীন :পরাশক্তির বিবর্তন' সেটাও শেষের দিকে। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে মার্কসের পুঁজি অনুবাদ করছি, এখন দ্বিতীয় খণ্ডের শেষের দিকে। বাংলাদেশে পুঁজিবাদ ও ৫০ বছর নিয়েও কাজ করছি। 'ধর্মের কথা জীবনের কথা' অসমাপ্ত হয়ে পড়ে আছে। ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথা সম্পাদনা আমার নিয়মিত কাজ। কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ জার্নালও সম্পাদনা করছি। এছাড়া বাংলাদেশে শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডে নিরাপত্তাহীনতায় অসংখ্য শ্রমিক, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিতে কাজ করছি।
- ব্যক্তি জীবনের এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
-- সীমাবদ্ধতার তো শেষ নেই। এগুলো নিয়েই চলি। কষ্ট পেয়ে তো লাভ নেই।
- আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
আমি 'না' বলতে পারি।
- নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?
-- আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ সেরকম শুনি না, আমার কাজ চিন্তা মতাদর্শিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্নরকম কথা আছে। এর জন্য নানামাত্রায় সংগঠিত আক্রমণের মধ্যেও পড়ি, কুৎসা, মিথ্যাচারও থাকে। অভিযোগ তো সবার একরকম না। যারা আমাকে দেখলেই বা নাম শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন তাদের একরকম। তারা বলেন, আমি উন্নয়ন বিরোধী, সবকিছুতেই না বলি। আবার যারা স্বজন বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষী বা দেশের মানুষ তাদের একরকম, তাঁরা বলেন আমি দশ হাতে আরও কেন কাজ করি না।
- নিজের সম্পর্কে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসাবাক্য কোনটি?
-- প্রশংসাবাক্য তেমন কিছু শুনি না।
- কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
-- মানুষ হতে চেয়েছিলাম, মানুষ আছি।
- আপনার প্রিয় উদ্ধৃতি কোনটি?
প্রিয় উদ্ধৃতি সবসময় একটাই থাকে না। বহু উদ্ধৃতিই ভালো লাগে। গদ্য-পদ্য দেশি বিদেশি। এই মুহূর্তে একটা মনে পড়ছে- ÔWhen the last tree is cut down, the last fish is dead, and the last stream poisoned, you will realize that you cannot eat money.’
- জীবনকে কেমন মনে হয়?
জীবনের মতোই মনে হয়। জীবন যদি জীবন্ত না থাকে তাহলেতো তা মৃত। জীবন আসলে কারও ব্যক্তিগত নয়, তার সাথে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি। জীবন মহাপ্রাণের অংশ, যদি সমষ্টি ও সর্বপ্রাণের সাথে নিজেকে মেলানো যায় সে জীবনই হলো আনন্দময়, অর্থপূর্ণ।