পর্ব-১৭
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কয়েকটি মাইলস্টোনের কথা আমরা স্মরণ করি, তার মধ্যে ৬ দফা অন্যতম। বস্তুতপক্ষে ৬ দফা এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যেই সংঘাতটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে লড়াইয়ে পরিণত হয়, তা এই ৬ দফার কারণেই হয়। তাহলে এই ৬ দফা কী- সেটা আমাদের বোঝা দরকার। ৬ দফা হঠাৎ করেই জন্মলাভ করেনি বা এটি আচমকা ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এটি ধারাবাহিকভাবে চলে আসা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনীতির অংশ। এক্ষেত্রে আমাদের সূত্র দেখতে গেলে যেতে হবে একেবারে ১৯৪০ সালের দিকে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের যে সকল দলিলপত্র বের হয়েছে, সেসবের কাছে। যেহেতু এসব দলিল তখন স্বাধীন দেশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। যেমন আবুল হাশিমের 'ইস্ট পাকিস্তান মেনিফেস্টো' বা ইস্ট পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির পূর্ব পাকিস্তানের রূপকল্প বা কাঠামো ইত্যাদি। ৬ দফার সঙ্গে এর প্রতিটার যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু সে সময়ে এগুলো ব্যর্থ হয়ে যায়- এবং এই পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়ে যাবার পরে লাহোর প্রস্তাবে উল্লিখিত দুটি পৃথক স্বাধীন দেশের কথাকে পরিবর্তন করে দিল্লির সম্মেলনে এক পাকিস্তানের প্রস্তাব করা হয়। সম্মেলনে যে প্রস্তাবটিকে ভোটের জন্য উপস্থাপন করেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
কিন্তু কী কারণে ১৯৪০ সালের প্রস্তাবটা করা হয়েছিল? এর কারণ ১৯৩৭ সালে যে নির্বাচনটা হয় সে নির্বাচনে আমাদের যে আজকের বাংলাদেশ- সেখানে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ অন্য কোনো স্থানে এত বিপুলভাবে জয়লাভ করতে পারেনি। মূলত এই জনগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়েই কিন্তু পাকিস্তানের প্রস্তাবটা নেওয়া হয়। এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে প্রস্তাবটা উত্থাপন করতে দেওয়া হয়, কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু যে ইতিহাস থেকে আজকের বাংলাদেশ এবং আজকের পাকিস্তান দুটোই সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু এই স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মোর্চা গঠনের ভিত্তি ছিল ভারতের প্রতিষ্ঠিত এলিট শ্রেণি-যাদের কারণে এই আলাদা ইতিহাসের দুই দেশ এক হতে পেরেছিল। মুসলিম লীগ ছিল একটি মোর্চা, এবং সেটা গঠন সম্ভব হয়েছিল কারণ তাদের উভয়েরই প্রতিপক্ষ ছিল তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত সর্বভারতীয় এলিট শ্রেণি- যাদের দল ছিল কংগ্রেস। '৩৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯৪০ সালের প্রস্তাবটি যেমন হয়, ঠিক একইভাবে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যখন মুসলিম লীগ বাংলাদেশে একক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজয় লাভ করে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে তখন পরিস্কার ছিল যে, বঙ্গীয় মুসলিম লীগ এবং সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের বঙ্গীয় শাখা এক নয়। আর চল্লিশের পরে এখানে স্বাধীনতাপন্থি পূর্ববঙ্গীয়দের সাবল্য অনেক বেশি ছিলো। তাদের ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জিন্নাহর পক্ষে সম্ভব ছিল কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন। অর্থাৎ, জিন্নাহ দেখলেন যে, এটা তো একটা আলাদা দেশ হতে যাচ্ছে; যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। দ্বিতীয়ত, চল্লিশ থেকে ছেচল্লিশ পর্যন্ত জিন্নাহ কোনোদিনই একক পাকিস্তানের কথা বললেন না। ছেচল্লিশে এসে হঠাৎ করেই তিনি কেন এক পাকিস্তানের কথা বলবেন-সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
ছেচল্লিশে দিল্লিতে মুসলিম লীগের নবনির্বাচিত বিধায়কদের সভায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একক পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি আলাদা রাষ্ট্রের এই প্রস্তাব উত্থাপনের পর বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম খুব দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করে বলেন, 'এটা তো ঠিক না। লাহোর প্রস্তাবে এটা নেই।' জিন্নাহ সাহেব বললেন, 'কে বলেছে ঠিক না।' তখন রেজ্যুলুশনের বইটা আনা হলো। সেখানে ঠিকই দেখা গেল লেখা আছে 'ংঃধঃবং', অর্থাৎ রাষ্ট্রসমূহ। কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন বললেন, এটা বোধহয় টাইপিংয়ের ভুল হয়েছে। শুরু হলো এক নতুন জটিলতা। এ পরিস্থিতি নিরসনে তখন প্রস্তাব উঠল যে, তাহলে ভোট নেওয়া হোক। সেই ভোটে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রসমূহের বদলে একটি একক রাষ্ট্র গঠন করার পক্ষে জিতে গেলেন।
ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য
আবুল হাশিম দিল্লি থেকে ফেরত এসে বাঙালির জন্য প্রথম রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন 'ইউনাইটেড বেঙ্গল মুভমেন্ট' শুরু করলেন। আবুল হাশিম এ আন্দোলন শুরু করলেন বঙ্গীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। শুরু হয় যৌথ বাংলা আন্দোলন। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবার লেখা হয় 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট বেঙ্গল মেনিফেস্টো'। অতএব দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার ইতিহাসের সূত্রই হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব কেন্দ্রিক। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সাফল্য যেমন বেশ কিছু ইশতেহার তৈরি করেছে, ১৯৪৬ সালে সেই লাহোর প্রস্তাবকে হত্যা করেও ঠিক একইভাবে ইশতেহার তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ এই ধারাবাহিকতা পূর্বেকার। ১৯৪০ থেকে '৪৭ পর্যন্ত, যেটি সামগ্রিকভাবে আমাদের রাজনীতিতে বিদ্যমান ছিল।
আশ্চর্যের বিষয় নিজের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপক্ষে গিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আবার যৌথ বাংলার আন্দোলনকে সমর্থন করলেন। লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তান যদি পাকিস্তানের একচ্ছত্র অংশই থাকত, তাহলে আবার যৌথ বাংলার আন্দোলনকে মেনে নেওয়ার ঐতিহাসিক কী কারণ থাকতে পারে? যে কিনা লাহোর প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা ভাবছে, সে-ই আবার যৌথবাংলা আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে। জিন্নাহ ভেবেছিলেন বেঙ্গল মুসলিম লীগের ওপর নিশ্চয়ই তিনি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন। জওহরলাল নেহরুর সাথে তার বিবাদ। তাই একই কারণে নেহরু এই যৌথ বাংলার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন-কারণ বেঙ্গল মুসলিম লীগের ওপর তো তার কর্তৃত্ব থাকবে না। একইসঙ্গে কলকাতাভিত্তিক ওপরতলার লোকেরাও প্রায় একই কারণে এটার সমর্থন করেনি। এবং এই সময়ে যে হিন্দু মহাসভা এবং অন্যান্য মহল- তারাও একে গ্রহণ করার স্বাভাবিকভাবেই কোনো কারণ নেই। এতে আমি দোষেরও কিছু দেখি না- কারণ বাংলাদেশের আলাদা ঐতিহাসিক সত্তা তৈরি হয়ে গেছে বহু আগেই। এই সত্তাটা তাদের থেকে আলাদা। দুই দিকে দুটি আলাদা ইতিহাসে বসবাস করা মানুষ। কী করে তারা এক দেশে থাকবে? এক দেশে যে থাকতে পারবে না তার বড় প্রমাণ হচ্ছে দাঙ্গাগুলো। আমরা তাকে সাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, কিন্তু রাষ্ট্রের সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে দেখি না। বস্তুতপক্ষে তখন কলকাতায় হোক আর নোয়াখালীতে হোক, যারা ছিল তারা আলাদা দুটি দেশের নাগরিক। যদিও তারা তখনও পুরোপুরি সনদপ্রাপ্ত নাগরিক হয়নি; কিন্তু চেতনার দিক থেকে, সত্তার দিক থেকে, ঐতিহাসিকতার দিক থেকে তারা আলাদা দেশের নাগরিক। অতএব এটা অবধারিতই ছিল। ঠিক যেই ঘটনাটা ১৯৭১ সালে অবাঙালি-আমরা যাদের বিহারি বলি, তাদের সঙ্গে হয়েছিল। তারা ছিল পাকিস্তানি। তারা একই দেশের নাগরিক না। তাই তাদের সাথে সংঘর্ষও অবধারিত ছিল। তেমনিভাবে যেটা হয়েছিল ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশের দিকে।
সাতচল্লিশের পরে উনপঞ্চাশ-বাংলাদেশে যে আওয়ামী লীগ বেরিয়ে এলো, এটা আসলে বঙ্গীয় মুসলিম লীগেরই একটি নতুন সংস্করণ। এই সংস্করণে যারা যুক্ত হলেন, তারা পূর্বের ঐতিহাসিক যে সমস্যাগুলো ছিল, অর্থাৎ কে মুসলমান কে হিন্দু- এসব থেকে মুক্ত হয়ে প্রধান শত্রু বা নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সবল করে তুলতে চাইলেন। এবং সেখানে অন্যরাও আসতে সক্ষম হলেন। সেই আন্দোলনের সক্ষমতা থেকেই ১৯৫৪ সালে গিয়ে ২১ দফার আবির্ভাব হলো। এই ২১ দফাতে পুরোপুরিভাবে একটি স্বাধীন দেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তাবগুলোই স্থান পেল। অর্থাৎ এখানেও স্বাধীন দেশের চিন্তার সেই ধারাবাহিকতা। সংস্কৃতি, কৃষি, অর্থনীতিসহ সবকিছু নিয়ে নিজস্ব স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের কাঠামো এই ২১ দফাতে প্রতিভাত হয়ে উঠতে দেখা যায়, যার কারণে সবাই তাদের ভোট দিল।
৬ দফাতেও একইভাবে স্বাধীনতার চেতনার সেই ধারাবাহিকতাই প্রতিফলিত। এটা সেই ২১ দফারই একটি নতুন রূপ। এই নতুন রূপ তৈরি হয়েছে নতুন ঐতিহাসিক কাঠামোর দিক থেকে। যার কারণেই দেশ স্বাধীন হলো। অর্থাৎ, ধারাবাহিকতার দিক থেকে আমাদের দেশের শুরুটা অনেক আগে- ১৯৪০ সাল। যেখান থেকে আমাদের রাষ্ট্র গঠনের যাত্রাটা শুরু হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা কীভাবে চরম পর্যায়ে পৌঁছালো
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সেই ধারাবাহিকতাকে মোকাবিলা করতেই ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল জারি করে ক্ষমতা দখল করে পাকিস্তানে আইয়ুব খান সামরিক সরকার গঠন করে। আমরা জানি ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রীদের নিয়ে নির্বাচন করলেন। সেই নির্বাচনেও আইয়ুব খান বাংলাদেশে ৫৩ ভাগের বেশি ভোট পায়নি। অর্থাৎ, ক্ষমতা দখল এবং তার মাধ্যমে সুবিধাবাদী মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি করেও পর্যাপ্ত ভোট পায়নি আইয়ুব খান। লক্ষণীয় যে, এরা হচ্ছে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগী, যাদের ওপরে আইয়ুব খানের পুরো শাসন ব্যবস্থাটা নির্ভর করত। তাদের মধ্য থেকেই যদি আইয়ুব খানকে পঞ্চাশ ভাগের সামান্য বেশি ভোট দিয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে, এই আইয়ুব খানের এই মধ্যস্বত্বভোগী মডেলটা ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীকালে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে অনেকে শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছিল, তাদের ভোটও পায়নি আইয়ুব খান। গ্রামে যে ভিত্তি ছিল আইয়ুব খানের, সেটা রাজনৈতিকভাবে টেকেনি। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের সাথে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে জমিদার শ্রেণির রাজনৈতিক ভূমিকার। কিন্তু ঠিক যেভাবে ইংরেজদের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে জমিদাররা ব্যর্থ হয়েছিল, সেভাবেই এই ব্যাসিক ডেমোক্র্যাটরাও ব্যর্থ হয়েছিল আইয়ুব খানের স্বার্থ রক্ষা করতে।

'৬৫ সালেই পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই নতুনভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান যে অরক্ষিত ছিল, এই বিষয়টিকেই প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যরা নিয়ে আসেন। প্রেক্ষাপটটা তখন সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। পাকিস্তানের বিষয়টা তখন আর ভারতের সাথে না, তখন বিষয়টা হয়ে যায় যে, 'তুমি পাকিস্তান-কিন্তু তুমি আমাদের জন্য কী করেছো!'। সমগ্র পাকিস্তানের সমস্ত বিরোধী দলের নেতারা এই সময় ১৯৬৬ সালে একটি সম্মেলন ডাকেন। পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষও বেশ কিছু ব্যাপারে নাখোশ ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরের সেই সম্মেলনে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানেই তিনি ৬ দফা প্রস্তাবটা পেশ করার দাবি জানালেন। এখানে লক্ষণীয় যে, পাকিস্তানি বিরোধীদলীয় এই রাজনীতিবিদরা কিন্তু এই প্রস্তাবটি তখন পেশ করতে দেয়নি। কেন তারা পেশ করতে দেয়নি-এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্র যদি একই হতো, তাহলে তো তারা পেশ করতে দিতই।
৬ দফা পরিস্কারভাবেই আলাদা রাষ্ট্র গঠনের একটি কাঠামো। পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্সরাও কয়েক জায়গায় এটা বলেছেন যে, ৬ দফা মানে হলো খুব ভদ্রভাবে চুপচাপ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সবকিছু আলাদা হয়ে যাওয়া। এটাতো তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব না। ৬ দফা অনুযায়ী পাকিস্তানই আর থাকে না। তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনগতভাবে স্বাধীন দেশ না হলেও, বাকি সমস্ত দিক থেকে স্বাধীন দেশের কাঠামো পেয়ে যায়।
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির লাহোর সম্মেলনে ৬ দফা প্রস্তাবটি প্রকাশিত হলো না, কিন্তু পত্র-পত্রিকায় ঠিকই প্রকাশিত হয়ে গেল। এবং তার পরেই উত্তেজনাটা আরম্ভ হয়ে যায়। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তান বলতে যা বোঝায় ৬ দফার মাধ্যমে সেটা আর থাকে না। আর সেনাবাহিনীতো এটা বুঝে ফেলেছেই যে, ৬ দফা মানেই হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টা।
৬ দফার দফাগুলোতে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের কথা স্পষ্ট করে বলাই আছে যে, লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী আমাদের স্বাধীনতা দিতে হবে। অর্থাৎ যে যৌথ একটা মোর্চাভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা লাহোর প্রস্তাবে ভাবা হচ্ছিল, সেই প্রস্তাবের কথাটাই এত বছর পরে এসে ১৯৬৬ সালে আবার সরাসরিভাবে উপস্থিত হচ্ছে ৬ দফার মাধ্যমে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তো জানতো যে এটা একটা অবাস্তব রাষ্ট্র, একটা মিথ্যা রাষ্ট্র। পাকিস্তান বস্তুতপক্ষেই একটা অরাষ্ট্র। এই অরাষ্ট্রকে ৬ দফার সামনে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিটা আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিকতা থাকে, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিকতার ভিত্তিই হচ্ছে এই ৬ দফা। ৬ দফা এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই করতে সক্ষম হয়েছিল। এবং স্বাধীনতার ধারাবাহিক আন্দোলনকে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। এর কোনো বিরোধী ছিল না। তবে যদিও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি আলাদাভাবে একটা ১৪ দফা দিয়েছিল-কিন্তু সেটা কেউ মনে রাখেনি। কারণ তা থেকে কোনোকিছুই সামনে এগিয়ে আসতে পারেনি। মানুষ তখন আর ৬ দফার বাইরে অন্যকিছু ভাবছে না। একে কেন্দ্র করেই তখন আন্দোলন শুরু হলো। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বই বের হয়েছিল, 'আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা'। অর্থাৎ আন্দোলনটা তখন নানাভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবিসমূহ
প্রস্তাব ১ :শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:
লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষদ সার্বভৌম হবে।
প্রস্তাব ২ :কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:
কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে- যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।
প্রস্তাব ৩ : মুদ্রা বা অর্থ-সম্বন্ধীয় ক্ষমতা:
মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দুটির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে-
(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দুটি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।
অথবা
(খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাব ৪ :রাজস্ব, কর, বা শুল্ক্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা:
ফেডারেশনের অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর কর বা শুল্ক্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনোরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব ৫ :বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:
(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর এখতিয়ারাধীন থাকবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোই মেটাবে।
(ঘ) অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক্ক বা করজাতীয় কোনো রকম বাধানিষেধ থাকবে না।
(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং নিজ স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
প্রস্তাব ৬ :আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা:
আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
পাকিস্তানিদের প্রতিক্রিয়া
৬ দফা প্রকাশের পরপরই আসছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। লোকে ভাবে যে শেখ মুজিব যে আগরতলায় গিয়েছিলেন, সেই কারণে বুঝি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই বাজে ধারণা। পাকিস্তানিরা যদি ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবের আগরতলায় গমনের কথা জানত, তাহলে কবেই তাকে এ কারণে গ্রেপ্তার করে ফেলত। তা তো করেনি। সে কারণে ছেষট্টি পর্যন্ত তারা বসে থাকত না। কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত ছিল, তারা হচ্ছে সেনাবাহিনীর মধ্যম শ্রেণির কিছু মানুষ, কিছু রাজনীতিবিদ এবং আমলারা। কিন্তু এর খবর শেখ মুজিব কি জানতেন না? হ্যাঁ, জানতেন। শেখ মুজিবকে বাদ দিয়ে কোথাও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচেষ্টা তখন হয়নি। কিন্তু তার মানে এই না যে, শেখ মুজিব তাতে জড়িত ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মূলত পাকিস্তানিদের ৬ দফার প্রতিক্রিয়া।
আগরতলা স্বাধীনতা প্রচেষ্টায় তারা জেনারেল ওসমানীর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। ওসমানী শুনেছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো মত দেননি। লে. কর্নেল মোয়াজ্জেম হোসেনের নামটা আমাদের মনে রাখা দরকার- তিনি ৬ দফা মেনেই আগরতলা স্বাধীনতা প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছিলেন, যাকে ষড়যন্ত্র মামলা নামে ডাকা হয়। মূলত এই সবকিছুই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অংশ। পাকিস্তান আর্মির পক্ষে যে বিষয়টি বোঝা সম্ভব হয়নি তা হলো, আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেলে পাকিস্তানের আইনগত বা তার দার্শনিক যে ভিত্তি, সেটাতো আর টেকে না। যে কারণে ষড়যন্ত্র মামলায় প্রথমেই শেখ মুজিবুর রহমানের নাম আসলেও গোটা বাংলাদেশ এটাকে অস্বীকার করল। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৮ সালে বাঙালিদের কাছে অপরাধ করার মতো কোনো ব্যক্তিত্ব নন। অর্থাৎ তিনি তখন অপরাধঅসম্ভব একজন ব্যক্তি। আমাদের ইতিহাসে এ অবস্থানে কেউ পৌঁছাতে পারেনি। তাই পাকিস্তানিরা যখন বলছে শেখ মুজিব ষড়যন্ত্রে জড়িত, অপরাধী- তখন বাংলাদেশের মানুষ তা হতে দেয়নি। কারণ পাকিস্তান তো তখন কোনো জীবিত রাষ্ট্রই না। অতএব ১৯৬৮ সালে যে আন্দোলনটা হলো, সেই আন্দোলনের ভিত্তি তো হলো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চেতনা। এবং সেটি তখন একটি জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ৬ দফার পরে ইতিহাস আর আগের মতো থাকেনি। ইতিহাস বদলে গেছে। ৬ দফার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র প্রথমেও ছিল, আলাদা রাষ্ট্র এখনও আছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিকে বোঝা সম্ভব।
[এই প্রসঙ্গ সমাপ্ত]