মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় মননশীল বই প্রকাশের অগ্রদূত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর সম্পাদনা বিভাগে আমার প্রায় আড়াই বছর কাজ করবার সুযোগ ঘটে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। জনাব মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত মতবিনিময়ের সুযোগ ছিল যৎসামান্য। তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে আমার জানা তাই অতি সীমিত। তাঁর আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করাতে আমি ছিলাম ব্যস্ত। তবে তাঁর স্বপ্নটা আমি জানতাম। মহিউদ্দিন আহমেদ সুন্দর ও জ্ঞানগর্ভ অথচ জনপ্রিয় বই প্রকাশ করতে চাইতেন। কিন্তু দেশে তেমন লেখক ছিলেন গুটিকয়েক বা কেউ না। তিনি দ্রুতবেগে বই প্রকাশ করতে চাইতেন। কিন্তু বই প্রকাশের ধীর প্রক্রিয়া তাঁকে হতাশ করত।

ইউপিএলের তখনকার সম্পাদক নাঈম হাসান আমাকে ইউপিএলের সম্পাদনা বিভাগে নিয়ে আসেন। ১৯৮৮ সালের প্রথম দিকে। মে-জুন মাস হবে। কয়েক দিন কাজ করার পর জনাব মহিউদ্দিনের সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা হয়। মিস্টার পিকে দেব, ইউপিএলের তদানীন্তন বয়োবৃদ্ধ অ্যাকাউন্ট্যান্ট অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার আমার চাকরির দরখাস্ত ও আমাকে তাঁর সামনে হাজির করেন। জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ আমার দরখাস্ত দেখে বলেন, এত ছোট হাতের লেখা! চলবে?

নাঈম হাসানের রুচি ও জ্ঞান সম্বন্ধে তিনি এতটা নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি আমার যোগ্যতা সম্পর্কে আর কোনো খোঁজ নেবার দরকার বোধ করেন না।

কাজে যোগদানের পরপরই সম্পাদক নাঈম হাসান আমার হাতে কয়েকটা পলিথিনের পোঁটলা তুলে দেন। কয়েক দিন পর জানতে পারি বইটার নাম : To Chase a Miracle। পলিথিনের পোঁটলাগুলো থেকে বহু রোল করা প্রিন্টেড কাগজ বের হয়। সেগুলোর মাথামুণ্ডু বুঝতে বুঝতে মাস গড়ায়।

সে-সময় ঢাকায় আসা অত্যাধুনিক ফটোকম্পোজ পদ্ধতিতে বইটি কম্পোজ হচ্ছিল। শুরুতে প্রেসটির কর্মকর্তারা খবরের কাগজের গতিতে বইটি ছাপার প্রতিশ্রুতি দেন। একদিনে পুরোটা বই কম্পোজ হয়ে যাবে। তারপর একটু পড়ে দেখা। তারপর মেকআপ। ছাপা হবে অফসেটে মুহূর্তে। নতুন বাঁধাই মেশিন ও উপকরণ আসছে। এমন উন্নত মানের বইটা হবে যে, কেউ ভাবতেই পারবে না বইটা বাংলাদেশে তৈরি। হায়! শেষ পর্যন্ত To Chase a Miracle অত্যাধুনিক প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় পাঁচ বছর আটকে থাকে প্রেসে।

কম্পোজের কাজটি সহসাই শেষ হয়েছিল। কিন্তু সংশোধনের সময় গোলমাল বাধে। অত্যাধুনিক ফটোকম্পোজ মেশিনের অপারেটররা পেশাদার কম্পোজিটর না হওয়ায় প্রুফরিডারের ব্যবহূত সংকেত বুঝতে পারেন না। প্রুফরিডাররা ফিরে ফিরে একই ভুল এবং নতুন নতুন ভুল সংশোধন করে সময় পার করেন। পাণ্ডুলিপি এলোমেলো হয়ে পড়ে। কম্পোজ করা ফাইলগুলো লুকিয়ে পড়ে অজস্র ডিস্কে। কোন্‌টাই বা প্রথম আর কোন্‌টাই বা শেষ প্রুফ তা খুঁজে ও বুঝে পাওয়া হয় দুস্কর। সে-সময়কার ডিস্কগুলোর ডাটাধারণ ক্ষমতা ছিল আজকের সময়ের তুলনায় যৎসামান্য। আমি পাণ্ডুলিপি ও প্রুফগুলো মিলিয়ে নিই। তেলতেলে আর্টপেপারে (যাকে বলা হতো আরসি) মুদ্রিত ছিল ফাইনাল প্রুফ। মাস দুয়েক কাজ করে, সেই আর্টপেপারে মুদ্রিত ফাইনাল প্রুফেই কারেকশনগুলো আঠা দিয়ে সেঁটে আমি প্রাকপ্রিন্টকপি তৈরি করি। তেলতেলে কাগজে ছোট টুকরো টুকরো কারেকশনগুলো কিছুতেই লেগে থাকতে চাইত না। ওই সংশোধিত প্রুফের ছবি তুলে পজিটিভ বের করে বইটি অফসেটে ছাপা হবে বলে ঠিক হয়।

ঠিক সে-সময় বইটির লেখক দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষার শেষে ঘোষণা করেন যে, আমরা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে বইটি প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হলে তিনি নিজেই বইটি ছাপা শুরু করবেন।

লেখকের ইচ্ছায় আর কালবিলম্ব না করে আমরা বইটা ছেপে ফেলি। বইটির ছাপা ও বাঁধাইয়ের প্রশংসা শুনে আমরা হই ধন্য ও পরিতৃপ্ত।

হায়! শিগগিরই To Chase a Miracle বইটিতে শতশত মুদ্রণপ্রমাদ ধরা পড়ে। যার একটা বড় অংশ ছিল বইটির প্রচ্ছদ ব্লার্ব থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় মুদ্রণপ্রমাদ ছড়ানো। লেখকের কাছ থেকে মুদ্রণপ্রমাদের লম্বা তালিকা পাবার পর জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ আমার পদোন্নতি ঘটান ও বেতন বৃদ্ধি করেন। আমার পক্ষে বরখাস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কেন হই নাই, তার ব্যাখ্যা বোধকরি দেবার দরকার নাই।
যদ্দুর জানি, জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর সমগ্র প্রকাশনা জীবনে এত মারাত্মক ভুলসহ কোনো বই প্রকাশ করেননি। আমার জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়টি নেই।

ত্রুটিযুক্ত প্রকাশনা না বলে ওই কাজটিকে নতুন প্রযুক্তির একটা ট্রায়াল বা পরীক্ষা বলা যায়। ওই ট্রায়ালের পর ইউপিএল নয়াপ্রযুক্তি ব্যবহারে আর পিছপা হয় নাই। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বেক্সিমকো ঢাকায় Apple Macintosh কম্পিউটার-এর সাহায্যে বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটারে বাংলা হরফ প্রচলন করে। ইউপিএল এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে সৈয়দ মইনুল হাসান পরিচালিত বাংলা কম্পিউটার সার্ভিসেস-এর কাছ থেকে। কম্পিউটারের সফ্‌ট বাংলা হরফ ব্যবহার করে দুই বাংলাতেই প্রথম বাণিজ্যিক বইগুলো ইউপিএল প্রকাশ করে। ইউপিএল লেটার প্রেস এবং মনোকম্পোজ যুগের অবসান ঘটিয়ে ডেস্কটপ প্রকাশনার যুগে প্রবেশ করে, বাংলা ও ইংরেজি দুটি ভাষাতেই। প্রযুক্তির পরিবর্তন যন্ত্রণা ও বেদনাদায়ক কাজ। পুরোনো প্রেস মালিকরা তাঁদের কাজ ও প্রাসঙ্গিকতা হারান। নতুন ডেস্কটপ পাবলিশিং হাউসগুলোকে ঠেকেঠেকে শিখতে হয় কী করে তৈরি করতে হয় বই। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আমি যখন ইউপিএল ছেড়ে আসছি, তখন হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি বই-এর কাজ চলছে ধাতুর হরফ ব্যবহারকারী প্রেসে, আর পুরো প্রকাশনাটাই অনিবার্যভাবে ঢুকে যাচ্ছে ডেস্কটপ পাবলিশিং-এর আবর্তে।

নির্ভুল নিখুঁত বই বের করা একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটা যেন To Chase a Miracle অর্থাৎ অলৌকিকতাকে ধাওয়া করা। নির্ভুল নিখুঁত পাণ্ডুলিপি ছাড়া নির্ভুল নিখুঁত বই প্রকাশ করা অসম্ভব। কিন্তু নির্ভুল নিখুঁত পাণ্ডুলিপির দেখা পাওয়া যায় কদাচিৎ।

সকল শিল্পেই একদল নেপথ্য কর্মী থাকেন। তাঁদেরকে ছাড়া একটা শিল্প দাঁড়ায় না। তাঁদের নামডাক থাকে না। তাঁরা গণমানুষের আগ্রহের বিষয় নন। বইপত্র দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটলেও তাঁদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা সম্ভব নয়। তাঁরা সৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করেন। সেটিই তাঁদের পরম পাওয়া। যাঁরা নেপথ্যে কাজ করেন, মায়ের মতো আত্মত্যাগ করেন, প্রভু তাঁদের মূল্যায়ন ও পুরস্কৃত করেন। মানুষ পারে না।