শেষ পর্যন্ত কবিতা পাঠককে কোথায় নিয়ে যায়? কবিতা যেমন অনেকরকম, পাঠকও অনেকরকম। নদী যেমন, নদী তো ভূমিতটে জলরেখা; তবু মহানন্দা বা কর্ণফুলী, দুটিই নদী বটে, চরিত্র তাদের এক নয়। সাগরঘেঁষা বদ্বীপে দাঁড়িয়ে আমাদের জানা আছে, এ অঞ্চলের সব নদীই প্রায় হিমালয়দুহিতা এবং নদীরা এসে মিলেছে বঙ্গোপসাগরে। মধ্যে কত জনপদ, দুই তীরের কত গল্প-আখ্যান, ইতিকথা পাড়ি দিয়ে তার যাত্রা। হয়তো বাংলা কবিতাও জন্মায় কোনো ঝর্ণা লুকিয়ে রাখা পাহাড়ে, সত্যিই কি পাহাড়ে? সেই পাহাড় কোথায়? কবির মাথার মধ্যে? নাকি কবিতা নেমে আসে কবির বুকের ভেতর থেকে? কবির দেহের পাঁজরে কি সত্যি কোনো উপত্যকা নেই? কোনো কোনো কবিতার উৎসভূমি কি চাঁদের আগুনে পোড়া আলুলায়িত চরাচর নয়? কত অভিপ্রায়কে অবলম্বন করে কবিতা নেমে আসে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা হয়তো ইসরায়েলি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মতো, সে তার সীমানা ক্রমশ বাড়াতেই থাকে। কবির অভিপ্রায়, ভালোবাসা। ভালোবাসা তার অধিকার নিশ্চিতকরণ ও সীমানা বাড়ানোর কাজ করতেই থাকবে। ভালোবাসা, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা কবিতা হয়ে নামে। ধাবমান ভালোবাসা কি পাহাড়ের পাঁজরে লুকানো ঝর্ণা? নাকি নদী? কবিই কি জলের ছদ্মবেশে ভালোবাসা হয়ে বহে বহে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র?
কবি বললেন, পুরোটা আকাশ নিয়ে বর সেজে বসে আছি। কবি বললেন, মোহনপুর স্টেশনে আমি দাঁড়িয়ে। সেঁজুতির বীণে পাল দোলে, দুলুক; তিয়াসীর জল তুমিহীনা বছরের ছায়া খেয়ে ফেলে, ফেলুক! মেঘ রোপণ করে বৃষ্টি নামিয়ে নিই। কবি ডাকেন, তীব্র পিয়াসের স্রোতসিনীর মতো, এসো অজর সময়ের মহাকাল, চলে এসো এক কাপড়ে।
কাঁটাবন কনকর্ড এম্পোরিয়াম বইপাড়ার 'কবি' প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে কবি আবদুল্লাহ শুভ্র রচিত কাব্যগ্রন্থ 'চলে এসো এক কাপড়ে'। 'অর্থহীন কিছু অনুভূতি'কে উৎসর্গ করা কাব্যগ্রন্থের প্রায় পঞ্চাশটি কবিতা পাঠ করে এই উপলব্ধিতে পৌঁছানো যায় যে, থই থই ভালোবাসা কবিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ভালোবাসা তাকে ঘুরিয়ে মেরেছে, ভালোবাসা তাকে পুড়িয়ে মেরেছে। মেরেছে কি, মেরেই চলেছে। ভালোবাসা কবিকে রিমান্ডে নিয়ে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ভালোবাসার সেই ক্ষমতা আছে। ভালোবাসা তা পারে। কবি আব্দুল্লাহ শুভ্র'র কবিতার ভেতরে সেই রোদ আছে, যেরকম রোদ দেখলেই মনে হয়, বাতাসের প্রান্তে খোদাই হয়েছে অবিরাম, যতবারই বুক ফুঁড়ে আসে, ভালোবাসার তীক্ষষ্ট শিসে, খসে পড়েছে হতবিহ্বল আঁধারিয়ার দল, কালো রাতের ঘোমটার মতো, কালো নদীর কোনো উপমা নেই। কল্লোলের নন্দন মন্থনে, খোঁপার অচেনা জ্বলনে যতবারই এ হৃদয়ে আস্ম্ফালন, আমার সাঁঝবাতির চিড়ল প্রেমে জেগেছে সহসা প্রমাণ। কেন না, জলের ভাঁজে জল সাজে, কল্লোল বলে গাঙ, বুকের ভেতর সানাই বাজে, মায়ার তালে সাঙ... কিংবা, কেউ শোনে না, কিছু বোঝে না, মৃত হয়ে দেখি নিজের বিদগ্ধ অবয়ব! তোমার শরীরেই মেখে আছি নতুবা তুমি মেখে আছো...। প্রেম অনুষঙ্গ হিসেবে আবদুল্লাহ শুভ্র'র কবিতায় প্রভাবশালী। আছে যাপিত জীবনের নানান অনুভূতি, অনুভূতির ক্ষত, ক্ষত থেকে উপশম পাবার এষণা। 'চলে এসো এক কাপড়ে' কাব্যগ্রন্থের কবিতায় রোমান্টিসিজমই মৌল তাড়না হিসেবে প্রতিভাত। খাটখোট্টা নাগরিক বাস্তবতার মধ্যে থেকেও এসব কবিতা পাঠককে হয়তো নিয়ে যাবে এমন এক নির্জন বনভূমির ধারে, যেখানে প্রবাহিত প্রসন্ন বিকেল, পাড়া গাঁর পাখিরা হয়তো বাঁশবনে ফেরার গল্পে ব্যস্ত, সেখানে কি ভালোবাসা এসে দাঁড়িয়ে নেই? সন্ধ্যা নামার একটু আগে কি কবিতাও মাঠপথের আলের ধারে ঝিঙেফুলের মতো হলুদ বর্ণে জ্বলে ওঠেনি?
কবিতা পড়তে গেলেই নানারকম অনুভূতিতে পৌঁছয় পাঠক। অনুভূতিই কবিতার প্রধান জারক। সেই অনুভূতিকে ধরতে উপস্থিত হয় শব্দ। শব্দ আরেকটি শব্দকে আমন্ত্রণ করে। আমন্ত্রণ চলতেই থাকে। বাক্য দাঁড়িয়ে যায়। ছোট বাক্যেরা সারিসারি অবস্থান গ্রহণ করে, মনে হয়, অনুভবের তাপমাত্রায় গঠিত কিছু বাক্যের ঝুপড়িঘরই কবিতা। সেই ঝুপড়িঘর পাঠককে ডাকে, ঔদাসীন্যে বসিয়ে রাখে। ভালো লাগে। ভালো লাগে বলেই আমরা বেঁচে থাকি, আরও বাঁচতে চাই। আরও ভালোবাসতে চাই। তাই ক্রমশ আমরা কবিতার কাছাকাছি হতে থাকি।
কবি আবদুল্লাহ শুভ্রকে স্বাগত জানাই বিস্তৃত বাংলা কবিতার পাঠকভুবনে। আশা করি, উত্তরোত্তর রচনার মধ্য দিয়ে তিনি তার স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তৈরিতে আরও আগ্রাসী মনোযোগ রাখবেন। আর আজকের জীবন-যাপনের চাপে ঘায়েল হয়ে থাকা আধুনিক মানুষের জন্যে তিনি এইভাবে রোমান্টিসিজমের জাল বুনবেন, যাতে আমরা আটকা পড়ি, ভালোবাসার জালে যেন আটকা পড়ি।