কিছু ঘটনা এবং কিছু মানুষের সংস্পর্শ- এ বিষয়গুলোই আমাকে আজকের পর্যায়ে আসতে সাহায্য করেছে। শুধু ঘটনা বা শুধু মানুষ নয়, দুটো মিলিয়েই একজন শিল্পী তৈরি হয় বলে আমার বিশ্বাস। আগে কিছু ঘটনার কথা বলি।
শৈশব থেকেই সৌন্দর্যের প্রতি অন্য ধরনের এক আকর্ষণ ছিল আমার। সুন্দর কিছু দেখলেই সেটা আমাকে খুব টানত। ছেলেবেলায় এমন একটা বিষয় ছিল রথমেলা। আমি পুরো বছর অপেক্ষা করে থাকতাম কবে রথমেলা আসবে- আমি কিছু পুতুল কিনে আনবো, নতুন নতুন কী কী জিনিস মেলায় এলো সেগুলো দেখবো। তারপর দুর্গাপূজার সময় আমাদের পাড়ায় প্রতিমা তৈরি হতো। আমি স্কুলে যাওয়া-আসার সময় প্রতিদিনই কারিগররা যে প্রতিমা বানাচ্ছে সেটা খুঁটে খুঁটে দেখতাম। এটা একটা নেশার মতো ছিল আমার। এছাড়া আমি বইয়ের অলঙ্করণ খুব পছন্দ করতাম। প্রাণেশ মন্ডল, হাশেম খান- এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা অলঙ্করণ থাকতো বইগুলোতে। বইয়ে আঁকা ছবিগুলো গোগ্রাসে গেলার মতো করে দেখতাম। আমার বড় ভাই, তিনি আমার দুই বছরের বড়। প্রতি বছরই নতুন বই পেতাম- তারও নতুন বই, আমারও নতুন বই। বড় ভাইয়ের বইয়ের ইলাস্ট্রেশন দেখতে চাইলে তিনি আমার কাছ থেকে কখনো কখনো কিছু আদায় করে নিতেন!
কিছু কষ্টও পেয়েছি শৈশবে। এখন মনে হয়, এই কষ্টগুলো না পেলে আমি বোধহয় শিল্পী হয়ে উঠতে পারতাম না। সে কথায় পরে আসছি। তো, বইয়ের ইলাস্ট্রেশন দেখা আমার অনেকটা নেশার মতো হয়ে উঠলো। আমি পাবলিক লাইব্রেরিতে যাওয়া শুরু করলাম। কারণ, সেখানে নতুন আসা বই এবং শিশুদের বইয়ে আঁকা ছবিগুলো দেখা যেতো। প্রতুল চন্দ্র বলে একজন শিল্পী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের, ছোটদের বইয়ে খুব চমৎকার অলঙ্করণ করতেন তিনি। এছাড়াও নারায়ণ সান্যাল, রথিন মৈত্র- তাদের কাজও আমার খুব ভালো লাগতো। লাইব্রেরিতে 'মেঘদূত' কাব্যগ্রন্থটিও ছিল, এখানে কবিতার সংখ্যা কম হলোও বইজুড়ে ছিল খালেদ চৌধুরীর আঁকা দারুণ সব ইলাস্ট্রেশন, এগুলোও আমাকে খুব টানতো। প্রায় প্রতিদিনই একবার করে এই অলঙ্করণগুলো দেখতাম। রামায়ণ-মহাভারত পড়া হতো আমাদের বাসায়। রামায়ণের মধ্যে কিছু ছবি ছিল রবি বর্মার আঁকা। রবি বর্মা তখনকার আমলে খুব বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন। তখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, সে সময় আমি কত বকা যে খেয়েছি মায়ের, কারণ কেন আমি স্নান না করে রামায়ণ ধরেছি, কেন আমি বইয়ের পাতা ওল্টালাম। কিন্তু সব বকা উপেক্ষা করেও আমি রামায়ণে রবি বর্মার আঁকা ছবি দেখতাম। একদিনে কতবার যে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই, বারবার দেখতে মন চাইতো। ছবি এবং গল্প মিলে মনে এক আবহ তৈরি হতো। কল্পনাগুলো হাওয়ায় ভাসতো আর প্রসারিত হতো। প্রকৃতি দেখার জন্য ঈশ্বর আমার চোখে যেন রাক্ষুষে তৃষ্ণা দিয়ে দিয়েছেন। ট্রেনে, বাসে চড়ে কোথাও যেতেও আমি কখনো জানালার কাছে ছাড়া বসতে চাইতাম না।
আমাদের ওখানে তখন সিনেমা হল ছিল একটা। হলের বাইরে টাঙানো থাকতো সিনেমার পোস্টার। এই পোস্টারগুলো দেখতেও ভালো লাগতো। এছাড়া সে সময় চমৎকার কিছু ক্যালেন্ডার আসতো, সেই ক্যালেন্ডারে হেমেন মজুমদার এবং রবি বর্মার ছবি থাকতো। এগুলোও আমাকে টানতো অনেক। ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছবি আর জিন্নাহ, কবি ইকবালের ছবি। এসব ছবি বা ইলাস্ট্রেশন বাসায় বসে আঁকার চেষ্টা করতাম।
যে ঘটনায় দুঃখ পেয়েছিলাম সেই কথাটা বলি এবার। তখন প্রাইমারিতে পড়ি। তৃতীয় শ্রেণির স্কুলে পরীক্ষা শুরু হলো। বলে রাখা ভালো, আমাদের আর্টের কোনো শিক্ষক ছিলেন না। যিনি অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন তিনি আর্টের ক্লাস নিতেন। তো আর্টের পরীক্ষার দিন এলো। অঙ্কের স্যার বোর্ডে আঁকাবাঁকা করে একটা পেঁপে আঁকলেন। আর একটা বইকে বোর্ডে ধরে চারদিকে চক দিয়ে রেখা টেনে বললেন, এই দেখো, একটা বই হয়ে গেলো। এটার বাঁ দিকের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে ডান দিকের দৈর্ঘ্য সমান আবার ওপরের দিকের সঙ্গে নিচের দিকের প্রস্থ সমান- এমন করেই বই আঁকতে হয়। এগুলো আঁকতে বললেন। স্যার যেভাবে বই আঁকতে বললেন, কাগজে আমি সেভাবে বই আঁকতে গিয়ে বেশ বিপদে পড়ে গেলাম। আমি কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। বারবার মাপ দিচ্ছি স্কেল দিয়ে উপরে নিচে সমান আছে কিনা, ডানে-বাঁয়ে সমান আছে কিনা। সবই তো ঠিক আছে কিন্তু বইতো আমার মনের মতো হচ্ছে না! বারবার আঁকা-মোছায় আমি কাগজই ছিড়ে ফেললাম। শেষে আমি কেঁদেই ফেললাম। এ অবস্থা দেখে স্যার খুব বকলেন আমায়। আমি দুঃখ পেয়েছিলাম স্যারের বকা শুনে নয়, দুঃখ পেয়েছি এই ভেবে যে, আমি তো আঁকতে পারি, ইলাস্ট্রেশন দেখে বা কোনো ছবি দেখে সেটি এঁকে ফেলতে পারি কিন্তু এই সামান্য বই আঁকতে পারছি না! এটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিল। এখন মনে হয় এই কষ্টটা আসলে আমাকে শিল্পী হয়ে উঠতে বেশ সাহায্যই করেছে।
আরেকটা ঘটনা, আমি তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন 'অশ্বপৃষ্ঠে সুলতানা রাজিয়া'- এই ছবিটা বই থেকে দেখে দেখে এঁকে ফেলেছিলাম। মজার কথা হলো, এই ছবি এঁকে আমি বিপদেই পড়লাম, কারণ কেউ বিশ্বাস করতে চাইছিল না যে, এটা যে আমি এঁকেছি। আমার ক্লাশমেটদের বিশ্বাস করাতে গিয়ে কমপক্ষে পঞ্চাশটা ছবি আঁকতে হয়েছিল!
ফেনী শহরের উপকণ্ঠেই ছিল আমাদের বাসা। ছবি আঁকায় কিছুটা নাম-ধাম হয়েছে আমার তখন। বাসার পাশেই ছিল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। সেখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষকরা আসতেন ট্রেনিংয়ের জন্য। এক বছরের আবাসিক ট্রেনিং হতো তাদের। তাদের কিছু উপকরণ ছিল যেমন- আম, কলা, পেঁপে, ফুল, পাতা, পাখি ইত্যাদি। আমি তাদের সেই উপকরণগুলো আঁকতে সাহায্য করতাম। এই কাজের জন্য আমি সেখানকার শিক্ষকদের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম। সেখানে তখন একটা ঘটনা ঘটে। আমি তখন একরামুল নামে একজন টিচারকে পেলাম। তিনি আমার চিন্তায় একটা বিরাট পরিবর্তন এনে দিলেন। সেটা কীভাবে? আমি এতদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে সব নেতিবাচক কথাই শুনে এসেছি। তার গান শুনলে ঘুম আসে, তিনি নানা কৌশল করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একরামুল স্যার রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে আমার কাছে উপস্থাপন করলেন। তার কবিতা পড়ে শোনাতেন আমাকে। 'বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা' বা 'দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশির বিন্দু'- এমন অনেক কবিতা আমাকে পড়ে পড়ে বোঝাতেন। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গের মতো আমারও স্বপ্ন ভঙ্গ শুরু হলো। আমার মনে হতে লাগলো, আসলেই তো এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। রবীন্দ্রনাথের 'কৃষ্ণকলি' কবিতাটি স্যারের মুখে শুনে তখন আমাকে এমনভাবে নাড়া দিল, যার প্রভাব আমাকে এখনও আবিষ্ট করে রেখেছে। আমি এখনও গাঁয়ে গেলে আমাদের গ্রামীণ জীবনের মধ্যে নন্দনতাত্ত্বিক দিকগুলো খুঁজে বেড়াই। একরামুল স্যার আমাকে ধরিয়ে দিলেন কীভাবে সাহিত্যের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, কীভাবে চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে বিষয় খুঁজে নিতে হয়, কীভাবে চোখ বন্ধ করে দেখতে হয়, কীভাবে একটি স্বাভাবিক বিষয়কে অন্যভাবে দেখতে হয়। এই ঘটনা আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল নিঃসন্দেহে।
আরেকটি কথা বলি, আমাদের বাড়িতে নিজেদেরই গরু ছিল। প্রতিদিন নিয়ম করে বিকেলবেলা গরু মাঠে চরাতে নিয়ে যেতাম। গরুকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে আমি একটা খেলা খেলতাম। সেই খেলা তখন যদিও আমার কাছে শুধুই খেলা ছিল কিন্তু এখন মনে হয়, এটা আসলে ছিল বিমূর্তধারার এক শিল্পখেলা। খেলাটা খেলতাম গরুর দড়ি নিয়ে। আমি দড়িটা মাঠের মধ্যে ছুড়ে মারতাম। দড়িটা মাঠের মধ্যে পড়ে একটা ফর্ম তৈরি হতো। এই ফর্মগুলো কখনো আমার কাছে ফুলের মতো, প্রাণীর মতো মনে হতো কিংবা কখনো কিছুই মনে হতো না, শুধুই সুন্দর লাগতো। আমি গড়নগুলো পুনরায় তৈরির চেষ্টা করতাম কিন্তু কখনোই একটা আগেরটার মতো হতো না। এই খেলা আমার বিকেলের সময় কাটানোর একটা দারুণ মাধ্যম ছিল। সর্বোপরি এটা আমার মধ্যে সৌন্দর্য এবং বিমূর্তবোধের জন্ম দেয়। এসবও হয়তোবা আমাকে পরবর্তী সময়ে শিল্পী হতে অনেক সাহায্য করেছে।
আরেকটা মজার কথা না বললেই নয়। আমার কৈশোর বয়সেই আমাদের এলাকায় একবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তখন তো পোস্টার, ব্যানার সবই হাতে আঁকা হতো। এলাকার এক কমিশনার ধরলেন তার নির্বাচনের সব প্রচারণামূলক কাজ আমাকে করে দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা বাধলো, তার নির্বাচনের প্রতীক নিয়ে। তার প্রতীক ছিলো গরুর গাড়ি! আমি অনেক কিছুই এঁকেছি কিন্তু গরুর গাড়ি তো কখনো আঁকিনি। আঁকাটা সহজও ছিল না। বেশ মুশকিলেই পড়ে গেলাম। তবু চেষ্টা করতে তো দোষ নেই। দুরুদুরু বুকে শেষ পর্যন্ত গরুর গাড়িও এঁকে ফেললাম। এবং তার যত পোস্টার, ব্যানার হয়েছিল সবই হাতে আঁকতে হয়ছিল আমাকে। এখন মনে হয় ওই পরীক্ষায় সে যাত্রায় ভালোভাবেই উৎরে গিয়েছিলাম।
কৈশোরকালে আরেকজন মানুষ আমার জীবনে এসেছিলেন, তাকে দেবদূতই বলা দরকার। তার প্রভাব আমার শিল্পী হবার অন্যতম পাথেয় ছিল। টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হয়ে এসেছিলেন তিনি। তার নাম সুধীন কুমার সাহা। তিনি ঢাকা চারুকলা থেকে পাস করে সেখানে জয়েন করেছিলেন। তিনি আমার ছবি আঁকা দেখে বললেন, তুমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ সব ছবিই মুখস্থ আঁকছো। তুমি এসব না এঁকে উঠোনে যে একটা মানকচুর গাছ আছে কিংবা ওই যে পেছনে পেয়ারা গাছ আছে সেটা দেখে দেখে স্কেচ করো। হাসগুলো আঁকো। পেন্সিল দিয়ে একটা বিষয় দেখে দেখে কীভাবে হুবহু আঁকতে হয় সেটা তিনি আমাকে ধরিয়ে দিলেন। বলা চলে ছবি আঁকার সঠিক উপায় তথা প্রাথমিক ট্রেনিংগুলো আমি তার কাছেই পেয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আমাকে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হতেও সুধীন স্যার বেশ সাহায্য করেছিলেন।
আমি ভাগ্যবান এজন্য যে, এ সময় এলো মহান মুক্তিযুদ্ধ, যার চেতনায় বিধৌত হয়ে জীবনকে বিশুদ্ধভাবে বুঝতে শিখেছিলাম। ১৯৭৪ সালে চারুকলায় ভর্তি হতে পারলাম না, কারণ তখনকার সময় বেশ দুর্ভিক্ষউন্মুখ ছিল। পরিবার থেকেও সায় পাইনি। যাই হোক, ১৯৭৫ সালে এসে চারুকলায় ভর্তি হলাম। সুধীন স্যার আমাকে একটা চিঠি লিখে দিলেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী স্যারকে দেওয়ার জন্য। আসার আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমার কিছু কাজ নিয়ে যেও স্যারদের দেখাতে পারবে। সমরজিৎ স্যারের সঙ্গে আমার নামের মিল আছে আর তিনি আমার কাজ দেখে খুব খুশিও হয়েছিলেন। তখন তো এখনকার মতো এত প্রতিযোগিতা ছিল না, কড়াকড়িও ছিল না। সমরজিৎ স্যার আমাকে পরীক্ষা দিতে বললেন। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখলাম, আমি অনেকের চেয়ে ভালোই ছবি আঁকি। পরীক্ষার সময় একটা সাবজেক্ট ছিল, টবের মধ্যে একটা পাতাবাহারের ডাল, সেটা দেখে দেখে আঁকতে হবে। একজন স্যার বললেন, আঁকা শেষ হলে পাতার মধ্যে লাইট শেড দাও। কিন্তু লাইনের মধ্যে শেড দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। সুধীন স্যারও আমাকে কখনো দেখিয়ে দেননি লাইনে মোটা চিকন করে কীভাবে শেড দিতে হয়। স্যার বুঝতে পেরে বললেন, যেভাবে এঁকেছো সেভাবেই রাখো। আমি পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিলাম। ভর্তিও হয়ে গেলাম চারুকলায়। ক্লাস শুরু করতে আসার পর স্যাররা এবার বেশ কড়া গলায় বললেন, 'তোমরা একেকজন মফস্বল শহরের বড় বড় আর্টিস্ট, অনেক পুরস্কার-টুরস্কার জিতে এসেছো, কী করেছ, না করেছ সব ভুলে যাও, যেন কিছুই জানো না এমনটা ভেবে আবার শুরু করো!' এখানে আসার পর স্যাররা আমার কাজের ভুল ধরতে লাগলেন, আমি যে একটা শহরের একজন বড় শিল্পী ছিলাম, এখন আমারও সবই ভুল মনে হতে লাগলো! বলা চলে, প্রায় নতুন করেই ছবি আঁকা শুরু করলাম। চারুকলায় প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষ শেষে তৃতীয় বর্ষে এসে একটি নির্দিষ্ট সাবজেক্ট বেছে নিতে হয়। আমি ওরিয়েন্টাল আর্ট নিয়ে পড়তে চাইলাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য এ ডিপার্টমেন্টের প্রায় সব শিক্ষক উচ্চতর শিক্ষার জন্য সে সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। আমি তিন মাসের মতো ক্লাস করলাম ওরিয়েন্টাল আর্টের ওপর। সেখানে কোনো শিক্ষক আমি পেলাম না, কেউ এসে আমাকে শিখিয়ে দিচ্ছে না বা ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে না। আমাদের ইয়ারের অন্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা এসে মজা করে আমাকে বলতো, ওরিয়েন্টাল আর্ট শিখে শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কোনো পুরুষ মানুষ আঁকা শিখতে পারবে না তুমি। আমি সত্যিই বেশ হতাশ হয়ে পড়লাম। তখন একটা সুযোগ আসে, আমাদের এক বন্ধু যে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং সাবজেক্ট নিয়েছিল সে ব্যক্তিগত কারণে চারুকলা ছেড়ে দেয়। আমি তার শূন্যস্থানে আসবার জন্য আনোয়ার স্যারকে ভীষণ করে ধরলাম। এই তিন মাসে যা কাজ হয়েছে সেটা করে দেবার শর্তে তিনি রাজি হলেন এবং আমি ডিপার্টমেন্ট বদলে ফেললাম। এটা আমার শিল্পীজীবনে খুবই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল বলে মনে করি।
আমার শিল্পীজীবনে আরেকটি আলোকসম্পাতের কথা বলতেই হয়। সেটা হলো, কর্মজীবনে এসে শিল্পী কামরুল হাসানকে পেয়ে যাওয়া। তিনি হস্তশিল্প ডিজাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, শিল্পবিপ্লব তথা যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার ফলে আমাদের দেশে যে কুটিরশিল্প এবং লোকশিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করা। লোকশিল্প স্টাডি করার জন্য আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে পালবাড়ি, নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন লোকশিল্প-সংশ্নিষ্ট মানুষদের খুঁজে খুঁজে বেড়াতাম। তাদের কাজ দেখতে হতো, ওদের সংশ্নিষ্ট কাজের মধ্যে রেখেই নতুন কোনো নকশায় সম্পৃক্ত করা এবং উপার্জনের ব্যবস্থা করা যায় সেটা আমাদের ভাবতে হতো। শিল্পী কামরুল হাসানে তার চিত্রকর্মেও বাংলার লোকজধারাকেই বিষয়বস্তু করে তুলেছিলেন। এটা আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য যে আমি শিল্পী কামরুল হাসান স্যারকে কর্মজীবনে পেয়েছিলাম, তার কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে যেতাম, কামরুল হাসান স্যার যখন একটা পাতা, ফুল বা পাখি আঁকতেন সেটার মধ্যেও বাঙালিত্ব নিয়ে আসতেন। কাইয়ুম চৌধুরী স্যারের কাজও দেখতাম। তিনি বাংলার ছবিই আঁকতেন কিন্তু তিনি সে ধারার সঙ্গে আধুনিকতাকে যুক্ত করেছিলেন। এস এম সুলতান তার নিজস্ব ধারায় বাংলারই ছবি আঁকতেন, আমার সময়ের প্রতিভাবান এবং প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পীদের কাজ স্টাডি করতাম দিনরাত, এমনটা করতে ভালোও লাগতো আমার। এসব দেখে দেখে আমি আমার নিজের একটা স্টাইল দাঁড় করানোর চেষ্টা করতাম। যেহেতু ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চাকরি ছিল, সে জন্য আমি ছবি আঁকায় তেমন সময় দিতে পারতাম না। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি সে সময় বইয়ের কিছু প্রচ্ছদ আঁকতাম এবং বেশ নাম-ধামও কামিয়েছিলাম!
জিঙ্ক ব্লকে ছাপা ম্যানুয়াল যুগ থেকে এখনকার ডিজিটাল যুগে আসতে গিয়ে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। প্রায় একপ্রকার অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ডিজিটাল পদ্ধতি শিখতে হয়েছে বলা চলে। এখন যা আঁকা হয় তা-ই ছাপা যায়। কিন্তু আমাদের শুরুর সময়ে অনেক পদ্ধতি পার হয়ে সেগুলো ছাপা হতো। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল। এখন যারা কাজ করছে তাদের জন্য কাজগুলো সহজ হয়েছে। এই সহজ হয়ে যাওয়াতে কিছু ক্ষতি যেমন হয়েছে কিছু ভালোও হয়েছে। আমার মনে হয়, এত সহজ হয়ে যাওয়াটা উচিত হয়নি। কেননা, শিল্প মাধ্যমে শিল্পীর হাতের কাজটা বেশি থাকা উচিত। একটু ভেঙে বলি, যেমন জামদানি শিল্পে যে তাঁতি একটা একটা করে সুতো বুনে শাড়ি তৈরি করেন, তার এই কাজে যে দরদ থাকে তার বিপরীতে টেক্সটাইল শিল্পে কম্পিউটারে ঝকঝকে, নিখুত ডিজাইন করে মেশিনে ছাপা হওয়া বিষয়টির মধ্যে সে দরদটা থাকে না বলেই মনে করি। কম্পিউটারের কাজকে কখনো নিজের কাজ মনে হয় না। এখনকার অনেকের মাঝে কম্পিউটারের বিভিন্ন সহজ মাধ্যম ব্যবহার করে চমক দেওয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু হাতে আঁকা একটি পেইন্টিংয়ের যে দরদ, যে মায়া সেটা কম্পিউটারের একটা কাজে থাকার প্রশ্নই আসে না।
মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক এবার বরং। চাকরি করতে করতে একটা সময় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর আমি আর বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকবো না, আর কোনো কমার্শিয়াল কাজ বা চাকরিও করবো না, শুধুই ছবি আঁকবো। এবং সেটা আমি করছিও এখন। এখন আমি শুধুই ছবি আঁকি। আমার আঁকার অধিকাংশ বিষয় গ্রামে কাটিয়ে আসা আমার শৈশবের টুকরো ছবি। যখন ছবি আঁকি তখন আমি যেন আমার মাকে দেখতে পাই। আমার গ্রামকে দেখতে পাই, গ্রামের মাটি, জল, পাটক্ষেত, ধানক্ষেত, নদী, নৌকা, গ্রামের মানুষ চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে। আমি আমার শৈশব যেভাবে কাটিয়ে এসেছি সে সব এখনও আমাকে টেনে ধরে রাখে। আঁকতে গিয়ে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, এ বিষয়গুলো আমি যদি খুব আধুনিকভাবে ছবি আঁকতে চাই তাহলে আমি আর সেই গ্রামকে, গ্রামের মানুষদের পাই না। সে জন্যই আমার ছবি খুব সরল আর মায়ায় ভরা। যে সরলতা আর মায়া আমি শৈশবে গ্রামের মানুষের জীবন-যাপনে দেখেছি সেটাই ছবিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। গ্রামীণ জীবনে হয়তো আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার ছোঁয়া লেগে সেই মায়াটা এখন আর দেখা যায় না। যেটা আমি পেয়েছি আমার মায়ের কাছে, বাবার কাছে, দিদিদের কাছে, আমার শিক্ষকদের কাছে, প্রতিবেশীর কাছে তাই আমার চোখে লেগে আছে। গ্রামে হয়তো এখন আর ঢেঁকি দেখা যায় না, গরু দিয়ে হাল চাষ দেখা যায় না। কিন্তু আমি আমার ছবিতে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সেই আদি ও অকৃত্রিম সারল্যকে ধরে রাখতে চাই। দুর্বোধ্যতা নয়, আমি আমার ছবির দরজা সবার জন্য খোলা রাখতে চাই। যাদের আঁকি, যাদের জন্য আঁকি তারা যেন সহজেই আমার ছবি দেখে বুঝতে পারেন, তারা যেন ছবির আনন্দটা লাভ করতে পারেন, ছবিটা উপভোগ করতে পারেন।

বিষয় : প্রচ্ছদ সমর মজুমদার

মন্তব্য করুন