এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে এই শেষ বয়সে কীভাবে এসে পৌঁছলাম, কথাটা যখন মাঝে মাঝে ভাবি, তখন স্মৃতি হাতড়ে এমন কিছু মনে পড়ে না যা লিখে রাখা কর্তব্য বলে মনে করি।
এটা একটা স্বার্থপরের মতো কথা হয়ে যায় জানি। একজন মানুষের বেড়ে ওঠার সঙ্গে তো থাকে তার পরিবেশ, তার কাছের মানুষজন, তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, কিন্তু ভাগ্যের বিপাকে সেরকম কিছু আমার ছেলেবেলায় ছিল না।
কিন্তু আমার উপায় নেই। জীবনের পথ নির্জন এবং একাকি, এই সত্য মেনে নিতে না পারলে সমুখের দিকে অগ্রসর হওয়া বড়ই কঠিন।
আমার লেখালিখির জীবন কীভাবে শুরু হলো, কার অনুপ্রেরণায়, সেটি বলতে গেলে ছেলেবেলা থেকে শোনা কিছু গান, কিছু কবিতা, কিছু আবৃত্তির কথা মনে পড়ে। সেইসব গান কথা আবৃত্তি আমাকে নিশ্চয় মনে মনে আন্দোলিত করত, রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে কখনোবা সেইসব গান কথা আবৃত্তি মনে পড়লে আন্দোলিত হতো শিশু শরীর, ঘুম পাড়ানোর সময় মা কোনো কোনো রাতে সুর করে ছড়া বলতেন, অজস্র ছড়া জানতেন মা, অজস্র গল্প বলতেন, কখনওবা গরিবের দুঃখ অভাব বা লাঞ্ছনার কথা বলতেন, এসব কথা, ছড়া, গরিবের দুঃখ, মনে দোলা দিত।
ছিলাম খুব অন্যমনস্ক একটি শিশু। আপন ধেয়ানে বসে থাকতে পারতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
স্কুলের আপা আমার বড় বোন রিজিয়া খাতুনকে ডেকে একদিন বললেন, তোমার বোন খুব বুদ্ধিমতী কিন্তু বড় অন্যমনস্ক!
পূর্ণিমাদির সেই অভিযোগ শুনে আমার মনে মনে খুব রাগ হয়েছিল। না, আমি অন্যমনস্ক ছিলাম না, আমি চিন্তা করতাম! কত রকমের যে চিন্তা করতাম সেটা আমি কাউকে বোঝাতে পারতাম না।
তবে আমার ছেলেবেলায় দু-একজন বন্ধু আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, সে কথা এখন নির্দি্বধায় বলা যায়।
সত্যি কথা বলতে, আমাদের বাড়িটি ছিল একটি চড় মাতালে বাড়ি। বাড়িতে নিয়মকানুন শৃঙ্খলা বলতে সেরকম কিছু ছিল না। যেজন্য অনেকটা একগুঁয়ে একজন মানুষের মতো বড় হয়ে উঠেছিলাম।
আমার মা সারাদিন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন। আর বাবা ভোর থেকে বাড়ি ছেড়ে উধাও। ফিরতেন সেই অনেক রাতে। বাবা রাগি ছিলেন বলে বাড়ি না থাকলেই আমরা খুশি থাকতাম।
ভোর না হতেই মায়ের চোখের আড়ালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তাম হাটে। সপ্তাহে দু'দিন হাট বসত। শনি ও মঙ্গলবার। হাট ছিল বাড়ির ৫০০ গজের ভেতরে। সেখানে আমি ও আমার মতো দুষ্টু কতকগুলো ছেলেমেয়ে রাতের বেলা হাটুরেদের ফেলে যাওয়া নানারকমের হাবিজাবি কুড়িয়ে মস্তবড় এক সম্পদের মালিক হয়ে বাড়ি ফিরতাম! আমার কোচড়ে থাকত হাটে ফেলে যাওয়া ভাঙা চিরুণি, একটা-দুটো বেঢপ সাইজের কাচের চুড়ি, ভাঙা আয়না, মাথার চুলের ক্লিপ, ছেলেদের দাড়ি কামাবার ক্ষুর, একটা-দুটো টুকরো সাবান, আর অজস্র কুড়িয়ে পাওয়া পাকা পটল, পাকা লাউ, আধা সবুজ করোলা, লম্বা ডাঁটিঅলা লাল বেগুন, এইসব।
জামা কাপড়েরও কোনো ছিরিছাঁদ ছিল না। হাফ প্যান্টের ওপরে মায়ের হাতাঅলা লম্বা ব্লাউজ পরে চলে যেতাম। এবং বাড়ি ফিরে এসে মায়ের উত্তমমধ্যম খেতাম। এটা ছিল নিয়ম মাফিক একটা মার খাওয়া।
বাড়িতে সময় কাটাবার কোনো কারণ ছিল না। বাড়িতে না ছিল বই, না ছিল খেলনা, না ছিল উপযুক্ত জামাকাপড়, না ছিল তেমন পরিবেশ।
তবে যা বাড়িতে ছিল, তা ছিল আবার অনেক মধ্যবিত্ত বাড়িতেই অনুপস্থিত। অঢেল, অজস্র খাবার। যত ইচ্ছে খাও ও যত ইচ্ছে ফেল।
আবার মাঝে মাঝে কোনো খাবারই নেই!
তো এই পরিবেশে একজন লেখক হয়ে উঠলাম কীভাবে? কে আমাকে লেখক হতে অনুপ্রাণিত করল?
এ বিষয়টা সব লেখকের জীবনেই যে রহস্যাবৃত থাকে তাতে সন্দেহ নেই। নইলে এগারো ভাইবোনের ভেতরে, একই পরিবেশে থেকে, একজন লেখক হয়ে ওঠে কী করে?
বিশেষ করে যে বাড়িতে একটি কাঠের রেহেলের ওপরে সযত্নে রক্ষিত একমাত্র পবিত্র কোরআন শরিফ ছাড়া আর কিছু ছিল না?
ব্যপারটা একটু আশ্চর্যের।
তবে ছিল স্কুল। স্কুলটার নাম ছিল এমএসটিপি গার্লস হাই স্কুল। এটি ছিল কবি মাইকেল মধুসূদনের নামে গড়ে তোলা স্কুল। আর এই স্কুলের দোতলায় ছিল বিশাল একটি লাইব্রেরি। লাইব্রেরি ভর্তি ছিল বই। টিফিনের সময় কাচের জানালায় নাক ঠেকিয়ে দেখতাম থরে থরে বইয়ের সারি। লোভাতুর চোখে সেই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু কোনো দিন লাইব্রেরি খুলে বই আমাদের দেওয়া হতো না। ওই স্কুলে ১০ বছর পড়েছিলাম, তার ভেতরে মাত্র একদিন আমি লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে অনুমতি পেয়েছিলাম। বছরে একবার সেই লাইব্রেরি খুলে ঝাটপাট দেওয়া হতো।
তো তারপরও আমি বড় হয়ে এরকম দিনরাত্রির লেখক হলাম কী করে?
প্রথম কথা, ছিলাম একটি মেয়ে বাচ্চা, তার ওপর ছিলাম হাবলা টাইপের। বাড়িতে মা সর্বক্ষণই রান্নাঘরে। মায়ের সঙ্গে গল্প করতে হলে রান্নাঘরে বসেই গল্প হতো। আর মা বলতেন, এখন যা, এখন আমি কাজ করছি। আমি আমার বড় বোনের কাছে কাছে থাকতাম। তাকে উত্ত্যক্ত করতাম। সে তাতে বিরক্ত হতো। কারণ সে আমার চেয়ে পাঁচ-ছ' বছরের বড় ছিল।
আমি তখন বাড়ির ভাড়াটেদের কাছে ভিড়তাম। আমাদের বাড়ির পেছনে অনেক বড় জমি ছিল। জমির চারদিক ঘিরে ছিল নারকেল গাছ। সেখানে সারি সারি ভাড়াটেদের ঘর ছিল। তাদের কাছে গিয়ে বায়না ধরতাম। গল্প বলো, গল্প বলো। তারা অধিকাংশই সাধারণ গৃহিণী। লেখাপড়া ক্লাস থ্রি-ফোর। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, প্রত্যেকেই ছিল রূপকথার গল্পের ডিপো। সন্ধ্যেবেলা তাদের ঘরের সামনে উঠোনে পাটি পেতে বসে তারা গল্প শোনাত আমাদের মতো বাচ্চাদের।
আমাদের ঘিরে থাকত নারকেল গাছের সারি। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ উঁকিঝুঁকি দিত, এর চেয়ে রোমান্টিক পরিবেশ আর কী হতে পারে?
দিনের বেলাতেও এইসব রূপকথার খোঁজে আমি রাস্তা,বাজার চষে বেড়াতাম!
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনো ছেঁড়া কাগজ বা বিস্কুটের ফেলে দেওয়া প্যাকেট বা বাদাম বা তেলে ভাজার ঠোঙা কুড়িয়ে পেলেই তাদের গা দুই চোখ দিয়ে যেন লেহন করে দেখতাম কোনো গল্পের হদিস পাওয়া যায় কিনা! এইভাবে কাগজ কুড়োতে কুড়োতে খাটের নিচে একটা বস্তা করে ফেললাম! এখন কেউ আমাকে সেরকম দেখলে ঠিক 'সিজোফ্রেনিয়া' রোগী বলে বসত।
একটু বড় হতেই সামনের বাড়ির কাকিমার পাছ ধরলাম। তিনিই আমার গল্পের জগতে একজন উদ্ধারকর্তা।
কাকাবাবু ছিলেন যশোর কোর্টের উকিল। অনেক বড় বড় বই পড়তেন। কালো কোট পরে কোর্টে যেতেন। তার ছিল হাঁপানির রোগ। নাম ছিল রনজিৎ বসু উকিল। তাঁর তিন-চারজন ছেলেমেয়ে ছিল। তার ভেতরে স্বাগতা দিদি অন্যতম।
কাকিমা ও কাকাবাবুর ছেলেমেয়েরা রোজ সকালে যে যার মতো বাইরে চলে গেলে আমার কাকিমার অখণ্ড অবসর। তিনি তখন গল্পের বইয়ের ভেতরে ডুব দিতেন। আমি তখন কাকিমার হাত নুড়কুড়। কাকিমা অজস্র গল্প বলতেন। আর সেসব গল্প একটাও ছিল না রাজা-রানী বা রাক্ষস-খোক্কসের। এসব গল্প ছিল অদ্ভুত আশ্চর্য সব গল্প। স্বদেশ প্রেমের গল্প। বাঘা যতীন, সূর্য সেন, সুভাষ বসুর গল্প।
'তুমি আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব।' এই বাক্যটি তো আমার কাকিমার মুখেই শোনা।
আমার মায়ের গল্পগুলো ছিল যেন বিষাদে ভরা, কষ্ট আর হাহাকারের, আর কাকিমার গল্পগুলো ছিল যেন আগুনের তাপে টকটকে লাল।
আমার মনের মধ্যে কেমন করে জানি প্রথমে কবিতা পরে গল্প লেখার ঝোঁক চাগিয়ে উঠল। আমি যেন দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই খুঁজে পেলাম গল্প লেখার রসদ। স্কুল না থাকলে দিনরাত বাড়ির কাছের বাজারে ঘুরঘুর করতাম। আমার বাবা-চাচাদের সকলে চিনত এবং ভয় করত বলে কেউ আমাকে কিছু বলত না। আমি সমস্ত বাজার ঘুরতাম আর আপন মনে কথা বলতাম। ভাগ্য ভালো যে, আমি ছেলেধরাদের হাতে পড়িনি। আপন মনে কথা বলতে বলতে আমি গড়ে তুলতাম গল্পের নায়ক-নায়িকাদের কথোপকথন। আমার মা আমার অবস্থা দেখে একবার ভয় পেয়ে ওঝা ডেকে পাঠালেন।
কিন্তু না, ভূতে আমাকে কোনোদিন ধরেনি।
এখন এই বয়সে এসে বুঝি আমি ছিলাম একজন স্কেপিস্ট।
যখন শিশুরা তাদের বাস্তব জগতের নিষ্ঠুর এবং অমানবিক ব্যবহারের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়, তখন তারা গড়ে তোলে নিজেদের এক কল্পনার জগৎ।
আমার হয়তো সেরকমই হয়েছিল কিছু।
না, সত্যি বলতে স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনোদিন কোনো উৎসাহ পাইনি লেখক হতে, উৎসাহ পেয়েছি কীভাবে ভালো গৃহিণী হবো এবং শ্বশুরবাড়ির মন জুগিয়ে চলব!
এমনকি যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার আগে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত ডোমেস্টিক সায়েন্স না নিয়ে অঙ্ক নিতে চাইলাম, ক্লাসের শিক্ষকরা একযোগে বললেন, উরেবাবা, অঙ্ক নিয়ে কী করবি? ডোমেস্টিক সায়েন্স নিয়ে পড়, ঘর-সংসার ভালোভাবে করতে পারবি!
এতে শিক্ষকদের কোনো দোষ নেই। পঞ্চাশের দশকে দেশ, সময়, সমাজ এবং পরিবার বুঝতে হবে।
বুঝতে হবে তখনকার দিনে একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার ও সমাজে কখনও কোনোদিন তাদের সন্তানদের লেখক হবার কথা চিন্তা করতে পারত না, যা এখনও পারে না। মেয়ে সন্তানদের বেলাতে তো নয়ই।
এসব হচ্ছে সুদূরপ্রসারী সব কাল্পনিক ভাবনা।
সরোজিনী নাইডুর মতো পরিবারে তো অধিকাংশ মেয়ের জন্ম হয় না!
কিন্তু উৎসাহ পেয়েছি সাধারণ সব মানুষদের কাছ থেকে। যারা আমার বুদ্ধির প্রশংসা করতেন। আর আমার অবোধ বাবাকে মাঝে মাঝে দেখতাম রাস্তার সামনে একটা চেয়ারে বসে থাকতেন এবং তাঁর বন্ধুদের ডেকে দেখাতেন, এই যে, কই যাও, দেখে যাও, আমার মেয়ে কেমন পদ্য লিখেছে!
আমি তখন বড় হয়েছি। এবং বাবার ব্যবহারে লজ্জায় মরে যেতাম। সেই বাবাই আমাকে বিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়তে দেননি। জোর করে মেডিকেলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন।
সেই অবস্থা থেকে লেখক হয়ে ওঠা। ক্রমাগত নিজের বুদ্ধিতে খুঁজে খুঁজে দেশ-বিদেশের সাহিত্যের বই জোগাড় করে পড়া।
তবে আমার রাগি এবং একরোখা বাবা আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি আমার বায়নায় আমাকে ২০ টাকা দিয়ে এক আলমারি ভর্তি সাহিত্যের বই পরোনো জমিদার বাড়ি থেকে কিনে দিয়েছিলেন। কারণ সেই জমিদার সাহেব ভারতে পাড়ি দিচ্ছিলেন। সেই বইগুলো থেকে আমি 'শেক্সপিয়রের' হদিস পাই, রোমিও ও জুলিয়েট পড়ি, পড়ি ম্যাকবেথ ও হ্যামলেট। সেটি ছিল আমার জীবনের এক আবিস্কার।
কোনো দাদা, বাবা, চাচা বা বড় ভাইয়ের নয়, নিজের লাইব্রেরির স্রষ্টা আমি নিজেই হলাম!
তারপর যখন মেডিকেলে এসে ভর্তি হই, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, তখন একেবারে বেভুল। ডাক্তারি পড়তে অবশ্য খারাপ লাগত না। বরং ভালোই লাগত। কিন্তু আরেকটা মন পড়ে থাকত সাহিত্যের দিকে। বই পড়া থামেনি। বা গল্প লেখাও থামেনি। হয়তো সেসব গল্প ছাপার উপযুক্ত ছিল না, তবু লেখা হতো। তখন পর্যন্ত রাজনীতি অসচেতন ছিলাম। বাস্তবের চেয়ে যেন কল্পনার জগতেই বেশি বিচরণ করতাম।
অথচ তখন রাজনীতি অসচেতন থাকার কথা নয়, কারণ তখন ভাষা আন্দোলন হয়ে গেছে, '৬৩ রায়ট হয়ে গেছে, আইয়ুবের সামরিক শাসন শুরু হয়ে গেছে, ছেষট্টির ছয় দফা শুরু হয়ে গেছে, ঘুমিয়ে থাকা বাঙালি জেগে উঠছে।
কিন্তু আমি ছিলাম ঘুমিয়ে!
তারপর কীভাবে যেন একজন লেখকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম! সারাজীবন নিজেই লেখক হতে চেয়েছিলাম, হঠাৎ একদিন তাকিয়ে দেখলাম, আমি লেখক হতে পারিনি, বরং একজন নামকরা লেখকের স্ত্রী হতে পেরেছি! সেই অভিধা আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করল যে, আমি নিজে যে একদিন লেখক হতে চেয়েছিলাম, সে কথাটা যেন ভুলেই গেলাম!
তারপর হঠাৎ একদিন যেন জাগরণ ঘটল। সেই হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো।
আরে, আমি কী করছি?
মনে মনে ভাবলাম।
তারপর পা বাড়ালাম বন্ধুর পথে।
বড় কষ্টের সেই পথ। সংসার, বাচ্চা, বিদেশের হাসপাতালে চাকরি, নাইট ডিউটি, পরীক্ষা, মানসিক টানাপোড়েন।
জীবন বড় বাস্তব এবং সমস্যা সংকুল।
কিন্তু এবার আমি আর একাকি নই, আমার সাথে আছেন এমন একজন যিনি তাঁর নিজের লেখার জন্য সবকিছু ছেড়েছেন।
আমি যখন লিখতে বসে গেলাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তারপরও আরও অনেক ঘণ্টা, তিনি ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে আমার লেখার দরজার সামনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে। বুঝলাম তাঁর খিদে পেয়েছে, বাচ্চারও খিদে পেয়েছে। আমার মনে অপরাধবোধ জমা হওয়ার আগেই তিনি একগাল হেসে বললেন, মনে করো না, আমি তোমাকে এখন লেখা ছেড়ে উঠতে বলছি! সেই তখন থেকে লিখছো তো, তাই দেখতে এলাম!
তারপর একজন অরেকজনকে সহযোগিতা করে চলা। তাঁর কোনো লেখা তৈরি হওয়া মাত্র খুলে না পড়া, ছাপা হওয়ার পর আর দশজনের মতো করে পড়া, আমার কোনো লেখা তৈরি হওয়া মাত্র তাঁকে পড়তে না দেওয়া, ছাপা হবার পরে যদি আমি মনে করি লেখাটা তাঁর পড়ার উপযুক্ত হয়েছে তাহলে তাঁকে পড়ানো, নতুবা নয়। শেষের দিকে একের পর এক যখন বই বেরোতো, আমি আর তাঁকে পড়তে বলতেও অনুরোধ করতাম না, আমার লজ্জা লাগত, যদি তিনি নিজে ইচ্ছে করে কিছু পড়তেন তো পড়তেন, তবে আমার মনে হয় আমার অনেক লেখাই তিনি পড়তেন যখন আমি বাড়ি ছেড়ে সারাদিনের মতো বাইরে চলে যেতাম কাজের জন্য।
তারপর আরও দিন গেছে, যখন তাঁর আর আমার একটার পর একটা বই বেরোচ্ছে! তখন যেন কেউ আর কারও বই পড়বার মতো সময়ও নেই! যেন পড়া নয়, লিখে যাওয়াটাই জীবনের মিশন। একদিন আমি তাঁর লেখা তিন পয়সার জোছনার কথা উল্টোপাল্টা করে বলেছিলাম, আর তিনি রাগ করে বলেছিলেন, তুমি দেখি আমার বইটা মন দিয়ে পড়োনি!
শুনে আমার মনে অপরাধবোধ হয়েছিল। মনে হয়েছিল সত্যি কি আমি তাঁর তিন পয়সার জোছনা মন দিয়ে পড়িনি?
জীবনে বড় ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যেন সে সময়। কেউ কারও দিকে তাকাবারও সময় নেই! তবু এতসব কর্মব্যস্ততার ভেতরেও আমার যেন মনে হতো আমাকে ঘিরে ধরে আছে তাঁর প্রেম। আর আমি ঘিরে ধরে আছি তাঁকে। আমার ছিন্নভিন্ন এলেবেলে মাথায় তিনি পরিয়ে দিয়েছেন একটি সোনার মুকুট, আর সেই গর্বে যেন আমার আর মাটিতে পা পড়ে না!
তবু কত যে আমি মাটি-ঘনিষ্ঠ ছিলাম। কত যে ভয় পেতাম কে না জানি আমার মাথা থেকে মুকুটটা টেনে ছুড়ে ফেলে দেয়। শত্রু তো কম ছিল না!
সত্যি সত্যি তিনি একদিন চলে গেলে ভেবেছিলাম, আমাকে যে অনুপ্রাণিত করে রেখেছিল এতদিন, আমাকে যে টগবগে তরুণী করে রেখেছিল এতদিন, সে তো চলে গেছে। এখন আমার কী হবে? আমি কি আর সেই ঝড়ের মতো করে লিখে যেতে পারব?
এক, দুই, তিন, চার করে একশটার মতো বই আবার হয়ে যাবে?
নাকি, আমি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকব পথের ধুলায় আর লোকে আমার দিকে তাকিয়ে করুণার হাসি হাসবে?
কিন্তু না, সে তো সত্যি চলে যায়নি, চোখের সামনে থেকে চলে গেলেও, দৃশ্যত তার সেই চলাফেরা, কথা বলার স্টাইল, হাসি, ভিড়ের মধ্যে আমার দিকে ফিরে তাকানো, সত্যি তো চলে যায়নি; তা না হলে আমি এভাবে, এতভাবে লিখে চলেছি কীভাবে? আমাকে নিরন্তরভাবে প্রেরণা দিয়ে চলেছে কে? আমাকে সাহস জুগিয়ে চলেছে কে? আমাকে অভয় দিয়ে যাচ্ছে কে? সেই তিন পয়সার জোছনার মানুষটিই তো! আজ আমি তাঁরই তো সাজিয়ে রেখে যাওয়া থরে থরে বইভরা লাইব্রেরিটিতে, সাজিয়ে রেখে যাওয়া দেশ-বিদেশের স্যুভেনির, রবীন্দ্রনাথের বাড়ি থেকে কুড়িয়ে আনা নুড়ি পাথর, বঙ্গবন্ধু, ছোট ছোট নোট খাতায় কবিতার গহিন রাজত্বে, শিলালিপিতে, ডানামেলা পরীর শুভ্রতায়, তাঁরই রেখে যাওয়া চেয়ারের পাশটিতে আরেকটি বাতিল চেয়ারে বসে আমি লিখে যাচ্ছি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, এখন বছরের পর বছর!
তিনি আর আমি তো লিখে যাচ্ছি সেই একইভাবে, সেই আগের মতন করেই তো, তাহলে?