পর্ব-১৯
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
৬ দফা: লাহোর প্রস্তাবেরই প্রত্যাবর্তন
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি ছিল ৬ দফা এবং শেখ মুজিবকে প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো যেহেতু পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেছে, সে কারণে পাল্টা আঘাতটা সে আর সামলাতে পারলো না। সামলাতে না পেরে মূলত পাকিস্তান নিজেকেই নিজে মৃত্যুদণ্ড দিল। কেননা সত্তরের নির্বাচন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে, এই দেশের মানুষ কেবল ৬ দফা, শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করে না- তারা এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে, যার মাধ্যমে এখন স্বাধীনতাটা অবধারিত। এই কারণে অবধারিত যে, ৬ দফা বাস্তবায়ন করাটা ম্যানডেট হয়ে গেছে। আর ৬ দফা বাস্তবায়ন করলে পাকিস্তান থাকে না। অতএব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ঐতিহাসিকতাটা আমাদের বিচার করে দেখা দরকার। এ মামলায় যারা ছিল তাদের প্রত্যেকের নাম আমাদের জানা উচিত। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা উচিত। এ মামলায় অভিযুক্ত যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয় তারা হচ্ছেন- শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন এলএস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সিডিআই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজউল্লাহ, প্রাক্তন কর্পোরাল আবুল বাশার, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, মো. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম এএমসি, ক্যাপ্টেন মো. আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি, ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মো. মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এস.এম.এম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এ.কে.এম তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এএমসি এবং লে. আবদুর রউফ। শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যুক্ত হবার আগে এ ষড়যন্ত্র মামলার যিনি এক নম্বর আসামি ছিলেন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, যিনি সেনাবাহিনী থেকে সরে এসেছিলেন। তিনি একটি সংগঠন দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিলেন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইঙ্গিতবাহী যে, সেই সংগঠনের নামটি কী ছিল? সংগঠনের নাম ছিল 'লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি'। অর্থাৎ, লাহোর প্রস্তাবই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং একে ঘিরে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মূল বাস্তবতা। যে বাস্তবতাই মূলত আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর পাকিস্তান আসলে শুরু থেকে সেই লাহোর প্রস্তাবকেই অমান্য করে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে। ৬ দফা সেই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিকেই চূড়ান্তভাবে সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে আবার। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায় এই লাহোর প্রস্তাবকে অর্থাৎ বাংলাদেশকে পৃথক একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিল। মূলধারার রাজনীতির ৬ দফার পাশাপাশি লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনদের এই 'লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি'র মতো উদ্যোগ তারই সাক্ষ্য বহন করে। যে কারণে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি যে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামক আক্রমণ করে- তাতে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের সাথে সাথে কয়েকজন ব্যক্তিকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খুন করেছিল। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন এই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। ২৬ মার্চ প্রায় ভোর বেলা তার স্ত্রীর সামনে তাকে গুলি করে মারা হয়। এবং তিনি যখন নিহত হচ্ছেন, পাকিস্তানও সেই মুহূর্তেই নিহত হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই ঘটনা লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটিতে লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, সেটিও প্রমাণ করে। আর প্রমাণ করে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে যে দুটি স্বাধীন দেশের কথা বলা হয়েছিল- সেই দুটি স্বাধীন দেশকে একটি দেশ 'পাকিস্তান' করে রাখার দীর্ঘদিনের মিথ্যা ও ছলচাতুরির অবসান হচ্ছে সেদিন।
পাকিস্তানের কাঠামোগত দুর্বলতার আরও কিছু দিক
পাকিস্তানের কাঠামোগত দুর্বলতা হচ্ছে যে, রাষ্ট্র ছিল কেন্দ্রীয়- কিন্তু ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান বলতে যা বোঝায়, সেটি ছিল দুটি অংশে বিভক্ত। এই কাঠামোর সমস্যা নিয়ে কীভাবে উভয় অংশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়? পাকিস্তান কখনও তা পারেওনি। পারেনি কাঠামোর দুর্বলতার জন্যই- কারণ এটি কখনোই একটা রাষ্ট্র ছিল না। আর দুটি দেশকে একটি রাষ্ট্র করা সহজ ব্যাপার নয়। কাঠামোগতভাবে এটি প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীর কোনো দেশেই এটি সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানও সেই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। মূল বিষয়টি হচ্ছে ইতিহাস। পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান দুটো আলাদা ইতিহাস থেকে উদ্ভূত। একটির সূত্র হচ্ছে এক ওপরতলার মানুষের সঙ্গে আরেক ওপরতলার মানুষের বিবাদে, কে লড়াইয়ে জিতে ক্ষমতাধর হবে। অন্যটির সূত্র হচ্ছে কৃষকদের প্রতিবাদ এবং মধ্য শ্রেণির উপরে ওঠার প্রতিবাদ। ১৯৪৭ সালে যে পাকিস্তানটা আসে, তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের ওপরতলা জিতে যায়; কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের যে কৃষক শ্রেণি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা ওপরে উঠতে চাইছে, তাদের যে আকাঙ্ক্ষা- সেটার সমাধান হয়নি। অতএব দ্বন্দ্ব ছিল অবধারিত। যেহেতু ইতিহাস আলাদা এবং ইতিহাস আলাদা বলেই রাষ্ট্র আলাদা।
অন্য যে বিষয়টি ছিল- তা হলো পাকিস্তান একটি প্রতিক্রিয়াশীল [reactive] রাষ্ট্র। প্রতিক্রিয়াশীল এ অর্থে যে, এর সমস্ত চিন্তাভাবনা ছিল ভারতকে কীভাবে আটকে রাখা যায়, সেই বিষয়ে। ভারতও ঠিক একইভাবে মনে করে যে, পাকিস্তানকে কীভাবে দমন করা যায়। অর্থাৎ, উত্তর ভারতের যে পুরোনো দ্বন্দ্ব বা জিন্নাহ আর নেহরুর দ্বন্দ্ব- সেই দ্বন্দ্ব থেকে পাকিস্তান কখনও উঠে আসতে পারেনি। ভারতও পারেনি সে অর্থে। কাশ্মীর যেহেতু ভারতের সাথে পাকিস্তানের ঝগড়া চালু রাখার একটা প্রতীকী ভিত্তি ছিল- সেই ভিত্তিকে রক্ষা করাই হচ্ছে পাকিস্তানের মূল কাজ। এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিন্তু রাষ্ট্রের গ্যারান্টার, সে পাকিস্তানের সরকারের একটি অংশ নয়। সরকারের চেয়েও ওপরে তার অবস্থান। যেহেতু সে রাষ্ট্রকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। অতএব এই পাকিস্তানকে রক্ষা করার দায়িত্বটা কিন্তু সেনাবাহিনীই পালন করেছে। সেই কারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেহারাটা কেমন হবে। এবং সেই চেহারায় যারা পাকিস্তানের আদর্শের সঙ্গে মেলে না তারা বাদ পড়েছে। তারাই পাকিস্তানের শত্রু পরিগণিত হয়েছে। তাই সমস্ত সময়টাতেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি তাদের কাছে ছিল শত্রুর রাজনীতি। পাকিস্তান সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বের হয়ে আসার মতো কোনো কারণও নেই। কারণ কাঠামোগতভাবে পাকিস্তানের যে রাষ্ট্র, তাতে এটা তো নির্দিষ্ট- সেই নির্দিষ্টতাকে সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। ক্ষমতা তারা তৈরি করতে চেয়েছে কিনা, সেটা বলা যায় না। কারণ এমন কোনো প্রচেষ্টা কখনও দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, এখানকার রাজনীতিতে যে ভিত্তি ছিল- সেই রাজনীতির ভিত্তিতে এমন কোনো শক্তি সামনে এগিয়ে আসতে পারেনি, যা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সুবিধা দিয়ে, অর্থ দিয়ে, দালালির মাধ্যমে- কোনোভাবেই এটা করা সম্ভব হয়নি পাকিস্তানের পক্ষে। এবং আমরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বা শান্তি কমিটির লোকদের ব্যাপারে অনেক কিছুই হয়তো বলি- সামগ্রিকভাবে তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, সম্পদ ছিল; কিন্তু সম্মুখ সমরে যখন গেছে, রাজাকাররা কোনো যুদ্ধে জিততে পারেনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। ঠিক তেমনিভাবে পাকিস্তান অর্থাৎ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন যুদ্ধে এসেছে- মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধে জিততে পারেনি, তাদের পক্ষে এ যুদ্ধে জেতাটা অসম্ভব ছিল। এমনকি পাকিস্তানিরা এখন স্বীকারও করে যে, পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের কাছ থেকে সামরিকভাবে রক্ষা করা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার মানে বোঝা যাচ্ছে এটি জন্ম থেকেই একটি অবাস্তব রাষ্ট্র হিসেবে ছিল। অতএব জন্মেই যেটা অবাস্তব- অবাস্তব মৃত্যুই তো তার হবে এবং মৃত্যু তার অবধারিত।
৬ দফার আঘাতে পাকিস্তান আর টিকতে পারেনি
৬ দফা ঘোষিত হলো ১৯৬৬ সালে। ততদিনে রাজনৈতিক নদীতে অনেক পানি গড়িয়েছে। তখন পাকিস্তানপন্থী কোনো মানুষ রাজনীতিতে সক্রিয় অবস্থানে ছিল বলে বলা যাবে না। যারা ছিল, তারা মুসলিম লীগ। তারা আর কোনো অর্থেই সবল নেই। ৬ দফা ছিল একেবারে মৌলিক কাঠামোতে আঘাত। এখানে বলা হচ্ছে- পাকিস্তানের চেহারা-চরিত্র এমন এমন হওয়া দরকার। অর্থাৎ পাকিস্তানের কাঠামোকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে ৬ দফার মাধ্যমে। ১৯৪৭ থেকে '৬৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের যে চেহারা- তাতে যখন আঘাত করা হচ্ছে, তখন এটা আসলে গোটা রাষ্ট্রের ওপরে আঘাত। এবং সেই আঘাতটাকে পাকিস্তানের পক্ষে গ্রহণ করা, মেনে নেয়া কিংবা এ নিয়ে সমঝোতা বা আলাপ-আলোচনা করাই আর সম্ভব না তখন। কারণ পাকিস্তানের মূল শক্তি যেই সেনাবাহিনী- সেই সেনাবাহিনীকেই এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান এবং ভারত উভয়ই যেটা করতে চায় না- সেটি হচ্ছে ফেডারেশন। ৬ দফার সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎও যদি দেখি- তা হচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ফেডারেশন। সেই ফেডারেশন তো পাকিস্তান মানতে পারলো না। তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পাকিস্তান কেবল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র হিসেবেই টিকতে পারত। ৬ দফা তার সেখানেই আঘাত করলো। ৬ দফা বলছে যে, এই রাষ্ট্র এভাবে আর চলতে পারে না। আর এই রাষ্ট্রের প্রধান ধারক তো হচ্ছে সেনাবাহিনী। সুতরাং সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প পথ নেই পূর্ব পাকিস্তানকে আক্রমণ করা ছাড়া, ৬ দফাকে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে আক্রমণ করা ছাড়া। ৬ দফার সঙ্গে পাকিস্তানের সমঝোতা অসম্ভব ছিল বলেই কাঠামোগতভাবে পাকিস্তান আর টিকতে পারেনি।
আমাদের দফাভিত্তিক রাজনীতির ইতিহাস ও স্বাধীনতা
যদি দফাভিত্তিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ইতিহাস দেখা হয়, এটা পরিস্কার হয়ে যাবে যে, এই দ্বন্দ্বটা ছিল দীর্ঘদিনের। এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের এই দ্বন্দ্বটা সৃষ্টি হয়েছে তাদের আর্থসামাজিক কারণেই। যে কারণে বারবার তারা আঘাত করছে, বারবার তাদের সঙ্গে যে রাষ্ট্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে- তাকে তারা বারবার বোঝাচ্ছে যে, এইরকম রাষ্ট্র আমার প্রয়োজন। কৃষক বিদ্রোহ যেমন সাংঘর্ষিক; কিন্তু কৃষক বিদ্রোহ একই সাথে বলছে যে এই ব্যবস্থায় কৃষকদের জীবনটাকে আর পরিচালনা করা চলবে না। এটা দফার মধ্য দিয়েই বলা হচ্ছে। ১৭৯৩ সালের আগে যে বিদ্রোহ হয়েছিল, তার মধ্যেও দফা দেয়া হতো যে, এগুলো করা যাবে, এগুলো করা যাবে না, এভাবে খাজনা নেয়া যাবে না ইত্যাদি। অতএব আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে পড়তে হলে এই দফাগুলোর ইতিহাসটা দেখা দরকার। ১৮৫৭ সালেও যখন বলা হচ্ছে, তখনও কিন্তু দফা ছিল। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যে কৃষক আন্দোলনগুলো হয়েছে, সেগুলোতেও দফা ছিল। তখনও দফাভিত্তিক আন্দোলন হয়েছে। ফরায়েজি আন্দোলনেও দফা ছিল। কৃষকরা সব সময় বলছে আমার অবস্থার উন্নতি দরকার। তার জন্য আমি জান দিতেও রাজি আছি। একাত্তরেও আমরা যেটা দেখতে পাই। কৃষকরা তো আর ৬ দফা মুখস্থ করে যুদ্ধে যায়নি। কৃষকরা যুদ্ধে গেছে তাদের হাজারটা কারণে। কিন্তু তার মূল বিষয় হচ্ছে 'আমার জীবনের উন্নতি' দরকার। এবং এটাই হচ্ছে আমাদের ইতিহাস পাঠের নিয়ম। মধ্যবিত্ত শ্রেণি- যারা রাজনীতি করে, তারা মূলত এ বিষয়টাকেই পরিশীলিত করে একেবারে আইনি ভাষায় তুলে ধরেছে। যেহেতু আমাদের দেশের রাজনীতি তৈরিতে আইনের লোকেরা বড় ভূমিকা পালন করেছে, সে কারণে তারা বিভিন্ন দফার মাধ্যমে বলছে যে, আমাদের এই এই সুবিধাগুলো দিতে হবে। প্রতিপক্ষ যখন মানতে পেরেছে, তখন সেটা সফল হয়েছে। এটা যে কেবল ঔপনিবেশিক শাসক বা রাষ্ট্রকে তারা বলেছে তা নয়। এমনকি শরৎ বসু যখন বেঙ্গল প্যাক্ট করছেন- তিনিও দফা দিয়েছিলেন। এই দফাগুলো হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, লাহোর প্রস্তাবের পরপরই যে দফাগুলো এসেছে- চুয়ান্ন সালে ২১ দফা, ছেষট্টিতে ৬ দফা সবকিছুই হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার একেকটা ফর্মুলা। একেকটা পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে, সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু যখন এমন হয়ে যায় যে, এই পরিকল্পনা মানতে পারব না অর্থাৎ ৬ দফা যে রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে দেয়া হচ্ছে সে রাষ্ট্র যদি কাঠামোগতভাবে এতটা দুর্বল হয় যে, গণহত্যা ছাড়া তারা এই দফা বা দাবিগুলোর সমাধান করতে পারবে না- তাহলে বুঝতে হবে যে, ওই রাষ্ট্রের মৃত্যু অনেক আগেই ঘটেছে। সে কারণে যুদ্ধের মাধ্যমেও সেই পাকিস্তান আর বাঁচতে পারেনি।
[এই প্রসঙ্গ সমাপ্ত]