আমার বাবা ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মচারী ছিলেন, পরে কর্মকর্তা হন। তিনি ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের খুব ভক্ত। সেই সঙ্গে ছিলেন নজরুল-অনুসারী কবি। আমি তাঁর প্রভাবে ছোট বেলায় নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতে শিখি। বাবার বইপত্রের সংগ্রহে নজরুলের প্রথম সংস্করণের 'বিষের বাঁশি' কাব্যগ্রন্থটি ছিল। আমি এটি সযত্নে আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষণ করি। [বইটি এ বছর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার হিসেবে দিয়েছি।]
আমি স্কুল ও কলেজজীবনে নজরুলের কবিতা পড়ে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হই। পরে, চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে নজরুল সাহিত্য ব্যাপকভাবে পাঠের সুযোগ পাই। আরও পরে, নজরুলের জীবন ও তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রণয়ন করি 'নজরুল তারিখ অভিধান' গ্রন্থটি।
আমার মতোই আমার পুত্র তাঁর শৈশবে নজরুলের কবিতায় আকৃষ্ট হয়। কুমিল্লার অধ্যাপক আলী হোসেনের আবৃত্তি করা নজরুলের কবিতার ক্যাসেট শুনে সে অনেক কবিতা কণ্ঠস্থ করে ফেলে। গত দু-তিন বছরে আমার নাতনি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় নজরুলের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। 'করোনা'র অতিমারিতে স্কুলহীন জীবনে সে অন্তর্জালে বেশি সময় কাটায়। তারই মধ্যে সে অনলাইনে নজরুলের কবিতার পাঠ নিয়েছে।
এমনিভাবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নজরুল বাঙালির জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।
২.
বিপ্লবী মানবতার কবি নজরুল উনিশশ বিশের দশকে বিদ্রোহের কবিতা লিখে বাঙালির চেতনায় ঝড় তুলেছিলেন। সে বিদ্রোহ ছিল অন্যায়, অসত্য, শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতায় বিরুদ্ধে; কলুষিত পচা সনাতন মিথ্যার বিরুদ্ধে; সব ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। সে বিদ্রোহ ছিল বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে তিনি চমৎকার প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন, কারো কারো মতে, তাঁর সবচেয়ে সেরা কবিতাগুলো হচ্ছে প্রেমের কবিতা। প্রেমের সেসব কবিতা জীবনকে সার্থক ও ঋদ্ধ করতে চায়; পূর্ণ ও আনন্দময় করতে চায়। অন্যদিকে বিখ্যাত 'বিদ্রোহী' কবিতার মতো কিছু কবিতায় তিনি প্রেম ও বিদ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, যেমনটি প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর নিজের জীবনে।
নজরুলের কবিতা কুশলতার সঙ্গে রচিত। তাতে আছে পাঠকের মনকে ছুঁয়ে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তাঁর কবিতার ভাষা ও ভাববস্তুতে রয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেওয়ার পরিসর; আছে শক্তিশালী ও নিরন্তর হৃদয়-সংবেদী আবেদন। নজরুলের কবিতার সর্বকালীন আবেদনের মূলে রয়েছে প্রগাঢ় মানবতাবাদ। তা মূর্ত হয়েছে সর্বস্তরের মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতিতে, দুঃখী মানুষের অসহায়তার আন্তরিক উপলব্ধিতে এবং শোষিত-নির্যাতিত মানুষের জন্য প্রবল সহমর্মিতা ও সহৃদয়তায়।
দুর্বল, ভীরু মানুষকে নজরুল সাহস জুগিয়েছেন, সকল বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা জাগিয়েছেন। রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতার মধ্যে মুক্তির পথ খুঁজেছেন; ইতিহাস খুঁজে প্রগতির দীক্ষা নিয়েছেন। বিখ্যাত 'কামাল পাশা' কবিতায় নজরুলের প্রখর ইতিহাস-চেতনার পরিচয় মেলে। ভারতে মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলীর নেতৃত্বে তুরস্কে মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য যে খেলাফত আন্দোলন হয়েছিল তাতে নজরুলের আস্থা ছিল না। বরং মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কে সালতানাতের অবসান ঘটিয়ে যে নব্য তুর্কি আন্দোলন হয়েছিল তাতে তাঁর দৃঢ় সমর্থন ছিল। এর কারণ, কামাল পাশা তুরস্ককে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। তুরস্কের সমাজ জীবন থেকে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করার কামাল পাশার সাফল্য নজরুলকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ধর্মান্ধতা, রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার ও আচার-সর্বস্বতার কবল থেকে তুরস্কের মতো ভারত ও বাংলার জনগণের মুক্তি চেয়েছিলেন।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব নজরুলকে সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদ ভাবাদর্শে উজ্জীবিত করেছিল। তাঁর 'সাম্যবাদী' ও 'সর্বহারা' গ্রন্থের কবিতাগুলো তার প্রমাণ।
২৬ বছর বয়সে নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন আমূল সংস্কারবাদ তথা প্রগতিবাদী চেতনায়। হয়েছিলেন সাংগঠনিকভাবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্য।
নজরুল ছিলেন মনে-প্রাণে অসাম্প্রদায়িক। তিনি তাই যোগ দিয়েছিলেন ভারতের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্মিলিত আন্দোলনে। কবিতা ও গানে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত করেছেন বার বার। 'পুতুলের বিয়ে' নাটিকায় সন্নিবেশিত তাঁর গানে তিনি লিখেছিলেন, 'মোরা একই বৃন্তে দুটি ফুল - হিন্দু-মুসলমান।' 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' কবিতায় লিখেছেন, 'হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।' শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায় নামে রাজনৈতিক দল গঠনেও নজরুল সক্রিয় ভূমিকায় নেমেছিলেন। সারা বাংলার বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই তিনি প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সাম্যবাদী আদর্শে প্রথম শ্রেণি-সচেতন সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। পত্রিকার নাম ছিল 'লাঙল'। এই পত্রিকার পাতায়ই প্রথম প্রকাশিত হয় শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলের ঘোষণাপত্র, যেখানে প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।
সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগীত ইন্টারন্যাশনালের অনুবাদ করেছিলেন - 'অন্তর ন্যাশনাল সংগীত' (জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত)। এটিও 'লাঙল' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি রেড ফ্ল্যাগ অবলম্বনে লিখেছেন 'রক্ত পতাকার গান'।
নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম এখন অগ্রসরমান সমকালে সে সংগ্রামেও ছিল নজরুলের অকুণ্ঠ সমর্থন। বিখ্যাত 'নারী' কবিতায় তিনি নারীকে পুরুষের সমমর্যাদার অভিষিক্ত করেছিলেন। তাঁর নিজের প্রথম রেকর্ড ছিল বিখ্যাত 'নারী' কবিতার স্বকণ্ঠ আবৃত্তি। 'বীরাঙ্গনা' কবিতায় তিনি নারীর অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মানের সঙ্গে সমুন্নত করেছেন। 'জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা' গানে মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া ও ভগ্নি- সব রকমের সম্পর্কের নারীকে মুক্তির সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। এভাবে একই নজরুলের মধ্যে আমরা নানা নজরুলকে পাই। যে-কেউ তার নিজের মতো করে নজরুলকে খুঁজে নিতে পারেন। নজরুলের কবিতা ও গানের গভীর রয়েছে প্রবল দেশপ্রেম। তাতে রয়েছে উদ্দীপনা ও সাহস জোগানের শক্তি। আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর কবিতা ও গান হয়েছে বাঙালির সহায়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাম্পে ক্যাম্পে নজরুলের কবিতা ও গান হয়েছিল আমাদের মরণজয়ী প্রণোদনা।
নজরুলের কবিতা ও গানের ভাববস্তুর বিচিত্রতা বাংলাদেশের কবিতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। উনিশশ তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, জসীমউদ্‌দীন, বুদ্ধদেব বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ নজরুলের কবিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। পরে সুকান্ত ভট্টাচার্য, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, নবেন্দু রায় প্রমুখ নজরুলের প্রগতি চেতনায় কবিতা লিখেছেন। বাংলাদেশের কবিতায় নজরুলের উত্তরাধিকার বহন করছেন আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, গোলাম কুদ্দুস, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সানাউল হক, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ। নজরুলের ভাববৈচিত্র্য ও কাব্যপ্রকরণ দ্বারা তাঁরা কম-বেশি প্রভাবিত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতায়ও নজরুলের প্রভাব দেখা যায়। এক্ষেত্রেও নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছেন।
নজরুলের গান ও কবিতার রয়েছে প্রভাবক ভূমিকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এদেশে নজরুলের কবিতার পাঠ নিয়ে চলেছে। তাঁর কবিতা ও গান উপস্থাপিত হচ্ছে মঞ্চে, বেতারে, টেলিভিশনে ও অনলাইনে।
৩.
নজরুলের রচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমে। বাংলা পাঠ্যসূচিতে প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত নজরুলের লেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যসূচিতে প্রাধান্য পেয়েছে কবিতা, পরে অন্যান্য রচনা।
প্রথম শ্রেণিতে শিশুরা পড়ে নজরুলের 'ভোর হলো' (ভোর হলো দোর খোল) কবিতাটি ভোরের প্রকৃতির রঙিন ছবি শিশু মনে রং ও রেখার আল্পনা ছড়ায়।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে তাদের পড়তে হয় 'আমি হবো' (আমি হব সকাল বেলার পাখি)। এই কবিতা পাঠে শিশু মনের ইচ্ছেরা পাখির মতো ডানা মেলে চারপাশে।
তৃতীয় শ্রেণিতে পাঠ্য রয়েছে 'চল চল চল' কবিতা। ওই কবিতা পড়ে সজীব প্রাণের অধিকারী কিশোর-কিশোরীরা অন্ধকার দূর করতে চায়। সব বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়।
চতুর্থ শ্রেণিতে 'মা' কবিতা পড়ে তারা বুঝতে পারে, সবার জীবনে 'মা' মধুমাখা নাম। মায়ের স্নেহ-মমতায় মানুষ বড়ো হয়, জীবনে সফল হয়।
পঞ্চম শ্রেণিতে রয়েছে 'সংকল্প' কবিতাটি। এই কবিতা পড়ে কিশোর মন প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। সে আবিস্কার করতে চায় অসীম আকাশের রহস্য। জানতে চায় বিশ্বের অজানা সব দিক।
এভাবে নজরুলের কবিতার ভাববৈচিত্র্য ও ছন্দদোলা শিশু মনকে আনন্দলোকে পৌঁছে দেয়। তাঁর কবিতা পড়ে শিশুরা ভাসতে পারে কল্পনার জগতে, তাদের মনোজগতে লাগে সৃজনশীলতার ছোঁয়া। তারা মা, মাটি, মানুষকে ভালোবাসতে শেখে। তাদের মনের ইচ্ছেরা বিকশিত হতে থাকে। তাদের মধ্যে ব্যক্তিত্ববোধের স্ম্ফূরণ ঘটে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাঠ্য নজরুলের 'ঝিঙেফুল' কবিতা। এ কবিতা পড়ে অপরূপ সৌন্দর্যময় প্রকৃতির প্রতি শিক্ষার্থীদের গভীর ভালোবাসা ও মমতা ফুটে ওঠে।
সপ্তম শ্রেণিতে নজরুলের 'কুলিমজুর' কবিতা পড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা। এ কবিতা পাঠে যুগযুগ ধরে সমাজে বঞ্চিত, শোষিত, নির্যাতিত কুলি-মজুরদের প্রতি গভীর সমবেদনা জেগে ওঠে তাদের মনে।
অষ্টম শ্রেণিতে রয়েছে 'নারী' কবিতা। এ কবিতা পাঠ পুরুষের সর্বেসর্বা মনোভাবের অবসান ঘটায়। নারীর অবদানকে পুরুষের সমপর্যায়ে দেখতে শেখায়। 'বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর'- এই উপলব্ধি কিশোর মনে ছড়িয়ে যায়।
নবম শ্রেণিতে 'মানুষ' কবিতা পড়ে ছাত্রছাত্রীরা। তারা বর্ণ, ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের মহিমাকে সবচেয়ে বড় করে দেখার শিক্ষা পায়।
একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা নজরুলের 'সাম্যবাদী' কবিতাটি পড়ে। বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা জাগে তরুণ মনে। তারা সাম্য চেতনায় উজ্জীবিত হয়। প্রেরণা পায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মহিমাকে গুরুত্ব দেওয়ার। তাদের মনে জাগে মানবতাবাদী চেতনা।
স্নাতক ও স্নাতক সম্মান পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা নজরুলের কাব্য ছাড়াও তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটকের সঙ্গে পরিচিত হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা পায় নজরুলের প্রতিভার বহুমাত্রিক পরিচয়। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নজরুল চর্চা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদে নজরুল অধ্যয়নের সুযোগ আছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে 'নজরুল চেয়ার' আছে। নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুল চর্চা ও গবেষণায় ভূমিকা রেখে আসছে।
৪.
নজরুল ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক চারণ কবি। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালির জাতীয় জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রপথিক। বাঙালির মানস চেতনায় তিনি এনেছিলেন উদ্দীপনাময় নবজাগরণের বাণী। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ-বিরোধী জাগরণের উত্তাল সময়ে তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিলেন জাতীয় চেতনায়।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির মনোজগতে অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী ও সাম্যবাদী চেতনার বিকাশে নজরুলের কবিতা ও গান, উপন্যাস ও নাটক, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছিল। এসবেরই প্রভাবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়। এসব মূলনীতি বাঙালির চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশে শ্রেণিবৈষম্য এখনও প্রকট, শ্রমজীবী মানুষের ওপর শাসন ও শোষণের দাগরেখা স্পষ্ট। ধর্মান্ধতা ও রক্ষণশীলতা শিক্ষিত সমাজকেও আচ্ছন্ন করছে। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি হিংস্র থাবা মেলছে। লুটেরা রাজনীতি, ক্ষমতার দৌরাত্ম্য, সর্বনাশা নেশা ও সন্ত্রাসের আধিপত্য দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটছে। এই অবস্থায় নজরুলের রচনা থেকে আমরা সংকট উত্তরণের প্রেরণা ও সাহস পাই।
সকল প্রতিকূলতা ও অন্ধকারময়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তিনি আমাদের আশার আলো, আস্থার ভিত্তি, সাহসী ঠিকানা।
ভিন্ন প্রসঙ্গে নজরুল লিখে গেছেন 'আমি চিরতর দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে।' এ কথা বহুলাংশে প্রাসঙ্গিক। সত্যিই বাঙালি নজরুলকে কখনো ভুলতে পারবে না।
অসাধারণ সাহিত্যকৃতির জন্য কবি নজরুল আমাদের জীবন ও সাহিত্যে চিরজীবী হয়ে বেঁচে থাকবেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন তিনি প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।