ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ক্যাফে, প্রজাপতি, বালিকা এবং কবি

গল্প

ক্যাফে, প্রজাপতি, বালিকা এবং কবি

ফারুক আহমেদ

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

ক্যাফের মৃদু আলোয় অনেকগুলো মুখ ভেসে আছে খরকুটোর মতো।
কবি বলতে শুরু করে, সকাল হলো নিরাময় কেন্দ্র। একেকটা সকাল এসে একটু একটু করে তোমার বেদনা, তোমার বিষম স্মৃতি ঘষে ঘষে ফ্যাকাশে করে দেবে। তারপর দেখবে বেদনার দল ফ্যাকাশে হতে হতে ফুরিয়ে গিয়ে পৃথিবীর ভালোবাসায় স্থির হচ্ছো আবার।
এর মধ্যে কারো কি কান্নার শব্দ শোনা গেল! কবি বলে যায়। শ্রোতার দল মৃদু আলোর এই ছোট্ট উপত্যকায়, আপন আপন বৃত্তে ডুব দিয়ে থাকে। কেউ কবির কথা শুনে, কেউ শুনে না।
অনেক রাত পর্যন্ত কবির কথা বলার এই ব্যাপারটা চলে। ক্যাফের সব আলো নিভে গেলে কবি বেরিয়ে আসে। রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে। যারা আছে, তারা আত্মমুগ্ধ প্রাণী যেন একেকটা, কোনো দিকেই তাকাচ্ছে না। এমন এক নীরব শহরে একজোড়া চোখকে একটা নোট গুঁজে দিয়ে কবি ফুটপাতে ফিরে এলে দু'জনের দেখা হয়। ছোটখাটো, ঠোঁট ওলটানো রূপময় মেয়েটা পাশে এসে দাঁড়াতে দাঁড়াতে কবিকে বলে, কেমন আছেন?
কবি এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। বলে, কেন এসেছেন। আমি ক্যাফের বাইরে স্বপ্নের কথা বলি না।
-আমি স্বপ্নের কথা শুনতে আসিনি। এসেছি আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটব বলে।
কবি এ কথার উত্তরে বলার কিছু পায় না। এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, প্লি-জ ...
দু'জন চুপচাপ হাঁটতে থাকে। একটা গাড়ি শোঁ শোঁ শব্দে পেরিয়ে গেলে দু'জোড়া চোখ পরস্পর দৃষ্টিবিনিময় করে আবার ফুটপাতে মনোযোগ দেয়।
-আমরা তো চুপচাপ হাঁটব? কবি জিজ্ঞেস করে।
উত্তরে মেয়েটি মাথা নাড়ায়। বলে, শহর কথা বলার ঘণ্টা পেরিয়েছে। এখন বললে জরিমানা গুনতে হবে।
এবার কবি মাথা নাড়ায়। দূর থেকে কয়েকটা হুইসেলের শব্দ দু'জনকে পেরিয়ে চলে যায়। ফলে আবারও নীরবতায় ভরে ওঠে ফুটপাত।
এবার কবির থলে থেকে বাতাসের সঙ্গে পাতার বাড়ি খাওয়ার একটা শব্দ কানে আসে। খুবই নিচু স্বর, ঠিক নিশ্চিত নয়, আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে নিশ্চিতই।
-আপনাকে বোধহয় কেউ ফোন করেছে।
-ফোন! কবি খানিকটা অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে চোখ রাখে।
-এই যে শব্দ পেলাম, কী অদ্ভুত রিংটোন আপনার! মেয়েটি মিটিমিটি হাসে।
এ কথায় কবিও হেসে ওঠে।
-আমি রিংটোন হওয়ার মতো কোনো যন্ত্র ব্যবহার করি না।
-তাই! আশ্চর্য, তাহলে এ শব্দ কোথা থেকে আসছে!
কবি দাঁড়িয়ে পড়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে মেয়েটির দিকে। মেয়েটিও কবির চোখে চোখ ফেলে।
-কয়েকটি গাছ অনেক দিন ধরে আছে আমার সঙ্গে। বাসা বদল করলেও ওরা আমার সঙ্গেই যায়। এদের কাউকে কাউকে নিয়ে আসি ক্যাফেতে, ঘুরেফিরে একেক দিন একেকটা। ওদের ঘুরে বেড়ানোর খুব শখ। ব্যাগের ভেতর চুপচাপ বসে থাকে। শহরের ক্যাফেগুলো ওরা দেখতে চায়, মানুষের চোখ, অনুভূতি এসব দেখার খুব ইচ্ছে ওদের। যখন আমি একা থাকি, ওরা মানুষের নানারকম আচরণের বিবরণ আমাকে দেয়, ব্যাখ্যা করে। মাঝে মাঝে আমি অভিভূত হয়ে শুনি ওদের কথা।
মেয়েটা কবির দিকে অবিশ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর একসঙ্গে আরও খানিক হেঁটে থামে, বলে, আচ্ছা আসি। কথা শেষ হতে না হতেই একটা অভিজাত গাড়ি মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ালে তাতে সে উঠে পড়ে।
এতে পড়ে থাকে সোডিয়াম আলো আর জ্বলতে থাকা সারি সারি চোখ, যেসব চোখের একজনকে কবি একটা নোট দিয়ে ফুটপাতে ফিরে এলে দেখা হয় মেয়েটির সঙ্গে। এরপর কয়েক দিন আর দু'জনের দেখা হয় না, ক্যাফেতে কখনো-সখনো শুধু চোখ পড়ে পরস্পরের।

২.
ঘরজুড়ে লালচে আলো, তার ভেতর ধবধবে শাদা জ্যোৎস্না ককটেল বানিয়েছে। দরজায় টোকা পড়ে। দরজা তো খোলাই! কবি দেখে ঘরে প্রথমে ঢুকল একটি সুমিষ্ট ঘ্রাণ, তারপর মেয়েটি।
কবি বলে, কেন এসেছেন?
-আমার একটা খুব দরকারি কথা আছে।
-আজ তো পূর্ণিমা, আজই তো কথা বলার দিন! বাহ, বসেন। একটা চেয়ারের দিকে ইশারা করে কথাগুলো বলে কবি।
-তাড়াতাড়ি শুরু করা যাক, কী বলেন? আচ্ছা, আপনি জানলেন কীভাবে, আজ কথা বলার দিন!
মেয়েটা হাসে, বলে, আমি জানতাম না। বেশ ক'দিন ধরেই ভাবছি আপনার কাছে আসব। আর মিলে যাওয়ার ব্যাপারটা আমার হিসেবে নেই।
মেয়েটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা গাছ বের করে টেবিলে রেখে বলে, এটা আপনার জন্য।
-বনসাই! কবি আঁতকে ওঠে।
মেয়েটি মাথা নাড়ে।
-আমি বনসাই একদম নিতে পারি না। আমার সঙ্গে যারা, ওরা আলাদা, বনসাই না। বলে কবি গাছটাকে মেয়েটির দিকে ঠেলে দেয়।
মেয়েটি বড় বড় চোখে কবির দিকে দৃষ্টি ফেলে, গল্পটা শুরু করি তাহলে?
কবি মাথা ঝাঁকায়।

৩.
মেয়েটির কপালে কয়েকটি দেয়াল তৈরি হয়। সে বলতে শুরু করে, আমি যার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলাম, সে আমাকে অদ্ভুত সব গল্প শোনাত। সেসব গল্প আমাকে ক্ষুধা নিবারণের মতো ভালোবাসার নিবারণ ঘটাত। তার অনেক অদ্ভুত গল্পের মধ্যে একটা ছিল সাপের খামারের গল্প। বলত আমরা পালিয়ে গিয়ে যেখানে উঠব, তা হলো একটি সাপের খামার। পালিয়ে যে যাব, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত ছিলাম।
গল্প বলা ছিল তার কাছে অনেকটা ধ্যানের মতো। ওর গল্প শুনে আমার অভিভূত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ভাবতাম, এসব অদ্ভুত গল্প সে পায় কোথায়, এ তো আমাদের এই মহানগরের গল্প নয়। আমার চেনা গল্প নয়! তার এমনসব অদ্ভুত গল্প বলার কারণে আমার পরিবারের কেউ ওকে পছন্দ করত না। আমার পরিবার জানিয়ে দেয়, তারা ওকে মেনে নেবে না। তাতে অবশ্য আমি কোনোরকম উদ্বিগ্ন বা দুঃখবোধে আক্রান্ত হইনি।
গল্প বলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া আর কিছুদিনের জন্য উধাও হয়ে যাওয়া হামেশাই ঘটত ওর। সে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেলে আমি খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়তাম। আমার মনে হতো আর কখনো তার সঙ্গে দেখা হবে না। সে হয়তো নতুন কারো প্রেমে পড়েছে! ফোন বন্ধ থাকত। তার সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো মাধ্যমই খোলা থাকত না। যেসব বন্ধুর সঙ্গে সে আড্ডা দিত, তাদের কাউকেই আমি চিনতাম না। তাদের সঙ্গে আমাকে কখনোই সে পরিচয় করিয়ে দিত না। বলত, ওরা আমার বন্ধু না। ফলে তার খোঁজ জানার আমার কোনো উপায় থাকত না। তার পরিবারের সঙ্গেও সে কখনো আমার পরিচয় করিয়ে দিত না। বলত, তুমি আর আমি, এই হলো আমাদের ভূগোল, হা হা।
আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। হয়তো এর ভেতর অন্য কোনো বালকের সঙ্গে কফিশপে বসা হতো। একদিন, দু'দিন। হাত ধরতাম, চুমু খেতাম। তারপর এসব আমাকে ওর প্রতি আরো তীব্র করে তুলত। ওর জন্য অপেক্ষায় থেকে থেকে মনে হতো কফিশপের এই বালককে আমি খুন করে ফেলব। সেটা সম্ভব হতো না বলে শেষ পর্যন্ত ঘরে ঢুকে যেতাম। মন খারাপ আর বিষণ্ণতা নিয়ে গৃহবন্দি কয়েকটা দিন পেরিয়ে যেত। তারপর একদিন সে আমাকে চমকে দিয়ে হাজির হতো। আমি বিষণ্ণতার খোলস থেকে বেরিয়ে তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। সে প্রতিবার ফিরে এসে এমনসব গল্প শোনাত; মনে হতো এ গল্প বুঝি গ্যালাক্সি থেকে উল্ক্কার মতো বায়ুমণ্ডলে এক্ষুনি খসে পড়ল। আমি আনন্দে তখন আত্মহারা এক প্রজাপতি।
সে কখনো তার বলা গল্পগুলো লিখত না। আমি তাকে লেখার কথা বললে, হেসে উড়িয়ে দিত। বলত, আমি লিখতে শুরু করলে যারা লিখছে, যারা আসলে কিছুই লিখছে না, তাদের কী হবে, হা হা।
আমার কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। শুধু মনে হতো এগুলো পৃথিবীর আশ্চর্য-সুন্দর, একই সঙ্গে ভয়াবহ সব গল্প। তবে ঠিক বিশ্বাস করতে পারতাম না! আবার অবিশ্বাস করার কোনো যুক্তিও ছিল না আমার কাছে। বরং এসব আমাকে ঘোরগ্রস্ত করে রাখত। এইসব ভ্রান্তির ফলে মনে হতে থাকল সাপের খামারের গল্পটা ওর বানানো। আবার মনে হতো সত্যি। সত্যি মনে হতো, কেননা ওর বাবার ছিল চামড়ার ব্যবসা। যে ব্যবসার কথা শুনলে সে রাগে-অপমানে আর কথা বলতে পারত না। চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে কীভাবে জানি আমি সাপের খামারের একটি যোগসূত্র তৈরি করে নিলাম।
পরিকল্পনা অনুযায়ী একদিন আমরা পালিয়ে যাই। এই পালানোটা এমন নয় যে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছিল। আমরা একটা কফিশপে দেখা করি। দু'জন দুটা ম্যাপেল পেকান লাতে খেতে খেতে অনেকক্ষণ গল্প করি। যখন দেখি আমাদের আর কোনো গল্প নেই, আমরা প্রায় ক্লান্ত, তখন উঠে পড়ি। এরপর ওর গাড়িতে করে পৌঁছাই গল্পে শোনা সেই খামারে, যা কিনা প্রায় পরিত্যক্ত, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিষমিশাময় অনেক অনেক সাপের দিনরাত্রি। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। আমি ভয় পেলেও অদ্ভুত গল্প বলা আমার প্রেমিকের হাত ধরে সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। তারপর ভ্রমণের ক্লান্তি আর ভালোবাসায় ঘুমিয়ে পড়ি আমরা।

৪.
আশ্চর্য সুন্দর সকাল এলো একটা। খামারবাড়িতে সকালের রোদ ভীষণরকম আদর ঢালতে লাগল। সঙ্গে নানারকম গাছ, ফুল, পাখি যেন গল্পের আসর বসিয়ে দিল। আমরা বারান্দায় বসে সকালের খাবার সারতে সারতে এইসব দৃশ্য দেখতে লাগলাম। খামারের কেয়ারটেকার হাসান একধরনের উদ্বিগ্নতা সহযোগে দূরে বসে আমাদের নজরে রাখছিল।
নাশতা শেষ হলে প্রেমিকের হাত ধরে সবুজ ঘ্রাণময় একটি সকালের ভেতর নেমে পড়ি। এ কীভাবে সাপের খামার হয়; ভাবছি আমি! আবার জিজ্ঞেস করতে ভয় করছে, যদি সত্যি সত্যি বলে, ওই দেখো একটা অজগর। তাহলে তো আমি ভয়ে জ্ঞান হারাব। ওই যে দূরে অস্পষ্ট একটা ঘর দেখা যাচ্ছে, ওখানেই কি আছে ওরা, বিষাক্ত, নানা রঙের, খুনি চেহারার শীতল সব প্রকৃতির প্রাণ! একটা গাছ পেরিয়ে যাই। সাদা ফুলে ভরে আছে গাছের শরীর। একটা প্রজাপতি আমাদের দিকে উড়ে আসে। অদ্ভুত সুন্দর। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। তারপর আরেকটা গাছ, আরো একটি প্রজাপতি উড়ে আসে। এটাও অপরূপ। এভাবে একেকটা গাছ অতিক্রম করছি আর একেকটা প্রজাপতি এসে আমাদের মুগ্ধ করে দিচ্ছে। তবে আশ্চর্য যে, একসঙ্গে নয়, একটা একটা প্রজাপতি একেকটা গাছের আড়াল থেকে উড়ে আসছে। এভাবে আমি নতুন রঙের জীবনের ভেতর ডুবে যেতে লাগলাম।
আরেকটু এগোনোর পর ভয়ে চিৎকার করে প্রেমিককে জড়িয়ে ধরি। প্রথম মনে হয়েছিল সাপ। পরে দেখি অজস্র শুঁয়াপোকা। ছোট ছোট গাছের পাতায়, ডালে ছড়িয়ে আছে। এরা আমার চিৎকারে কর্ণপাত করে না। মনোযোগ দিয়ে যেভাবে পাতা খাচ্ছিল, সেরকমভাবেই খেয়ে যাচ্ছে। আমার এ রকম ভয় পাওয়া দেখে প্রেমিক হো হো করে হেসে ওঠে। যেন বিরাট এক আনন্দের ঘটনা! এদিকে তার হাসির শব্দে মনে হলো ব্যস্ততা রেখে শুঁয়াপোকাগুলো একটু থামল; যেন হাসিটা বোঝা দরকার।
আমরা বাগান থেকে বাংলোর দিকে ফিরে আসি। আসতে আসতে প্রেমিক বলে, এরা নিরীহ শুঁয়াপোকা, এরা সারাদিন দুধলতা গাছের পাতা খেতেই ব্যস্ত থাকে। এরা ভালো, সুন্দর, নিরীহ। তবে তুমি যাদের দেখছ না, ওরা হয়তো নিরীহ নয়, ওরা তীব্র এবং ভয়ংকর ...। মনে হলো কিছুক্ষণের জন্য শুঁয়াপোকাগুলো থেমে গেছে, চুপচাপ, কোনো খসখসানি নেই। আমি একটা বিহ্বলতার ভেতর পড়ে যাই। আর কোনো প্রশ্ন করতে পারি না। শুধু বাগান থেকে বাংলোতে ফিরে আসার জন্য ওকে তাগিদ দিতে থাকি।
রাতে খেতে বসে বললাম, তোমার সাপ কোথায়?
সে মুচকি হাসে। কিছু বলে না। এর মানে হলো, ওকে দিয়ে আর কিছু বলানো যাবে না।

পরের সকালটাও একইরকম মুগ্ধতার। বাগানে নেমে পড়ি প্রেমিকের হাত ধরে। প্রজাপতি উড়ে আসতে থাকে একে একে। মনে হলো উড়ে এসে প্রেমিককে স্পর্শ করে ফিরে যাচ্ছে। স্পর্শ ঠিক নয়, যেন কানে কানে কিছু বলে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে ওর আরো কাছে চলে আসি। কিন্তু এতে করেও প্রজাপতির দল আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না।
দ্বিতীয় দিন রাতে আবার সাপের কথা জিজ্ঞেস করি। রাতের খাবার খাচ্ছিলাম তখন আমরা। হাসান খাবার দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেছে। এখানে আমরা দু'জন শুধু। ওই মুহূর্তেই শুনতে পাই দরজায় প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আমি আনন্দে প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠি, দেখো দেখো প্রজাপতির দল এসেছে, দরজা খোলে দিই?
সে আমার হাত চেপে ধরে বলে, খাও। আমি দেখছি। কিন্তু সে উঠে আর দরজার দিকে যেতে আগ্রহী হয় না। এদিন রাতে আমার অনেকবার ঘুম ভেঙে যায়, প্রেমিকেরও। ব্যাপারটা এমন যে, আমার ঘুম ভাঙার একটি শব্দ আছে এবং প্রতিবার সেই শব্দে তারও ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিবার প্রেমিক আমার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে, ঘুমাও। আমি একটা বিরাট ভয় কোলবালিশের মতো নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
পরের রাতে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যাপারটা ঘটে। ঝাপটানো, ভয়, হাত চেপে ধরা ইত্যাদি নিয়ে সারারাত ছটফট করে কাটিয়ে দিই। ঘটনার তৃতীয় রাতে আমার ভেতর সন্দেহ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেমিককে নানারকম প্রশ্ন করেও উত্তর পাই না। এত এত প্রশ্নে সে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। দু'জনের ভেতর ভীষণ ঝগড়া হয়। এ ব্যাপারগুলো আমার মাথায় ছিল না। সে ভয়ংকর-সুন্দর গল্প বলা এক বালক, ভাবুক, ঘোরলাগানো প্রেমিক। তার বাইরে যে আরো কিছু আছে, তা ভাবি নাই। তার ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠা আমাকে বিরাট বিস্ময় উপহার দেয়। এর ফলে ঝগড়া, ক্লান্তি, পরস্পরের প্রতি গোপন এক ক্রোধ নিয়ে আমরা ঘুমাতে যাই। আর সে রাতেও ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করে। ডানা ঝাপটানোর ভয় আমাকে পেয়ে বসে। মনে হয় এক্ষুনি ডানার দল দরজা ভেঙে ফেলবে। এ প্রজাপতির ডানা না সাপের লেজ- কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। সে আজ ঘুমাচ্ছে বেঘোরে। একটা ভয় বা কৌতূহল আমাকে দরজার দিকে ঠেলে দেয়। নিজেকে কোনোমতেই নিভৃত করতে পারি না। মনে হয় দরজা খোলে দিলে সব শান্ত হয়ে যাবে। আমার হাত-পা কাঁপতে থাকে। আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ডানা ঝাপটানো থেমে আবার শুরু হলে দরজা খোলে দাঁড়াই। এতক্ষণে প্রেমিকের ঘুম ভাঙে। সে চিৎকার দিয়ে ওঠে, এমন চিৎকার যে, এক্ষুনি আমাকে খুন করে ফেলবে। ততক্ষণে আমার চোখেমুখে বিস্ময়। অগণিত প্রজাপতি ঘরে ঢুকে পড়ছে। একেকটার বিরাট শরীর, তবে কোনো বর্ণিলতা নেই। এমন প্রজাপতি আগে কখনো দেখি নাই! ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে প্রেমিককে ঘিরে ধরে। ঘিরে ধরে এমনভাবে যে, কিছুক্ষণের মধ্যে সে প্রজাপতির ভেতর ডুবে যায়। সে এই বূ্যহের ভেতর থেকে চিৎকার করে বলে, তুমি পালাও। সেটাও মুখ চেপে ধরার পর যেভাবে শব্দ বেরোয়, সেভাবে বেরিয়ে আসে।
মুহূর্তেই মনে হলো, আমাকে পালাতে হবে। হাতের কাছেই গাড়ির চাবিটা পেয়ে যাই। ঘর থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে গাড়িতে উঠে বসি। দেখতে পাই প্রজাপতির ঝাঁকটা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। ঝাঁক মানে বুঝতে চেষ্টা করি ... এর ভেতর আমার প্রেমিকও রয়েছে, ওকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে আসছে। আমি ভয়ে কাঁপছি আর ভাবছি ওকে আমার নিয়ে যেতে হবে। কিছু প্রজাপতি গাড়ির জানালায় ঠোকর দিতে শুরু করেছে। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, তুমি পালাও, তোমাকে ওরা খেয়ে ফেলবে। আমার জন্য চিন্তা করো না, আমি দ্রুতই ফিরে আসব।
তার তীব্র চিৎকার গোঙানোর মতো গাড়ির জানালা ভেদ করে আমার কাছে পৌঁছে। আমি দেরি না করে গাড়ি ছুটিয়ে দিই। জঙ্গলের ভেতর ভীষণ অন্ধকার রাস্তা। ভেবে পাই না, এখান থেকে কীভাবে পালাব। শুধু শহরের দিকে রাস্তাটা গোগল ম্যাপে ঠিক করে গাড়ি চালাতে থাকি।

৫.
গল্প শেষ হলে দু'জন অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকে পরস্পর। তবে মনে হয় না, কেউ কাউকে দেখছে। জোছনার রূপ আরো উজ্জ্বল হয়েছে, বোধহয় দু'জনের গল্প বলার ফাঁকে চাঁদ পার্লার থেকে ঘুরে এসেছে।
কবি বলে, তারপর কী হলো?
বালিকা কোনো উত্তর দেয় না, তাকিয়ে থাকে কবির দিকে।
-প্রেমিকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি?
-না।
-তাকে উদ্ধার করা যায়নি।
বালিকা এবার বলতে শুরু করে, আমি ওর পরিবারের সন্দেহে পড়ি। মামলা হয়। আমাকে জেলেও যেতে হয়। কিন্তু আমার বিপক্ষে কোনো প্রমাণ শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমার পরিবারও তো বিত্তশালী। এরপর সহসা মামলার ব্যাপারটা শেষ হয়ে যায়। তবে ...
-তবে কী? কবি জানতে চায়।
-একদিন কেয়ারটেকার হাসানের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে চমকে ওঠে। তাকে পেয়ে নানারকম প্রশ্ন করতে থাকি- কিন্তু সে কিছুই বলে না। যখন ওকে শক্ত করে চেপে ধরি, তখন সে জানায়, প্রজাপতির এ রকম ঘটনা আগেও বহুবার ঘটেছে। কিন্তু কোনোটাই শেষবারেরটার মতো নয়। প্রজাপতির দল আমার প্রেমিককে নিয়ে এভাবে গিলে ফেলে হাওয়া হয়ে যেত। তারপর সে ফেরত আসত দু'একদিন পর। কিন্তু আমার ঘটনাটা এমই ছিল যে, তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। এক মাস, দু'মাস, তিন মাস। তার পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে আমার ওপর মামলা করে। এরপর একদিন সে ফেরত আসে। তার পরিবার দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে পাঠিয়ে দিল।
এটুকু বলে বালিকা চুপ হয়ে যায়।
-তাহলে প্রতিবারই কি সে ...। কবি জানতে গিয়েও থামে।
বালিকা কবির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তারপর আর দেরি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

৬.
বালিকা বেরিয়ে গেলে কবি দেখে বনসাই গাছটা টেবিলেই থেকে গেছে। পরদিন কবি ফেরত দেবে বলে ব্যাগে ভরে ক্যাফেতে নিয়ে যায়। কিন্তু এদিন বালিকা আসে না। ক্যাফে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও নিচে কবি অপেক্ষা করে। বালিকাকে পাওয়া যায় না। কবি বাড়ি ফিরে বনসাইকে নিজের ছোট্ট বাগানে রেখে দেয়। পরদিন আবার নিয়ে যায় এবং যথারীতি বালিকা এদিনও অনুপস্থিত। কবির কাছে তো ঠিকানা নেই। নিরুপায় হয়ে গাছটা আবার ফেরত নিয়ে আসে। ফেরার পথে এদিন কবি ফুটপাতে বালিকার সঙ্গে দেখা হওয়ার দৃশ্যগুলোকে স্মৃতিতে আনার চেষ্টা করে। তার মনে হয় আজও বোধহয় সেদিনের মতো দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে না। কবি বনসাইয়ের দায় এবং হেমন্তের কুয়াশার মতো মিহি বিষণ্ণতা নিয়ে বাড়ি ফিরে। বনসাই গাছকে বাগানে এদিন রোপণ করে রাখে। পরদিন কবি আরেকটু বিষণ্ণ এবং উদভ্রান্তের মতো ক্যাফেতে পৌঁছে। ক্যাফেতে ততক্ষণে সবাই অপেক্ষা করে আছে কবির জন্য। কবি চারদিকে চোখ রেখে আজও কোথাও বালিকা দেখতে পায় না। এদিন তার বক্তৃতা এমন এলোমেলো হয়ে যায় যে, চারদিকে একটা শোরগোল শুরু হয়। ক্যাফে বন্ধ হওয়ার পর ম্যানেজার ডেকে বলে, আপনি বোধহয় অসুস্থ।
কবি কিছু চিন্তা না করে, মাথা নাড়ায়। মানে, হ্যাঁ।
-আপনার কয়েকদিন বিশ্রাম দরকার কবি।
কবি বলে, তার প্রয়োজন নেই।
-না, প্রয়োজন আছে। ম্যানেজার জোরের সঙ্গেই বলে।
কবি কথা না বাড়িয়ে সোজা বাড়ি চলে আসে। ক্লান্ত খুব, তবু মনে হয় একবার বাগানে যাওয়া দরকার। এমন পরিস্থিতিতে তো গাছগুলোই প্রতিবার সমাধান দেয়।
বাগানে গিয়ে কিন্তু কবিকে চমকে উঠতে হয়। দেখতে পায়, তার যে কটা গাছ আছে, সবগুলোই বনসাই হয়ে গেছে। তার হাত-পা কাঁপতে থাকে। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এখন তার কী করা উচিত!
পরদিন সন্ধ্যায় কবি ক্যাফেতে পৌঁছে দেখে মঞ্চ দখল করে আছে নতুন এক কবি। এক কাপ কফি অর্ডার করে ক্যাফের এক কর্নারে বসে পড়ে। ওয়েটার কফি দেয়ার সময় মনে হলো কবিকে চিনতে পারছে না। কবির অবশ্য সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বালিকাকে খুঁজে। কিন্তু কোথাও পায় না। ফলে বনসাইয়ের মতো একটা দায় এবং শীতের ঘন কুয়াশার মতো ভারি একটা বিষণ্ণতা নিয়ে বসে নতুন কবির মোটিভেশন শুনতে থাকে।

আরও পড়ুন

×