পর্ব-২০
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
ঊনসত্তর ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তান রাষ্ট্রটির কাঠামোকে এ মামলা এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে, তা থেকে পাকিস্তানিরা আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু এটা এমন না যে হঠাৎ করেই যখন এ মামলা শেষ হয়ে গেল, তখনই স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়ে গেল বা রাজনীতিবিদরা তার পরের দিন থেকেই স্বাধীনতার কথা বলতে লাগল। স্বাধীনতার বিষয়টা একটা দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতার অংশ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। মামলাটা শেষ হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, আন্দোলনের কারণে। কিন্তু স্বাধীনতার ইচ্ছাটি ঐতিহাসিকভাবে চলে আসছে এবং ১৯৪০ সালে সেটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই উত্থাপিত হয়েছে। অতএব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এটি পরবর্তী ব্যবস্থা নয়।
এ সময়ে এসে মূলত আন্দোলনটা চরম একটি পর্যায়ের দিকে এগিয়েছে। এই চরম পর্যায়ের ক্ষেত্রে ঊনসত্তর সালটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, মামলার সাথে সাথে পাকিস্তানের আইনি বাধাদানের প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যায়, সত্তরের নির্বাচনে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই যার পরিসমাপ্তি ঘটে। নির্বাচনের পর তাদের বাধা দেয়ার কাজটি গিয়ে পর্যবসিত হয় একেবারে সরাসরি গণহত্যায়, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চে। সত্তরের নির্বাচনেও তারা পাকিস্তানকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যেসব ভোট জিতে নেবেন এটা তারা ভাবতে পারেনি। তারা প্রথমে ভেবেছিল মামলা দিয়ে আইনের মাধ্যমে আটকে দিতে পারবে, কিন্তু সেটা না পেরে তারপর তারা ভাবলা নির্বাচনে পারবে। সেখানেও ব্যর্থ হলো। তাই তখন তারা রাজনৈকিতভাবে আর গেল না, গণহত্যার পথ বেছে নিল।
অন্য বিষয়টি হলো, পাকিস্তান যে সংকটের সমাধান করতে চেয়েছিল সেই সংকটটা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানের ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর কারণে। মামলা দিয়ে সংকটটি বরং আরও ঘনীভূত হলো। এ কারণে তারা এবার মামলাটাকেই বাদ দিয়ে দেয়।
শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যরা ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। এ-সংক্রান্ত প্রেসনোটে সরকারি তেমন কোনো বিষয়ে কিছু বলা হয়নি, শুধু বলা হয়েছিল মামলাটা উঠিয়ে নেয়া হলো এবং ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী এটি করা হলো। এ হলো আইনের কথা, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটি ছিল একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন। যে অর্জনের মধ্য দিয়ে তখনকার পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণরূপে শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের দিকে চলে যায়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা উচিত যে বাংলাদেশের অনেক বিতর্কে শেখ মুজিবুর রহমান বনাম মওলানা ভাসানী এসে যায়। কে কতটুকু স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন ইত্যাদি নিয়ে। আমার কাছে মনে হয়, দুজন কিছুটা হলেও দুই পরিসর থেকে রাজনীতিতে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতিতে ছিলেন, মওলানা ভাসানী ছিলেন সামাজিক রাজনীতিতে। এবং এ দুটো রাজনীতি সমন্বিত হয়েছিল এই দুজনের মাধ্যমে। আমি এখন পর্যন্ত এমন কোনো দলিল বা বক্তব্য পাইনি যেখানে বিশেষ করে স্বাধীনতার প্রশ্নে এ দুজন কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থানে ছিলেন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ইতিহাসের এ পর্যায়ে এ দুজন মানুষ একে অন্যকে বুঝতে পেরেছিলেন এবং ঐতিহাসিক ভূমিকাটাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়ে তার সাথে সাথে চলতে পেরেছিলেন।

নির্বাচনের রূপরেখা নির্মাণ
শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে সভায় বললেন যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব চাই। জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব মানে হচ্ছে যেই ব্যবস্থাটা পাকিস্তানের হাতে ছিল অর্থাৎ 'টু ইউনিট'-পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণটা মিলে এক ইউনিট এবং পশ্চিম পাকিস্তান যে চারটা প্রদেশ ছিল সেগুলো মিলে আরেকটি ইউনিট। এই দুই ইউনিটে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচন দিতে হবে। আওয়ামী লীগ এর আগেও এ বিষয়টির সমর্থন করেছিল।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯-এর সেই সভায়ই শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তারপর থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
এই যে তাদের ছেড়ে দেওয়া হলো জেল থেকে বা মামলা উঠিয়ে নেওয়া হলো-তার উদ্দেশ্য ছিল একটি সমঝোতামূলক সভা করা। পিন্ডিতে এই গোলটেবিল বৈঠক বা সভাটি হয়েছিল। মওলানা ভাসানী অবশ্য এর বিরোধিতা করেছিলেন। শেখ মুজিব সেই সভায় গিয়ে যেসব বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সেখানে শেখ মুজিব বলছেন একটি ফেডারেল পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির কথা। ফেডারেল বলতে কী বোঝায়? ফেডারেল মানে একটি কেন্দ্র থাকবে কিন্তু অন্যসব নীতি হবে যেটা ছয় দফায় বলা হয়েছে তার মত। সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ মৌলিক গণতন্ত্রের পতন। পূর্ব ও পশ্চিম মিলে ইউনিট হবে একটাই। অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলো প্রদেশ মিলে একটাই ইউনিট থাকবে। প্রতিটা প্রদেশকে পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিন্তু সেভাবেই হয়েছিল। কেউ যদি কষ্ট করে লাহোর প্রস্তাবটা পড়েন, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা পড়েন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা পড়েন-দেখবেন যে সব ক্ষেত্রেই এর বাইরে নতুন কোনো কিছু চাওয়া হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবে একটি রাষ্ট্র গঠন এবং পরিচালনার জন্য যা কিছু দরকার সেটাই কিন্তু দলগুলো চাচ্ছে রাষ্ট্রের কাছে। এবং সেটাই কিন্তু তারা পাচ্ছে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তারা খুব বেশি পরিমাণে পায়নি, ভারতের ক্ষেত্রেও পায়নি। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রগুলো যেভাবে গঠিত হয়েছে, সবাইকে অধিকার দেয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবাইকে অধিকার দিলে ক্ষমতা টেকে না বা শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর ভিত্তিই হচ্ছে অসম উন্নয়ন। এবং এ থেকে আমরা এখনও বেরিয়ে আসতে পারিনি। পারব কিনা সেটাও আমরা এখনও বলতে পারছি না।
রাজনীতির মূলধারায় বহু মতের সমন্বয়
গোলটেবিল বৈঠক করেও সমাধান হলো না। নতুন আন্দোলনের ঝামেলা এড়াতে তখন বাধ্য হয়েই ২৪ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা দিয়ে চলে যায়। আমাদের ইতিহাসের বড় একটি অধ্যায় শেষ হলো, পাকিস্তানের অধ্যায়। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন পাকিস্তানকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার জন্য, নির্বাচন দেওয়ার জন্যও নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও নয়।
এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বেশ তীব্র হয়ে উঠছে। চারদিকে স্বাধীনতার কথা শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন দল বিভিন্নভাবে স্বাধীনতার কথাই বলছে। কিন্তু মূল যে বিষয়টি, সেটি হচ্ছে পাকিস্তানের ভেতর দিয়েই এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সামরিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে রাজনীতি কোনদিকে যাচ্ছে? পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চায় তাদের টিকে থাকতে হলে নির্বাচনে যেতে হবে। কিন্তু নির্বাচন দিতে গেলে যে অবস্থা তা সামনে আসবে, সে অবস্থা তারা সামাল দিতে পারবে কিনা-সে প্রশ্নটাও রয়েছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘোষণা হচ্ছে। এবং ১৯৬৯ সালের ১ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। অর্থাৎ ইশতেহার। এটি ছিল একটি মৌলিক দলিল। এ ইশতেহার পড়লে যে কেউ তৎকালীন বাস্তবতা ও দলটি সম্পর্কে জানতে পারবে। আমি এখানে কেবল একটি বিষয়ে বলতে চাই যে, আওয়ামী লীগ দলটি দলের চেয়ে বেশি অনেকগুলো মতের একত্রীকরণ। এবং একাত্তর পূর্ব আওয়ামী লীগের সাফল্য এ জায়গায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের শক্তি ও মতবাদের তারা একত্রীকরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মূলধারাটি যখন এতটা পুষ্ট হয়, রাজনীতি তখন সেই মূলধারার অধীনেই চলে আসে। অন্যান্য বামপন্থী দলও যে কথাটা বলছে।
আওয়ামী লীগ তাদের অর্থনৈতিক আদর্শে যে কথাটা বলছে তা হলো, 'সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করার মাধ্যমে বর্তমান শোষণ বৈষম্য অবিচার ও দুর্দশার হাত হইতে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব বলিয়া আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকালে সমাজব্যবস্থা কায়েম করা আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত লক্ষ্য।' এবং তাহলে সে সময়ে বামপন্থী দলগুলো যে কথাবার্তা বলছে, মোটা দাগে আওয়ামী লীগও তাই বলছে। তার বাইরে তো আর কোনো কথা নেই। অর্থাৎ, এই যে মূলধারা গঠনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্যরা মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-এর সঙ্গে কারও পক্ষেই পেরে ওঠা সম্ভব হয়নি। তারা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি একটি চিন্তা প্রতিষ্ঠা করছেন, যেটা পাকিস্তান বজায় থাকলে সেই পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও যেমন প্রযোজ্য ছিল, তেমনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যেও তা প্রযোজ্য। আওয়ামী লীগ তথা তৎকালীন মূলধারার এই যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিষয়টা-যেটা নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক হয়, যা নিয়ে বিতর্ক আওয়ামী লীগের ভেতরেও ছিল। তবে শেখ মুজিবুর রহমান মূলত মধ্যপন্থী হিসেবেই ছিলেন।

নির্বাচন হবে কোন পথে?
নভেম্বরের ২৮ তারিখে ইয়াহিয়া খান বক্তৃতা দিচ্ছেন-এখানে নির্বাচন হবে। যেটা লক্ষণীয় সেটা হলো, বক্তৃতায় একটা জায়গায় ইয়াহিয়া বলছেন, কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে। এখানে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তারা যে ক্ষুব্ধ এবং ক্ষুণ্ণ-এটাকে তিনি ন্যায্য মনে করেন। এ কারণে যতদূর সম্ভব স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু একই সাথে পাকিস্তানের যে অখণ্ডতা, যে সার্বভৌমত্ব-সেটাকে রক্ষা করে স্বায়ত্তশাসনটা দেয়া সম্ভব। শেষের এই কথাটা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত বলেছে যে, এই অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে না বলেই তারা পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ করেছে, অর্থাৎ গণহত্যাটা শুরু করেছে।
ইয়াহিয়া খান স্বীকার করছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর অন্যায্যতা হয়েছে। নানা রকম প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তাদের ভাবনাটা চলছে কিন্তু অন্যদিকে, মূল ভাবনাটা আসলে কীভাবে তারা নির্বাচনটা করবে।

লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি
২৯ মার্চ ১৯৭০-এ গঠিত হয় 'লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি'। এই কমিটিতে থাকা নামগুলো দেখলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। যিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি। এবং করপোরাল এবিএম আবদুস সামাদ। এরা সবাই সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন সদস্য। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, যিনি সাংগঠনিক সম্পাদক। এমএস সুলতান উদ্দীন আহমেদ এবং সার্জেন্ট আবদুল জলিল যিনি যুগ্ম সম্পাদক; সুবেদার তাজুল ইসলাম, রিসালদার শামসুল হক, এমএস নূর মোহাম্মদ, ফ্লাইট সার্জেন্ট আব্দুর রাজ্জাক এবং এবিএম খুরশিদ সদস্য মনোনীত হয়েছেন।
বোঝাই যাচ্ছে এরা সবাই প্রাক্তন সামরিক বাহিনী সদস্য। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীর একটি অংশ একাত্তরের ২৫ মার্চের আগেই কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অতএব ধারাবাহিকতার দিক থেকে বাদ পড়ে যাওয়া বা ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর পরেই সব সৃষ্টি হয়েছে-ব্যাপারটা তা নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের এই ধারাবহিকতা চলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সংগঠিত তা ১৯৬৬ সালে হয়েছে-সেখানেও এরা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মামলা উঠিয়ে নেওয়ার পরে এসেও তারা আবার একই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
স্বাধীনতার সব আন্দোলনকে বৈধতা দিল সত্তরের নির্বাচন
আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে দেখতে হবে বড় চোখ দিয়ে। যেখানে নানাদিক থেকে নানা ধারা এসে মিলিত হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে একের পর এক প্রবাহের মাধ্যমে স্বাধীনতার এ আন্দোলন এগিয়ে গেছে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা, সেনাবাহিনীর সদস্য যারা রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার রাজনীতি করতে চাচ্ছে তাদের ধারা, সিভিলিয়ান রাজনীতির ধারা-এই প্রত্যেকের ধারা এসে এক জায়গায় মিলিত হয়েছে। নির্বাচনটা তখনও হয়নি। কিন্তু দেশ জাতি জনগণ তখন উন্মুখ।
সত্তরের ৩০ মার্চ লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার বা এলএফও প্রণয়ন করা হয়। তাতে বর্ণিত নীতিগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এখানে এক জায়গায় বলা ছিল নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক সংবিধানই শেষ কথা আর যার শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রেসিডেন্টের হাতে। এসব বিষয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তার পরেও মানুষ যখন নির্বাচনটাই চাচ্ছে তখন বোঝা যাচ্ছে যে নির্বাচনটা কেবল ক্ষমতার জন্য হচ্ছে না, পরিস্থিতির কারণে এবং ওই পর্যায়ে গিয়ে নির্বাচন ছাড়া মানুষের সামনে আর কোনো পথ নেই। মানুষ এই সুযোগ গ্রহণ করতে চায়। অস্বীকার না করে সুযোগ গ্রহণ করার মাধ্যমেই পরবর্তী সময়ে সাবল্যটা তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচনটি হয়েছিল একটি ইউনিটের ভিত্তিতে। তার মানে সামগ্রিকভাবে এক পাকিস্তানের নির্বাচন। আর জনসংখ্যার ভিত্তিতে পাকিস্তানের ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছিল ১৬২টি আসন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্ত দল পুরো পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে। এখানে লক্ষণীয় ঘটনা হচ্ছে যে আগেও কিন্তু একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের আগের বাংলায়। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারাই রাজক্ষমতায় আসবে। সেখানেও ভোটটাই সিদ্ধান্ত দিয়েছে তিরিশ ও চল্লিশ দশকের রাজনীতিতে। সেটাকে যদিও আটকে দেয়া হয়েছে, ভেঙে ফেলা হয়েছে। ১৯৭০ সালে এসেও ভোটের ভূমিকাটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। ভোটটাই এবার স্বাধীনতার জন্য করা বাকি সব আন্দোলনের বৈধতাটাকে নিশ্চিত করে দিচ্ছে।
[ক্রমশ]