- ব্যক্তিগত জীবনে কোন ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
-- আমার আব্বা অনেক ধার্মিক ছিলেন, আম্মা গ্রাম থেকে আসা মানুষ। বাবা সপ্তাহে সপ্তাহে চলে যেতেন, ৭ দিন ৮ দিন তাঁর কোনো খোঁজ থাকত না, কিন্তু আব্বা আমার অনেক প্রিয় মানুষ। পয়সাপাতি দিয়ে যেতেন না, না খেয়ে থাকতাম। আমার আম্মা মানুষটা আমাদের স্বার্থে তার নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিয়ে আমাদের আগলে রাখতেন। এই ঘটনাটা আমাকে প্রভাবিত করে।
-আত্মপ্রকাশলগ্নে কোনো প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে কি?
--আমি আসলে ভাগ্যবান। আমার কাছে মনে হয় এটা আমার মনের জোর, যা আমাকে ভাগ্যবান বানিয়েছে। যখন লেখালেখি করতাম পাড়ার মানুষরা বলত, এ বাসায় কেন ছেলেরা আসে। তখন আমার বেশিরভাগ সময় ছেলেদের সাথে উঠাবসা হতো। যখন তাঁরা বলত আমি ডোন্ট কেয়ার করতাম।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে সাহিত্য পাতায় তখন মহিলাদের লেখা ছাপা হতো না খুব একটা। আমি ভাবতাম বছরে আমার একটা লেখা অন্তত ছাপা হতে হবে সাহিত্য পাতায়। আমি মহিলা পাতায় লিখব না। আমার মনে হয় আমার প্রতিবন্ধকতাগুলোকে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তাড়াতে পেরেছি।
-প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?
--আমার প্রথম বই যখন বের হয়, মাত্রই চার রঙের প্রচ্ছদ এসেছে। আমার বরের বদলি হবার কারণে তখন চলে যেতে হয়েছিল সিলেটে। প্রথম বই প্রকাশের আনন্দে সিলেট থেকে প্লেনে ঢাকা চলে এসেছিলাম। বই মেলায় এসে যখন প্রথম বইটা হাতে নিলাম, মনে হয়েছিল বইটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে। প্রচ্ছদ যেমনটা আশা করেছিলাম তেমনটা হয়নি। এটা খুবই খারাপ লেগেছিল এবং আমি কান্না করে দিয়েছিলাম।
-এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
--আমি একটা পর্যায়ে গিয়ে অনুভব করলাম আমার এত উপন্যাস, গল্প লেখা ঠিক হয়নি, আরো কম লেখা উচিত ছিল। আমার আগে থেকে মনে হতো আমি কবিতা বুঝি। এটা প্রথমবার বলছি। কখনও মনে হয়নি আমার কোনো লেখাকে আমি বাতিল করি। কবিতায় আসার পর মনে হলো নিজের বানানো কবিতা আমার গল্প-উপন্যাসে লেখা ঠিক হয়নি। সেগুলো বাতিল করে আমি এখন শুধুই কবিতা লিখছি। কারণ, কবিতাগুলো উপলব্ধি থেকে আসে।
-কোন বই বারবার পড়েন?
--একটা বই কোনোদিন বারবার পড়তে পারি না। আমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট'। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আমাকে টানে। তবে যে লেখাগুলো আমাকে টানে- একদম কাঁপিয়ে ফেলে। সেগুলো আমি দ্বিতীয়বার পড়তে পারি না। আমার বরং জীবনানন্দ দাশের কবিতা বারবার পড়তে ইচ্ছা করে।
-তাহলে কি বলব, প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ?
--অবশ্যই।
-ব্যক্তিজীবনের সীমাবদ্ধতা, যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
--না, নেই। একটা কথা কি, আমি ভাগ্যবান আশরাফ আহমেদ আমার স্বামী। সে একজন কবি। আমার জীবনে কত মানুষের কত সীমাবদ্ধতার কথা শুনেছি আমি, কিন্তু আমি পরকীয়া নিয়ে, এই নিয়ে, সেই নিয়ে অনেক লেখা লিখেছি। আশরাফ আমাকে কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করেনি। সুতরাং লেখক হিসেবে আমার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে মনে হয় যে রাতের শহরে যদি ঘুরে বেড়াতে পারতাম।
-আপনার চরিত্রের কোন দিকটি আপনি শক্তিশালী মনে করেন?
--আমার মনের জোর।
-আপনার সম্পর্কে শোনা অভিযোগ এবং প্রিয়জনদের থেকে শোনা প্রশংসা বাক্য কোনটি?
--প্রশংসা বলতে শুনেছি আমি অনেক সরল। একইভাবে সীমাবদ্ধতা বলতে গেলে সেটাও আমি অনেক সরল। মা বলতো তুমি এত সরল, তুমি বুঝবা না এগুলা। আমার সবচেয়ে বড় কথা হলো আমি মানুষকে অনেক বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করে ঠকিনি এই পর্যন্ত।
-কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
--আমার লক্ষ্য ছিল দুটি। আমার গানের গলা ভালো ছিল একসময়, একটা ইনফেকশন হওয়ার পরে গলাটা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রথমত গানের শিল্পী হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করতাম আমি মঞ্চে গান গাচ্ছি আর দর্শক আমাকে গ্রহণ করছে। পরে একটা সময় মনে হয়েছিল আমি অভিনয় শিল্পী হব। লেখক হওয়াটা ছিল আমার বাবার টার্গেট, বাবা চাইতেন আমি লেখক হই। কিন্তু আমি লেখক হতে না চাইতেই লেখক হয়ে গেছি। লেখক হওয়া আমার তৃতীয় ইচ্ছা ছিল। এখন মনে হয় এটাই ভালো হয়েছে। গানের গলা তো আগেই নষ্ট হয়েছে, অভিনয় করলে কান্নাকাটিতেই থাকতাম।
-আপনার প্রিয় উদ্ধৃতি?
--পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়।
-জীবনকে কেমন মনে হয়?
--জীবনকে অসাধারণ, অনবদ্য মনে হয়। আমি মনে করি জীবন একটাই। জীবন উদযাপনের নাম। প্রতিটি মুহূর্তে সীমাহীন অনুভবে বাঁচার নাম জীবন। একটা জীবনে কোনোভাবেই জীবনকে অপচয় করা উচিত না।
-আপনার এপিটাফে কী লেখা থাকবে?
--আমি মনে করি আমার কোনো এপিটাফ থাকবে না। কারণ, মারা যাবার পরও একজন মানুষের জায়গা দখল করার কোনো অধিকার নেই। আমি চাই আমি যে কবরে শায়িত আছি সেখানে আরও মানুষ শায়িত হোক।
গ্রন্থনা ::গোলাম কিবরিয়া