পারলৌকিক এলিভেটর
মধ্যবিত্তরা যখন লিফটে চড়েন তখন সেটা একটা দেখার মতো বিষয় হয়। এটা একটা বাহুল্য কথাই হলো অবশ্য। বাংলাদেশে তেমন কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া অবশ্যই গরিব লোকে লিফটে চড়েন না। বাড়ি সাত তলা হলেও কিছু কিছু বাড়িতে লিফটের পাশে পরিস্কার করে লেখা থাকে- 'বুয়াদের লিফটে ওঠা মানা'। গৃহশ্রমিকরা সেটা পড়তে পারুন বা না পারুন, নিয়মটা তারা অনায়াসেই জেনে যান। আর কিছুতেই এই রাজহুকুমের বরখেলাপ তারা করেন না। সম্ভবত ঈদের (ইদ, যাতে আপনাদের সন্দেহ দূর হয় যে বাংলা একাডেমির হুকুম আমি জানি কিনা) দিন এই বিধি লঙ্ঘনের একমাত্র সুযোগ ঘটে। ঈশ্বরের রাজ্য আসলেই দয়ার রাজ্য! যাহোক, কথা তাদের নিয়ে হচ্ছিল না। শিল্পপতি প্রমুখ ছাড়া যাদের চড়ার কথা তাদের নিয়েই বলছি। মুখ্যত চাকরিজীবী বা মাঝারি ব্যবসায়ী মধ্যবিত্ত। বলছিলাম দেখার মতো দৃশ্য হয় লিফটে। এটা দেখার জন্য আপনার নিজেরও সেখানে থাকতে হবে অবশ্য। এর বাইরে যে সুযোগ থাকছে তা হলো যদি লিফটের মধ্যেও একখানা সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো থাকে। আমার ঢাকার অভিজ্ঞতা বলে না যে খুব সাধ করে লিফটের মধ্যে একখান সিসিটিভি ক্যামেরা কেউ বসান। সেটা বাহুল্য বিবেচনা করে মালিকেরা এড়ান নাকি ক্যামেরার তারফারের সাথে লিফটের হরদম ওঠানামার সাংঘর্ষিক সম্পর্কের কারণে, সে বিষয়ে আমি কখনো গবেষণা করিনি। কিছু হরর আর থ্রিলার ছায়াছবিতে লিফট অতিশয় একটা ঘটনক্ষেত্র। সেগুলো নিয়ে আলাপ করতে বসলে আর আজকের প্রতিপাদ্যই ভেস্তে যাবে।
লিফটে ওঠার সাথে সাথেই অন্য সকলের থেকে নিজের দেহকে বাঁচিয়ে রাখার একটা মহা কসরত চলতে থাকে। খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে এটা যে সর্বদা নিজের দেহের প্রতি মায়া তা নয়; বরং অন্যান্য দেহের মালিকের যাতে সল্ফ্ভ্রমহানি না হয় সেদিকেও মনোযোগ হিসেবে এই কসরতকে দেখতে হবে। সব মিলে এটা একটা শরিকি বা মিউচুয়েল ব্যবস্থা যেখানে সকলে যুগপৎ ওই স্টিলের বাকশোটার মধ্যে নিজেদের শরীরগুলোকে অস্পৃশ্য করে রাখার বেসম্ভব একটা কসরত করতে থাকেন। তবে আলোচ্য লিফটিতে যদি দুয়েকজন নারী যাত্রী থেকে থাকেন, তারা এই প্রস্তাবকে সর্বতোভাবে সমর্থন নাও করতে পারেন। স্পর্শ এড়ানোজনিত এই বিধান গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করার দু'চারজন পুরুষকে তারা পেতে থাকেন বলে জানান। আর তাদের দাবিকে খারিজ করার মতো অনেক সুবিধা সমাজে পাওয়া যায় না। লিঙ্গাত্মক এই পরিস্থিতিটাও আজ খোলাসা না করে থাকতে হচ্ছে। আমি আবারো পাঠককে লিঙ্গহীন একটা দশার কথা কল্পনা করতে বলি। শরীরকে স্পর্শ থেকে বাঁচানো (বা তার অসম্ভব চেষ্টা) মাত্র একটা পালনীয় বিধান লিফটে। আরো আছে। সমস্যা হলো অধিকাংশ মানুষেরই দুইটা করে চোখ থাকে এবং সে দুটো কোথায় স্থাপন করা হবে এই বিষয়ক দুশ্চিন্তা এরপর আপনার হবেই। কোনোমতে আপনি দুই হাত একত্র জড়ো করে কুঁকড়ে এমন জায়গায় রেখে শরীর-বাঁচানি সারছেন, অন্য সময়ে যেখানে আপনি দুই হাত জড়ো করে রাখার কথা চিন্তাও করতেন না। তখন চোখ দুটোকে স্থাপনের কোনো আরামদায়ক ব্যবস্থা খুঁজে না পেয়ে সাধারণত সকলেই লিফটের ছাদের দিকে স্থাপন করেন। এই অবস্থা আরও দুরবস্থার হয় যেসব লিফটে আয়না কিংবা আয়নাসম চকচকে দেয়াল। তবু দুই চোখ সাধারণত একই দিকে ধাবিত হয় বলে, হাতের থেকে তা জড়ো করা কম আয়াসের। এই দুরূহ অঙ্গসঞ্চালনসমেত ঊর্ধ্বলোকে তাকিয়ে থাকা লিফটের যাত্রীদের সামান্য ওই কয়েক সেকেন্ডকেও মহাকাল এমনকি পরকাল মনে হতে থাকে।
অচেনাকে ভয় আর বিবিধার্থ
আগের দৃশ্যকল্পটি পরিশেষে সংশয়ের একটা কড়া চিত্র। এমন এক সংশয় যার মুখোমুখি এই রচনার পাঠকদের সিংহভাগই হয়েছেন কখনো না কখনো, কোথাও না কোথাও। এই সংশয় মুখ্যত আত্মমর্যাদাবোধের। আরও নিশ্চিত করে বললে, আত্মমর্যাদা নাশের সংশয়। যেসব মানদণ্ড এই শ্রেণি স্বগোষ্ঠীর জন্য খাড়া করে রেখেছে সেগুলোর নিঃশর্ত প্রতিপালন করতে করতে এই দশাটা সবাই মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন। আপাতগ্রাহ্যে এ রকম নিরীহ কৌতুকপ্রদ একটা দৃশ্য বাছাই করে নিলাম আমার তরফে খুবই স্পষ্ট একটা লক্ষ্য নিয়ে। লক্ষ্যটি হচ্ছে ওই মানদণ্ডগুলোর দিকে দৃকপাত করা। একটা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক-সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যকার মানদণ্ডগুলো ছাড়া এসব অনুভূতির সোজাসাপ্টা আলোচনার আমি পক্ষপাতী নই।
সাহিত্য কিংবা জনপ্রিয় দর্শনে সারাক্ষণই অচেনাকে স্বাগত জানাতে বলা হয়। মানুষের নয়া নয়া অভিযানের গৌরববাহী গল্পগুলোও দাঁড়িয়ে আছে এই অজানা-অচেনাকে 'জয়' করার উপাদান সাজিয়ে। ইংরেজিতে যাকে অ্যাডভেঞ্চার বলা হয়ে থাকে সেসব অভিযানও বস্তুত অজানা-অচেনাকে বিজিত বানানোর প্রক্রিয়াই। মনে হতে পারে, এসব মনুষ্য-অভিযান হয়তো সমকালীন বিষয়, যদি আমরা অসতর্কভাবে ভাবি। কিন্তু মানুষের ইতিহাস বলে, তা একেবারেই নয়। গহীন জঙ্গল থেকে পর্বতের চূড়া, বরফঢাকা মহাদেশ থেকে মহাকাশ-ইতিহাসে হাজার হাজার বছর ধরে অজস্র মনুষ্য-অভিযান অচেনাকে পরাভূত করতে সাধিত হয়েছে। কিন্তু যে কারণে এটা এই মুহূর্তে উত্থাপন করলাম তা হচ্ছে অজানা-অচেনা বিষয়ে মানুষের আগ্রহ নিয়ে যেসব গৌরবগাথা চালু আছে, তা আসলে জড়জগৎ সম্বন্ধে যতটা খাটে তা কিছুতেই জীবজগতের ক্ষেত্রে খাটে না। জীবজগৎ অকাতরে মানুষের হাতে নিধন হয়েছে। কিন্তু সে প্রসঙ্গও থাক। জীবজগতের একটা প্রজাতি হিসেবে মানুষ তার স্বজাতির কাছ থেকে বিশেষ কোনো সুবিধাজনক আচরণ পায়নি। উপনিবেশের আলাপ এখন কোনো অজুহাতেই কেউ না-করে পারেন না। এ অঞ্চলের মানুষ সেই বিরল উপনিবেশিতদের অংশ, যারা ব্যাপক হারে নিহত হননি। হত্যা ও উচ্ছেদের অভিজ্ঞতা আছে আফ্রিকীয় কিংবা অস্ট্রেলীয় মার্কিনের আদিবাসীদের। অচেনা মানুষের সাথে প্রীতিময় সম্পর্কের ইতিহাস দুনিয়াতে আছে। কিন্তু অচেনাকে 'জয়' করার প্রশ্ন মনুষ্যকুলকে মূলত নিহত ও হূত বানিয়ে ছেড়েছে। এই বৃহৎ ইতিহাসের সাথে হয়তো আপনার ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে এসে পড়া অচেনা আগন্তুকের কোনো সম্বন্ধ নেই, কিন্তু যে পরিমাণ আতঙ্ক বিদ্বেষ সংশয় আর প্রতিপক্ষতা নিয়ে সাধারণত এই আগন্তুককে সামলানো হয়ে থাকে, সেটা উল্লেখ করার সময়ে মনুষ্য-নিধনের ইতিহাস স্মরণ করা অন্যায্য মনে হয় না আমার। আমার মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে সাহিত্য আর দর্শনের মুখস্থের মতো মহত্ত্বধর্মী কথাগুলোও।
এই প্রতিপক্ষতা আর ঘৃণা বহুগুণ বেড়ে যায় যদি কোনো কারণে অচেনা আগন্তুকটি হন একজন গরিব মানুষ। তার পোশাক-আশাক, তার হতবিহ্বল ভঙ্গি, তার কুণ্ঠা, তার এই শহরটিতে নূ্যনতম কোনো সহায়-সম্পদ না থাকা, এমনকি পরিচয়ের সম্পদও না থাকা সমেত তিনি যখন কোনো কারণে আপনার আমার বাসস্থান কিংবা কর্মক্ষেত্রের বাইরে এসে ইতিউতি তাকাতে থাকেন, তখন পৃথিবীর দূরতম সব কল্পনা করে সকল প্রকার ঘৃণা আর বিদ্বেষ সমেত লোকটার দিকে তাকানো হয়। এর সরল নাম দেয়া হয় সতর্কতা, কিংবা সন্দেহ। যদি অমূলক বলে প্রতিপন্ন হয়, যদি কেউ এই মনুষ্য-আচরণের সমালোচনা করেন তাহলে মধ্যবিত্ত স্বগোষ্ঠী তার নাম দেন 'সতর্কতা'। আর যদি কোনো কারণে এই অচেনা-আগন্তুক কোনো একটা লক্ষণযোগ্য দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারেন, এমনকি কোনো বোধগম্য 'অপরাধ' করারও দরকার নেই, নিছকই 'মানদণ্ডের লঙ্ঘন' করে বসেন, অমনি সকলে একযোগে ঘোষণা দেবেন, 'তখনই সন্দেহ করেছিলাম।' সংশয়, দ্বিধা, ভয়, সন্ত্রস্ততার বোধ, ঘৃণা, ঈর্ষা, অনিশ্চয়তার বোধ নানান ধরনের অনুভূতির ক্ষেত্রেই এ শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন আমাদের পরিচিত মানুষজন। অবশ্যই সমার্থক শব্দের তালিকাতে বসাতে পারব না আমি। কিন্তু প্রয়োগে এসব ঘটে থাকে। কখনো কখনো সম্ভাবনা বা আশাবাদের সময়েও ব্যবহার হয়ে থাকে। অবশ্যই খুব গোলযোগের প্রয়োগ; কিন্তু মানুষ খুশিমনে বলে বসেন :'আমার কালকে তোমার গলা শুনেই সন্দেহ হয়েছিল, চলে আসবা আজকে।'
অধিকারীর প্রশ্নাতীত বোধ
অপরাধশাস্ত্রের বৃহত্তর পরিমণ্ডলে 'সন্দেহ' অতীব ক্রিয়াশীল পদবাচ্য। আইনি চর্চাকার, পুলিশ-গোয়েন্দা, বিচার বিভাগ সবাই মিলে যে রাজ্যটার অধিকর্তা সেটার কথা হচ্ছে। যেহেতু কিছু লোকে গোয়েন্দা কাহিনি লিখে থাকেন আর কিছু লোকে অপরাধ-বিষয়ক সাংবাদিকতা করে থাকেন, চাইলে তাদেরকেও এই বর্গে আমরা রেখে ভাবতে পারি। 'সন্দেহ' সেখানে ডিডাকশনের পদ্ধতিগত পথ। আবার দরকারমতো মারাত্মক ম্যানিপুলেটিভ। 'সন্দেহমুক্ত' হবার জন্য তখন আদমটিকে যারপরনাই মোচড়ামুচড়ি করতে হবে। তবে 'সন্দেহ' একটা পদবাচ্য হিসাবে যখনই আবির্ভূত হয় তখন প্রায় কোনোরকম ব্যতিক্রম ছাড়াই তা মনোযৌনজ ক্ষেত্রেই অধিক ইঙ্গিতবহ। সম্ভবত এবারের কালের খেয়া সংখ্যার প্রস্তাবনার সময়েও সেটাই মুখ্য বিবেচ্য থেকেছে। সম্ভবত। মনোযৌনজ পাটাতন নিয়ে বৃহত্তর সাহিত্যকর্মীদের বরাবরই মেলারকম টান। বোঝাবুঝির পাটাতন যাই হোক, অভিব্যক্তির ধরন যেমনই হোক, এই বিষয়ে সাহিত্যকর্মীদের বিশদ নড়াচড়া ঘটতে থাকে। তাদের কথাসাহিত্যের উপাদান এটা, তাদের কাব্যগুণের অন্যতম চালিকাশক্তি এটা, তাদের প্রবন্ধ-পর্যালোচনার অন্যতম আবিস্কারক্ষেত্র এটা। তাদের বাইরে মনোযৌনজ ক্ষেত্র নিয়ে আর যেসব পেশাজীবীর আগ্রহ থাকতে পারে, তারা হলেন মনোশাস্ত্রবিদ, মনোচিকিৎসাবিদ, যৌনচিকিৎসকদের একাংশ প্রমুখ। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যকর্মী নন এমনরা 'সন্দেহ' পদবাচ্যটির এরকম প্রয়োগ ঘটান না, তা নয় একদম। উল্টো, যাদেরকে 'সাধারণ' বলা হয়ে থাকে তারাই এটার সর্বোচ্চ প্রয়োগকারী। প্রায়শ, বিষমযৌন দাম্পত্যের মধ্যে মুখ্য একটা অস্ত্র ও স্তম্ভ এই 'সন্দেহ'। বিষমযৌন বা হেটারোসেক্সুয়েল আলাদা করে বললাম, কিংবা দাম্পত্য আলাদা করলাম সেটা বড়জোর আলাপটাকে একটা সীমানার মধ্যে রাখতে। না হলে আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নাই যে, সমলিঙ্গীয় সম্পর্কেও এই টানাপোড়েন শক্তিশালীভাবে থাকতে পারে। আর বিবাহ ও অবিবাহের পার্থক্যও অতি সামান্য। নাই বললেই চলে, যদি 'প্রেমযুগল'কে এই আলোচনার অধীন বানাই। পরিশেষে, সকল ক্ষেত্রেই প্রশ্নটা যৌনতা ও তথাকথিত 'হৃদয়ের' উপর একচ্ছত্র মালিকানার সাথে সম্পর্কিত। অধিকারীর কর্তৃত্ববোধের দোলাচল হচ্ছে সন্দেহ।
প্রেমিক বা প্রেমিকা কিংবা বউ বা বরের তথাকথিত হৃদয় আর শরীরের উপর পূর্ণ-মালিকানা (একচ্ছত্র অধিকার অর্থে) আসলে এই সম্পর্কগুলোর মৌলিক ভিত্তি, এমনকি মৌলিক শর্ত। এ কথা ঠিকই যে, বর ও বউয়ের সম্পর্কের রূপরেখা যে রকম স্পষ্ট বোধগম্য, আইনি পাটাতনের কারণে, কিংবা ঈশ্বরের বিধানের কারণে, কিছুতেই প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক ততটা বোধগম্য নয়। (বউ-বউ বা বর-বর সম্পর্কের বেলাতেও তাই; কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশের প্রচলিত আইন এখনো এ রকম দম্পতি কবুল করে না তাই স্বতন্ত্র রাখতে হচ্ছে।) লোকজন এত এত শত শত কর্মকাণ্ডকে 'প্রেম' নামে চালিয়ে থাকেন! বর-বউয়ের কর্তব্যজগৎ সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাকৃত আর প্রেমিক-প্রেমিকার তা নয়। তা সত্ত্বেও মনোযৌনজ জগতের ব্যাকরণ এ দুই পক্ষের গুরুতরভাবে ভিন্ন নয় বলে আমি দাবি করছি; এবং নিজ দায়িত্বেই করছি। ঠিক এভাবে ভাবতে থাকলে আমরা অনায়াসেই টের পাব, সন্দেহ তাহলে গভীরভাবে নিবদ্ধ এক মালিকানার বোধ, মালিকানার সাথে কাঠামোগতভাবে সমন্বিত একটা অনিশ্চয়তার বোধ। আর এর (সন্দেহ) রূপগ্রহণের কালে গুরুতর সব অধিকল্পনা বা ফ্যান্টাসি কাজ করতে থাকে। কর্তৃত্বাধীন দেহ-মনের সত্তাটি যথেষ্ট পরিমাণে আয়ত্তে আছে কিনা তার অমীমাংসিত মস্তিস্কপ্রবাহ এটা; অশান্তির বিধিলিপি। কত কী হয়ে থাকতে পারে, তা ভাবতে-ভাবতে, ভাবতে-ভাবতে, ভাবতে-ভাবতে, এবং ভেবে কূলকিনারা না-পেয়ে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সব দৃশ্যরূপ রচনা করতে থাকেন কর্তালোকটি। তাঁর অশান্তি ততক্ষণে বহুগুণে বেড়ে গিয়ে লোকসমাজে দৃষ্ট। পরিশেষে, নিশ্চিত হতে পারেন যে 'সন্দেহ' আসলে কর্তাটির যথেষ্ট কর্তাগিরির অনিশ্চয়তার একটা ঘোষণাপত্র মাত্র। আর যে অশান্তির তিনি ধারক, সেই অশান্তির তিনি কারকও বটে। তার সম্মুখে থাকা মানুষটির, এমনকি ঈশ্বরের হুকুমে পাওয়া সাথিটির পক্ষেও, শান্তিতে থাকার কোনোই কারণ নাই তা সেই সাথিটি চুক্তির বাইরের কাউকে কোলাকুলি-চুমাচুমি করে আসুন আর কখনোই তা স্বপ্নেও না-ভেবে থাকুন না কেন। 'সন্দেহ' তাই বাসনার মনোপলির ঘোষণা।
বাক্যে বা হাস্যে ইতি
ওই যে এলেভেটরখানি। ওর মধ্যে আমি থাকলেই প্রায়শ পরিস্থিতি বদলে যায়। আমি অচেনা মানুষের দিকে তাকিয়েও হাসতে পারি। সলাজ নয়, সহিংস নয়, বার্তাবাহী নয়, বিদ্রুপ বা তামাশা তো নয়ই; নিছকই একটা উদ্দেশ্যহীন হাসি; বড়জোর আস্থাবাহী হাসি। কিংবা আমি একটা বাক্য বলি, কখনো হয়তো দুই শব্দের বাক্য। প্রায়শ কারো দিকে নয়। সাহিত্যে যাকে বলে স্বগতোক্তি। কিংবা গ্রিকনাটকের কোরাসের ভূমিকাই একা-একা পালন। দীর্ঘমাপের নয় অবশ্যই, সীমিত পরিসরে; হয়তো সকলেই যে নিরীহ লিফট-ছাদে প্রাণপণ তাকিয়ে সেকেন্ডকে ঘণ্টার মতো পার করছেন, সেই একই ছাদটার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু যেখানে আমার ভূমিকাটা গ্রিক নাটকের কোরাস কিংবা (সাবেক) যাত্রাদলের বিবেক হয়ে পড়ে (বা ওঠে) তা হলো অমোঘ সত্যটির ঘোষণা। আমি হয়তো ওইটাই বলি 'লিফটে সবাই এত শক্ত থাকেন'। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু পরিস্থিতির রদবদল ঘটে। কিছু দেহশৈথিল্য লক্ষ্য করা যায়, দু'চারজনের হাসিও। তবে সকলেই যে আমাকে গ্রিক-কোরাস মর্যাদায় নেন তা বলব না। কেউ কেউ মি. বিন সাব্যস্ত করে থাকতে পারেন। তাদের চোখ সে কথা বলে। আর তাতেও আমার ফুর্তিভাব বা গৌরব কিছুই কমে না।
এখন কেউ এসে যদি আমাকে পাকড়াও করে বলেন :'সবকিছু এমন সহজ পেয়েছো? এভাবে ঘরের সন্দেহ যাবে? রাষ্ট্র পরিচালনা হবে?'-আমার অনেক কিছু বলার থাকবে না। আসলেই তো! এখন হবু যদি ভাবতে থাকেন, ভাই গবুর ছেলে রাজ্যপাট দখল করার ষড়যন্ত্র করছে; তাহলে এই সন্দেহ হেসে-হেসে গবুচন্দ্র বা তার পুত্র কীভাবে দূর করবেন! ওদিকে গবুর ছেলে চৌকস, বিচক্ষণ এবং নেতৃত্বদক্ষ হলে সেটা হবুচন্দ্রের নিজেরও চাচা হিসাবে না-টের পাবার কারণ নাই। এদিকে গবু তার আখাম্বা ও আধাবুদ্ধির গোঁয়ার ছেলেটাকে যতই মার্কেটিং করুক, আর সাইবার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে রাখুন, বাস্তবে সেই ইমেজ হয়তো তৈরি হচ্ছে না! এ রকম জটিল সময়ে হবুর সন্দেহ দূর করার মন্ত্র আমার জানা নাই। তখন হয়তো হবু আর গবু সারাক্ষণ জনদরবারে হাজির হয়ে বলতে থাকলেন, 'আমরা দুটি ভাই, গৌর নিতাই; আমাদের মাঝে কোনো সন্দেহ নাই', পাবলিক কিন্তু ঠিকই সন্দেহ করবে যে হবু অনাগত নেতা হিসাবে ভ্রাতষ্পুত্রের গতিবিধি সন্দেহ করছেন; হবুও পাবলিককে সন্দেহ করতেই থাকবেন বুঝিবা তার আখাম্বা পুত্রের গুণাগুণ পাবলিক বুঝে ফেলেছেন; বুঝি বা তার কী সাধ তাও পাবলিক বুঝে ফেলেছেন। এগুলো ঐশী পর্যায়ের সব দুর্ঘটনা; গ্রিক নাটকের মতোই।
কিন্তু যখন নেহায়েত বাসার নিচের ওই আগন্তুকটি, বিহ্বল চোখে তাকানো পথক্লান্ত ঠিকানা-খোঁজাড়ূ বা ফেরিওয়ালা। হাস্যে বা বাক্যে তাকে স্বাগত জানালেই দেখবেন 'সন্দেহ' নাই। বেমালুম গায়েব! দেখবেন,আপনার এই অনাহূত অতিথিও দারুণ হাসছেন, আপনার জন্যই প্রস্তুতকৃত, একান্ত কাস্টমাইজড হাসি। হয়তো আপনার হাসির সুযোগেই তিনি বলার সুযোগ পাবেন, পানির অভাবে তার গলা শুকিয়ে গেছে। তখন পানিপান শেষে তিনি আবারো হাসবেন বা আরেকটি বাক্য তৈরি করবেন। আপনারই জন্য। কয়েক দিন বাসার বাইরে আগন্তুকের সাথে অনুশীলন করার পর হাতপাকা হয়ে গেলে বাড়িতে ঢুকে নিজের স্ত্রীগণ বা প্রেমিকাকুলের সঙ্গেও আরামসে চর্চা করা যাবে (বা বরবৃন্দ ও প্রেমিককুল)।