রাতের রাজা নিখোঁজ হয়েছেন, রাজ্যের আর রাত কাটে না। এই গোধূলি বেলাতেও রাজামশাই ঝিরঝির বৃষ্টিভেজা বাতাসের সুগন্ধ নিয়েছেন। রাজবাড়ির ছাদে যে সাঁতার সরোবর তার পাশে সিংহাসনে বসে একবার বলে উঠেছিলেন, 'বৃষ্টি হলেই বাতাসের শরীর কী যেন একটা মোহনীয় গন্ধের মৌতাত হয়ে ওঠে, একেবারে সুন্দরীর নিঃশ্বাসের মতো।' তারপরই বললেন, 'কেউ একজন সুন্দরীকে নিয়ে আস। বেশ কিছুদিন গত হয়েছে, তার স্পর্শ পাইনি।' এখানেই ঘটল বিপত্তি। রাজা মশাইয়ের একান্ত ব্যক্তিগত রক্ষী জানালেন, 'সুন্দরী বিবি এখন বুড়ো বটগাছের ছায়ার নিচে আছেন। তিনি তার কাছে আপনার নামে অনাচারের নালিশ করেছেন। অতএব সুন্দরীকে এই মুহূর্তে নিয়ে আসা অসম্ভব। তাছাড়া বুড়ো বটগাছের তীক্ষষ্ট দৃষ্টি, প্রখর ঘ্রাণশক্তি। ওর কাছে যাওয়ার বিশ গজ দূরে থাকতেই বুঝে যায়, কে আসছে, কী উদ্দেশ্যে আসছে, একেবারে অন্তর্যামী যেন।' ব্যক্তিগত রক্ষীর কাছে এই কথা শুনে রাজামশাই রাগে গোঁ গোঁ করে উঠলেন এবং সিংহাসন থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি যাচ্ছি, ফিরে এসে রাজদরবারে বসব, তোমরা দরবার সাজিয়ে অপেক্ষা কর।'
সেই যে গেলেন, রাতের প্রথম প্রহর শেষ হতে চলল, রাজামশাই ফিরলেন না। প্রথম প্রহরের শেষ ঘণ্টায় রাজামশাই নৈশভোজ সেরে নেন। সবাই ভেবেছিল, নৈশভোজের আগে তিনি আসবেন। কিন্তু এলেন না। এবার সবাই চিন্তিত হয়ে উঠলেন। এরপর রাতের দ্বিপ্রহরের প্রথম ঘণ্টা পার হলে দুশ্চিন্তা চরমে উঠল। দরবার কখন বসবে, রাজ্য পরিচালনার এত এত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে, কতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় আছে, অর্থ বরাদ্দের বিষয় আছে, সে আলোচনা কখন হবে?
ছোট্ট দ্বীপরাজ্য প্রলয়নগরের রাজার অদ্ভুত খেয়াল। রাজদরবার বসে রাতে। রাজ্য পরিচালনার যাবতীয় সভা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া চলে রাতের দ্বিতীয় প্রহর পর্যন্ত। রাজদরবার শেষে রাতের তৃতীয় প্রহর পার করে চতুর্থ প্রহরে প্রত্যুষের পূর্ব পর্যন্ত রাজা সংগীতসাধনা ও নৃত্যকলা দর্শনে নিমজ্জিত থাকেন। তারপর অপরাহেপ্তর শুরু পর্যন্ত ঘুমান। অপরাহেপ্ত জেগে উঠে তিনি একসঙ্গে প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্নভোজ করেন। পুরো বিকেল কাটে তার বাগানে হেঁটে, সাঁতার সরোবরের পাশে একাকী বসে থেকে। এ সময়টাতে তিনি কাউকে সঙ্গী করেন না। এ জন্যই প্রলয়নগরের রাজামশাইকে বলা হয় রাতের রাজা। রাজদরবারের সময় শেষ, জলসাঘরের ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠার সময় শুরু হলো, রাজা ফিরলেন না। অবশেষে উজিরমশাই তৎপর হলেন। তিনি রাজার ব্যক্তিগত রক্ষীর কাছে জানতে চাইলেন, 'মহামান্য রাজা নিখোঁজ হওয়ার শেষ মুহূর্তে শেষ বাক্য কী বলেছিলেন?' 'জি হুজুর, রাজামশাই সুন্দরীর খোঁজ নিয়েছিলেন।' এরপর রাজামশাইয়ের শেষ সংলাপের বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। সব শুনে উজির সাহেব চোখ বন্ধ করে ঝাড়া প্রায় এক মিনিট কী একটা চিন্তা করলেন। এবার তার চোখ চকচক করে উঠল। রাজ্যের লাঠিয়ালপ্রধানকে ডাকলেন। 'লাঠিয়ালপ্রধান, সুন্দরী কোথায় আছে তার খোঁজ নিয়ে আস। রাজামশাই তার সঙ্গে একান্তে গোপনে কোথাও সাক্ষাতে ব্যস্ত আছেন কিনা তাও জানার চেষ্টা কর। যদি দেখ, সুন্দরীর জবাবে সন্দেহ হচ্ছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিচ্ছে না, তাহলে আমার সামনে হাজির কর।' প্রধান লাঠিয়াল বললেন, 'ব্যক্তিরত রক্ষী তো বলেছেন, সুন্দরী বিবি বিকেলে বুড়ো বটগাছের ছায়ার নিচে অবস্থান করে নালিশ করছিলেন। তিনি এখনও সেখানে থাকলে আপনার নির্দেশ পালন করব কী উপায়ে?' উজির সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। 'বুঝলেন প্রধান লাঠিয়াল। নালিশ করা সুন্দরীর এটা একটা বাজে স্বভাব। প্রায় তিন বছর আগে এই শহরে যখন সে প্রথম আসে তুমিই আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলে। প্রথম পরিচয়েই আমি তার সংগীতের মূর্ছনায় মুগ্ধ হয়ে সংগীতচর্চার পাশাপাশি নৃত্যকলায় আরও উন্নতির জন্য রাজ্যের নামকরা ওস্তাদের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অথচ সেই সুন্দরী এক বছরের মধ্যেই এই রাজামশাইয়ের কাছে আমার বিরুদ্ধে অনাচারের নালিশ করেছিল।' প্রধান লাঠিয়াল বলল, 'ক্ষমা করবেন হুজুর। সুন্দরীকে আমিই এই রাজ্যের প্রধান শহরে নিয়ে এসেছিলাম। যে গ্রামে তার বাড়ি, সেখানে একবার পরিদর্শনে গিয়ে তার সুমধুর কণ্ঠে সংগীত শুনে আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন সে গ্রামপ্রধানের বিরুদ্ধে অনাচারের নালিশ করেছিল। আমি তাকে প্রধান শহরে নিয়ে এলাম। আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। এরপর কিছুদিন পর আপনি আমাকে সুন্দরীর সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন।' উজির সাহেবের কণ্ঠে এবার হতাশা। 'বুঝলে প্রধান লাঠিয়াল, তোমাকে সুন্দরীর সঙ্গে মিশতে বারণ করেছিলাম। কারণ, সে তোমার বিরুদ্ধেও আমার কাছে নালিশ করেছিল।' প্রধান লাঠিয়ালের চোখ বিস্ম্ফারিত হয়ে উঠল। উজির উদাস কণ্ঠে বললেন, 'তুমি রাজ্যের প্রধান আধিকারিককে বল রাজসভার সবাইকে ডাকতে। রাত শেষ হওয়ার আগেই রাজামশাইয়ের সন্ধান না পেলে এই রাজ্যে আর কখনও ভোর হবে না, আমাকে বলেছেন প্রধান সাধন গুরু। অতএব দ্রুত যাও এবং রাজদরবার আয়োজনের ব্যবস্থা কর। আমি আজ রাজদরবার পরিচালনা করব।'
রাজদরবার বসেছে। রাজসিংহাসনের নিচে নিজের আসনে বসে উজির রাজকার্য পরিচালনা করছেন। উজির প্রথমে রাজামশাইয়ের ব্যক্তিগত রক্ষীকে নিখোঁজ হওয়ার আগে তার শেষ সংলাপ বর্ণনা করতে বললেন। ব্যক্তিগত রক্ষীর বর্ণনা শেষে সুন্দরী বিবির প্রসঙ্গ উঠে এলো। এবার সুন্দরীর চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে উঠে দাঁড়ালেন প্রধান লাঠিয়াল। 'প্রিয় রাজসভা, আপনাদের বলতে চাই, এই সুন্দরী বিবি আজ এই রাজ্যের সর্বনাশের মূল। তার সুমধুর কণ্ঠ আর মোহনীয় রূপের মায়ায় রাজামশাই মোহিত হয়ে সমস্ত কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেই বোধ হচ্ছে। যে কারণে সুন্দরী যখন রাজামশাইয়ের বিরুদ্ধে অনাচারের নালিশ করেছেন, তখন রাজামশাইয়ের কোমল অন্তর সহ্য করতে পারেনি। তিনি নিরুদ্দেশ হয়েছেন।' এবার প্রধান সাধন গুরু বললেন, 'প্রিয় প্রধান লাঠিয়াল মহাশয়, আমার গুরুসাধনার জ্ঞান বলছে, যদি রাজামশাই ফিরে না আসেন তাহলে এই রাতের শেষ হবে না। রাত দীর্ঘ হতেই থাকবে, ভোরের আলো আর ফুটবে না। এটা গুরুতর অশনিসংকেত।' এবার রাজ্যের প্রধান আধিকারিক হায় হায় করে উঠলেন। 'যদি রাত শেষ না হয়, তাহলে মহাবিপদ। রাত দীর্ঘ হলে অনেক বেশি বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গেলে রাজ্য অন্ধকার হয়ে যাবে।' উজির সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন, 'মজুদ জ্বালানিতে আর কতদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে?' 'জি হুজুর, তা প্রায় এক বছরের হিসেবে জ্বালানির বাড়তি মজুদ সব সময়ই রাখা হয়। সেটাই আছে। তবে আপনি অভয় দিলে একটা কথা বলতে পারি। জ্বালানির মজুদ শেষ হওয়ার আগেই যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করা যায়, তার জন্য একটা গবেষণা প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।' উজির জানতে চাইলেন, 'সেটা কী রকম?' 'হুজুর, আগে তো সৌরশক্তির ব্যবহারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রকল্প নিয়েছিলাম। এবার রাতের নিকষ আঁধার কিংবা জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার বিষয়ে গবেষণা করতে পারি। এই ধরুন আশি থেকে একশ কোটি'র একটা গবেষণা প্রকল্প হতে পারে।' উজির বললেন, 'প্রধান আধিকারিকের প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের অন্য কারও কোনো মত থাকলে বলুন।' বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার প্রধান কর্তা বললেন, উত্তম প্রস্তাব। তার সঙ্গে পরিবেশের প্রধান কর্তা এবং প্রধান লাঠিয়াল একমত হলেন। শুধু বাদ সাধলেন রাজ্যের প্রধান পণ্ডিত। তিনি বললেন, 'এক বছর রাত দীর্ঘ হওয়ার দুশ্চিন্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এ মুহূর্তে আলোচনা অহেতুক। তাছাড়া রাতের আঁধার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গবেষণা অতিশয় উদ্ভট ও অবৈজ্ঞানিক প্রস্তাব। এসব আলোচনা রাখুন, এখন রাজামশাইকে দ্রুত খুঁজে পাওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করুন।'
পণ্ডিতের কথায় উজির নিজেও নড়েচড়ে বসলেন। 'রাজপণ্ডিত ঠিকই বলেছেন। এখন রাজামশাইকে খুঁজে বের করাটা জরুরি। সেটা নিয়ে আলোচনার জন্য রাজসভাকে আহ্বান জানাচ্ছি।' প্রধান লাঠিয়াল বললেন, 'আমি আগেই বলেছি, সুন্দরী বিবিকে বুড়ো বটগাছের ছায়া থেকে বের করতে হবে। রাজামশাইয়ের বিরুদ্ধে অনাচারের নালিশ প্রত্যাহার করতে হবে। এটাই একমাত্র উপায়।' প্রধান আধিকারিক বললেন, 'কিন্তু বুড়ো বটগাছের ছায়া থেকে সুন্দরী বিবিকে বের করবেন কীভাবে?' প্রধান লাঠিয়াল বললেন, 'এখন বুড়ো বটগাছকে বোঝাতে হবে। নালিশ করা সুন্দরী বিবির ওপরে ওঠার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব সুন্দরীর কথায় কান না দিয়ে তার নালিশ করার অপকৌশল রুখে দেওয়ার জন্য আইন প্রয়োগই সংগত।' উজির কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। মাঝখান থেকে রাজপণ্ডিত বললেন, 'প্রিয় লাঠিয়ালপ্রধান, একটা বিষয় আমার কাছে পরিস্কার নয়। সুন্দরী বিবি যখন গ্রামপ্রধানের বিরুদ্ধে অনাচারের নালিশ করেছিল, আপনারা কি তার তদন্ত করেছিলেন? এরপর আপনার বিরুদ্ধে, উজির সাহেবের বিরুদ্ধে যখন নালিশ করল তখনও কি তার তদন্ত হয়েছিল? যদি তদন্ত না হয়, তাহলে করেননি কেন? গ্রামপ্রধানের বিরুদ্ধে নালিশ প্রমাণ না হলে তো সেখানেই সুন্দরী বিবির অপকৌশলের অপমৃত্যু ঘটত। তদন্ত কেন হয়নি সেটা আগে জানতে চাই।' পণ্ডিতের কথায় উজির, প্রধান লাঠিয়াল আর প্রধান আধিকারিকের মুখ কেমন লাল হয়ে উঠল, কপালে ভাঁজ পড়ল। রাজসভা কিছু সময়ের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নীরবতা ভাঙলেন উজির সাহেব। 'পণ্ডিত সাহেব, আপনি কী বলতে চান, সুন্দরী বিবি রাজামশাইয়ের বিরুদ্ধে যে নালিশ করেছে সেটা সত্যি? আপনার দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। যা হোক, এখন রাজামশাইকে খুঁজে বের করে সিংহাসন পুনঃঅলংকৃত করানোই মুখ্য কাজ। তার একটাই উপায়। বুড়ো বটগাছের ছায়া থেকে সুন্দরী বিবিকে বের করে এনে তার নালিশের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। অতএব সবাই চলুন বুড়ো বটগাছের কাছে।' রাজপণ্ডিত আবার মুখ খুললেন। 'না উজিরমশাই। আপনারা যাই বলুন, আমি বুড়ো বটগাছের কাছে সত্যিটা বলব। সুন্দরী বিবির নালিশের বিষয়ে একবারও তদন্ত হয়নি, সেটাই বলব।' এবার চরম বিরক্ত হলেন উজির। 'প্রিয় রাজসভা, পণ্ডিত সাহেবের কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা আপনারা শুনেছেন। তিনি কি চান না, রাজামশাই ফিরে আসুক?' পণ্ডিত আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। জোরে একটা চিৎকার দিয়ে থামিয়ে দিলেন প্রধান লাঠিয়াল। তারপর উজিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'উজিরে আলম, এই পণ্ডিতকে বুড়ো বটগাছের সামনে নেওয়া যাবে না। একে বাদ দিয়ে যেতে হবে। না হলে সবার সর্বনাশ হবে।' উজির চিন্তিত মুখে বললেন, 'কিন্তু ওনাকে আটকাবেন কীভাবে?' প্রধান লাঠিয়াল বললেন, 'পণ্ডিতমশাই সম্ভবত অধিক সুরা পান করেছেন। তাকে অধিক সুরা পান হেতু মাতলামির অভিযোগে আটক করা অসংগত হবে না।' বলেই পকেট থেকে বাঁশি বের করে একটা ফুঁ দিলেন। দু'জন লাঠিয়াল দৌড়ে রাজকক্ষে ঢুকল। পণ্ডিত এবার প্রধান লাঠিয়ালের হাত চেপে ধরে বললেন, 'আপনার মতলব কী?' প্রধান লাঠিয়াল এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, 'পণ্ডিতমশাই, আপনাকে অধিক সুরা পানের পর মাতলামির অভিযোগে কিছু সময়ের জন্য আটক করা হচ্ছে।' এবার উজির সাহেবের কণ্ঠ শোনা গেল। 'এই দৃশ্য আমারও কাম্য ছিল না। কিন্তু, এ ছাড়া বাস্তবতাবিবর্জিত পণ্ডিতকে আটকে রাখার উপায়ই বা আর কী ছিল, বলুন?' রাজসভা একদম নীরব।
পুরো রাজসভা এখন বুড়ো বটগাছের সামনে। সুন্দরী বিবি তখনও বটগাছের ছায়ার নিচে। জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় বটগাছ ঘিরে অদ্ভুত এক ছায়া, সেখানে সুন্দরী বিবির ফর্সা মুখ দেখে মনে হয় জ্যোতির্ময় কিছু একটা ভূপৃষ্ঠে অবতরণ করেছে। উজির সাহেব কিছুক্ষণ ছায়ার ভেতরে সুন্দরী বিবির মুখ দেখেন। তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়। চট করে কণ্ঠ খোলে না, মাথাও যেন কাজ করে না। অগত্যা উজির সাহেব চোখ মাটির দিকে নামিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। 'পরম শ্রদ্ধেয় বটগাছ মহোদয়, আমি জানি, আপনি সুন্দরী বিবির কাছে অনাচারের নালিশ শুনে খুবই ব্যথিত হয়েছেন। কারও প্রতি অনাচার হলে সেটা অবশ্যই বেদনার। কিন্তু আপনাকে জানাতে চাই, সুন্দরী এর আগে আরও তিনটি অনাচারের নালিশ করেছিলেন। একটা ছিল গ্রামপ্রধানের বিরুদ্ধে, একটা রাজপণ্ডিতের বিরুদ্ধে। দুটি ঘটনারই তদন্ত করেছেন স্বয়ং প্রধান লাঠিয়াল। তিনিই আপনাকে এখন বিস্তারিত জানাবেন।' এবার প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে প্রধান লাঠিয়াল বলেন, 'পরম শ্রদ্ধেয় মহোদয়, আমি সুন্দরী বিবির দুটি নালিশের বিষয়ে তদন্ত করেছি। কোনো তদন্তেই তার নালিশের সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং দেখা গেছে, দুটি ঘটনাতেই সুন্দরী বিবি তাদের কৌশলে নিজের মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন এবং তারপর তাদের কাছ থেকে অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিতে শুরু করেছেন। যখনই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তখনই অনাচারের নালিশ করেছেন। অতএব এবার আপনি সদয় সিদ্ধান্ত নিন, সুন্দরীর প্রতি আমাদের কী আচরণ হওয়া উচিত? তাকে আপনার ছায়া দেওয়া উচিত কিনা?' সুন্দরী এবার ছায়ার ভেতরে থেকে চিৎকার করে উঠলেন- 'প্রধান লাঠিয়াল, আপনি মিথ্যা বলছেন। আমার প্রতি গ্রামপ্রধান, উজির, রাজা সবাই অনাচারের সমূহ চেষ্টা করেছেন। আমি যখন গ্রামপ্রধানের অনাচারের প্রতিকার চেয়েছি, তখন আপনি প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেই অনাচারের চেষ্টা করেছেন। আর আমি কারও সঙ্গে সম্পর্ক করিনি। আমার সংগীতে আকৃষ্ট হয়ে...' আর বলতে পারলেন না। প্রধান লাঠিয়াল প্রায় গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলেন। 'শ্রদ্ধেয় মহোদয়, এই সুন্দরী একজন পেশাদার মিথ্যুক, রাজকীয় তদন্তের বিরুদ্ধে কথা বলার ধৃষ্টতা থেকে সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। তাকে আরও বলার সুযোগ দিলে সে মিথ্যায় মিথ্যায় আপনার সবুজ, স্নিগ্ধ পরিবেশ বিষময় করে তুলবে। এবার আপনার ছায়া সরিয়ে নিন, এ রাজ্যকে বাঁচান।' প্রধান লাঠিয়ালের রোদন শেষ হলে বুড়ো বটগাছের শাখা-প্রশাখা আড়ষ্ট হয়ে একটি ছোট বৃত্তের ভেতরে আচ্ছাদিত হয়ে যায়। সুন্দরীর মাথার ওপর আর ছায়া দেখা যায় না। এবার তাকে ধরে ফেলে একদল লাঠিয়াল।
রাজামশাই সূর্য ওঠার আগেই ফিরে আসেন। আজ তিনি জলসাঘরে যাননি। সোজা নিজের শয়নকক্ষে চলে এসেছেন। তার সামনে উজির, প্রধান লাঠিয়াল আর প্রধান আধিকারিক। রাজামশাই উচ্ছ্বসিত। 'আমি আপনাদের সবাইকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনারা রাজ্যের রাজকীয় রঙ্গমঞ্চে অসাধারণ নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। আপনাদের চিত্রনাট্য এত নিপুণ ছিল, অভিনয় দারুণ প্রাণবন্ত ছিল যে বুড়ো বটগাছ পর্যন্ত আড়ষ্ট হয়ে আমাদের বৃত্তের আচ্ছাদনে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। আমি আপনাদের সবার বেতন দ্বিগুণ করে দিচ্ছি। আপনাদের পদমর্যাদায় আরও মর্যাদাপূর্ণ শব্দাবলি যোগ করারও ব্যবস্থা করছি। তা সুন্দরীর সর্বশেষ অবস্থা কী?' উজির বললেন, 'সুন্দরীকে মোহনার কাছাকাছি নদীতে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা সুসম্পন্ন হয়েছে।' এবার আয়োজন সম্পর্কে প্রধান আধিকারিক বর্ণনা দেন। 'প্রিয় রাজন, চিত্রনাট্যের শেষ দৃশ্য বড়ই চিত্তাকর্ষক এবং মঞ্চায়নও অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। বুড়ো বটগাছ নালিশ আমলে না নিয়ে নিজের ছায়া থেকে অবমুক্ত করার পর সুন্দরী বিবি রাগে-দুঃখে ক্ষোভে লাঠিয়ালদের ঠেলে সাগর সঙ্গমে ধাবমান নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে, সে দৃশ্যের ভিডিওচিত্র রয়েছে। সেটাও কাল দিনের বেলাতেই রাজ্যবাসীর সপ্রতিভ ও বুদ্ধিমান মুঠোফোন যন্ত্রে পৌঁছে দেওয়া হবে।' প্রধান আধিকারিক একটু থেমে লম্বা দম নিলেন। বাকিটা বলতে শুরু করলেন প্রধান লাঠিয়াল। 'সুন্দরীকে নদীতীরে নিয়ে গিয়ে বলা হয়েছিল, তুমি পালাও। পালিয়ে বাঁচ। তখন নদীতীর দিয়ে তার দৌড়ের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর আমাদের একজন লাঠিয়ালের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্য ভিডিও করা হয়েছে। নিখুঁত সম্পাদনা, কেউ বুঝবে না কে ঝাঁপ দিচ্ছে। আর সুন্দরীকে কাঠের ভেলার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে বোটে তুলে আরও দূরে মোহনার কাছাকাছি নিয়ে জলস্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নৌ রক্ষীদের কাছাকাছি থেকে সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে বলা হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হলে তার মরদেহ গভীর জলরাশি থেকে উদ্ধার করার ঘোষণা দেওয়া হবে। অতএব দুশ্চিন্তার কিছুই নাই রাজন। আর কেউ কোনো দিন অনাচার নিয়ে নালিশ করবে না।'