ব্রিটেনের সাহিত্য জগতের অবিস্মরণীয় নাম চার্লস ডিকেন্স। পনেরোটি নভেল, অসংখ্য ছোট গল্প, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতার নানা সব লেখা, ভাবতেও অবাক লাগে কী করে তিনি এত কিছু লিখলেন! জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮১২, মৃত্যু ৯ জুন ১৮৭০। পুরো নাম চার্লস জন হাফম্যান ডিকেন্স। তাকে বলা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগের একজন নামকরা লেখক। লন্ডনে এসে শহরটিকে আমার যে অচেনা মনে হয়নি, তার কারণ আমি দেশে থাকতে ডিকেন্সের কিছু অনুবাদ পড়েছিলাম।
সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মেলবন্ধন যে কতখানি শক্তিশালী হতে পারে তারই বিরল উদাহরণ চার্লস ডিকেন্স। ডিকেন্স কী এমন দিয়েছিলেন, যার জন্য দশ পাউন্ডের নোট থেকে ব্রিটেনের সমাজ জীবনে, বিশ্ববৃক্ষের শাখায় শাখায় আদিগন্ত প্রতিভার স্বাক্ষরে আজ তিনি অবিস্মরণীয়! তাকে ভোলা কারও পক্ষে সম্ভব নয়; সম্ভব নয় সাহিত্যের অরণ্য থেকে উপড়ে ফেলা। সামাজিক পরিবর্তনে তার অবিনাশী কলম ছুটেছে নগরে নগরে। আজ হয়তো নতুন বইপত্রের সমারোহে কেউ কেউ ভুলে যেতে বসেছেন এই সাহিত্যিক কত বড় সাহিত্যিক ছিলেন, সে কথা। কারণ, একবার ব্রিটেনের সিলেবাস কমিটির একজন বলেছিলেন- ব্রিটেনে 'ও' লেভেলে ও 'এ' লেভেলে ডিকেন্স, জেন আয়ার এদের কেন সংযুক্ত করা হয়নি? কেন? তার সদুত্তর ঠিকমতো দিতে পারেনি। ক্লাসিক সাহিত্য বলতে তাদের অবদানই তো প্রধান।
ডিকেন্সের জীবনে সাংবাদিকতা আগে এসেছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়েই তিনি দেখেছিলেন সমাজ, সমাজের নানা স্তরের মানুষ। একতলা আর দোতলার মানুষ। তিনি বলতে চেয়েছিলেন সেই চোরাগলির গল্প, যেখানে বিচার ও সূর্য কোনোটাই একসঙ্গে প্রবেশ করে না।
কেমন করে তিনি সাংবাদিক হয়েছিলেন? বাবা দেনার দায়ে জেলে। পরিবারসুদ্ধ সেখানে। ডিকেন্সের পড়াশোনায় এলো বড় এক ব্যাঘাত। ভাবলেন, একটা কিছু করতে হবে। নিজের চেষ্টায় শিখলেন শর্টহ্যান্ড। তার আগে এক দোকানে সামান্য একটা কাজ করতেন। কিন্তু সেটা তিনি বেশিদিন করেননি। কারণ? তিনি হতে চাইলেন সাংবাদিক। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে পড়াশোনার জন্য একটি টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। ফলে ওখানে গিয়ে তিনি দিনরাত পড়তেন। তার সঙ্গে শিখতে শুরু করলেন শর্টহ্যান্ড। সেকালে কাগজের রিপোর্টার হতে গেলে এটি একটি আবশ্যকীয় ব্যাপার ছিল। ১৮৩২-এ মাত্র কুড়ি বছর বয়সে 'মিরর অফ পার্লামেন্টে' তিনি রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলেন। এর সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে লাগলেন। 'দি ট্রু সান' পত্রিকাতে তিনি কাজ করতে শুরু করেন। এখানে পার্লামেন্টের নানা রিপোর্ট তিনি লিখতেন। পার্লামেন্টে ৮০-৯০ সাংবাদিকের ভেতর তিনি একজন। সেইসব সংবাদের সঙ্গে মেলাতেন তখনকার জীবন। ওপরতলার ও নিচতলার জীবন। 'আপস্টেয়ার্স ও ডাউনস্টেয়ার্স'-এ কতটা পার্থক্য। তিনি ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন এসব আমাকে জানাতেই হবে। যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের জাগাতে হবে। সেই সময় তিনি 'ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকও' ছিলেন। খুঁজে আনতেন নানা সংবাদ। সেগুলো নানা কাগজে ছাপাতেন। রাস্তার মানুষ, ভয়াবহ বস্তির মানুষ, শিশু, পথশিশু, স্কুলের নির্দয় ব্যবহার, র‌্যাগেড স্কুলের নির্যাতিত শিশু, পতিত রমণীর কথা, তাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকবার কথা, পতিতাদের করুণ জীবন এবং আরও অনেক বিষয়। সেই সময় তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন 'মর্নিং ক্রনিকেলে'। যেখানে তিনি তার কলমকে ব্যবহার করেন তরবারির মতো। এরপর জীবনে এলো প্রথম প্রেমের যন্ত্রণা। মারিয়া বিডনেল নামের এক অসামান্য রূপসী তার জীবন তোলপাড় করে দিলেন। মারিয়া বিডনেল চলে গেলেন জীবন থেকে। তিনি চলে গেলেন প্যারিসে। মন ভেঙে গেলেও কাজে থেমে থাকলেন না। মারিয়া বিডনেল গেলেন, কারণ এই চালচুলোহীন তরুণ সাংবাদিক কি আমার উপযুক্ত- এমন ভাবনায়। ফিরে এসেছিলেন মধ্য বয়সে। তখন আর তিনি ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা করেননি। ডিকেন্সের খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। আর মারিয়া বিডলেন? দাঁত নেই, চুল নেই, রূপ নেই এমন এক প্রৌঢ় নারী। যিনি ডিকেন্সের সামনে যেতে ভয় পেলেন।
একসময় ডিকেন্সের পরিচয় মিস্টার হোগার্থের সঙ্গে। যিনি ছিলেন তার ভবিষ্যৎ শ্বশুর, যার মেয়ে ক্যাথারিন হোগার্থকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। সমাজ জীবনে তার এসব অভিজ্ঞতার প্রথম বই- স্কেসেজ অব বজ। বজ ছিল তার সাংবাদিক ছদ্মনাম। ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৬ সালের মধ্যে লেখা নানা কলাম ও সংবাদ লেখা। বিভিন্ন কাগজে তিনি লেখা দিতেন। এই বইতেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের সৃষ্টিশীল রচনার মহান বীজ। যেখান থেকে মহীরুহ আকাশ স্পর্শ করেছিল। এরপর ভাগ্য খানিকটা বদলে গেল। তিনি হলেন যথারীতি নামকরা সাংবাদিক। কাগজের নাম- বেন্টটিস মিসলেনি। এটা ছিল একটি ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকা। মিস্টার বেন্‌টলি তার কর্ণধার। ১৮৩৬ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত এ পত্রিকা চলেছে। এখানে সম্পাদকের পদে আসীন হন চার্লস ডিকেন্স। সময় ১৮৩৬ থেকে ১৮৩৮। জীবনের এইসব অভিজ্ঞতা থেকে রচনা করেন প্রথম উপন্যাস। নাম তার 'পিকুইক পেপার'। ১৮৩৬ সালে তিনি প্রথম উপন্যাস ছাপেন। 'দ্য পিকুইক পেপার'। ১৮৩৬ সালে তিনি ছাপেন 'অলিভার টুইস্ট'। পথশিশুদের কাহিনি। বিখ্যাত হয়ে যান রাতারাতি। তখন জীবনে অনেক মিস্টার পিকুইককে দেখেছেন তিনি। দেখেছেন ওয়েলারের মতো চরিত্র। দেখেছিলেন অসংখ্য চালচুলোহীন পথশিশু। দেখেছেন ফাগিনের মতো মানুষ আর বিল সাইসকস। দেখেছেন পথশিশুদের নানা কষ্ট এবং মানবেতর জীবন। রাস্তায় ও নগরজীবন তাকে দেখিয়েছিল কিছু কঠিন বাস্তব। লেখা একেবারে মিছরির ছুরি, যাকে চাবুক মারছেন সে তা একসময় বুঝতে পারছে। দুই বছর পর কাগজে রেজিগনেশন দিলেন। হতে চাইলেন সত্যিকারের সাহিত্যিক। কিন্তু সাংবাদিকতা তাকে ছাড়ল না। তিনি বের করলেন- দ্য ডেইলি নিউজ। ১৮৪৬ সালে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় এবং তিনি সম্পাদক হন। নানা প্রকার সামাজিক অসংগতি কেবল সাহিত্যে থাকবে, তা হয় না। কাজেই এইসব ঠিকমতো জানার জন্য একটি পত্রিকা চাই। তিনি রাজনীতি নিয়েও লিখতেন। কিন্তু তার প্রধান লেখার বিষয় ছিল সামাজিক সমস্যা এবং তার ভয়াবহতা। একসময় এই কাগজ থেকে রিজাইন দেন। প্রতিষ্ঠা করলেন- এ হোম ফর রিফর্মড প্রসটিটিউট। কিন্তু সাংবাদিকতা থেকে দূরে থাকতে পারেন না। বের করেন দুই পেন্সের কাগজ 'এ হাউসহোল্ড ওয়ার্ল্ড'। এখানে কেবল সংবাদ নয়, নানা গল্প ও কবিতাও স্থান পেল। তিনি জেনেছেন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মেলবন্ধন আমাদের জীবনে কী ঘটনা ঘটাতে পারে। সেকালে এই কাগজ সপ্তাহে চল্লিশ হাজার কপি বের হতো। আগেই বলেছি, দাম মাত্র দুই পেন্স। এবার তিনি ভাবতে লাগলেন সেইসব সাহিত্যিকের কথা, যাদের এক কথায় বলা যায় 'আনপেয়েড লেবারার'। তাদের পরিশ্রমের দাম নেই। তাদের লেখা ছাপিয়ে সম্পাদক তাদের ধন্য করেন। তারা বই প্রকাশ করতে পারেন না। লিখে লিখে কেবল বাক্স বন্দি করে রাখেন। তাদের কথা ভেবে সৃষ্টি করলেন - 'গিল্ড অব লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট'। তার সঙ্গে ছিলেন এডওয়ার্ড বুলার লিটন। তারা বলতে চাইলেন এই সমস্ত সাহিত্যিকের সমস্যার কথা। তাদের উন্নতির কথা। তাদের সাহিত্যিক হয়ে ওঠার ঘোরতর সমস্যার কথা। তিনি জেনেছিলেন, যারা লিখতে চায় তারা লিখবেই এবং অন্যের সঙ্গে নিজের ভাবনার সংযোজনের কারণে ছাপাতেও চাইবে।
তিনি কাগজে প্রকাশ করতে লাগলেন ক্রাইমিয়ান যুদ্ধের সময় কী ঘটেছিল এদেশে এবং আর সবকিছু। ক্রাইমিয়ান যুদ্ধের সময় ১৮৫৩ থেকে ৫৬। 'এ হাউসহোল্ড ওয়ার্ল্ড' বলেছে তাদের কথা, যারা আমাদের সমাজে পতিত। তিনি 'ডেইলি নিউজ' থেকে রিজাইন দিয়েছিলেন, কারণ সেখানে কেবল রাজনীতির কথা। সমাজের এইসব অবহেলিত পতিত মানুষের কথা নেই। কিন্তু তার বিষয় নয় রাজনীতির কচকচানি নিয়ে মাথা ঘামানো। তিনি অনেক মানুষ সৃষ্টি করলেন, যাদের নিয়ে ভাববার সময় এসে গেছে। অলিভার টুইস্ট আর নিকোলাস নিকোলরির মতো বইগুলোতে থাকত সেই সব চোখে দেখা মানুষ। 'এ হাউসহোল্ড ওয়ার্ল্ড'-এ সে সময়ের বড় বড় চিন্তাবিদ লিখতেন। শুধু সাংবাদিকতাতেই সব বলে শেষ করলেন না। সেই আলোকে রচনা করলেন অনেক বিখ্যাত ভাবনা ও ভালোবাসার বই। সমাজকে কীভাবে শোধরানো যায় সেইসব কথা। সমাজের এ অব্যবস্থা তাকে রাতে নির্ঘুম রাখত। কেবল সমস্যার কথা নয়। থাকত সমস্যা সমাধানের কথা। ১৮৫৯ সালে 'এ হাউসহোল্ড ওয়ার্ল্ড' বদলে আর একটি পত্রিকা করলেন এবং নাম দিলেন 'অল দ্য ইয়ার রাউন্ড'। অনেক লেখক সৃষ্টি করেছিলেন চার্লস ডিকেন্স। তবে অনেক তরুণ লেখক লিখতেন তার কাগজে। কাগজের সাব হেডিং-এ লেখা থাকত 'কনডাকটেড বাই চার্লস ডিকেন্স'। তার মতো এই বিশাল মাপের সাংবাদিক আজকের যুগের ভাবুকতা ও চাটুকারিতার জগতে কোথায় পাওয়া যায়? প্রায় সাংবাদিকই করেন রাজনীতির প্রচার বা অপপ্রচার এবং বিকিয়ে যান অল্পমূল্যে। আমার মনে পড়ছে, কিছুদিন আগে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির অনেক কিছু পড়ছিলাম। তার জন্মদিনে তাকে নিয়ে কিছু লিখবার জন্য। জানলাম তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। একজন বড় মাপের সাংবাদিক ও সাহিত্যিক এবং মানুষ হিসেবে বিনয়ী ও মিষ্টি। আমি এমন মেলবন্ধনে আরও কিছু সৃষ্টি করতে বলি। আরও দুই-একজন দেশে আছেন, যারা একাধারে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। তাদের কলমে জাদু থাকে।
চার্লস ডিকেন্স তার পর্বতপ্রমাণ সাহিত্যপ্রতিভা নিয়ে থাকতে পারেননি। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সমাজে কী ঘটছে। আমি কেবল বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখছি না। এগুলো আমাদের সমাজের কথা। বাবার দুঃখ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ম্যাকেবার, প্রথম প্রেম মারিয়া হয়েছে ডোরা স্পিনলো। শ্যালিকার অকাল মৃত্যু তাকে অসংখ্য চরিত্র সৃষ্টি করিয়েছে। তার চোখে দেখা অনেক অলিভার টুইস্ট আর 'পিকাপকা পটেটো আর্টফুল ডজার', বিল সাইক্স অনেক ফাগিন। অনেক পথশিশু। তিনি জানতেন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। তাই দুটিতেই খুঁজেছেন মানুষের কষ্টের সমাধান। তিনি ভালো করে জানতেন কোনটি হয় সাংবাদিকতার ভাষা, আর কোনটি হয় সাহিত্যের ভাষা।
সাহিত্যই তাকে অমর করেছে। সাংবাদিকতা গভীর মানবিক। অনেক গল্প তাকে নিয়ে। কী এসে যায় যদি তার জীবনে থাকে একাধিক নারী। যদি স্ত্রীর সঙ্গে ঘটে বিচ্ছেদ। একবার রোমান পোলানস্কিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- আচ্ছা, এই কি সত্যি, আপনি একবার এক কম বয়সী মেয়ের সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হন। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন- আচ্ছা, ভবিষ্যতে আপনি আমাকে কীভাবে মনে রাখবেন?
প্রশ্নকর্তা উত্তর দিয়েছিলেন- আমি আপনাকে মনে রাখব একজন 'আউটস্ট্যান্ডিং' বড় মাপের পরিচালক হিসেবে। রোমান পোলানস্কি বলেন- তাহলে আপনার আগের প্রশ্নের উত্তর নাই বা দিলাম। আসলে যা কালের খেয়ায় টিকে থাকে তা সৃষ্টিশীলতার সোনালি ফসল, আর কিছু নয়। সারাজীবন নিজের লেখা নিজে পড়ে শোনাতেন। দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত তার কথা। দর্শকের হাততালি তাকে মুগ্ধ করত। কিন্তু তার পরিচয় তার লেখা ও সাংবাদিকতার পরে বদলে যায় গ্রেট ব্রিটেন। তার কালের স্কুল আর এখনকার স্কুলে কত পার্থক্য! সমাজও কতটা এগিয়ে গেছে তারই লেখার কারণে। 'পেন ইজ মাইটার দেন দ্য সোর্ড' তিনি তা লাখ লাখ শব্দ দিয়ে প্রমাণ করেছেন।
ব্রিটেনে তার আবাসভূমির কয়েকটি দেখেছি। মনে হয়েছে হাঁটু মুড়ে বসে আমি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মন ভরে গেছে সেইসব জায়গাতে যেতে পেরে।