আমি যতই আবেগি মানুষ হই না কেন, চারপাশের দৃষ্টিনন্দন রকি মাউন্টেইন ঘেরা কলোরাডো অঙ্গরাজ্য থেকে চোখের পলকে বাড়ি বেচে নতুন বাড়ি কিনে মাত্র এক মাসের মধ্যে আমাদের ফ্লোরিডা চলে আসা, চারপাশের সকলকেই বিস্মিত ও চঞ্চল করেছে।
আত্মীয়-পরিজনও কিছুটা চিন্তিত, বিভ্রান্ত। কিছুটা ব্যথিত। তাদের সকলকে ছেড়ে, ডেনভার শহরের মতো ক্রমবর্ধমান, আধুনিক ও সৌন্দর্যে ভরপুর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এক রাজধানী শহর ফেলে, আমরা স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি বলে। এমন এক জায়গায় যাচ্ছি, যেটি শহর ও গ্রামের মাঝামাঝি এক জায়গায় যেখানে গগনচুম্বী বিশাল দালানকোঠা, বৃহৎ কারখানা কিংবা করপোরেট হেড কোয়ার্টারের কোনো অস্তিত্ব নেই। আছে কিছু ঘরবাড়ি, বিশাল প্রান্তর, গাছপালা, মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা, ছোটবড় জলাশয়, নির্মীয়মাণ কিছু গৃহ আর দৃষ্টির সীমা-অতিক্রান্ত প্রকাণ্ড এক দিগন্ত। জল-ঝড়ে ঘেরা আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব কোনে আটলান্টিক মহাসাগরের ধার ঘেঁষে অবস্থিত উপকূলবর্তী সমতলভূমি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে। তার-ই দক্ষিণ-পূর্বে আটলান্টিকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রায় অশ্রুত নামের এক শহর, পোর্ট সেইন্ট লুসি, আমাদের নতুন ডেরা সেখানেই।
কেন সেখানে?
ওরা বলে, ওই বাড়ি-সংলগ্ন ফলের বাগান। ওটাই কারণ।
আম, জাম, লিচু, আতা, সফেদা, কামরাঙা, পেয়ারা, বরই, আখ, কলা, নারকেল, আমড়া, বেদানা, কমলা, পেঁপেসমেত উষ্ণ অঞ্চলের অনেক ফলই ফলছে বাড়ি-সংলগ্ন এক বিঘা জমির ওপর প্রোথিত বিভিন্ন ফলের গাছে। ফুল এবং ফলের গাছের প্রতি আমার দুর্বলতা সকলেই জানে। ফলে তারা বলে এই ফলপ্রসূ বৃক্ষগুলোই আমার জায়গাটির প্রতি আসক্তি বা আকর্ষণ জন্মাবার মুখ্য কারণ।
তারা যা জানে না, আমি জানি। দীর্ঘ লালিত একটি শখ, একটি ইচ্ছা, একটি বাসনা ও স্বপ্ন এতোদিনে পূর্ণ হতে চলেছে। যতদিন পারি, আমার এই ইচ্ছা আমি পূরণ করে যাব। সোনার বদলে পিতল দিয়ে বাসনার তৃপ্তি সাধন করব। এখন থেকে একটানা এখান থেকে সাগর আর সাগরের ঢেউ, সাগরের বুকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখে যাব। না হোক স্বদেশ, সূর্য তো এক-ই। যতদিন নিজ ঘরে, নিজ আকাশে, নিজের জলরাশিতে ফিরে যেতে না পারি, ততদিন এই অসীম জলরাশি (আটলান্টিক মহাসাগরের একাংশ), তার পাড় ঘেঁষে চলে যাওয়া উত্তরে-দক্ষিণে একের পর এক বহু বিচের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম জনাকীর্ণ নতুন বাড়ি-সংলগ্ন বিচই হবে আমার সূর্য পর্যবেক্ষণের স্থল। যতদিন না সাধ মেটে ততদিন পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।
অন্যরা জানে না পৃথিবীর নানা সাগর, মহাসাগর, উপসাগর বহুভাবে বহু জায়গা থেকে দেখা সত্ত্বেও, চারদিকে জলে ঘেরা মুন্সীগঞ্জের জলে সাঁতার কেটে বড় হওয়া আমি আজ অর্ধশতক ধরে বড় আশা করে আছি। আশা করছি, বঙ্গোপসাগরের ঠিক ওপরে বসা আমার নিজের দেশের সমুদ্র ও সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার অথবা কুয়াকাটার বালিমাটির উপকূল ধরে খালি পায়ে সোজা হেঁটে বেড়াব আমি, যা করার সুযোগ হয়নি কোনোদিন। যাওয়া হয়নি আজো জাহাজে চড়ে ঘুরতে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে- যেখানে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আমার শেষ বয়সের কুড়িয়ে পাওয়া ভাই হুমায়ূন আহমেদ।
বিয়ের পাঁচ দিন পরে স্বামী পড়াশোনা করতে বিদেশে চলে যাওয়ায় সেই অল্প সময়ে সমুদ্র স্নানে যাবার প্রশ্ন আসে না। এরপর তিন চার সপ্তাহের জন্যে যখনই দেশে যাই তখন বন্ধুবান্ধব ও ঢাকায় এতোরকম প্রোগ্রাম থাকে যে তিন-চার দিনের জন্যে সমুদ্র ভ্রমণে আর যাওয়া হয় না। নব্বুইয়ের দশকে যখন প্রায় এক দশক সময় দেশে কাটিয়েছিলাম, তখনও এই যাবো, যাচ্ছি করে আর যাওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে বিগত পাঁচ দশকে অন্য কতো সাগর-মহাসাগর পার হয়েছি, কত সমুদ্রতীরে বসে সূর্যাস্ত দেখেছি, কতো স্বচ্ছ জলে সাঁতার কেটেছি! কিন্তু সবই অন্যভূমিতে- অনাবাসে।
মনে পড়ে আজ থেকে অর্ধ শতকেরও আগে ঢাকা টেলিভিশনে একাধিকবার প্রচারিত জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের একটি নাটকের কথা। নাম 'সমুদ্র আর দূরে নয়'। নাটকে নববধূ নায়িকার সারা জীবনের বড় শখ সমুদ্রে যাবার। সমুদ্র দেখার। আশা করেছিল মধুচন্দ্রিমা যাপনে স্বামী হয়তো তাকে নিয়ে যাবে সেখানে, যেমন নিয়ে গেছে তার অন্য অনেক বন্ধুকে- তাদের স্বামীরা, মধুচন্দ্রিমা যাপনে। কিন্তু না, শুধু মধুচন্দ্রিমা কেন, সেখানে, মানে সমুদ্রে বা সমুদ্রতীরে আর যাওয়াই হয় না কখনও তাদের। প্রাত্যহিক নানা কাজের ব্যস্ততায়- অর্থের টানাটানিতে। বধূ তখন তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি দীর্ঘ প্রকল্প খাড়া করে। সমুদ্র দর্শনের জন্যে সংসারের খরচ থেকে প্রতিদিন সামান্য বাঁচিয়ে একটু একটু করে জমাতে শুরু করে সে যাতে একদিন সমুদ্র ভ্রমণের জন্যে যথেষ্ট টাকা তাদের হয়। লক্ষ্যে পৌঁছবার আর দেরি নেই। মহাখুশি সে সমুদ্রে যাবার- তার আজীবন লালিত স্বপ্ন পূর্ণ করার জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু ঠিক তখন-ই ধরা পড়ে স্বামীর দেহে এক মারাত্মক ব্যাধি। স্ত্রী তখন তার সারা জীবনের সাধ, আশা, সমুদ্র দেখার বাসনা জলাঞ্জলি দিয়ে জমানো টাকায় স্বামীর চিকিৎসা শুরু করে। যে সমুদ্র আর দূরে নয় সে ভেবেছিল, তা প্রায় সারা জীবনের জন্যে নাগালের বাইরে চলে যায়। এই গৃহবধূর মতো সমুদ্রপাগল, বিশেষ করে নিজ ভূমিতে নিজস্ব সামুদ্রিক জলে গা ভাসাতে না পেরে আমি বড়ই অন্তর্জ্বালায় জ্বলি। স্বামীকে এই বঞ্চনার কথা বলে কোনোদিন সহানুভূতি পাই না। তার একই বক্তব্য- পৃথিবীজুড়ে এতোসব নামিদামি বিখ্যাত বিচ, সাগর, মহাসাগর, দেখে আসার পরও তুমি কক্সবাজার দেখোনি বলে দুঃখ কর? হ্যাঁ, করি। কারণ, ওই জায়গার সাগর ও বিচের প্রতিটি জল কিংবা বালুকণার সঙ্গে আমার অতিপ্রিয় জলকাদার গন্ধ লুকিয়ে আছে, যার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ পরিচিত। সে নিজে যদি বিবাহপূর্বকালে সেখানে না যেত অন্য বন্ধুদের সঙ্গে একত্রে, জোট বেঁধে আনন্দ করতে, তাহলে সে বুঝত আমি কোন 'লোনা বালিতীর'-এর কথা বলছি। জগতের সকল ভূমি যেমন মাতৃভূমি নয়, তেমনি সকল জল বা মহাজলই আমাদের পিতৃজল নয়।
কত সাগর/মহাসাগর দেখেছি, পাড়ি দিয়েছি, ছুঁয়েছি; দেখি নাই শুধু...।।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু। -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাগর/মহাসাগর আমি প্রথম দেখেছি, অনেক অনেক উঁচু থেকে। জীবনের দুই দশক পার করে, তখন বিবাহিত আমি, সদ্য বিফার্ম পরীক্ষা দিয়ে, উচ্চ শিক্ষার্থে ও স্বামী সঙ্গলাভে বিদেশে আসাকালে প্লেনের জানালা থেকে। বিমান আরোহণ ও অবতরণের সময়- বিশেষ করে ইউরোপ থেকে আমেরিকা যাত্রাপথে পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ যে জল এবং মাত্র এক-চতুর্থাংশ স্থল, তার ধারণা পাওয়া যায়। মনে হয় অসীম জলরাশির ওপর ভাসছে কিছু আঁকাবাঁকা সীমানার মাটিখণ্ড।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যাত্রা ও পরিস্থিতিতে বহুবার সাগর দেখেছি, তার গর্জন শুনেছি, তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ডুব দিয়ে সাঁতার কেটে জল তোলপাড় করে বাল্যস্মৃতি রোমন্থন করেছি, অথবা তার বুকের ওপর দিয়ে কাঠের বিশাল বজরা কিংবা ধাতব যান্ত্রিক বাহনে চড়ে দেশ ভ্রমণ করেছি। সেসব থেকে কয়েকটির উল্লেখ করছি।
নিউইয়র্কে কোনি আইল্যান্ড, ফাররকাওয়ে [আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে।] বিলক্সি, মিসিসিপি, গালফ কোস্ট, আলাবামা। সানফ্রান্সিস্কো, ক্যালিফোর্নিয়া [প্রশান্ত মহাসাগর]। ফ্লোরিডায় আটলান্টিক মহাসাগর ও গালফ অব মেক্সিকোয় মায়ামি বিচ, যেন্সন বিচ, পাম বিচ, বয়ন্টন বিচ, ডেলরে বিচ, ডেটনা বিচ, কিজ অব ফ্লোরিডা বা কি ওয়েস্ট।
অন্য দেশে- হোভারক্রাফটে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম, ব্রাইটন বিচ, জুহু বিচে আরব সাগর, পোর্টরিকো, জ্যামাইকা, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ডমিনিকান রিপাবলিক, বেলিজ।
কিন্তু এত এত সাগর-মহাসাগর এবং বিচ দেখেও তৃপ্তি নেই স্বদেশের সৈকতে যেতে না পারার অভিমানে। তাই মৌসুমী ভৌমিকের সঙ্গে গলা মেলাতে ইচ্ছা করে- 'আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে/ নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো/ আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে/ বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো/ আমি কখনও যাইনি জলে, কখনও ভাসিনি নীলে/ কখনও রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাংচিলে/ আবার যেদিন তুমি সমুদ্র-স্নানে যাবে/ আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়?/ বলো, নেবে তো আমায়?'