পর্ব-২২
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
একাত্তরের জানুয়ারি-মার্চের দলিলপত্র এবং ঘটনাক্রম দেখলে বোঝা যায় যে, স্বাধীনতার প্রত্যাশাটি তখন কতটা সম্প্রসারিত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের মনে। একের পর এক ঘটনা আর প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচনের পর থেকে নতুন রূপে উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নির্বাচনটি দিতে রাজি হয়েছিল, কারণ তারা ভেবেছিল আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জিততে পারবে না। কিন্তু ফলাফল হলো তার উল্টো। এখন তাই তারা সেটা মানতে পারছে না।
নির্বাচনে সর্বাধিক ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে পাকিস্তান জাতীয় সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮১টি আসন। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত পাকিস্তান পিপলস পার্টি-তার নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। নির্বাচনের পরপরই ভুট্টো বলেন যে, পিপলস পার্টি বিরোধী দলে বসবে না। অর্থাৎ তারা নির্বাচনকে এক অর্থে বাদ দিয়ে দিচ্ছে। নির্বাচন তো একটি আইনি বিষয়- কে ক্ষমতায় থাকবে; পিপলস পার্টি সেই আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে বলছে যে, তারা ক্ষমতায় থাকবে না। তারা বলছে যে, তারা এমন একটা সংবিধান চায় যেটি সমগ্র পাকিস্তানের জন্য হবে। আসন্ন ক্ষমতা গ্রহণকারীদের সংবিধান তারা মেনে নেবে না। জুলফিকার আলি ভুট্টো আরও বলেছিলেন যে, পাঞ্জাব এবং সিন্ধ হচ্ছে কেন্দ্রের মূল শক্তি। এদের বাদ দিয়ে কিছু করা যাবে না। এখানে মনে রাখা দরকার, যাকে আমরা পাকিস্তান বলি- পিপলস পার্টি হলো তারই প্রতিনিধিত্বমূলক দল।
২০ ডিসেম্বরের পিপলস পার্টির এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে পর দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, এখানে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করা হচ্ছে, পাঞ্জাব এবং সিন্ধকে কেন্দ্র করার কোনো মানে হতে পারে না। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রয়েছেন, তারাই সংবিধানের সিদ্ধান্তগুলো দেবেন।
এই ভাবনাটাই ছিল পাকিস্তানিদের প্রধান ভাবনা। আমরা যদি জিজ্ঞেস করি যে, পাকিস্তান ছিল কোথায়? পাকিস্তান ছিল এই পাঞ্জাব আর সিন্ধেই।
এ সময়টাতে বাংলাদেশে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং রাজনৈতিক দল থেকে বিভিন্ন ধরনের পুস্তিকা প্রকাশনা বের হচ্ছে। এগুলোতে মূল যে আলাপটা তখন লক্ষ করা যাচ্ছে, তা হলো- এই পাকিস্তানিদের সঙ্গে আর থাকা যাবে না। দেশকে এভাবে আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। ১ জানুয়ারি ১৯৭১-এ প্রকাশিত একটি দলিলে দেখা যাচ্ছে- জাতীয় মুজাহিদ সংঘ নামক একটি দলের কথা। এ দলটি মূলত বাঙালি মুসলমানভিত্তিক একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল। এই জাতীয় মুজাহিদ সংঘের মতো দলও বলছে যে, স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, এদের সঙ্গে থাকার আর কোনো প্রশ্নই আসে না। এ সংঘের দীর্ঘ যে একটি পুস্তিকাটি রয়েছে, তাতে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে বাঁচতে হলে দেশ স্বাধীন করতে হবে। এমনকি সেই স্বাধীন দেশের জন্যে একটি জাতীয় সংগীতও লিখেছে তারা। সেখানে তাদের কিছু স্লোগানও ছাপা হয়েছে- স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ, ইসলাম জিন্দাবাদ, পশ্চিম পাকিস্তানি দ্রব্য বর্জন কর, পশ্চিমা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বয়কট করুন, উর্দু ইংরেজি ধ্বংস হোক, পশ্চিম পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, বিশ্বের মুসলিম সর্বহারা এক হও এক হও। এই পুস্তিকাটিতে প্রকাশক হিসেবে নাম দেখা যাচ্ছে শামসুদ্দিন আহমেদ। ১৪৮-বি ছোট কাটরা ঘাট রোড, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। যদিও এ পার্টির নাম এর আগে-পরে আর কখনও শোনা যায়নি- কিন্তু এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে স্বাধীনতার কথাটা তখন কত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এরকম বহু দল ও ব্যক্তির বিভিন্ন বক্তব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাদের সবারই মূল সুর তখন স্বাধীনতা।
৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গণপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়- শোষণমুক্ত সুখী সমাজের বুনিয়াদ গড়ার সংকল্প। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই প্রথম সামনে এসে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যরা একত্র হয়ে শপথ গ্রহণ করছেন। এটা রাষ্ট্রের সংবিধানের শপথ নয়, গণমানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় সদস্যদের নিজেদের শপথ। ২৫১ জন এমএনএ ও ২৬৭ জন এমপিএকে শপথবাক্য পাঠ করান শেখ মুজিবুর রহমান। পরে তিনি নীতিনির্ধারণী ভাষণ দেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলছেন, 'কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে তোমরা ৮৫ জন, আমরা ১৫ জন। সামরিক বিভাগে তোমরা ৯০ জন, আমাদের দিয়েছ ১০ জন। বৈদেশিক সাহায্যের তোমরা খরচ করছ ৮০ ভাগ, আমাদের দিয়েছ ২০ ভাগ। মহাপ্রলয়ে দক্ষিণ বাংলার ১০ লাখ লোক মারা গেল। লাখ লাখ লোক অসহায় অবস্থায় রইল। রিলিফ কাজের জন্য বিদেশ থেকে হেলিকপ্টার এসে কাজ করে গেল, অথচ ঢাকায় একখানা মাত্র সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর কোনো হেলিকপ্টার এলো না। আমরা এসব বে-ইনসাফির অবসান করব।'
অতএব স্বাধীনতার দিকে এই যে প্রস্তুতিটা- এটা তখন পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে পত্রিকাতে দেখা যায়- ৬ দফা এবং ১১ দফার ভিত্তিতে শেখ মুজিবুর রহমানের যে ঘোষণাটি ছিল, সেটিকেই আবার সমর্থন দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দকে তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য বলা হচ্ছে। এটি এখন আইনগতভাবে যেমন বৈধ, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

স্বাধীনতার প্রত্যাশাটি তখন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে

৮ জানুয়ারির একটি দলিল পাই- যেটি পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, অর্থাৎ সিরাজ সিকদারের। তারাও স্বাধীন পূর্ব বাংলা কায়েমের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তার মানে বামপন্থি, জাতীয় মুজাহিদ সংঘ ইত্যাদি সকল দলই তখন মুক্তভাবে স্বাধীনতার কথা বলছে।
১৫ জানুয়ারি পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদ দিবস পালনের আহ্বান করে। শহীদ দিবস আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে তারা পূর্ব বাংলা স্বাধীন করার কথা বলছে। সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে তারা। সশস্ত্র বিপ্লবের কথাও রাজনীতিতে তখন চলছে।
৩০ জানুয়ারি জুলফিকার আলি ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ করে বললেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধানের জন্য কাজ করতে চায়। কিন্তু ভুট্টো মূলত চেষ্টা করছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বা ক্ষমতায় সবল হওয়ার জন্য। কারণ এটা খুব পরিস্কার যে, এই অবস্থাতে সাংবিধানিকভাবে পাকিস্তানকে আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। ১৪ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চে ঢাকায় নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো বলেন যে, তার দল জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবে না। শেখ মুজিব এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেন। এই সময় শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল, সাংবাদিক নির্মল সেন যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন-তারা বলছেন যে, গণবিপ্লব দিবসে মেহনতি জনতার নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার কায়েমের শপথ নিন। অর্থাৎ স্বাধীনতার বিষয়টি তখন গোপন কোনো বিষয় নয়।
১৫ ফেব্রুয়ারিতে ভুট্টো আরও বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ যদি নমনীয় না হয়, তাহলে পাকিস্তান পিপলস পার্টি সংবিধানে যাবে না। কিন্তু এখানে নমনীয় বলতে কী বোঝায়- নমনীয় মানে ছয় দফার নমনীয়তা- এটা তখন পরিস্কার। লড়াইটা যেমন রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে হচ্ছে, তেমনি লড়াইটা বিদ্যমান পাকিস্তান বনাম ছয় দফার। আর ছয় দফার রাষ্ট্র ভাবনা অবশ্যই লাহোর প্রস্তাব থেকে এসেছে। অর্থাৎ, যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধেই আবার পাকিস্তানিদের অবস্থান। কিন্তু ভুট্টোর এই পাকিস্তান পিপলস পার্টি ছাড়া আর সকল বিরোধী দলই সংবিধানে যাবার পক্ষে। তখন পরিস্কার যে পিপলস পার্টির সঙ্গে কেন্দ্রের বা সেনাবাহিনীর যোগসাজশ।
ডন পত্রিকায় ১৭ ফেব্রুয়ারির একটি সংবাদে দেখা যাচ্ছে, ভুট্টো এবার বলছেন যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর কোনো সমঝোতা করার সুযোগ নেই। অপরদিকে মর্নিং নিউজ পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, সেদিনই শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, আর কোনো শক্তি বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
এ অবস্থাতেই ২১ ফেব্রুয়ারি চলে এসেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন এবং বাংলা ছাত্রলীগ ভাষা দিবস উপলক্ষে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে বিশেষ বিবৃতি দেয়। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন তার ১৪-দফা দাবি পেশ করে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ভুট্টোকে অধিবেশনে যোগদানের আহ্বান জানান এবং বলেন যে ৬ দফা কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
১ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদে যোগদানের অস্বীকৃতি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, 'শুধু সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের সেন্টিমেন্টের জন্য অধিবেশন স্থগিত রাখা হইয়াছে এবং আমরা উহা নীরবে সহ্য করিতে পারি না। ইহার দ্বারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রায় ব্যর্থ হইয়াছে। পরিষদ অধিবেশনের জন্য সারা বাংলাদেশের সকল সদস্যই ঢাকায় ছিলেন। জনাব ভুট্টো ও জনাব কাইয়ুম খানের দল ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানি সকল সদস্যই অধিবেশনে যোগ দিতে রাজি ছিলেন।'
প্রতিবাদে ২ মার্চ সকাল থেকেই সর্বস্তরের মানুষ ঢাকার রাজপথে অবস্থান নেয়, ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। সকাল থেকেই মিছিল ছিল বিশ্ববিদ্যালয়মুখী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সেদিন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা আ স ম আবদুর রব সর্বপ্রথম পতাকা উত্তোলন করেন। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে এদিন থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান কথাটা প্রায় পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যায় বাঙালিদের মুখ থেকে। শেখ মুজিবুর রহমানও সন্ধ্যায় তার প্রেস কনফারেন্সে বারবার বাংলাদেশ উচ্চারণ করেন।
সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের প্রতি নির্দেশ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার অনুপস্থিতিতে আন্দোলন চালানোর রূপরেখা দেন। ৩ তারিখে সারাদেশে হরতাল পালনের আহ্বান করেন। পরদিন তিনি সংসদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত না-মানার ঘোষণা দিয়ে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েতের আহ্বান জানান।
৪ মার্চ পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ এয়ার ভাইস মার্শাল আজগর খান প্রেস কনফারেন্স করে বলছেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দেওয়া ছাড়া এই সংকট আর শেষ হবে না।
পাকিস্তান তো শেখ মুজিবকে বা আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই ক্ষমতা দিতে চায় না। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে মিছিলে গুলিবর্ষণ করেছে আর্মি। ঢাকায় ২৩ জন নিহত, চট্টগ্রামে ৭৫ জন। ঢাকা, সিলেট ও রংপুরে কারফিউ জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে ১১৩নং সামরিক আইন আদেশ জারি। চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা ১২১, খুলনায় নিহত ৬। ঢাকায় কারফিউ প্রত্যাহার।

প্রথম পতাকা উত্তোলন: ২ মার্চ ১৯৭১

ছাত্রলীগ ও ডাকসুর আবেদন- ৬ মার্চের মধ্যে ঢাকা শহরে এবং ৭ মার্চের মধ্যে সারাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন শেষ করতে হবে।
৫ মার্চ টঙ্গীতে গুলিবর্ষণ, ৪ জন নিহত ২৫ জন আহত। চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৮। রাজশাহী, রংপুরে আবার কারফিউ। ভুট্টোর সঙ্গে ইয়াহিয়ার ৫ ঘণ্টা বৈঠক। গভীর রাতে পাওয়া এক খবরে জানা যায়, জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবনে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠক করেন।
অতএব মার্চ মাসে এসে দেশকে আর স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে।
৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন ইয়াহিয়া খান। ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের ডাক। টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয় এই দিন।
৭ মার্চের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান ১০টি নির্দেশ দিয়েছিলেন। ৭ মার্চে সেই দশ দফাসহ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিলেন শেখ মুজিব এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক ডাক দিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তান আমাদের এ দাবিগুলো না মানলে আমরা স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ব। সেই দশটি দফা বা দাবির ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে অসহযোগ পর্যায় চালু থাকছে। এর মধ্যে একটি বড় দফা হচ্ছে- নো ট্যাক্স ক্যাম্পেইন, মানে আমরা আর ট্যাক্স দেব না।
৭ মার্চের ভাষণ ঢাকা শহরের মানুষ যারা শুনেছে, তারা যেভাবেই অনুভব করে থাকুক-কিন্তু গ্রামের মানুষকে এটি অনেক বেশি উজ্জীবিত করেছিল। আমরা গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, গ্রামের মানুষ সংগঠিত হয়েছিল এবং 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' এই স্লোগানকে তারাই সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন জয়গায় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়া শুরু হয়। যেটা মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল।
পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ৯ তারিখে ঘোষণা করেছে- শত্রু বাহিনীকে মোকাবিলায় প্রস্তুত হোন। গণস্বার্থে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখুন। পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চিত জনসাধারণের প্রতি মওলানা ভাসানীর আহ্বান- পূর্ব পাকিস্তানের আজাদি রক্ষা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ূন।
মুজিব-ভাসানী এক হবে- এই সংবাদটা বের হয়েছে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায়। মওলানা ভাসানী ১৪ দফা ঘোষণা করছেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দলের নির্বাচিতরা আওয়ামী লীগের পক্ষে আছেন। কারণ, তারাতো পাঞ্জাব এবং সিন্ধের অধীনে থাকতে চায় না। যেই সমস্যা পাকিস্তানে এখনও বিদ্যমান।
১১ মার্চ শেখ মুজিবের কাছে ভুট্টোর তারবার্তা। ঢাকায় আসতে রাজি আছেন বলে জানান। পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের ইয়াহিয়ার প্রতি বার্তা, অবিলম্বে প্রতিকার না করা গেলে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদিকে, নিউজপ্রিন্টের অভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রের কলেবর হ্রাস। করাচির ডনসহ পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোর কলেবর ১৪ পৃষ্ঠার পরিবর্তে মাত্র ৪ পৃষ্ঠা ছাপা হয়েছে। এসব পত্রিকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাগজ ব্যবহার করত। ১ মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চালান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
১৪ মার্চ করাচির এক জনসভায় ভুট্টো দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ সেই অর্থে ভুট্টোও মেনে নিচ্ছেন যে, একত্র পাকিস্তানের ক্ষমতা তো আর তার পাওয়া সম্ভব না-সে কারণে এখন আলাদাভাবে সে ক্ষমতার ভাগ চাইছেন। এবং উল্লেখ্য, এ সময়ে একটা কথা উঠেছিল- 'তুম ইধার, হাম ইধার'। মানে তুমি এদিকে নাও, আমি ওদিক নিচ্ছি।
অতএব এই বাস্তবতা কিন্তু পাকিস্তানিদের কাছেও বর্তমান। পাকিস্তানিরাও জানত। অর্থাৎ বিষয়টা কখনোই এমন না যে, পরিস্থিতিটা তারা নতুন করে অনুধাবন করছে।
১৫ তারিখ অনেকটা গোপনীয়তায় ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন। শেখ মুজিব কর্তৃক আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা। কমবেশি একটি সরকার যেভাবে ঘোষণা দেয়, সেরকম দীর্ঘ একটি ঘোষণাপত্র। সেদিন প্রেস কনফারেন্সে ভুট্টো বললেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
[ক্রমশ]