'শীত এলে মনে হয়, এবার দুপুর থেকে রাত মধুময় হয়ে যাবে, যে রকম চেয়েছেন পিতৃপিতামহ ...' শীতের রাতগুলো অন্য রাতের চেয়ে নিস্তব্ধ হয়। সেই ছেলেবেলাতেই দেখেছি শীত এলে থুত্থড়ে বুড়োর মতো স্থবির হয়ে যায় আকাশ। উত্তুরে বাতাসের নিঃশব্দ দাপটে পৃথিবীর প্রাণিকুল আরও নিঃশব্দে লুকিয়ে পড়ে চারদেয়ালে খিল এঁটে। শীতঘুমে নিভৃতে লুকিয়ে থাকে পার্থিব ব্যস্ততা। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে যেমন ছুটি পায় শৈশব। ঠিক এমনই কোনো এক শীতের রাতে আমার আউট বইয়ের সাথে সখ্য। আমার বাবাই প্রথম হাতে তুলে দিয়েছিলেন সে অমূল্য পৃথিবী। অপ্রস্তুত আমার হাতে, যে হাত পুতুলের ঘর সাজায়, টুকরো কাপড় জড়ো করে পুতুলের বিয়ের জন্য। তখন একদিন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বাবা কী জানি কী ভেবে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন 'ঠাকুরমার ঝুলি'। পাবলিক লাইব্রেরির কার্ড করে আনা বই। যত দূর স্মৃতিরা যায়, হাতড়ে দেখি। ঠিক নিউজপ্রিন্ট নয়, সাদা পাতাও নয়, দুয়ের মিশেলে স্বর্গীয় গন্ধ ছড়ানো পৃষ্ঠা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। স্মৃতি আর শৈশবে প্রথম ঢিল ছোড়া ঘ্রাণ। সে ঘ্রাণ আমি এখন আর কোথাও পাই না।
সেই রাতে নিরক্ষর শৈশব থেকে আমি ঝাঁপ দিলাম কল্পনার কৈশোরে। প্রাথমিক সেই শুরুর লগ্নে অক্ষর যখন কল্পনাকে পায়, কিংবা কল্পনা অক্ষরকে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দখল করে রাখে মানুষের আগামী, নিয়তির মতো। বোধ হয় মানুষ তারে চাইলেও পারে না এড়াতে।
আজ এখানে দাঁড়িয়ে আমি বেশ দেখতে পাই আমার অতীতের উৎসমুখ, যেখান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল আমার ভবিতব্যের। আউট বইয়ের আঙুল ধরে।
সুয়োরানী দুয়োরানী ডালিমকুমার ডাইনিবুড়ি ... দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তারা যে কেমন দখলদারিত্ব ফলায় আমার অস্তিত্ব গ্রাস করে, আমি টের পাই তখন, খেতে বসলে গলায় আটকে যায় মাছের কাঁটা, আমায় ডাকে সাত ভাই চম্পা, স্নানঘরে সাবান পিছলে যায় সেই যে অরুণ কুমার পৌঁছে গেছে পাথর হয়ে থাকা রাজপুত্তুরদের সামনে, এরপর ...। এরপর? এরপর?? 'এরপর' খুঁজতে থাকা আর ফুরায়নি এ জীবনে।
ঠাকুরমার ঝুলির রানী তো মাছ কোটেন, জল তোলেন, বাটনা বাটেন ঠিক আমার মায়ের মতোন। কোথায় যেন আমার মায়ের সাথে মিলে যান তারা সেই শিলনোড়া ধোয়া জল খাওয়ার বঞ্চনায়। ভাগ্যহত রানীদের চেহারায় আমি চোখ বুজলেই মাকে দেখি। 'দ্য জুনিপার ট্রি'র নিষ্ঠুর সৎমায়ের নির্মমতায় ভয়ে কুঁকড়ে যাই নিজের পরিণতি কল্পনায়। সেই তো শুরু আউট বইয়ের সাথে নিজের জীবনকে, চেনা জীবনকে দেখা জীবনকে সম্পর্কিত করার এক সহজ সমীকরণ। আমি অভিমন্যুর মতো আটকে যাই আউট বইয়ের চক্রবূ্যহতে। মাতা সুভদ্রা বূ্যহতে প্রবেশের গল্প শেষে আর বের হওয়ার গল্পটা বলতে পারেননি যে। আমার বাবাও বুঝি ঠাকুরমার ঝুলি তুলে দিয়ে কেবল প্রবেশপথটাই দেখিয়ে দিয়েছেন সেবার। আমিও কি ছাই বের হতে চেয়েছি আর?
বড় হতে হতে যেমন বালিকার ফুলতোলা ফ্রকগুলো বদলে যায়, জীবন চিনতে চিনতে, মানুষ জানতে জানতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে সালোয়ার-কামিজ-ওড়নায় বদলে যায়, আমাদের আউট বইয়ের তালিকাও বদলে যায়। বাবা বিচ্যুত হয়ে যান সে জগৎ থেকে, বন্ধুরা সহপাঠীরা একে একে দখল করে নেয় ফাঁক, শূন্যস্থান থাকে না কোথাও। সহপাঠী বন্ধুদের জগৎ আর নিজের জগতের মিথস্ট্ক্রিয়া। বড়বেলার পাঠ শুরু হয় দেবদাসের জন্য গলায় কান্না আটকে। এই যে পড়তে পড়তে চরিত্রগুলোকে দেখতে পাওয়া, সেই ঘাট, দেবদাসের ছিপ দিয়ে মাছ ধরা, পার্বতীর কপালে চিরস্থায়ী প্রেমের দাগ এঁকে দেয়া, পড়তে পড়তে কেউ ডুকরে আসা কান্না লুকায়নি বালিশের নিচে, আমার বিশ্বাস হয় না পৃথিবীতে এমন কোনো বাঙালি যুবক কিংবা যুবতী ছিল এককালে।
সেই এককালে। যেকালে ছেলেমেয়েদের হাতে হাতে ডিভাইস ছিল না, রিমোট ঘুরিয়ে একশটা বিনোদনের অপশন ছিল না, সেইকালে। আমাদের পৃথিবী দখল করে ছিল দস্যু বনহুর আর মাসুদ রানা। একটার পর আরেকটা, নাওয়া-খাওয়াহীন পৃথিবী ভোলা দিন-রাত আমার। এরই ফাঁকে কোন দিক দিয়ে কীভাবে যেন ঢুকে পড়ে কুউউউ ঝিক ঝিক অপু কাশবন, দুর্গা ...। ঢুকে পড়ে মেমসাহেব। কী নয়? শনাক্ত করতে শিখি যেন নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মতোই। কী আমার পড়তে ভালো লাগে, কী নয়।
শনাক্ত করতে শিখি এক নতুন পৃথিবী। যে পৃথিবীতে চাইলেই নিজেকে হারিয়ে ফেলা যায় মায়ের পাহারাদারি ভুলে। মা যে ডাকপিয়নের হাত থেকে ছোঁ নিয়ে নেন সব চিঠি, কিংবা আতিপাতি খোঁজেন পড়ার টেবিল, কোথাও কোনো প্রেমের ফাঁদে আটকে গেলাম কিনা!
এই যে নতুন পৃথিবী চিনতে শেখা, বিচিত্র মানুষ আর জীবনের গল্পে বুঁদ হয়ে যাওয়া আমি টের পাই না কখন আসলে এর ফাঁদেই পড়ে গেছি, যে বখাটের ভয়ে মায়ের গোয়েন্দাগিরি, অন্য ফাঁদের খবর মা জানেই না। জানেই না। আমি শরৎ-এর বড়দিদি, মেজদিদি, রামের সুমতি পড়ে ফেলি বইয়ের ভাঁজে রেখে, যার নিচে ত্বরণ-সরণ-প্রিজম তখন অসহায়। 'রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ' পড়ে পড়ে ঘুরে আসি পৃথিবী। উভচর মানুষের মতো প্রেমে পড়ি মৎস্যকন্যার। অক্ষরে অক্ষরে নিজেকে হারিয়ে ফেলার এই রাত ভোর হয়ে যাওয়া কাল কখন যে নিজের ভেতরে এক স্বপ্নবৃক্ষকে বীজ থেকে মহিরুহতে ডালপালা ছড়িয়ে গ্রাস করে নিয়েছে আমাকে, আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না আর।
অনাকাঙ্ক্ষিত হতে থাকল একাডেমিক পরীক্ষার রেজাল্ট। মা একদিন রসায়ন বইয়ের ভেতর থেকে টান দিয়ে বের করলেন 'বিবর'। সেই চড়ের জ্বলুনি এখনও হাত দিয়ে টের পাই, মা বোধ হয় জানতেন না এ নিষিদ্ধ বই। নইলে নিশ্চয়ই ঝাড়ুর শলাকাই ভাঙতেন পিঠে। বাবার বন্ধুরা বলতেন, মেয়ে আরও পদ্য লিখুক, সুফিয়া কামাল হবে তো। পড়েলিখে কী হবে? উপহাসের কাঁটার খচখচ ব্যথা আর ক্ষত বাবাই হজম করে নিতেন। আর বাসায় ফিরে আমার মাথায় হাত রেখে বলতেন, মারে দুনিয়াটা বড় কঠিন। পড়াশোনাটা ভালো না করলে টিকতে পারবা না।
টিকতে কি আমি পেরেছি? হয়তো পেরেছি। কিন্তু সে টেকা -মা-বাবার স্বপ্নের মতো নয়।
সে তো প্রতিষ্ঠা আর অর্থবিত্তের দিক থেকে।
কিন্তু এই যে মানুষের বেদনায় আর্দ্র হই, সংকটে অন্যের আগে নিজেকে ভাবি না, আচরণের সততায় দাঁড়িয়ে বলি কৈফিয়ত দেই না সে তো আউট বইয়ের জন্যই। নিজের সীমিত সামর্থ্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকি অর্থে বিত্তে সৃজনে সবই এই আউট বইয়ের জন্য। এর শব্দ অক্ষর চরিত্র সব মিলেমিশে যে তৈরি করে দিয়েছে আমাকে। আমাকে তৈরি করে যাচ্ছে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, মাক্সিম গোর্কি আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আমাকে তৈরি করে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ। সোনাবাবু, পাভেল কিংবা কুসুমের জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘুরতে ঘুরতে নিজের জীবনের বাঁকগুলো যে দাঁড়াতেই পারে না পথ আগলে!
সমবয়সীদের দিকে যখন তাকাই, এই সব প্রতিষ্ঠার আয়োজন, গাড়ি-বাড়ি, হাঁড়ি-পাতিল, বাসনকোসনের ভিড়ে এরা কুসুমের মধু পান করতে জানে না। এরাও সুখী। কিন্তু এই যে আমার এদের সুখ দেখে ঈর্ষা নেই সে তো কুসুমের মনস্তত্ত্ব জেনেছি বলে, শশী ডাক্তারকে দেখলে তার যে শরীর কেমন করে। কজনই-বা স্বীকার করতে জানে প্রকৃতির এই অনিবার্য আহ্বান? এই দেশ-কাল-রীতি প্রথায় উন্মীলিত হয়নি তাদের তৃতীয় চোখ। যা-ই ঘটে, যা-ই হয়, তাই স্বাভাবিক। জীবনের বহুমাত্রিক রং চেনা হয়নি তাদের। তৈরি হয়নি তাদের নিজের ভুবন। তারা মনের গোপন জানে না কোনোদিন ...। জানে না এই মানবজীবনে সংকীর্ণতার চৌকাঠ পেরোনো কতই সহজ!
'আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত-রাত্রিটিরে ভালো,
খড়ের চালের 'পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার;
পুরানো পেঁচার ঘ্রাণ;- অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ,- মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহদ্মাদে ভরা; অশ্বত্থের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক;'
মানুষ হিসেবে যে ছেলেটাকে দেখি ডাক্তারের চেম্বারের সামনে চেয়ার দখল করে বসে আছে, সামনে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি জানি সে আউট বই পড়েনি। ছকবাঁধা সিলেবাসে তাই মানুষ হওয়ার পরশ পাথরের সন্ধান পায়নি সে।
শিক্ষক হিসেবে যখন ছাত্রদের সহজাত বুদ্ধির কাছে জিজ্ঞাসা নিয়ে দাঁড়াই, পরীক্ষার দিনে যদি দেখ রাস্তায় যন্ত্রণায় কোনো রোগী কাতরাচ্ছেন, তুমি কী করবে? ছেলেটি উত্তর দিতে মুহূর্ত সময় নেয় না, আমি জানি এই নিষ্পাপ ছাত্রটির মানবিক বোধটাকে উস্কে দিতে পারে একমাত্র আউট বই।
অভিভাবক হিসেবে যখন পুত্র-কন্যার হাতে তুলে দেই আউট বই, ক্ষীরের পুতুল আর আমপাতার ভেঁপু খুব আশা নিয়ে থাকি এরা একদিন মানুষ হবে। পৃথিবীর কাঙ্ক্ষিত মানুষ। প্রতিষ্ঠার যন্ত্র নয়।
আর আমি তো সেই পথহারা অভিমন্যু, বূ্যহতে যে একবার প্রবেশ করেছি, ভেতরে জন্ম নিয়েছে এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা। সৃজনশীল থেকে মননশীল, আউট বই। ভেতরে জন্ম নিয়েছে যে অদম্য কৌতূহল, মুক্তি নেই তার থেকে জীবদ্দশায়। একদম মুক্তি নেই।
চাইও না মুক্তি। পৃথিবীর হীনতা, দীনতা ক্ষুদ্রতা, মনুষ্য নির্মিত জটিল আর রূঢ় আঘাত সবই তো ভুলে থাকা যায় কেবলই বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে। সেখানে যে ডুব দিতে শেখেনি জীবনের ক্ষুদ্রতা তাকে পর্যুদস্ত করবে বারবার।
আমি তারে পারি এড়াতে শুধু অনন্ত যৌবনা বইখানা আছে বলে। আউট বই।