খ্রিষ্টাব্দ ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকের কথা। ক্লাশ ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষা হইয়া গিয়াছে। রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা; এই অপেক্ষায় অধীরতা নাই। কত নম্বর পাইব, প্লেইস থাকিবে কিনা এইসব নিয়া মাথাব্যথা নাই। বৎসরের শুরুতে নতুন ক্লাশে উঠিব ইহাই বড় কথা। আর দুই-এক সপ্তাহ মাত্র বাকী। ইত্যবসরে খৎনা করানো হইয়াছে। বাসার উঠানের পশ্চিম প্রান্তে আমগাছ, পেয়ারাগাছ ইত্যাদির ছায়ায় মা পাটি পাতিয়া দিয়াছেন। সকালের নাশতা খাওয়া হইয়া গেলে সেইখানে উবু হইয়া বসিয়া খৎনার নতুন লুঙ্গি কিঞ্চিত উঁচাইয়া ধরিয়া বই পড়িতেছি।
স্থূলকায় বইটির নাম 'মবি ডিক', হারম্যান মেলভিলের লেখা 'মবি ডিক'। কে ইহার অনুবাদক ছিলেন মনে নাই। দৈত্যাকার তিমি মাছ 'মবি ডিক' আহাবের হাঁটুতে কামড় দিয়া পুরো একখানা পা কাটিয়া লইয়া গিয়াছে। জাহাজের সারেং ইসমাইল ইহার প্রতিশোধ লইবে। সে হন্যে হইয়া সমুদ্রে মবি ডিককে তালাশ করিতেছে-জীবনে সমুদ্র দেখি নাই, তিমি মাছ দেখি নাই, জাহাজ দেখি নাই। গল্প ফাঁদিতে গিয়া লেখককে কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়। আমার স্মরণ হয় 'মবি ডিক' পড়িতে গিয়া আমাকে অপার সমুদ্র, বিশালাকায় জাহাজ, তিমি মাছ, তিমি মাছ শিকারের অস্ত্র হারপুন এইসব কল্পনা করিয়া লইতে হইয়াছিল। কল্পনার জন্য পৃথক দৃষ্টির প্রয়োজন হয়। কল্পনার দৃষ্টি অর্জন শুরু হইল।
'মবি ডিক' সংগ্রহ করিয়াছিলাম ইউসিস লাইব্রেরি হইতে। টাউন হল ভবনের দক্ষিণ দিকের বই দিয়া সাজানো কক্ষটিই ইউসিস লাইব্রেরি। পরে ইহা প্রশস্ততর একটি ভবনে 'আমেরিকান সেন্টার' নামে স্থানান্তর করা হয়।
এই লাইব্রেরি হইতে আরও আরও বই আনিয়া পড়িয়াছিলাম, যাহাদের মধ্যে লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের লেখা 'এক যে ছিল চাষীর ছেলে' ও 'নদীর তীরে ফুলের মেলা'- এই দুইটির কথা মনে পড়ে। কে এইসব বই ইংরাজী হইতে বাংলায় অনুবাদ করিয়াছিলেন আজ আর তাহা মনে পড়ে না। বাঁধাই খুব সুন্দর ছিল। ভিতরের ছাপাও পরিপাটি। প্রকাশক কে মনে নাই। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিশার্স হইতে পারে। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিশার্স তাহাদের অনেক বই ইরানের রাজধানী তেহরানে লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে মুদ্রণ করাইয়া আনিত। বাংলাদেশে অফসেট মুদ্রণ তখনও চালু হয় নাই।
ভাবিয়া অবাক হইতেছি প্রাইমারি স্কুলের চৌহদ্দি ত্যাগের আগেই বিশ্বসাহিত্যের সাথে পরিচয় ঘটিয়া ছিল। ১৮৩৪ সালে প্রকাশিত ঞযব খধংঃ উধুং ঙভ চড়সঢ়বরর এর অনুবাদ ঐ সময়েই পড়া হইয়া গিয়াছিল।
১৯৬৬ সালের জুলাই মাসের এক শেষ রাতে ঘরের ভিতর নানা শব্দে ঘুম ভাঙিয়া গেল। কয়েকদিন আগে বাবা ঢাকা গিয়াছিলেন-মধ্য রাতের মেইল ট্রেনে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। প্যাস্ট্রি, ড্রাইকেক, আঙ্গুর ইত্যাদির সঙ্গে তিনি এক প্যাকেট বইও আনিয়াছেন। প্যাকেট হইতে বাহির করিয়া হারিক্যানের সলিতা উস্কাইয়া মেঝেতে বসিয়া একটি বই পাঠ করিতে শুরু করিলাম। বইয়ের নাম 'ধ্বংস পাহাড়'। লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। ঘটনা কী? কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের শেষ পর্বের কাজ জোরেশোরে চলিতেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান স্বয়ং উদ্বোধন করিতে আসিবেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষ আব্দুর রহমান (আবদুল) তিন দিন যাবৎ বাঁধ এলাকায় একটি অচেনা স্পিডবোটের আনাগোনায় উৎকণ্ঠিত। সে ঘটনাটা চিফ ইঞ্জিনিয়ার লারসেন সাহেবকে জানাইয়াছে। লারসেন সাহেব ঘটনা তদন্ত করিতে আসিয়াছেন। আমি পড়িতেছি:
"কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর রিজারভয়েরের মধ্যে দূরে একটা স্পিড-বোট দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন মি. লারসেন। উঁচু একটা টিলার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। আরও আধঘণ্টা পর আবদুলের কথামত সত্যিই পানির উপরে ছোট ছোট বুদ্বুদ দেখা গেল। শক্তিশালী টর্চ জ্বেলে দেখা গেল সেই টিলার দিক থেকে বুদ্বুদের একটা রেখা ক্রমেই এগিয়ে আসছে বাঁধের দিকে। গজ পনেরো থাকতে এগোনোটা থেমে গেল-এবার এক জায়গাতেই উঠতে থাকল বুদ্বুদ।
মি. লারসেন উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'মাই গড! আশ্চর্য! আবদুল, তুমি ছুটে যাও তো, স্টোর থেকে আমার নাম করে দুটো অ্যাকুয়া-লাঙ (ডুবুরির পোশাক) নিয়ে এসো এক্ষুণি। আর যাওয়ার পথে লোকমানকে বলে যাও আমাদের স্পিড-বোট রেডি করে ঘর থেকে যেন আমার রাইফেলটা নিয়ে আসে। যাও, কুইক।'
দৌড় দিল আবদুল। ঠিক সেই সময়ে দূর থেকে একটা ইঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার শব্দ শোনা গেল। সেই টিলার দিক থেকেই এল শব্দটা। ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল সেই শব্দ-ফিরে চলে গেল স্পিড-বোট।"
এইভাবে রহস্যকাহিনীতে আমার অভিষেক হইয়াছিল। পৃথিবী রহস্যময়। মানুষের কাণ্ড-কারখানাও রহস্যময়। মানুষ অপরাধপ্রবণ। অপরাধ থাকে রহস্যে ঢাকা। রহস্যের পরত ভেদ করিয়া শত্রুকে খুঁজিয়া বাহির করিতে হয়। ইহার জন্য প্রয়োজন হয় শারীরিক সামর্থ্য, তীক্ষষ্টবুদ্ধি, বিচিত্র জ্ঞান ও ক্ষিপ্রতা। রহস্য-কাহিনীর এই শিক্ষা আমাকে দখল করিল।
আমার মেজমামার বিবাহ হইয়াছিল খুলনায়। মামী ছিলেন অধ্যাপক কাজী দীন মুহাম্মদের ভাগিনেয়। বরযাত্রীদের সকলকে নানা উপহার দেওয়া হইয়াছিল-সঙ্গে প্রত্যেকের জন্য কাজী দীন মুহাম্মদের একটি বই। এই সূত্রে আমাদের বাসায়ও এক-দুইটি বই আসিল। বইয়ের নাম মনে করিতে পারিতেছি না। কিশোর উপন্যাস জাতীয় বই। কাজী দীন মুহাম্মদ ছিলেন ভাষাতাত্ত্বিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং তৎকালীন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক। তাহার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৪০টি।
কাগজপত্রে যাহাই থাকুক আমার জন্ম জুন মাসের ৩ তারিখে। ষাট দশকের মধ্যভাগের কোনো এক বৎসর আমার জন্মদিন পালিত হইতেছে। তখনও ময়মনসিংহ শহরে কোনো কনফেকশনারী চালু হয় নাই। জি. পাল এন্ড কোম্পানি কেবল পাউরুটি আর বিস্কুট তৈরি করে। জিলা স্কুলের মোড়ের দোকান হইতে দুই সের রসগোল্লা আনা হইয়াছে। প্রতি সেরের দাম ১ টাকা। সেরে ১৬টি রসগোল্লা। মা টাঙ্গাইলের খাঁটি গব্য ঘৃতের পরোটা, বড় আলু দিয়া খাসির মাংস ও ঘনদুধের সুজির হালুয়া রান্না করিয়াছেন। অতিথি বলিতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন।
বড় মামী উপহারস্বরূপ একটি বই লইয়া আসিয়াছেন। বইয়ের নাম 'ডানপিটে শওকত'। পরের দুই দিন কাটিল এই মজার কিশোর উপন্যাস পাঠ করিয়া। ইহার লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। নানী আনিয়াছিলেন 'ঠাকুমার ঝুলি' জাতীয় ছোটদের গল্প-সংকলন। ইহাতেই গডজিল্লা'র কাহিনী পড়িয়া ছিলাম। বিজ্ঞান কল্প-কাহিনীর সহিত পরিচয় হইল। উপহারের মধ্যে একটি ছিল ফররুখ আহমেদের শিশুতোষ ছড়ার বই। মজার মজার ছড়াগুলি আগ্রহের সহিত মুখস্থ করিয়াছিলাম। একটি ছড়ার কিয়দংশ স্মরণ করিতে পারি:
মেলায় যেয়ো না রে ভাই, মেলায় যেয়ো না,
মেলায় যাওয়ার নাম ক'রে কেউ পয়সা চেয়ো না।
ক্যাবলা কান্ত জিদ ক'রে ভাই সেবার মেলায় গেলো,
মেলায় যাওয়ার মজাটা ফের হাতে হাতেই পেলো।
ব্যাপারটা তাই তাদের কাছে বলছি খোলাখুলি,
মেলায় যাওয়ার জন্য যারা ক'রছে ঝোলাঝুলি

নানীর বাসা অদূরে। সেই বাসায় যাইয়া শুক্রবার দুপুরে মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ-সিন্ধু' পড়িয়া আসিতাম। আরেকদিন গিয়া দেখি বিরাট মোটাসোটা একখানা বই- নীহাররঞ্জন গুপ্তের 'কালো ভ্রমর'। প্রতিদিন যাই, একটু একটু করিয়া পড়িয়া আসি। কিরীটি রায়ের ভূমিকায় নিজেকে কল্পনা করিয়া কয়েক মাস কাটিয়া ছিল। ১৯৮১ সনে নীহাররঞ্জন গুপ্ত ঢাকা আসিয়াছিলেন। সেই সময় ঢাকা ক্লাবে গিয়া তাহার সাক্ষাৎকার লইয়া প্রকাশ করিয়াছিলাম।
ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যে বুকস্টলটি ছিল তাহা ছিল শশধর দত্তের লেখা দস্যু মোহন এবং স্বপনকুমারের লেখা রহস্য সিরিজের উৎস। সেই সময় স্কুলছাত্র কমবেশী সকলেই দস্যু মোহন পড়িত। সাধু ভাষায় লেখা। ক্লাশ এইটে উঠিবার আগেই দস্যু মোহন সিরিজের ১৫ খানা বই শেষ করিয়া ফেলিয়াছিলাম। ওসমানিয়া বুক ডিপো ছিল ভারী ভারী ইংরেজী বইয়ের দোকান। দস্যু বাহরাম সিরিজের বই এইখান হইতে সংগ্রহ করিতাম-মনে পড়ে।
কবিতার সঙ্গে তখনও পরিচয় হয় নাই। 'ঝিনুক পুস্তিকা' কর্তৃক প্রকাশিত 'সঞ্চিতা' ছিল আমার জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ পাঠ। 'ঝিনুক পুস্তিকা' অনেক পেপারব্যাক বই প্রকাশ করিত। তাহারা রবীন্দ্র-রচনাবলীর পাঁচ খণ্ডের পেপার ব্যাক প্রকাশ করিয়াছেন। আম্মার সহিত ইস্টার্ন ব্যাংকে গিয়া ৩০০ টাকা জমা দিয়া আসিয়াছিলাম।
বাবার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী সৈয়দ আব্দুস সুলতান কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ'র একখানা ছোট আকারে জীবনী রচনা করিয়াছিলেন। তাহার বই একখানা উপহার পাইয়া আব্বা বাসায় লইয়া আসিয়াছিলেন। ইহা ১৯৬৬ কি ১৯৬৭ সালের কথা। বাংলাদেশ স্বাধীন হইলে সুলতান চাচা লণ্ডনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নিযুক্ত হন।
ছেলেবেলায় যে দুইজন সাহিত্যিককে চিনিতাম তাহাদের মধ্যে একজন আমাদের প্রতিবেশী খানসাহেব আব্দুল্লাহ। তাহার বই বাসায় দেখিয়াছি। পবর্তীকালে তাহার রচিত 'মোমেনশাহীর ইতিহাস' গ্রন্থটি পাঠ করিয়াছি। আমার নানার বাসায় ভাড়াটিয়া জনৈক বয়স্ক ব্যক্তি পদ্য রচনা করিতেন এবং পূর্বাহ্নে উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেন। মুমিনুন্নিসা কলেজ সংলগ্ন সড়কে অবস্থিত ছাপাখানায় তাহার একটি বই ছাপা হইলে সেই কাব্যগ্রন্থও পাঠ করিয়া দেখিয়াছিলাম। উহার নাম ছিল 'জীবনের মণিমুক্তা'।
মওলানা ভাসানীর সভা-সমিতিতে বাবার নিয়মিত ঢাকা যাওয়া পড়িত। ঢাকা হইতে সর্বদাই তিনি দুই-চারিটি বই লইয়া আসিতেন। একবার তিনি আনিলেন 'কোরিয়ার কবিতা'। কোরিয়ার কবিতা কে বাংলায় অনুবাদ করিয়াছিলেন তাহার নাম মনে নাই। একটি 'সিজো' মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল তাহা স্মরণ করিবার চেষ্টা করি:
পথে হলো দেরি, ঝরে গেলো চেরি
দিন গেল বৃথা প্রিয়া
তবুও আমার, মাটির পাহাড়
সবুজ জয়ন্তিয়া।
শেক্সপীয়ারের সঙ্গে পরিচয় হইল ১৯৬৯ সালে। আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ কবীর চৌধুরীর আগ্রহে ছাত্ররা 'মার্চেন্ট অব ভেনিস' নাটকটি মঞ্চস্থ করিল। আমাদের বাসায় জায়গীর থাকিয়া নেত্রকোণার ফকির বংশের সন্তান নেছার ভাই ঐ কলেজে বি.এ. পড়িতেন। তিনি নাটক দেখাইতে লইয়া গেলেন। পরের দিন ওসমানিয়া বুক ডিপো হইতে বইখানা খরিদ করা হইল। দাম পড়িল পাঁচ টাকা। ইহাই আমার তরফে স্বউদ্যোগে কোনো বিদেশী বই ক্রয়। ময়মনসিংহে জিলা স্কুলে ক্লাশ সিক্সে পড়িতেছি।
এই সময় বাবা কোনো একটি রাজনৈতিক বৈঠকে যোগদানের জন্য মওলানা ভাসানীর সহিত লাহোর গিয়াছিলেন। তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করিলেন তাহার বাক্সপ্যাটরার মধ্যে এক বাক্স আম ছাড়াও বেশ কিছু বই পাওয়া গেল। রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের লেখা 'ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার' উহাদের একটি। বলাবাহুল্য, নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিলেও বইটি পড়া হয় নাই। কমরেড মাও জে দং-এর 'লাল বই' বাসায় কয়েকখান থাকিলেও কখনও পড়া হয় নাই।
ময়মনসিংহে মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৬ সালে। আমার বাবা ইহার সভ্য ছিলেন। সপ্তাহে এক বা দুইদিন গিয়া বই 'ইস্যু' করিয়া নিয়া আসিতেন। বইয়ের তালিকা তৈরী করিয়া দিতেন মা। এই সূত্রে বাংলা উপন্যাস বেশ পড়া হইয়াছিল। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হইবার আগেই অনেক বই পড়া হইয়া যায়। দেশ স্বাধীন হইবার পর ফাল্কগ্দুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, জরাসন্ধ, শংকর, নীহাররঞ্জন গুপ্ত ইহাদের বই সস্তা পেপারব্যাকে দেদার পাওয়া যাইতে লাগিল। আমরাও সেইসব কিনিতে কার্পণ্য করতাম না।
মুসলিম ইনস্টিটিউট হইতে আনিয়া ফেরত না-দেওয়া একটি বইয়ের নাম 'রাণীখালের সাঁকো'। কবি আহসান হাবীব-এর লেখা। কীভাবে বইটি হারাইয়া গিয়াছিল বলিতে পারি না। নিয়ম ছিল হয় বাজার হইতে বই কিনিয়া জমা দিতে হইবে, না হয় বইয়ের মুদ্রিত মূল্যের দ্বিগুণ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। একদিন রিকশা সহযোগে মায়ের সঙ্গে গাঙিনার পাড় গিয়া 'রাণীখালের সাঁকো' কিনিয়া আনিলাম। বাবা তাহা মুসলিম ইনস্টিটিউটে জমা দিয়া আমাকে দায়মুক্ত করিলেন।
সাহিত্যের মধ্যে যৌনবিষয় থাকে তাহা জানিলাম 'দুর্গম দুর্গ' পাঠ করিয়া। ইহা মাসুদ রানা সিরিজের পঞ্চম গ্রন্থ। ১৯৬৭-তে প্রকাশিত। ইহার শেষাংশে মাসুদ রানা নায়িকা ইশরাতকে চুম্বন করিল, ইশরাত কাঁপিয়া উঠিয়া চোখ বন্ধ করিল। আমিও সর্বশরীরে অজ্ঞাতপূর্ব শিহরণ অনুভব করিলাম। মাসুদ রানা সিরিজের 'মূল্য এক কোটি টাকা মাত্র' প্রকাশ হইলে সরাসরি তাহা হাতে পাওয়া গেল না-আম্মাজী বেশ কিছু পাতা স্ট্যাপলারে পিন গাঁথিয়া আটকাইয়া দিলেন।
স্কুলের লাইব্রেরী কম বড় ছিল না। কিন্তু তাহাতে যাতায়াতের অবারিত সুযোগ ছিল সীমিত। যেই দিন প্রথম লাইব্রেরিতে নেওয়া হইল সেই দিন কামাল উদ্দীন স্যার একখানা শীর্ণকায় গ্রন্থ হাতে তুলিয়া দিলেন। রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর করিয়া সেই বই বাসায় লইয়া গেলাম। বইটি মুনশী মেহেরুল্লাহ'র ক্ষুদ্রকায় জীবনীগ্রন্থ (১৮৬১-১৯০৭)। কাহার লেখা জীবনী তাহা স্মরণ হয় না।
প্রগতি প্রকাশনীর কথা না লিখিলে এই স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ থাকিবে। ইহাদের দোকান ছিল শহরের ছোট বাজার এলাকায় একটি শ্যাঁওলা ধরা বাসভবনের নিচতলায়। সোভিয়েত রাশিয়ার মুদ্রিত সুশোভন বইগুলির কাচের আলমারীতে রক্ষিত ছিল। মিখাইল শোলোকভের রচনা- 'ধীরে বহে ডন' উপন্যাসটির বঙ্গানুবাদ ১৯৭০-এ পাঠ করি। সম্ভবত: ননী ভৌমিকের অনুবাদ। তাহার ভাষা আমার বিশেষ পছন্দ হইয়াছিল। অনুবাদক হিসাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। দুঃখের বিষয় আজ তাহার কথা বিশেষ কেহ মনে করে না।
১৯৭০-এর শেষভাগে ময়মনসিংহে একটি মেলা হইয়াছিল স্টেডিয়ামের মাঠে। তখন দেশে এয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন চলিতেছে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসান মেলার উদ্বোধন করিয়াছিলেন। ঐ মেলা হইতে একটি কবিতার বই ক্রয় করিয়াছিলাম। ইহার মাধ্যমে আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে আমার অভিষেক হইল। দুর্ভাগ্যের কথা কবির নাম স্মরণ হয় না। বাংলা কবিতার বিষয়ে আগ্রহী হইয়াছি আরো কিছু পরে- মুসলিম ইন্সটিটিউট হইতে আনা হায়াৎ মামুদের 'মৃত্যু চিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা'র প্রবন্ধসমূহ পাঠ করিয়া। ১৯৭৩ সালে আমার অগ্রজা কলেজের রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হইলে কিছু বই উপহার পাইলেন। তাহার একটি আহমদ ছফার 'জাগ্রত বাংলা'। 'জাগ্রত বাংলা' আমাকে মুগ্ধ করিল না, অন্য আরেকটি বই আমাকে মুগ্ধ করিল। এই মুগ্ধতা পরবর্তীকালে দৃঢ়মূল হইয়াছে। বইয়ের নাম 'রবীন্দ্রনাথ :কথাসাহিত্য'। লেখক বুদ্ধদেব বসু। উন্নতমানের বাংলা গদ্যশৈলীর সহিত পরিচিত হইলাম।
স্কুলপাঠ্য বইয়ের জগৎ ছিল সংকীর্ণ। প্রকৃতপক্ষে বইয়ের জগৎ অসীম। আমাদের সৌভাগ্য, শৈশবে ও কৈশোরে সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বই পড়িবার পথে বাধাগ্রস্ত হই নাই। স্কুলের চৌকাঠ পার হইয়া কলেজে উঠিবার আগেই পাঠাভ্যাস দাঁড়াইয়া গিয়াছিল। তবে ইহার জন্য আমার পিতা-মাতার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। নানা বিষয়ে নানা পদের বই পড়িয়া দিন কাটাইবার আনন্দ আর কীসে?