মাহমুদুল হকের বহুল পঠিত উপন্যাস 'জীবন আমার বোন'। বরাবরই মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, তাদের দ্বিধাগ্রস্ততা, অপূর্ণতা আর সুবিধাবাদী চরিত্র অসাধারণভাবে এঁকেছেন এই শিল্পী তার প্রতিটি উপন্যাসে। 'জীবন আমার বোন' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহেদুল করিমের মধ্যবিত্তীয় সুবিধাবাদী মানসিকতার পাশাপাশি যুদ্ধের নানা বাস্তবতায় নিজের বোঝাপড়াও লেখক তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। লেখকের অসামান্য উপস্থাপনা, ভাষার কাব্যিক ব্যঞ্জনায় ছোট্ট, হৃদয়গ্রাহী উপন্যাসটি যতই পড়া যায় ততই বিষমবেদনায় ভারাক্রান্ত করে। 'জীবন আমার বোন' লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে, ১৯৭২ সালে। বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে। এটি লেখকের তৃতীয় উপন্যাস। এর আগে থেকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত জীবন আমার বোন একই সঙ্গে একটা ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়ে আসছে। 'জীবন আমার বোন' বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ, যে কাহিনি মানবিকতায় এতই সমুজ্জ্বল যে এর অনিঃশেষ তাৎপর্য প্রত্যাশিত ধারার বিশ্নেষণে বুঝে-ওঠা যাবে না, মাহমুদুল হকের রচনার প্রতীক ও ইঙ্গিত সব সময়ে ছাপিয়ে যেতে চাইছে গৎবাঁধা চিন্তা, সেই পরিচয়ই মেলে ধরেছে 'জীবন আমার বোন'। একে প্রসারিত মাত্রায় বিবেচনায় নিলে যেমন আমরা বুঝতে পারব রচনা-মাহাত্ম্য, তেমনি অনুভব করতে পারব রচয়িতার জীবনদৃষ্টিভঙ্গি। কেননা, শেষ পর্যন্ত তো উপন্যাসে তিনি বলেছেন নিজেরই কথা। মাহমুদুল হক তথ্যসারণিকে ইতিহাসজ্ঞান করেননি। উত্তাল বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার ভেতর ব্যক্তির বিবিক্তি, দ্রোহ, সমর্পণ ইত্যাকার মানবিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর থেকে সংগ্রহ করেছেন ইতিহাসের শাঁস। কবি শামসুর রাহমান জীবন আমার বোন-এর শেষ প্রচ্ছদে মাহমুদুল হকের সাহিত্যকৃতি বিষয়ে যে মূল্যায়ন করেন, তাতেই যেন যথার্থ ব্যাখ্যাত এ উপন্যাস। জীবনের উপরিস্তরেই তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ নয়, তার দৃষ্টি যায় আরও অনেক গভীরে, যেখানে আদিম লতাগুল্মে আচ্ছাদিত এক জটিল জগৎ, যা মানুষের অস্তিত্বকে নাড়া দেয়, 'আমূল, আলো-অন্ধকারে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দেয়।'
মাহমুদুল হক তার চরিত্রের যান্ত্রিক গঠনে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই খোকাকে তার অন্তর্গত আলো-অন্ধকার, তার সংগ্রামকাতর এবং একই সঙ্গে পিছুটানপ্রবল চৈতন্যকে নিগূঢ় রসায়নে রূপায়ণ করেছেন। এয়ারপোর্ট থেকে হাজার হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নামছে। কসাই টিক্কা খান ঢাকায় আসছে। প্রাণ দিচ্ছে আসাদ। আর আমাদের খোকা উদ্ভূত পরিস্থিতির গনগনে আভার ভেতর থেকে মাঝেমধ্যেই ডুব দেয় নীলাভাবীর খোঁড়লে। এ উপন্যাস ইতিহাসশাস্ত্র নয়। এই উপন্যাস ইতিহাসশাস্ত্রের নথি না হলেও তা মুক্তিযুদ্ধ নামক ঘটনার স্বরূপ প্রকাশে বিশেষভাবে সমর্থ হয়েছে। কারণ, তা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাচরিত্রকে যে প্রখরতায় নির্মাণ করেছে এবং সে ঘটনার কর্তাকে যেরূপে হাজির করেছে, তা বিরল। ইতিহাসের কাহিনি নথিকারের মতো না বলেও যে ইতিহাসের দর্শনকে দৃশ্যমান করা যায়, জীবন আমার বোন তার আরেক প্রমাণ ছাড়া কিছু নয়। 'জীবন আমার বোন' মাহমুদুল হকের অন্যতম প্রধান সৃষ্টি, বাংলা কথাসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন, সার্বিক বিবেচনায় একটি শিল্পসফল উপন্যাস। এ উপন্যাসের অধিকাংশ পরিসরে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের, সমাজ ও রাজনীতির উত্তেজনা জায়গা করে নিয়েছে। তার বিশ্নেষণও রয়েছে। সম্ভবত বলা চলে না যে মুক্তিযুদ্ধ এই রচনার মূল বিষয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সমকালের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে ও গতি-প্রকৃতি এতে ব্যক্তির অনুভূতির মধ্য দিয়ে বিশ্নেষিত হয়েছে। সে হিসেবে এ উপন্যাস সমকালের অন্তর্দশন বটে।
প্রশ্ন
১. উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয় কত সালে?
২. 'জীবন আমার বোন' উপন্যাসটি কোন সময়কার প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা?
৩. উপন্যাসের শিরোনাম কোন কবির কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে?
কুইজ ২৭-এর উত্তর
১. ১৩৫৬
২. পাগলা পাদরী
৩. ওথেলো
কুইজ ২৭-এর জয়ী
মোহাম্মদ এনাম হোসেন
উত্তর কলেজ রোড, মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর

সেঁজুতি লিমা
গয়ঘর, পালং, শরীয়তপুর

সাইয়ি্যদ মঞ্জু
কুতুবজোম, মহেশখালী, কক্সবাজার।
নিয়ম
পাঠক, কুইজে অংশ নিতে আপনার উত্তর পাঠিয়ে দিন ৫ অক্টোবর মঙ্গলবারের মধ্যে কালের খেয়ার ঠিকানায়। পরবর্তী কুইজে প্রথম তিন বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে। বিজয়ীর ঠিকানায় পৌঁছে যাবে পুরস্কার।