মৃত্যুর সময় মানুষ কি বুঝতে পারে, চিরদিনের জন্য সে বিদায় নিচ্ছে জীবিতদের কাছ থেকে!
নিশ্চিতভাবে এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট তথ্য কোনোদিনই জানা যাবে না, মৃতদের সাথে কথোপকথনের কোনো উপায় কারও জানা নাই; তবে আবদুল গফুর আলাল তার সদ্যপ্রয়াত মায়ের মুখখানার দিকে চেয়ে বুঝতে পারে, তার মা ফজিলা বানু কিছু আগে তার আর তার বোন নীলুফার বানুর কাছ থেকে প্রায় হাত উঁচিয়ে বিদায় নেওয়ার মতো করেই বিদায় নিলেন।
দেশ যখন করোনার প্রকোপে প্রকম্পিত, তখনও ফুলবাড়িয়ার প্রত্যন্ত বাদিহাটির মানুষেরা করোনা রোগ কী প্রকার- তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে 'ইটা বড়লোকের রোগ, আমরার করোনা হয় না' বলে মশকরা করলেও অচিরে তারা বুঝতে পারে এই রোগ তাদেরও হয়, আর রোগ হলে এটা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জ্বর, কাশি কি বুক ব্যথা- কয়েক দিনের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, তারপর অধিকাংশ ভালো হলেও কেউ কেউ মরে যায়; আর যা হয় বাদিহাটিতে- ঘটনার চেয়ে গুঞ্জন বেশি, করোনা আক্রান্ত শুনলে তাকে একঘরে করা, মৃতের জানাজা বা দাফনে বিপত্তি ইত্যাদি শুরু হয়।
উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা সামান্য, তাই অধিকাংশ তীব্র অসুস্থের গন্তব্য হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
দৈনিক যুগবার্তা পত্রিকার ফুলবাড়িয়া প্রতিনিধি আবদুল গফুর আলাল তার অসুস্থ মাকে নিয়ে পাঁচ দিন আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে, ততদিনে রাজধানী ও বড় শহরগুলো ছাড়িয়ে করোনা ছড়ায় দেশের আনাচে-কানাচে, ছড়িয়ে পড়ে ময়মনসিংহের সমস্ত প্রান্তিক এলাকায়- রোগীর ঢেউ এসে জমা হতে থাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঠাঁই নাই, এতটুকু ঠাঁই নাই- এই রোগের চিকিৎসা বলতে অবিরাম অক্সিজেন সরবরাহ; বেসরকারি পর্যায়ের হাসপাতালে কোথাও অক্সিজেনের ব্যবস্থা নাই, ছিটেফোঁটা যা আছে সবই প্রাথমিক পর্যায়ের, আবদুল গফুর আলাল সাংবাদিক- সে জানে, করোনা বাড়ন্ত হলে 'হাইফ্লো' অক্সিজেন দিতে হয়, আর তারপর ভেন্টিলেশন- এসবই মেডিকেল কলেজ ছাড়া আর কোথাও নাই, আলাল তার যোগাযোগ সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে মা ফজিলা বানুর জন্য প্রথমে একটি সাধারণ বেড আর এক দিনের মাথায় একখানা কেবিন জোগাড় করে, ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আতাউল করিম খোকন তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করে। কেবিনে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পায় ফজিলা বানু, কিন্তু ষাটোর্ধ্ব ফজিলা বানু- করোনা দ্রুত তার ফুসফুস দখল করে; চিকিৎসকদের অবিরাম চেষ্টা আর অবিরত অক্সিজেন সরবরাহের পরও ফজিলা বানু শ্রাবণ মাসের এক বুধবার রাত ৯টায় মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে নাক-মুখের বহুবিধ নলের মধ্য থেকেই তার ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসা চোখ ফজিলা বানু যতদূর পারে খুলে রাখবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে 'যাই' বলবার মতো হাত উঁচিয়ে ইশারা করে। কেবিনে থাকা চিকিৎসক আলালকে বলে, 'আপনার মায়ের কানে দোয়া পড়ে ফুঁ দেন।'
কোনো দোয়া মনে পড়ে না আলালের। সে শূন্যদৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছুক্ষণ আগে হাপড়ের মতো ওঠানামা করা মায়ের বুক নিঃসার হতে থাকে, বিছানার পাশে রাখা অক্সিমিটারে দেখা যায় অক্সিজেনের কাঁটা ৪০ থেকে ৩০, ৩০ থেকে ২০, ২০ থেকে ১০ নামতে নামতে শূন্যে মেশে।
ঘনিষ্ঠ স্বজন মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকফাটা কান্নায় ফেটে পড়ে মরদেহের পাশে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনেরা, গত কয়েক দিনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই হয় আলালের অভিজ্ঞতা- কিন্তু নিজের মায়ের মৃত্যুতে সে কাঁদে না, হতবিহ্বল হয়ে বোনের দিকে তাকায়, বোন কী করবে ভেবে পায় না, সম্ভবত নীলুফার বানুও বুঝতে পারে না- এরই নাম মৃত্যু! বারকয়েক 'আল্লা, আল্লা' শব্দ করে 'তোর দুলাভাইরে ফোন দে আলাল' বলে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা ওষুধ-কাগজপত্র, কাপড়চোপড়, চাদর-বালিশ ইত্যাদি মাথা নিচু করে গোছাতে শুরু করে।
আলালের মনে হতে থাকে, এখন তার একটা কাগজ প্রয়োজন, যাকে বলে 'ডেথ সার্টিফিকেট', তারপর সে মাকে নিয়ে বাদিহাটি রওনা দেবে- ফুলবাড়িয়ার যে অ্যাম্বুলেন্সে মাকে নিয়ে পাঁচ দিন আগে আসে, সেটির ড্রাইভারকে সে ফোন দিয়ে হাসপাতালে আসতে বলে।
আলালেরা দুই ভাই, দুই বোন- নীলুফারের মতো আরেক বোন মলিনা বানুরও বিয়ে হয় বাদিহাটির পার্শ্ববর্তী কাওয়ানাড়া গ্রামে; বড় ভাই আবদুল মজিদ জালাল ময়মনসিংহ সদরে ঠিকাদারির ব্যবসা করে, সেদিনই দুপুরে এসে জালাল মাকে দেখে যায়- কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সে দেখে অক্সিজেন গ্রহণের জন্য প্রাণান্ত লড়াই করে মা- করোনার ভয়ে ভীত জালাল মায়ের হাত ধরা দূরে থাক, নিঃশ্বাস দূরত্ব এড়িয়ে চলে। গত পাঁচ দিনে হাসপাতালে বার দুই আসে বটে জালাল, তবে মাস্ক-টুপিতে ঢাকা দরজায় দাঁড়ানো বড় পুত্রকে ফজিলা বানু আদৌ চেনে কিনা, বলা মুশকিল হয়।
বড় ভাইকে ফোন করে জালাল, 'মা আর নাই!'
নীরবতা নামে।
'বুঝছি। দুপুরেই বুঝছিলাম। কী আর করবি। বয়স হইছে। আল্লা নিয়া গেছে।...ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' -জালাল বলে।
আবার নীরবতা।
আবার বলে জালাল, 'একদিক দিয়া ভালোই হইছেরে আলাল। আম্মা নিজেও কষ্ট করল না, আমাদের কাউরে কষ্টও দিল না। তাড়াতাড়ি চইলা গেল!'
এবার কথা বলে আলাল, 'কষ্ট কীয়ের! আর পাইমু জীবনে মায়েরে! কষ্ট করতে চাইলেও পামু?'
আবার নীরবতা।
'ভাই, আম্মারে নিয়া বাড়িত রওনা দিতাছি।' জালাল বলে।
'বাড়িত নিবি? ময়মনসিং কবর দিলে ভালো হইব। গুলকিবাড়ি গোরস্তান। ওইখানে করোনা রোগীর কবর হয়। বাদিহাটিত ঝামেলা হইতে পারে।'
'কী কও, ভাই?'
'গ্রামে গোরস্তানে কবর দিতে দিব না। ঝামেলার দরকার কী?'
আলাল বিস্ময় মানে, মায়ের কবর দেওয়া ঝামেলা কেন হবে? আর হলে তারাই বা মানবে কেন? এলাকায় সে পরিচিত সাংবাদিক, তার সাথে মায়ের কবর নিয়ে ঝামেলা করা সহজ হবে নাকি! আর সে মাকে কবর দেবে নিজের বাড়ির উঠানে, সেখানে কে আবার ঝামেলা করতে আসবে।
'উঠানে কবর দিবি মানে? উঠানে কেন? এইটুকু বাড়ি চার ভাগ হইলে কে কতটুকু ভাগ পাব আমরা, বোনেরা ভাগ ছাড়বে মনে করছস! এর মধ্যে আবার একটা কবর দিবি? আর গোরস্তানে ফেরেশতারা সব সময় দোয়া করে। বাড়ির কবরে ফেরেশতা আসে না। শহরে কবর দিলে আমরা শুক্রবার করে যেতে পারব!'- বড় ভাইয়ের কথা শুনে স্তম্ভিত আলাল কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না, শুধু অস্ম্ফুট বলে- 'আমি যে ভাগ পাব জমির, তাতে উঠান দিও। ওইখানে আম্মার কবর দিব।'
জালাল বোঝায় আলালকে, 'তোর বয়স কম। বিয়াশাদি করস নাই। একদিন বিয়া করবি। জায়গাজমি লাগব।'
'আব্বার কবর তো বাদিহাটিতে। আম্মা শহরে থাকবে?' আলাল বলে।
'আব্বার কবর হইছে বাদিহাটি গোরস্তানে। আম্মাকে তাইলে গোরস্তানেই কবর দে। আম্মা একলা বাড়িত কেমনে থাকব?' এবার বলতে বলতে বড় ভাই জালাল ফোনের ওপ্রান্ত থেকে হাইমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
বড় ভাই আলালের চেয়ে দশ বছরের বড়- পঁয়ত্রিশ বছর বয়স- বউ, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে ময়মনসিংহের সানকিপাড়ায় ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে, ব্যবসা জমিয়ে নিতে পারেনি সে, স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রী পাশে থাকায় চলছে কোনোরকম, মাঝে দুই বোন, সবার ছোট আলালের বয়স পঁচিশ- দশ বছরের ব্যবধানে তারা চার ভাইবোন- আলাল ফুলবাড়িয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করে কয়েক বছর হয় সাংবাদিকতা করে।
ফুলবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি কাজিমউদ্দিন, দৈনিক আলোর দেশ পত্রিকার ফুলবাড়িয়া প্রতিনিধি, আলাল তাকে ফোন দিয়ে নিজের মায়ের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে, জানাজা ও দাফন বিষয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা বলে। আলাল বলে, তার সহকর্মী সাংবাদিকদের যেন কাজিম ভাই খবরটা দেয় এবং সকালে তার বাদিহাটির বাসায় সকলকে আসতে বলে; স্থানীয় মসজিদে জানাজার পর নিজ বাড়ির উঠানে মাকে দাফন করবে আলাল।
কাজিমউদ্দিন মধ্যবয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ- আবদুল গফুর আলালকে সে স্নেহের চোখে দেখে, ছেলেটার পড়াশোনা ভালো, খানিক কবি প্রকৃতির, কবিতাও লেখে, স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হয়, বেশ সংবেদনশীল; কিন্তু বাস্তব জ্ঞান কিছু কম। সারাদেশে ছড়িয়ে যাওয়ার বেশ পরে বাদিহাটিতে করোনা আসে, করোনা তাই এলাকায় এখনও বিরাট আতঙ্ক, কেউই মৃত করোনা রোগীর জানাজায় অংশ নিতে চায় না, গোরস্তানে এখনও কাউকে দাফন করা হয়নি, ঝোপেঝাড়ে চুপেচাপে কয়েকজন মৃতকে দাফন করা হয়, নিজেদের দুই/চারজনের উপস্থিতিতে জানাজাও হয়। এ অবস্থায় আবদুল গফুর আলাল তার মায়ের জানাজা মসজিদে করে নিজের বাড়ির উঠানে মাকে দাফন করতে চায়! কাজিমউদ্দিনের ধারণা হয়, আলাল মসজিদের মাইকে মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য গ্রামবাসীর প্রতি ঘোষণাও দিতে চাইবে।
কাজিমউদ্দিন বুঝতে পারে, আপাতত আবদুল গফুর আলালকে বাস্তবতা বোঝানো যাবে না। সে আলালের মায়ের মৃত্যুতে নিজের শোক প্রকাশ করে বলে, 'আল্লার কাছে সবাইকে যাইতে হবে। আর তার বয়সও তো হইছিল। সত্তর বছর আয়ু পাওয়া কম না। শোকর কর মিয়া।'
রেগে ওঠে আলাল, 'আমার মার বয়স ষাইটও হয় নাই। সত্তর কন কেন? আর সত্তর হইলেই কী? মায়ের আবার বয়স হয় ভাই?'
'তা তো ঠিকই। তা তো ঠিকই। তয় কইছিলাম, আমি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারাইছি। তুমি তো তাও অনেক দিন মা পাইলা!'- কাজিমউদ্দিনের এই কথায় আলাল চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ; তারপর বলে, 'আপনি সবাইকে জানাজায় আসতে বলেন। আমি ডেথ সার্টিফিকেট নিয়া অ্যাম্বুলেন্সে রওনা দিতেছি। গাড়িতে উইঠা আরও ফোন দিতেছি।'
'শোন মিয়া। মায়েরে গোসল দিবা কোথায়? কে দিবে? বাদিহাটিতে আনলে গোসল ছাড়া দাফন দিতে হবে কইলাম। একটা মানুষ পাবা না! তোমার মা করোনায় হাসপাতালে ভর্তি ছিল সবাই জানে, ডরের চোটে তোমরার বাড়ির আশপাশে কেউ যায় না।'
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে আলালের। এই কথা তার মাথায় আসে নাই, আসলেই তো তার মৃত মাকে গোসল করাবে কে? বোন নীলুফার বানু আছে, প্রতিবেশী কয়েকজন চাচি-খালাকে নিয়ে পারবে না? অবশ্য নীলুফার একেবারে অনভিজ্ঞ- বাবা যখন মারা যান, নীলুফার আর আলাল- যথাক্রমে দশ আর আট বছরের বালক/বালিকা, মৃত্যু বিষয়টি ঠিকমতো বুঝেই ওঠেনি, তখন গোসল-জানাজা-দাফন ইত্যাদি স্বাভাবিক নিয়মেই হয়, আশপাশের কাকা-খালুরা সবাই মিলে নিমেষে সব করেন- এখন করোনার মৃত্যুতে সবই অচেনা আর এলোমেলো হয়ে ওঠে।
হাসপাতালে মৃত মানুষের গোসলের ব্যবস্থা নাই?
'না। হাসপাতালে এই ব্যবস্থা নাই।' কেবিনের নির্দিষ্ট চিকিৎসক ডা. মিলনের সাথে আলালের গত পাঁচ দিনে এক ধরনের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়, ডা. মিলন দ্যাখে মায়ের চিকিৎসার জন্য এই যুবক প্রাণপাত করে, তবে অনেক দেরি করে হাসপাতালে ফজিলা বানুকে আনা হয়, ক্ষতি যা হওয়ার ততদিনে হয়ে গেছে।
'এত দেরি করে মাকে হাসপাতালে আনলেন? আপনার তো ভালোই যোগাযোগ আছে দেখছি। লেখাপড়াও ভালো।' ডাক্তার শামীম বলেছিলেন আলালকে।
'আমাদের গ্রামে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা ছিল না। জ্বর-শ্বাসকষ্ট হয়া মানুষ মারা গেছে, সবাই ধারণা করছে- হাঁপানিতে মারা গেছে। করোনা টেস্টের জন্য ফুলবাড়িয়া যাইতে হইতো! আজকাল বাদিহাটিতে টেস্ট হয়, তাও কেউ যায় না বিশেষ। করোনা হইছে শুনলে তারে একঘরে করে সবাই! আম্মাকে বহুকষ্টে করোনার টেস্ট করাতে রাজি করাই।'- আলাল চিকিৎসককে জানায়।
হাসপাতালে মৃতের গোসলের ব্যবস্থা নাই জানিয়ে ডাক্তার শামীম মায়ের ডেথ সার্টিফিকেট আলালের হাতে দিয়ে বলেন, 'নিজের গ্রামে মাকে নিয়ে যান। আত্মীয়স্বজন আছে, কয়েকজন মহিলা মিলে গোসল দিয়ে দেবে। এটা নিয়ে এত চিন্তা কীসের?'
অ্যাম্বুলেন্সে মায়ের মরদেহসহ বোন নীলুফার বানুকে নিয়ে বাদিহাটির দিকে রওনা দেয় আলাল। ডুকরে ডুকরে কাঁদে নীলুফার, বোনকে কাঁদতে দেয় আলাল, কয়েকজনকে ফোন দেয় সে, বাদিহাটিরই- মোখলেস, কাশেম, ইদ্রিছ- পলাশীবাটা ইশকুলে যাদের সাথে সে পড়েছে একদা, প্রতিবেশী কয়েকজনকে; সবাই শুরুতে মর্মাহত-দুঃখিত, 'আহারে', আর তারপর 'যা হওয়ার হইছে! মা-বাপ তো আর সকলের চিরকাল থাকে না। তোমারও থাকল না। এইটাই নিয়তি।...তয় বাড়িত নিয়া আসার বুদ্ধিটা ভালো হইল না। মোমেনসিং গোরস্তানই ভালো হইত। জালাল ঠিকই কইছিল... করোনার মইদ্যে, সবারই জানের ডর আছে! করোনায় মরলে তার থিকা খুব জোর করোনা ছড়ায়...।
ঘনিষ্ঠ মানুষদের নিরাসক্ত কণ্ঠ- দুই বোনজামাই ফোন দিয়ে একই কথা বলে, নীলুফারের বর জামশেদ মাস্টার আরেক কাঠি চড়া- তোমার বোন হাসপাতালে করোনার রোগীর সাথে রাতদিন ছিল, এখন গুষ্টিসুদ্ধা মরতে পারব না। বাসায় আমার বুড়া বাপ-মা আছে, ছোট ছেলেমেয়েরা আছে, যা হওয়ার হইছে, বোনরে আজ রাইতেই কাওয়ানাড়ায় পাঠায় দাও। গোসল-টোসলে যেন সে না যায়, করোনা রোগীর গোসল আমার বউ করাবে না। সে এখন বাড়ি আসবে। আইসা আইসোলেশনে থাকবে পনেরো দিন।' পলাশীহাটা ইশকুলের বিজ্ঞান শিক্ষক জামশেদ আকন্দ বিএসসির মুখে এই কথা শুনে আর কথা বাড়ায় না আলাল, চুপচাপ বসে থাকে অ্যাম্বুলেন্সে, গাড়ি দ্রুতবেগে বানাড় নদীর দিকে এগোয়, রাত সাড়ে বারোটা পেরোয়, আর আধঘণ্টার মধ্যে বাদিহাটির নিজের বাড়িতে পৌঁছে যাবে মাকে নিয়ে আলাল।
'আলাল, যা গেছে তা আর ফেরত পামু না। বাড়িত ঝগড়া-বিবাদ ভালা লাগে না। তোর দুলাভাই যা কইছে তা-ই করি। মাকে বাড়িত নামায়া আমারে অ্যাম্বুলেন্স দিয়া কাওয়ানাড়া পাঠায় দে। সকালে বুঝায়া-শুনায়া আবার আসমু আমি।'- নীলুফারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবারও ফোন দেয় আরেক বোন মলিনা, রাত নয়টা থেকে কতবার যে সে ফোন করে তার হিসাব নাই, এবার অবশ্য অন্য কথা বলে মলিনা- 'আমি তো রাইতেই বাড়িত আসতে চাইলাম। তোর দুলাভাই রাজি না। বাচ্চাদের করোনা হইতে পারে। তয় ভোর বেলা বুজানের লগে কাওয়ানাড়া থিকা আমি বাদিহাটি আইতাছি।'
বুজান- নীলুফারের শ্বশুরবাড়ির পাশেই মলিনার শ্বশুরবাড়ি।
তারা বাদিহাটি পৌঁছে রাত একটায়।
মায়ের শোবার ঘরের বিছানায় মৃত মা ফজিলা বানুকে শুইয়ে মেয়ে নীলুফার স্বামীর বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
বহু পুরোনো এই খাটেই ফজিলা বানুর জীবনের অনেক সময় কাটে। সে খাটেই শেষবারের মতো তাকে শুইয়ে তার পাশে একখানা বেতের চেয়ারে বসে থাকে আলাল।
বাড়িতে আর কেউ নাই।
সদ্য মৃত যে কারও বাড়িতে স্বজনের কান্নার ধ্বনি-হাহাকার-আর্তনাদ সবই প্রাসঙ্গিক ও পরিচিত; আলালের বাড়িতে কেউ নাই- বানাড় নদীর তীরঘেঁষে একগুচ্ছ টানা বাড়ির শেষ মাথায় পিতা আবদুল মজিদের হাতে বছর চল্লিশ আগে বাড়িটি তৈরি- তার পিতাসূত্রে পাওয়া জমি, তখনই মজিদ বিয়ে করে ফজিলা বানুকে- পার্শ্ববর্তী রাঙামাটিয়া গ্রামের আশরাফ উকিলের কন্যা, ধনবান পিতার সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করে উঠতি ব্যবসায়ী মজিদ- কেশোরগঞ্জ বাজারে তার আড়ত, মাঝ বয়সে আচমকা হৃদরোগে মরে যাওয়ার সময় তার সবচেয়ে ছোট ছেলে এই আলাল তখন আট বছরের, নীলুফার দশ, মলিনা বারো আর জালাল আঠারো- এই চার সন্তানকে বলতে গেলে পরে একা হাতে বড় করেন ফজিলা বানু। গ্রামের অল্পশিক্ষিত হলেও বুদ্ধিমতী ফজিলা নানা ছলছুতোর সামনেও আড়ত হাতছাড়া করে না, তার কোনো সন্তানই এর দায়িত্বে আসে না, জালাল বরং আড়ত থেকে কিছু টাকা নিয়ে ময়নসিংহ সদরে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করে- আলালের ব্যবসায় মন নাই, পিতার দীর্ঘকালের ম্যানেজার সুধাংশু ঘোষকে দিয়েই আড়ত পরিচালনা করে ফজিলা বানু। এলাকার চাল-ডালের বড় মজুদ একসময় ছিল এটা- চারপাশে আরও আড়ত আর পুঁজির উপস্থিতিতে ম্লান হলেও পাঁচ বছর আগে সুধাংশু ঘোষ মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত টিমটিম করে জ্বলে ফজিলা বানুর স্বামীর আড়ত। এরপর আড়ত বিক্রি করে ফজিলা বানু। ততদিনে আড়তের সম্পদ হয় অল্প।
আম্মা বড় বুদ্ধিমতী, রুচিশীল আর বিচক্ষণ ছিলেন।
মৃত মায়ের বিছানার পাশে বসে আলাল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এ রকম তীক্ষষ্ট সৌন্দর্য আর বুদ্ধির মিশ্রণ বাদিহাটিতে সেকেলে মানুষ, বিশেষত নারীর মধ্যে কম দেখা যায়। নিজের মা বলেই এমন ভাবে আলাল- তা নয়, বিধবা হন কত বয়স হবে তার? পঁয়ত্রিশ? বা তারও কিছু কম; তারপর বিশ-পঁচিশ বছর নিজের একক প্রচেষ্টায় এ রকম প্রান্তিক অঞ্চলে চার-চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে মাথা উঁচু করে চলেছেন তিনি, তারপর আবার ব্যবসা- মজুদদারির ব্যবসা। সাথে ম্যানেজার হিন্দু ভদ্রলোক- সুধাংশু ঘোষ।
আলালের মনে পড়ে নিজের বাল্য-কৈশোরে মাকে নিয়ে মুখরোচক বহু কথা তার কানে আসে। তাই কি তার বন্ধু এত কম হয় ইশকুলে-কলেজে? মাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বললে ভীষণ মন খারাপ হতো আলালের, আগপিছু না ভেবে মাকে জিজ্ঞেস করত আলাল- 'আম্মা পুলাপান আমারে দেখে হাসে ক্যান? আর কী কী জানি ইশারায় কথা কয়...'
'কউক গা। আমরা না খায়া থাকলে কেউ খোঁজ নিতে আসবি। ভালো আছি, এইটা মাইনষের সহ্য হয় না।'
এই প্রসঙ্গ কৈশোর পেরিয়ে এড়িয়ে চলেছে আলাল। মায়ের সাথে বা অন্য যে কারু সাথে।
মায়ের হিসাব ছিল পাকা, পাখির বুকের ওমে চার ছেলেমেয়েকে ঢেকে রাখেন তিনি, একটুও কষ্ট পেতে দিতে চান না। কোনো রটনা যেন কেউ ছড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে তার ছিল সজাগ দৃষ্টি- সুধাংশু কাকার সাথে সমস্ত কথাবার্তা তিনি বলতেন আড়তে আর পাঁচজনের সামনে, পরস্পরের বাড়িতে পারিবারিক যাতায়াতও ছিল; আর তা অবশ্যই পারিবারিক- স্ত্রী মায়া কাকি আর তার পুত্র রবিন, কন্যা সমলা- সকলকে নিয়ে সুধাংশু কাকু আসতেন আলালদের বাড়ি, মা ফজিলা বানুও চার পুত্র-কন্যা নিয়ে তাদের বাড়ি, কাউকে কোনো কথা বলবার সুযোগ ফজিলা দিতেন না।
কিন্তু তাতে কি মুখরোচক কথা কি থামে? থেমেছে কোনকালে?
মায়া কাকি মারা গেছেন সুধাংশু কাকা মারা যাওয়ার পরের বছরই, ছেলেমেয়েরা কেউ নাই আর বাদিহাটিতে, তারা সকলে শহরে থিতু হয়।
আলালের মনে হয়, বড় শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছেন মা, নাকে নাকফুল, গলায় সোনার মিহি চেইন। গোলাপি শাড়িতে সাদা চুলে শুভ্র-অনিন্দ্য মনে হয় আলালের কাছে মায়ের মুখ।
মায়ের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বড় শখ ছিল সমুদ্র দেখবেন, সারাজীবনে তার সবচেয়ে বড় দূরত্ব যাওয়া মানে ট্রেনে সরিষাবাড়ীতে বড় বোনের বাড়িতে যাওয়া, কতবার হাসিমুখে সেই গল্প করেছেন, বলেছেন- আলাল তুই আমারে একবার সমুদ্রে নিয়া যাবি!
'অবশ্যই যামু। টাকা গুছাই লই।' আলাল বলেছে।
'টাকা আমি দিমু, বাপ। আমার কাছে জমানো আছে।'
হয়নি, কিছুই হয়নি। মায়ের সাথে আলাল যায়নি সমুদ্রে, বরং বন্ধুদের সাথে, কলেজ থেকে কয়েকবারই গেছে সে- আহা, মায়ের চোখ দুইটা। যেন দুইটা দিঘি। মায়ের সাথে কত গল্প বাকি রয়ে গেল- আলাল ভাবে- কতদিন আম্মার পাশে বসে কথা বলা হয় নাই তার। অজস্র কাজে অন্তহীন ব্যস্ততা- আর কোনোদিন এই মুখ দেখবনা! আর কোনোদিন একটাও কথা হবে না!
এত সুন্দর আমার আম্মা- আলাল মৃত মায়ের মুখে হাত রাখে। ঠান্ডা। যেন গভীর ঘুমে, ঠোঁটের দু'প্রান্তে হালকা হাসির ছোঁয়া। তখন শেষ রাত- একটুপর ভোর হবে, মাকে মাটির নিচে শুইয়ে দিতে হবে, এই নাকফুল, এই সোনার চেইন সব খুলে রাখা হবে- আলাল জানে।
একেবারে শূন্য হয়ে সমস্ত বাধা ছিন্নর নামই মৃত্যু।
আলাল জানে, আর দশজন মায়ের চেয়ে একেবারেই আলাদা ফজিলা বানু। এই বাদিহাটিতে, সতেরো বছর আগে, ঠিকমতো বিদ্যুৎ যখন নাই এই গ্রামে তখন এক স্বল্পশিক্ষিতা বিধবা নারী চার সন্তানসহ একা হাতে সংসার সামলান, রেডিওতে গান শোনেন- পুরোনো দিনের বাংলা গান- এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন!
তখনও কেশোরগঞ্জ বাজারে ফটো স্টুডিও নাই, হাতে মোবাইল তো স্বপ্নেরও বহুদূরে, সেই সময় কি তারও আগে নব্বই দশকে স্বামীকে নিয়ে পুত্র-কন্যাদের নিয়ে ফজিলা বানু সেজেগুজে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলে। সেইসব ছবি যত্ন করে রাখা আছে। তাদের স্বামী-স্ত্রীর একখানা ছবি আছে এই শোবার ঘরের দেয়ালে ফুলবাড়িয়ার শাপলা স্টুডিওতে তোলা- পেছনে ভাসমান মেঘপুঞ্জ, সামনে তারা দু'জন- একদিন আলাল মাকে জিজ্ঞেস করে- 'মেঘকে পিঠে নিয়ে এভাবে কেউ ছবি তোলে? গাছ-ফুল-লতাপাতা ছিল না?'
'ছিল। আমিই বলছিলাম, মেঘের ছবির সাথে ছবি তুলব। মেঘের দেশেই ভাসতে ভাসতে যায় আমরার জীবন!'
কথা বাড়ায়নি আলাল। লক্ষ্য করে আলাল- আকাশে মেঘ জমলে মা উঠানে কি বারান্দায় কাজের ফাঁকে আকাশের দিকে তাকায়, জানালা খুলে রাখে, আলাল বা ভাইবোনদের কেউ যখন বলে, 'বিষ্টি হবে। জানলা বন্ধ করো মা।'
'হোক না। দ্যাখ, কী সুন্দর মেঘ! পুরা আকাশ জুইড়া নাইচা বেড়াইতেছে। একটা আরেকটারে জাপটায়া ধরতেছে। কী সুন্দর! কী সুন্দর!'
'অ্যাই আলাল, বাইরে আসো। সারারাইত করোনায় মরা একটা মানুষ নিয়া একলা বইসা আছো। দোয়াখায়ের করতি হবে না! গোসল, জানাজা- এইসব কী উপায়ে হবে। হায়! হায়! করোনা! সবাইরে ধ্বংস করবা তোমরা- মুরব্বিদের খবর দাও না কেলা!' বাদিহাটি মসজিদের পেশ ইমাম রেজোয়ান মুন্সি তিন/চারজন মুসল্লি নিয়ে আলালের বাড়ির উঠানে দাঁড়ায়, ভোর হয় নাই তখনও, অবশ্য আকাশে মেঘের ঘনঘটা- শ্রাবণ মাস, যখন তখন বৃষ্টি শুরু হবে, ক'টা বাজে- আলাল ঘড়ি দেখে, চারটা এখনও বাজে নাই-
আশপাশের উৎসুক প্রতিবেশীদের দ্রুত ঘুম ভাঙে, তারা ঘুম থেকে উঠে আলালের বাড়ির দিকে দূরত্ব বজায় রেখে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে- 'এই করোনা রোগীর দাফন এলাকাত হইলে আমরা বাঁচুম নি!'
'এহ্‌হে! আকাশ ভর্তি মেঘ! বৃষ্টি না আসে আবার।'
তারা গভীর দুশ্চিন্তায় পরস্পর আলাপ শুরু করে।
ঘরের ভেতরে মায়ের মরদেহের পাশে বসেই থাকে আলাল, খোলা দরজা দিয়ে আগতদের স্পষ্ট দেখা যায়, ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে উত্তেজনাহীন-উদ্বেগহীন কণ্ঠে আলাল কথা বলতে শুরু করে বলে-
'আজান হোক। আমি মসজিদে যাব। সবাইকে অনুরোধ করব জানাজায় অংশ নিতে। সকাল হইলে আমার দুই বোন নিশ্চয় আসবে, বড় ভাই-ভাবিও আসবে, আশপাশের খালা-চাচিদের দুই/একজন না আসলেও আমার দুই বোন আর ভাবি মিলেই মায়ের গোসল দিয়ে দিতে পারবে। আর আপনারা থাকবেন সবাই। মায়ের জানাজা হবে, দাফন হবে।'
আলালের ভাবনা আর বাস্তবতার দূরত্ব আমরা জানি না, তবে আমরা বলতে পারি, সারারাত্রি মৃত মায়ের পাশে একাকী বসে থেকে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার যে সামান্য ভেদরেখা- আলাল তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারে, মাথার ওপর দিয়ে বহমান 'মায়ের প্রিয়' শ্রাবণের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ আলালকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, জীবন এমনই অনিত্য- সবই শূন্যে মেলায়, তারপরও অবিমিশ্র সৌন্দর্যের ডালা নির্বিকার বয়ে চলে।
কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না।