পর্ব-২৪
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
মার্চের অন্তিম দিনগুলো
১৫ মার্চ প্রেস কনফারেন্সে ভুট্টো বললেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, সত্তরের নির্বাচনটাই যার ভিত্তিতে হয়েছে এখন সেটাকেই অস্বীকার করছে পশ্চিম পাকিস্তান। আর ভুট্টোর পেছনে মদদটা দিচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হলো। প্রতিদিনই বৈঠক হচ্ছে। ২০ তারিখের স্বরাজ নামক একটি পত্রিকার রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানে বেশ কিছু এলাকায় সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে।
২২ মার্চে ভুট্টোর উপস্থিতিতে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বলা হচ্ছে, আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। আবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়। পত্রিকায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক পরিকল্পিত বাংলাদেশের পতাকার মাপ ও বিবরণ প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হচ্ছে, পথে পথে বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি হচ্ছে। ২৩ তারিখে দেশব্যাপী প্রতিরোধ দিবস পালন। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলোতে, বাড়িতে, গাড়িতে কালো পতাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। একেবারে পতাকাই উত্তোলিত হয়ে গেছে- আর পতাকার চেয়ে বড় শক্তি তো আর নাই। ২৪ তারিখ শেখ মুজিব বলেছেন- অনেক বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২৭ তারিখে একটি হরতালের ডাক দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তা আর পালিত হয়নি। তার আগেই ঘটে গেল ২৫ মার্চ। পাকিস্তানিরা তাদের আসল চরিত্র চূড়ান্তভাবে পরিস্কার করে দিল। এবং এর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুও সম্পন্ন হয়ে গেল পাকিস্তানের।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করতে গিয়ে যে বিষয়গুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তার মধ্যে একটি হলো, অনেকে মনে করেন যে স্বাধীন বাংলাদেশ হচ্ছে পাকিস্তানি অপশাসনের প্রতিক্রিয়া, অর্থাৎ কেবল পাকিস্তানের অমানবিকতার জবাব হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম। কিন্তু আমরা মনে রাখি না যে, এই যুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের জন্মকেই আমরা শুধু হালাল করি, এর বেশি কিছু নয়; ইতিহাসে যার কোনো ভিত্তি বা প্রমাণ নেই।

বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তান থেকে নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু সাতচল্লিশের অনেক আগে। বরং সাতচল্লিশটা ঘটেছে পূর্বেকার রাজনীতি এবং তার প্রধান কলাকুশলী যারা ছিলেন, বিশেষ করে উত্তর ভারতের যারা, তাদের ব্যর্থতা বা পারস্পরিক শত্রুতার কারণে। এখানে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন বলতে যেটা বলা হয়ে থাকে- সেরকম কিছু ঘটেনি।
ইংরেজদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল স্থানীয় সাধারণ কৃষক; এবং গ্রামীণ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত উভয় শ্রেণি যাদের অনেকে ছিল জমিদার বা কর সংগ্রাহক। এ দুটো স্থানীয় শ্রেণির মানুষ যখন একত্র হয়েছে, তখনই মূলত সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধটা শুরু হয়েছে। এর আগের প্রতিরোধগুলো কিন্তু বাইরের মানুষের প্রতিরোধ, মানে বহিরাগত তুর্ক-আফগান জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ। বাংলাদেশের স্থানীয় মানুষরা প্রতিরোধ শুরু করেছে ইংরেজ আসার পর। ক্ষমতা থেকে ফেলে দেওয়া মধ্যবিত্ত এবং ইংরেজদের দ্বারা অত্যাচারিত কৃষক শ্রেণি মিলে ইংরেজদের বিরোধিতা করতে শুরু করল, যারা কর নিত সাধারণত কৃষকদের তো তাদের পক্ষে যাওয়ার কথা নয়- কিন্তু তারা তো ইংরেজদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাই একত্র হলো। যেমন ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন।
১৭৯৩ সালটাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন ইংরেজরা একটা জমিদারি ব্যবস্থা শুরু করে, যে জমিদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি স্থায়ী দালাল শ্রেণি এবং কৃষিতে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। এক্ষেত্রে কলকাতাভিত্তিক স্থায়ী দালাল শ্রেণি তৈরির প্রকল্পটি কিছুটা সবল হলেও অন্য যে বিষয়টা, কৃষিতে পুঁজিবাদ- সেটা তৈরি হয়নি। এবং জমিদারি একটা অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতা থেকে বাঁচার জন্যে ইংরেজরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইনের ব্যবস্থা করেছে এবং বিশেষ করে ১৮১১ সালে গিয়ে তারা পত্তনি আইনটা করে। যার মাধ্যমে খাজনার মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি হয়। অর্থাৎ তারা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছে যে কলকাতাকেন্দ্রিক এই জমিদার শ্রেণির আসলে দক্ষতা নেই। আমরা অনেক সময় এই জমিদার শ্রেণির পরিত্যক্ত বাড়িঘর দেখে খুব খুশি হই, এমনকি সেগুলোকে নিজেদের ঐতিহ্য ভেবে আপ্লুত হই। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এমনই অদ্ভুত যে সবচেয়ে নির্যাতনকারীদেরই আমরা নিজেদের ঐতিহ্যের অংশ বা মহা গর্বের বিষয় বলে মনে করি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা প্রধানত কৃষক বিদ্রোহের ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ যেটা আজকের বাংলাদেশ। সেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়নি ততটা, মধ্যবিত্তের মূল উদ্ভবটা হয়েছে কলকাতায়।

একটা সময় গিয়ে দেখা যায়, ইংরেজরা বাঙালি হিন্দুদের, বিশেষ করে ওপরতলার হিন্দুদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এর মূল কারণ হলো, হিন্দু মধ্যবিত্তরা ছিল স্থানীয়। আগে যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইংরেজরা এসেছে, তারা ছিল মোগল আমলের। তুর্ক-আফগানরা ছিল তাদের শত্রু। তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়েই তো ইংরেজরা এসেছে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে ইংরেজরা কোনো বিশ্বস্ততা আশা করেনি। অন্যদিকে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি খুব দ্রুতই দালাল হবার আন্দোলনে নেমে যায়। ইংরেজরা কখনও এই দালাল শ্রেণিকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করেনি। কারণ, তারা তো জানতো এরা নিজেরাই দালাল হতে চায়। ইংরেজরা চিন্তা করত কৃষক শ্রেণিকে নিয়ে। কারণ, কৃষকরা ছিল সশস্ত্র। ফলে ক্রমেই গ্রামের একটি আলাদা বাস্তবতা তৈরি হলো। যার মূল নেতৃত্বে ছিল যারা পত্তনি পেয়েছিল তাদেরই একটা অংশ। অন্য যে অংশটি ছিল, সেটি হলো ধর্মীয় নেটওয়ার্কগুলো। তারা ছিল সক্রিয়। তাদের ধারাবাহিকতা এসেছে ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন থেকে। সন্ন্যাসীরা এক সময় আলাদা হয়ে গেল, তারা ইংরেজদের দিকে চলে গেল। কিন্তু ফকিরদের অংশ বিদ্রোহ করতে লাগল। কারণ এদের কেউ নেয়নি, ইংরেজরাও তাদের তোষামোদ করেনি। আমাদের দেশে যাদের আমরা ফকির বা শাহ্‌ গোষ্ঠী বলি- তাদের বিদ্রোহ একটি মৌলিক বিষয়। তারা নিজেদের স্বার্থেই বিদ্রোহ করেছে এবং তাদের সঙ্গে সবসময় একত্র হয়েছে গরিব কৃষক শ্রেণি। যে আন্দোলন নিয়ে আমাদের দেশে বিশ্নেষণের চেয়ে প্রশংসা হয় বেশি- সেটা হলো ফরায়েজি আন্দোলন। কিন্তু ফরায়েজি আন্দোলন মূলত কৃষকদের স্বার্থে ছিল না প্রথমে। এমনকি তারা স্থানীয় কৃষকদের মুসলমানই মনে করত না। তবু স্থানীয় কৃষক কেন তাদের সঙ্গে গেল? কারণ তারা দেখল ফরায়েজিরা জমিদারদের বিরুদ্ধে। আর জমিদারের বিরুদ্ধে যেই যাবে সেই কৃষকের বন্ধু হয়ে যায়। আরেকটা বিষয় হলো, এই ফরায়েজিরা কোনো যুদ্ধই করতে পারত না, যদি কৃষকরা তাদের সঙ্গে না থাকত। যেটা তিতুমীরের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তারা তো বাংলার মুসলমান কৃষকদের 'মুসলমান' মনে করত না। এই 'অমুসলমান' কৃষকদের সঙ্গে নিয়েই ধর্মীয় ঝান্ডা উড়িয়েছে ফরায়েজিরা; নিজেদের স্বার্থে।
এই রাজনীতির যে ধারাবাহিকতা এটা হচ্ছে প্রতিরোধের, বিদ্রোহের, বিরোধের। এটার বাইরে যারা এসেছে তারা ইংরেজের দালাল হবার চেষ্টা করেনি, বিরোধিতা করেনি। যেহেতু পূর্ববঙ্গের কৃষক শ্রেণি সবচেয়ে বেশি সবল ছিল, অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে। সে কারণে তারা ক্রমেই নিজেদের ঐতিহাসিক পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হলো। যে পরিচিতি সাংস্কৃতিক পরিচিতি না। অর্থাৎ, হিন্দু-মুসলমান-বাঙালি-অবাঙালি নয়। এগুলোও মূলত সাংস্কৃতিক পরিচিতির সূচক।
আমরা আমাদের ইতিহাসের ধারা ধরে যদি আগাই, তাতে বাংলাদেশকে বোঝা যায়। বোঝা যায় আমাদের দেশের নেতারা কোন সময় কোন কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা শেখ মুজিবই হোক, মওলানা ভাসানী হোক বা অন্যরা হোক। তাদের মূল সূত্র ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি।

অন্য বিষয়টি হলো, এটি ছিল একটি দখলকৃত অঞ্চল। এখানে বাইরের মানুষ- সেটা আর্য আমল হতে পারে, মোগল কিংবা সুলতানি আমল হতে পারে, পাকিস্তানি বা অন্য যেকোনো আমল হতে পারে। সব আমলেই এই বাংলা বা আমাদের বাংলাদেশ দখলে ছিল। অতএব দখলদারদের বিরুদ্ধে যে মনোভাব সেটা এখানে সবসময়ই খুব তীব্র ছিল। আমরা ভারতের অংশ না, বা আমরা পাকিস্তানেরও অংশ না। এই বাস্তবতাটা আমাদের ইতিহাসবিদরা সব সময়ই মনে রাখেন না। তারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেক সময় অখণ্ড ভারতীয় ইতিহাসের লাইনে চলে যান। একইভাবে অখণ্ড বাংলার লাইনেও কেউ কেউ যান। অখণ্ড বাংলার ধারণাও তেমনিভাবে ভ্রান্ত। কারণ, ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হলো, তখন তো কলকাতার বাবুরা এর বিরোধিতা করেছে। তারা বিরোধিতা করেছে তাদের নিজেদের সুবিধা চলে যাবে বলে। সেই সময় পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ ক্রমে দুটো আলাদা পরিচিতি ধারণ করছে। এখানকার কৃষকরা, এখানকার সাধারণ মানুষরা তো বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিল না। ইতিহাসবিদরা নওয়াবদের দেখায়, নেতাদের দেখায়-কিন্তু সাধারণ মানুষ কী করেছে? অনেক দলিলে এটা পরিস্কারভাবে আছে যে সাধারণ মানুষ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল। কিন্তু কলকাতার মানুষ একে ধরে রাখার জন্য যেটা করেছে- তা হলো তারা স্বদেশি আন্দোলন করেছে। মানুষ এই স্বদেশি আন্দোলনের প্রশংসা করে। প্রশংসা করে, কারণ এর মাধ্যমে স্বদেশের দিকে ফিরে তাকানোর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে এ আন্দোলন তো পূর্ব বাংলাকে ধরে রাখারও একটা প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু কৃষকের কাছে এর অর্থটা কী? কৃষকের তাতে আলাদা কোনো আগ্রহ ছিল না। কৃষক তো জমিদারদের থেকে মুক্তি চায়। তাই আমাদের দেখা দরকার যে, পূর্ববঙ্গের মানুষ কি এই আন্দোলন করেছিল? পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান কি করেছিলেন? না করেননি।
ইংরেজরা ভেবেছিল, বঙ্গভঙ্গ করলে কৃষকরা তাদের উপরে খুশি থাকবে। বাবুদের নিয়ে তারা চিন্তিত ছিল না। কিন্তু ১৯০৫ সালে গিয়ে তা ভুল প্রমাণিত হলো। বাবুরা তখন যথেষ্ট সবল ছিল। তারা স্বদেশি আন্দোলন করে আবার বাংলাকে একত্র করল। তখন অবস্থা এমন হলো যে, বাবুদের কথা তারা শুনছে কিন্তু কৃষকদের থেকে তারা দূরে চলে যাচ্ছে। এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভোটের বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়ায়।
১৯২৩ সালে গিয়ে যখন বাঙালিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বেঙ্গল প্যাক্ট করলেন; বললেন, জনসংখ্যার ভিত্তিতে সুবিধাগুলো ভাগ হোক; তখন সবচেয়ে বেশি অসুবিধা বা বিরোধিতা এসেছে সেই কলকাতার মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে। তাহলে আমরা কীভাবে বলতে পারি যে বাঙালিরা এক জাতিগোষ্ঠী, তারা এক বাংলায় থাকবে? এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, প্রমাণ নেই। ১৯২৩-এ গিয়ে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি- যারা দীর্ঘদিন ধরে দালাল হবার চেষ্টা করছে, কিন্তু একটা সময় দেখল যে তারা দালাল পর্যন্ত হতে পারবে না; তো তারা কোথায় যাবে? তখন তারা কৃষকদের কাছে যাচ্ছে। তারা কৃষকদের বলল যে তোমাদের কথা আমরা বলব। কৃষকরা তো প্রস্তুত হয়েই আছে। সর্বভারতীয়ভাবে যখন পৃথক নির্বাচন দেওয়া হলো, তখন বাংলায় সিট হারিয়েছে মুসলিম লীগ। তারপরেও তারা মেজরিটি ছিল। কিন্তু ১৯১১-এর পর থেকে দ্বন্দ্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে। কারণ তখন তো রাষ্ট্রের চেহারা এসে গেছে। সেই রাষ্ট্রের চেহারাটা পূর্ববঙ্গের চেহারা। সেটা এগিয়ে নিয়ে গেল ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে। সেখানে মৌলিকভাবে মুসলিম লীগ জিতল এবং কৃষক প্রজা পার্টি জিতল। কিন্তু কংগ্রেস কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার করল না। তারা বিরোধী দলে রইল। তখন কৃষক প্রজা পার্টির ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে গেলেন। ১৯৪০ সালে '৩৭-এর নির্বাচনের বিজয়ের কারণে ফজলুল হক লাহোরে প্রস্তাব পাঠ করলেন। তবে এই প্রস্তাব তৈরি করেছিল যারা, তারা মূলত ছিল কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের মানুষ। যাদের সবাই অবাঙালি। প্রস্তাবটা তৈরি করা হয়েছিল আলাদা দুটি স্বাধীন এলাকার চিন্তা নিয়ে। যে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই প্রস্তাব এত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই স্বাধীন এলাকা দুটো হলো আজকের যে বাংলাদেশ এবং আজকের যে পাকিস্তান।
অন্য বিষয়টা হচ্ছে, জিন্নাহর কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ আর বেঙ্গল মুসলিম লীগের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটার শক্তি হচ্ছে জমিদার শ্রেণি, আরেকটার শক্তি হচ্ছে কৃষক শ্রেণি, যা কিছুতেই মেলার কথা না। এবং মেলার কোনো কারণও নেই।
নির্বাচন দ্বিতীয়বার হলো ১৯৪৬ সালে। দেখা গেল মুসলিম লীগ জিতে গেল, ফজলুল হক সম্পূর্ণরূপে হেরে গেলেন। কারণ, ফজলুল হক যাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন- সেই হিন্দু মহাসভা, তারা সামগ্রিকভাবে কৃষকবিরোধী। তারা ছিল সর্বভারতীয় রাজনীতির ধারক, যার প্রতি পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের কোনো রকম আগ্রহ ছিল না। ফজলুল হক ভাবলেন, তার কারিশমা দিয়ে পার হবেন। কিন্তু পারলেন না। তিনি ছাড়া তার দলের কেউ জেতেনি। এই যে মুসলিম লীগ জিতল- সম্ভবত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই সাহসেই ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবকে পাল্টে এক পাকিস্তান করার চিন্তা করল ১৯৪৬ সালে। তিনি ভেবেছেন যে তিনি জিতেছেন বলে এই চালাকিটা তিনি করতে পেরেছেন। নাহলে এটা কোথাও পাওয়া যাবে না যে, টাইপিং মিস্টেকের কারণে এক পাকিস্তানের কথা বলা হয়েছে। যেখানে জিন্নাহ ১৯৪০ থেকে '৪৬ সালের মধ্যে এর আগে একবারও বলেননি যে এক পাকিস্তান হবে।
কাজেই পাকিস্তান আন্দোলনের যে যৌথ আন্দোলনের কথা আমি বলছি, সে আন্দোলনের বিষয় ছিল আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র। একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে এই আন্দোলন কোনোদিন হয়নি। ১৯৪৬ সালে যখন দিল্লিতে আবুল হাশিম এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন এবং তবু সেটা পাস হয়ে গেল- তখন তিনি বেঙ্গল কংগ্রেসকে যৌথ বাংলার প্রস্তাব দিলেন। অর্থাৎ তিনি যদি পাকিস্তানপন্থিই হতেন তাহলে এমন পরিস্থিতিতে যৌথ বাংলার প্রস্তাব তিনি কেন দেবেন আর সবাই মিলে তখন যৌথ বাংলা আন্দোলন শুরু হলো কী করে? কারণ কেউই পাকিস্তানের পক্ষে ছিল না।
জিন্নাহ চেয়েছিলেন অন্যদের সততার সুযোগ নিয়ে একটা নির্দিষ্ট অঞ্চল তিনি তার নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। কিন্তু সেটা টেকেনি। আমরা সবসময় আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছিলাম এবং সেজন্যেই লাহোর প্রস্তাবটা তখন গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ১৯৪০ থেকে '৪৬ সালের প্রচুর দলিলপত্রে আছে লাহোর প্রস্তাবের দুটো স্বাধীন দেশের কথা। কিন্তু জিন্নাহ এটা হতে দিলেন না।
[ক্রমশ]