মোহনগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে অনুপম ও তার তিন বন্ধু রিকশায় বাড়ি ফিরছিল। সাধারণ পাঠাগারের সামনে উল্টো দিক থেকে আসা আরেকটি রিকশা ঠিকমতো সাইড দিতে না পারায় দুই রিকশার চাকা আটকে গেল। অনুপমের রিকশার চালক চাকা ছাড়াতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়ানো রিকশার চালককে বলল,
কী রে বেডা, ইছা মারা থইয়া টাউনে উইঠা রিসকা লইয়ালছস?
এই এলাকায় চিংড়ি মাছ ধরাকে 'ইছা মারা' বলে। অনেক দিন পর ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ ফিরে কথাটা শোনে অনুপম হাসল। তার হাসি তিন বন্ধুতেও প্রশমিত হলো। একজনকে টিপ্পনী কাটতে বা ছোট করতে এলাকায় ব্যবহূত কিছু চিকন কথা হাসির উস্কানিতে বেশ ভালোই ভূমিকা রাখে। কমলাপুর স্টেশন থেকে তাদের ট্রেন ছাড়ার আগে তারা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। একটা লোক খালি পায়ে হন্তদন্ত হয়ে তাদের কাছে ছুটে এল। দেখে বোঝা যায় খেটে খাওয়া মানুষ।
লোকটা অনুপমকে জিজ্ঞেস করল,
বাইছাব, আমরার একজন যাত্রাবাড়ী থাইকা রওয়ানা দিছুইন। ইস্টিশনে আইতে আরও আধা ঘণ্টা লাগব। ডাইবার সাবরে একটু কইয়া টেইনডা আধা ঘণ্টা আটকানি যাইত না?
অনুপম চাইলে লোকটার সঙ্গে মজা করতে পারত। তা না করে সে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, পাঁচ মিনিট পরই ট্রেন ছেড়ে দেবে। সে খেয়াল করে দেখে লোকটার মুখমণ্ডল সরলতায় ভরপুর। তার কথার টানে ভাটি অঞ্চলের মাটির ঘ্রাণ। ওই অঞ্চলে তার মতো মানুষেরা সরল মনে যা ভাবে তাই অকপটে বলে ফেলে। অকাল বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে গেলে তরঙ্গের মাঝে তাদের জীবন কোনো কোনো বছর নিস্তরঙ্গ অবস্থায় কাটে। তখন হাওরের ঢেউ যেন ছপাৎ ছপাৎ শব্দে তাদের বুকের পাটাতনে আছড়ে পড়ে। ধুয়েমুছে নিয়ে যায় জীবনের রং। ফলে অনেকেই মৌসুমি কাজের সন্ধানে উজান শহরে জমায়। অকাল বন্যার হাত থেকে তাদের ফসল রক্ষায় সরকারি অর্থায়নে কয়েক বছর আগে হাওর রক্ষা বাঁধ অবশ্য নির্মিত হয়েছিল। তারপরও পানির ঢলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তখন বাঁধ নির্মাণ কর্তৃপক্ষের একজন খবরের কাগজে বলেছিলেন- ইঁদুরের কারণে বাঁধ রক্ষা সম্ভব হয়নি। কথা ছিল জাল যার জলা হবে তার। কিন্তু জলের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই কিংবা হাওর বিলাস ব্যতীত যারা কখনও হাওরের পানি স্পর্শ করেন না তারাই সেসব জলাশয়ের অধিকর্তা। তারা থাকেন রাজধানী কিংবা বিভাগীয় বা জেলা শহরের সুরম্য বাড়িতে। লিজ নেওয়ার সুবাদে তারাই হাওরের সুস্বাদু মাছের মালিক। তাদের হয়ে হাওরের জেলেরা শুধু জালই টানে।
অনুপম ও তার বন্ধুরা দু'দিন মোহনগঞ্জ ঘুরেফিরে দেখল যে এলাকায় কোনো পাগল নেই। বাজারেও একটা পাগল নেই! পাগল ছাড়া বাজার অনুপমের কাছে শ্রীহীন লাগে। ব্যাপারটা তার কাছে বেখাপ্পা লাগে। গরুর হাটে একটা পাগল ছিল। রেল স্টেশনেও একটা পাগল ছিল। আরেকজন ছিল ভ্রাম্যমাণ পাগল। তার শীর্ণ দেহে ছিল অসম্ভব তেজ। হাতে থাকত একটা সাদা ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা ঘুরত কিনা তা কেউ বলতে পারেনি। কিংবা সেই ঘড়িতে আদৌ কোনো কাঁটা ছিল কিনা সেটাও কাউকে বলতে শোনা যায়নি। তার বাড়ি ছিল কংশ নদীর ওপাড়ে এক গ্রাম পরে তেলিকুড়ি গ্রামে। একসময় তার ছিল ঘর, সংসার আর জমি। লোকটাকে 'তেলিকুড়ি আগুন লাগছে' বললেই সে শরীরের সমস্ত শক্তিতে প-বর্গীয় আর চ-বর্গীয় শব্দ ব্যবহার করে উত্ত্যক্তকারীর মা-বাপসুদ্ধ গালি দিত।
দু'দিন পরের ঘটনা। অনপুমরা তখনও মোহনগঞ্জেই অবস্থান করছিল। এক সকালে লোকজন বলাবলি করছিল যে বাজারে এক অদ্ভুত পাগলের আগমন ঘটেছে। গায়ে ময়লার স্তর এবং চুলের জট দেখে অনুমান করা কঠিন সে সর্বশেষ কবে গোসল করেছিল। তবে তার দুই চোখের মণি ঠিকই জ্বলজ্বল করে। কিন্তু পাগলের নামটা কেউ জানে না। এ কেমন কথা! সব পাগলই তো স্বনামে পরিচিত। নাম যেহেতু নেই তাহলে তার একটা নাম দেওয়া যাক। ধরা যাক, তার নাম ভুবন পাগলা। ভুবন কোথা থেকে কীভাবে এল তাও মোহনগঞ্জের কেউ জানে না। সে কোনো কিছুর জন্য কারও কাছে হাত পাতে না। কারও দেওয়া পয়সা বা খাবারও ছুড়ে ফেলে দেয়। সে যাকে-তাকে গালি দেয়। অনেক সময় একাকী বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সে কটু কথা বলার সময় কেউ তাল দেয়। কেউ দেয় তালি। পাগলকে উস্কে দিয়ে অনেকে মজা লুটে। তাকে ঘিরে বাজারে বিনোদনের জটলাও বাধে। সে কখনও দোকানের সামনে সাজানো খাবারে হাত দিয়ে নিজেই নিয়ে নেয়। এ যেন তার আজন্ম অধিকার। দোকানের মালিক তখন বকা দেয়। মারতে উদ্ধত হলেও গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পায় না। কারণ তার গায়ে ময়লা আর দুর্গন্ধ। তার গায়ের ছিন্ন স্বল্প বসন বেশির ভাগ সময়ই ঠিক থাকে না। তাই তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে অনেকে সংকোচ বোধ করে। অনেক সময় তার গায়ের ছেঁড়া স্বল্প বসন আলগা হয়ে যায়। তখন লোকজন লজ্জায় চোখ ঢাকে। কিংবা তার পাশ দিয়ে এমনভাবে চলে যায় যে পাগলটাকে তারা দেখেনি। প্রভাবশালীরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজন তাদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সমীহ করে আদবের সঙ্গে সালাম দেয়। কিন্তু ভুবনের পাশ দিয়ে কে গেল-এল তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কে আইন বা প্রশাসনের লোক, কে টাকাওয়ালা, কে কোন দল করে, কে জমিওয়ালা কিংবা কে মস্তান তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কে কোন ধর্ম বা কত উচ্চবংশের লোক তাতেও তার কিছু আসে যায় না। সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে হোক, ভুবন অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী একজন।
দু'দিন যেতে না যেতেই এলাকায় ভুবনকেন্দ্রিক বিনোদন অনেকের সহ্যসীমা অতিক্রম করল। কারণ ভুবন রাতের বেলা কোনো না কোনো দোকানের সামনে বা বাসার গেটে মল ত্যাগ করে। এমন অত্যাচার তো সহ্য করার মতো নয়। এক রাতে ভুবন বাজারের বড় মহাজন বিভুরঞ্জন অধিকারীর আড়তের সামনে মল ত্যাগ করল। আড়তের লোকজন সকাল বেলা ভুবনকে পেটাল। অবশ্যই লাঠি ব্যবহার করে। কারণ তার দুর্গন্ধময় গায়ে হাত দেওয়ার সাহস যে তাদের নেই। পরদিন রাতে ভুবন বাজারের আরেক মহাজন ঝুনা চৌধুরীর আড়তের সামনে মল ত্যাগ করে অধিক পিটুনি খেল। প্রহারের সময় ভুবন একটুও কাঁদেনি। নির্লিপ্তের হাসি হাসছিল। পাল্টা আঘাত করতে সে তেড়েও এসেছে। তার এই সাহসে অনেকে অবাক হয়েছে। পাগলের কোনো বন্ধু, শুভাকাক্ষী বা আপনজন থাকে না। তাই প্রহারের সময় কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল না। কিংবা এতটুকু সহানুভূতিও প্রকাশ করল না। এত শক্ত মার খাওয়ার পরও কান্না কিংবা কথার মধ্য দিয়ে ভুবনের অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটেনি। কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একজনের আঘাত পাওয়ার অনুভূতি মরে যায়, সেটা ভাবতে গিয়ে অনুপম রাতে ঘুমাতে পারেনি। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। মোহনগঞ্জে পাগলের অভাব পূরণ করতে সে তার বন্ধুদের নিয়ে একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে ভাটি অঞ্চলে গিয়েছিল। নদী আর হাওর পেরিয়ে প্রায় সীমান্তের কাছে অবস্থিত মধ্যনগর বাজারের কাছে তারা ভুবনের সন্ধান পেয়েছিল। টাকার বিনিময়ে নৌকার মাঝিকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে কোথা থেকে কীভাবে মোহনগঞ্জে ভুবনের আগমন ঘটেছে সেটা সে গোপন রাখবে।
মোহনগঞ্জ ছেড়ে আসার আগে অনুপমরা সিদ্ধান্ত নেয় যে ভুবনকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় ফিরবে। তারা ট্রেনে না ফিরে একটা মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় ফেরার সময় জোর করে ভুবনকে তুলে নিল। ঢাকায় পৌঁছে তারা তাকে একটি সংশোধনী কেন্দ্রে ভর্তি করে দিল। খরচপাতি চার বন্ধুই বহন করছিল। প্রথম দিকে তারা খোঁজখবর রাখত। ভুবন স্বাভাবিক হতে প্রায় চার মাস লাগল। যে দিন সে সংশোধনী কেন্দ্র থেকে ছাড়া পেল সেদিন তিন বন্ধুসহ অনুপম রাঙামাটি ছিল। কেন্দ্রের লোকজন তাদের ভুবনের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা অবহিত করেছিল। তখন অনুপমদের অনুমতিসাপেক্ষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তার কয়েক মাস পর ভুবনের কথা অনুপম ও তার বন্ধুরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু ভুবন যে ঢাকাতেই অবস্থান করছিল সেটা তাদের জানা ছিল না।
একদিন অনুপম সুপারশপ টাইপের একটা দোকানে কিছু কেনাকাটা সেরে বেরোচ্ছিল। গেটে এসে দেখল দু'জন সিকিউরিটি গার্ড ভুবনকে গালাগাল দিয়ে ঘাড় ধরে বের করে দিচ্ছে। ভুবন তখন সামনে দাঁড়ানো ম্যানেজারকে কাকুতি-মিনতি করে বলছিল, স্যার গরিবের পেটে লাত্থি দিয়েন না। অনুপম সিকিউরিটি গার্ডদের হাত থেকে ভুবনকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর সে তাকে নিয়ে রাস্তার অপরদিকে একটা চায়ের দোকানে বসল। সে জানতে পারল ভুবন গ্রাম থেকে কৃষিজাত পণ্য কিনে এনে সেই দোকানে সাপ্লাই দিত। প্রতি মাসে তার বিলের কিছু না কিছু বাকি থাকত। এভাবে গত কয়েক মাসে ভুবনের ধারদেনা-নির্ভর পুঁজির একটা বড় অংশ আটকে গেল। বেশ কয়েকবার বিল পরিশোধের তারিখ দিয়েও মালিক টাকাটা পরিশোধ করেনি। আজও টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু টাকা না পেয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ভুবন মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের একপর্যায়ে মালিক ভেজাল মাল সাপ্লাই দেওয়ার অভিযোগ আনল ভুবনের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় অভিযোগটি হচ্ছে, কথা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে ভুবন মাল দেয়নি বলে প্রতিষ্ঠানের লস হয়েছে। সেই লসের দায়ভার ভুবনকেই বহন করতে হবে। তাই তার পাওনা পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ভুবন ধারদেনা করে মালের সাপ্লাই ঠিক রেখেছিল। সে যখন জানাল যে তার কাছে সাপ্লাইয়ের তারিখ অনুযায়ী বিলের ভাউচার আছে তখন মালিক সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। এ-ও বলে দিল সে যেন আর কখনও সেই প্রতিষ্ঠানের ত্রিসীমানায় না আসে। আসলে তাকে পুলিশে দেওয়া হবে।
ঘটনা বিস্তারিত শোনার পর অনুপম ভুবনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত খেয়াল করল। তার স্বাস্থ্যটা আগের চেয়ে অনেক ভালো দেখাচ্ছে। তার এখন সংসারও হয়েছে। ঝুটঝামেলা সত্ত্বেও সে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে বলেই অনুপম ধরে নিল।
অনুপম ভুবনকে জিজ্ঞেস করল,
সব মিলিয়ে এখন কেমন আছেন?
ভুবন চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল,
ভালো নাই। যখন পাগল ছিলাম তখন শয়তানরে শয়তান বলতে পারতাম। এখন বলার সাহস নাই।
এখন সাহস নেই কেন?
এখন তো আমি পাগল না। পাগল যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারে। আদালতেও তার কোনো বিচার হয় না।
অনুপমের চোখে আগের ভুবন ভেসে উঠল। পাগল থাকাকালে সাপের মার খাওয়ার পরও তার চোখে পানি আসেনি। দল বেঁধে তাকে মারতে এলে সে একাই তেড়ে যেত। অথচ আজ! অবাক চোখে ভুবনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অনুপমের মনে হলো যে পাগলের স্বাধীনতার সমতুল্য স্বাধীনতা কেউ দেখাতে পারে না। অনেক সময় সুস্থ স্বাভাবিক মানুষও কেবলই টিকে থাকার দায়ে কোনো কোনো প্রভাবশালীর অন্যায় মেনে নেয়। কিন্তু পাগলের সেই দায়বদ্ধতা নেই।