ঘরে বাইরে তুমুল ব্যস্ততা। মামা-খালা-মা-নানা সবাই ঘর সাজাচ্ছেন। উঠান সাজাচ্ছেন। ফল কাটছেন। বিস্কুট খুলছেন। শরবত তৈরি করছেন। ডেকোরেটর থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছে চেয়ার-টেবিল, বাসনকোসন। পুরো বাড়ি জুড়ে টিউবলাইট ও মরিচবাতির ঝিকিমিকি। বোকা মেয়েটা বুঝতে পারছে না উৎসব কীসের! মেয়েটা ঘরের পেছনের শানবাঁধানো ঘাটের সিমেন্টের বেঞ্চে গিয়ে বসে। সামনে বয়ে যায় স্রোতস্বিনী খাল। খালের পানিতে ভেসে আসে খালের পাড়ে থাকা কাঠের করাতকলের টুকরো কাঠ, দর্জির পরিত্যক্ত কাপড়ের ফালি, ওষুধ কারখানার বর্জ্যমিশ্রিত তরল, গোলাপি-সাদা হিজল ফুল, কীর্তনখোলা থেকে পথ ভুল করে ঢুকে পড়া কয়েক স্তবক কচুরিপানা। মেয়েটা ভাবে যদি ওই কচুরিপানাগুলো হাতে পাওয়া যেত, ওগুলোকে কেটে খেলাঘরের ডিম বানানো যেত। কোথাও শান্তিতে থাকার উপায় নেই, ঠিক বড় মামা এসে কোলে তুলে নেয়। বলেন, 'তোমাকে সবাই খুঁজছে ভালো মেয়ে।' মেয়েটা কথা কম বলে, ওর মনে পড়ে যায়, বড় ফুপাও ওকে নাম ধরে ডাকে না, ভালো মেয়ে বলেই ডাকে। ও অবাক হয়ে মামার দিকে তাকিয়ে থাকে, বড় ফুপা আর বড় মামাদের দেখতে কি একরকম হয়?
আজ মেয়েটার জন্ম উৎসব। ডেকোরেটর থেকে নিয়ে আসা চেয়ারে নয়, ঘরের জলচৌকিতে এক কোণে মেয়েটা বসে থাকে। যেন ও-ই এখানে সবচেয়ে বড় আর সবাই শিশু। বেলুন ফোলাচ্ছে, চিকমিকে জরির ঝালর ঝোলাচ্ছে, রঙিন কাগজের শিকল আর নিশান টানাচ্ছে। ঘরের সামনে শামিয়ানা টানানো হয়েছে। সবাই কিছু না কিছু কাজ করছে শুধু ও-ই বসে আছে। এর মধ্যে এক ফাঁকে বড় খালা মানে 'মনু' খালা মেয়েটার প্রিয় লাল ভাত (পোলাও ভাত) খাইয়ে দিয়ে যায়। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ববিতার মতো চুলের ছাঁট দেওয়া অসামান্য সুন্দরী মেয়েটির মা পাটকাঠির মতো পাতলা লাল টুকটুকে ফ্রক পরা মেয়েটাকে কোলে নিয়ে 'হ্যাপি বার্থডে টু ...' লেখা কেকের সামনে দাঁড়ান। অতিথি অভ্যাগতগণ উঠে দাঁড়িয়ে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গানের সঙ্গে হাততালি দেন। কেক কাটা হয়। অভ্যর্থনা টেবিলে জমে ওঠে উপহারের স্তূপ। ওয়াটার পট, স্কুলব্যাগ, স্কুল ছাতা, প্রাইজবন্ডের খাম, ফুলদানি, ঘড়ি, কাঁসার গ্লাস, কাঁসার বাটি, নগদ টাকা, সোনার দুল, রঙিন জামা আর ... আর একপাশে পাহাড়ের মতো টেবিল অধিকার করে থাকে ছোটদের গল্পের বই। মেয়েটার মা জিজ্ঞাসা করে, 'এসব থেকে তুমি কী নিতে চাও?' সরু সরু হাত দুটো দিয়ে মেয়েটা বইগুলো জাপটে ধরে বলে, 'এইগুলো মা, এইগুলো সব আমাকে দেবে?'
মেয়েটার মা, খালা, মামা ও খালাদের বন্ধুরা হা হা করে হেসে ওঠে। আসলেই তো মেয়েটা বোকা।
কিন্তু এই বোকা মেয়েটাকে মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করে ডে-নাইট খালাদ্বয়। সদর গার্লসের ক্লাস নাইনের ফার্স্ট গার্ল ও সেকেন্ড গার্ল। ছোট খালার বান্ধবী এরা। একজন ফর্সা আরেকজন কালো তাই বন্ধুরা পেছনে বসে তাদের বিদ্রুপ করে নাম দিয়েছে ডে নাইট। তখন বিদ্রুপাত্মক নামের একটা কঠিন প্রথা ছিল ওই এলাকায়। কেউ কেউ ওই নামের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভাড়া বাসা পাল্টে অন্য এলাকায় চলে গেছে।
পরদিন জন্মদিনের অনুষ্ঠানের আনন্দ স্তিমিত হয়ে এলে দুই বোন এসে দেখা করে মেয়েটার মায়ের সঙ্গে, 'টুলু আপা, ম্যাট্রিক পরীক্ষার পুরো বন্ধটাই তো এখানে থাকবেন?'
মা চিন্তিত গলায় বলেন, 'তাই তো থাকতে হবে মনে হয়। ওদের পরীক্ষার সময় কারুকে তো থাকতে হবে।'
'খুকীকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাই?'
ছোট খালা এসে নিয়ে সমর্থন জানায়, 'নিয়ে যাক, ওদের বড় বড় আরও তিনজন ভাই-বোন আছে, একজন শেরেবাংলা মেডিকেলে পড়ে, একজন বিএম কলেজে, আরেকজন ঢাকা ভার্সিটিতে, খুব শিক্ষিত ফ্যামিলি, ভদ্র। তুই ওদের বাড়িটাও চিনিস আপা, ওই যে পুকুরপাড়ে তিনটা তালগাছ, এরপর দুটো একতলা বাড়ির পরে যে দোতলা টিনের বাড়িটা, যার সামনের ড্রইংরুম একতলা দালান, সেই বাড়িটা।'
মা চিনতে পারেন, ওই বাড়ির গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে তার পরিচয়ও আছে। খুকী অনুমতি পায় নানা বাড়ির চৌহদ্দি পেরোনোর।
খুকীকে মেয়ে দুটো বসার ঘরে নেয় না। শোবার ঘরেও নয়। মূল ঘরের পাশ দিয়ে দুটো জবা আর টগর আর একটা শিউলি গাছের নিচ দিয়ে পেছনের পাকঘরে নিয়ে উপস্থিত করে। তাদের মা তখন রান্না করছে। মেয়েটাকে পাকঘরেই একটা টুল পেতে যত্ন করে তিলের নাড়ূ খেতে দেয়। এরপর তারা খুকীকে খাওয়ার ঘরে নিয়ে আসে। বড় একটা ঘরের এক পাশে ছয়টা চেয়ার আর একটা কাঠের টেবিল পাতা। পাশে মিটশেফ। বাসন রাখার র‌্যাক।
এমনিতে খুকীর অভ্যাস নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা। কিন্তু খুকীর হঠাৎ চোখ পড়ে ঘরের অন্য অংশে। তিনটা খোলা জানালা, কাঠের বেড়ার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিন-চারটা আলমারি। মাঝখানে ছোট একটা টেবিল পাশে দুটো চেয়ার। খুকীর ভীতি মুছে গিয়ে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হতে শুরু করে। ও দুই বোনের দুই হাত ধরে বলে, 'এই বইগুলো সব তোমাদের?'
খুকী তার স্কুলের শিক্ষককেও তুমি করে বলত তখন। অন্য মানুষকে যে 'আপনি' করে বলতে হয়, তারা অপর, এই বোধ জাগতে ও এই অভ্যাস রপ্ত করতে খুকীকে প্রাইমারি পার করতে হয়েছে।
ডে-নাইট খালার মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে খুকীর হাবভাব দেখছিলেন, বললেন, 'ঠিক বলেছিস তোরা, ও একেবারে শানুর মতো।' খুকী পরে ছোট খালাকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিল শানু ডে-নাইট খালার সবচেয়ে বড় বোন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ডে খালা একটা আলমারি খুলে দিয়ে বলল, 'যদি তুমি এই ম্যাট্রিক পরীক্ষার বন্ধে সবগুলো বই পড়তে পার, এখান থেকে একটা বই তোমাকে দিয়ে দেব।'
খুকী এখন মামা-খালাদের আদরের কোল ছেড়ে সারাদিন ডে-নাইট খালাদের খাবার ঘরে বসে থাকে বই মুখে নিয়ে। নানার বাসায়ও একটা থমথমে ভাব। মেজ খালা আর মেজ মামার একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা চলছে।
প্রতিদিন দুপুর বেলা জানালায় মুখ বাড়ান কালো সরু পাড়ের সাদা শাড়ি পরিহিত মাথার ধবধবে চুলে কদমছাঁট দেওয়া তোবড়ানো গালের এক বৃদ্ধ মহিলা। নিচুস্বরে ডাকেন, 'ও মনু তুমি খাইতে আসো, খাওয়া শেষে আবার তোমারে নিয়া আসব।' খুকী বুড়ামাকে দেখে বইয়ের ভাঁজে একটা পুরোনো খাম রেখে বেরিয়ে আসে পেছনের দরজা দিয়ে। প্রতিবার মনে এই আশঙ্কা কাজ করে, যদি খাওয়া শেষে ফিরে এসে দেখে এ বাড়ির সবাই বেড়াতে চলে গেছে। তখন দরজা খুলে দেবে কে?
একদিন সন্ধ্যায় চোখ-মুখ ফুলিয়ে বাড়ি ফেরে খুকী। অন্য কেউ লক্ষ্য করে না। কিন্তু বুড়ামা লক্ষ্য করে। সন্ধ্যার পরে সবাই যখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে যায় খুকীকে, বলে, 'কী হইছে তোমার, চোখ লাল কেন, কান্দো কেন?" খুকী আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে, হাউমাউ করে যা বলে তার সারমর্ম হলো, লোকটা তো আরেকটু বড় একটা নৌকা নিয়ে যেতে পারত, অথবা একটা বড় করাত, তাহলে তো মাছটাকে কেটে টুকরো করে কিছুটা হলেও নিয়ে আসতে পারত সমুদ্র থেকে, অথবা অন্য কাউকে আগে থেকে জানাতে পারত।
কোথাকার লোক? কোন মাছ? কোন সমুদ্র? কিছুই বুঝতে পারে না বুড়ামা। কিন্তু এই পুরো দৃশ্য দেখেছে ছোট খালা, সে বুদ্ধিমতী, পড়ূয়া। বুঝতে পারে, খুকী 'ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি' এর কথা বলছে। সে তার দাদিকে বুঝিয়ে বলে, 'দাম্মা, ও গল্পের বইয়ের কথা বলছে,' খুকীর কাছে এসে বলে, 'শুধু গল্পের বইয়ে নয়, সত্যি সত্যিও এ রকম অনেক ঘটনা ঘটে খুকী, আমরা সবকিছু পেয়ে যাই কিন্তু তখন আর তার প্রয়োজন থাকে না। অথবা সেই পাওয়ারও আর কোনো মূল্য থাকে না।'
খুকী অসহায় গলায় বলে, 'তাহলে,্‌ এই যে এত কষ্ট, এত ইচ্ছা এর কি কোনো দাম নাই?'
'আছে, এই মুহূর্তগুলোর, এই প্রচেষ্টার সময়গুলোর, এই প্রাণপণ লড়াইয়ের ইচ্ছাগুলোর অবশ্যই দাম আছে। সেজন্যই তো তুমি কেঁদেছ। তুমি ভুলে গেছ যে তুমি গল্পের বই পড়ছ। তোমার কাছে ওই গল্প সত্যি মনে হয়েছে। কারণ মানুষ এ রকম অনেক সত্যি সত্যি লড়াই করে। চেষ্টা করে। আমিও প্রথমদিন ওই গল্পটা পড়ে কেঁদেছিলাম।'
এবার বুড়ামা কথা বলেন, 'যে বই পড়লে কষ্ট হয়, কান্দা পায়, সেই বই পড়ার দরকার কী, কাল থেকে খুকী আর বই পড়তে যাবে না।'
খুকীর বই পড়া বন্ধ হয়নি সেবার। ছোট খালার তদারকিতে ওই আলমারির প্রায় অর্ধেক বই পড়ে ফেলেছিল এসএসসি পরীক্ষার ছুটিতে। উপহার হিসেবে পেয়েছিল দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের 'ঠাকুরমার ঝুলি' আর 'গ্রীম ভাইদের সেরা রূপকথা' বই দুটো। ওই আলমারিতে শুধু ছোটদের বই ছিল না, ছিল কিশোরদের বই ও কয়েকটা বড়দের বই। রাশিয়ার ছোটগল্পের প্রথম খণ্ডও খুকী ওই আলমারি থেকেই পড়েছিল।
জন্মদিনের আলো ঝলকিত উজ্জ্বল সন্ধ্যার চাইতেও ডে-নাইট খালাদের খাবারঘরের একপাশে থাকা বইয়ের আলমারিগুলোর মধ্যে কাটানো শান্ত দুপুরগুলোর দৃশ্য খুকীর মনে গেঁথে বসে থাকে।
আর গেঁথে আছে বুড়ামার সঙ্গে অথবা সঙ্গে নয়, এমন দুটো চিত্র। বুড়ামা একদিন সকাল সাতটার মুনির লঞ্চে চড়ে বসলেন খুকীকে দেখার জন্য। কাঠের বাক্সে দু'খানা সাদা থান একটা গামছা। খুকী স্কুল থেকে টিফিনের ছুটিতে ভাত খেতে এসে দেখে বুড়ামা তার জন্য বসে আছে খাবার নিয়ে, মা মিটিমিটি হাসছেন। জীবনের ভাণ্ডে এত বিস্ময়ও জমা থাকে! শুধু খুকীকে দেখার জন্য বুড়ামা একা বরিশাল থেকে পিরোজপুর চলে এসেছেন? নিজের নানি না থাকার কষ্ট কখনও বুঝতে দেননি বুড়ামা। সেবার যে কদিন ছিলেন, সারাক্ষণ তার বিছানায় গুটুর গুটুর গল্প। অনেকে ভেবেই পান না, বুড়ামা খুকীকে কেন এত ভালোবাসেন, মা বলেন, 'আমরা হলাম নাতনি, মানে দাম্মার সুদ, আর আমার সন্তান হচ্ছে সুদের সুদ।'
এইজন্য খুকীকে দাম্মা এত ভালোবাসেন। খুকী পড়তে বসলেও বুড়ামা এসে কোলে তুলে বলেন, 'তুমি আমার কোলে বসে পড়ো, আমি কোনো গল্প করব না।' কিন্তু, খুকী বুড়ামার শরীর থেকে, লবণের ঘ্রাণ পায়, লতাপাতা, মাটির ঘ্রাণ পায়। সুন্দরবনের ঠিক উল্টো দিকে বলেশ্বর নদীর পাড়ে তার বাবার বাড়ি। ঠিক পাশেই তার শ্বশুরবাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে সুন্দরবনের সবুজ রেখা দেখা যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে, মানে খুকীর বয়সে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পরম যত্নে সে সতীনের ছেলেমেয়েদেরও লালনপালন করেছে। সতীনের ছেলেমেয়েরা বড় না হওয়া পর্যন্ত জানেইনি যে বুড়ামা তাদের সৎমা। বুড়ামার শৈশব-কৈশোর-যৌবন কেটেছে খোলা মাঠ, সামনে প্রবহমান বলেশ্বর নদীর স্রোত ও বাড়ির পেছনের ফলদ বাগানের প্রাচুর্যে।
আচমকা দুর্ঘটনায় সাতটি শিশুসন্তান রেখে ছেলের বউ মারা যাওয়ায় তিনি সকল প্রাকৃতিক প্রাচুর্য আর গ্রামীণ সহজ পরিবেশ ছেড়ে বরিশালের ক্ষুদ্রায়তন বাড়ির চৌহদ্দিতে নিজেকে আটকে ফেলেছেন। যেখানে তার সন্তান-সন্ততি সেখানেই তার পরিবার। তবুও মন তার কখনও কখনও সহজতা-সরলতার জন্যই আকুলি-বিকুলি করে, তাই তো সে বারবার খুকীর জন্য ব্যাকুল হয়, খুকীর কাছে ছুটে আসে।
বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। আবারও খুকী বরিশালে। খুকীর ভাই অথবা বোন হবে। হঠাৎ এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। ঘরে ঘরে পানি শোধন ট্যাবলেট পৌঁছে দিচ্ছে পৌরসভার কর্মীরা। সাপ্লাইয়ের পানিতেও ওষুধের ঘ্রাণ। ঘরের এগারোটি প্রাণী সবাই সুস্থ, কিন্তু বুড়ামা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খুকীর মনে হচ্ছে বিশাল এক দৈত্য ঘরবাড়ি, সামনের উঠান, রাস্তা সব তুলে দু'হাতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মোড়াচ্ছে-রগড়াচ্ছে কাপড় নিংড়ানোর মতো করে। বুড়ামা দুর্বল হাতে খুকীর রোগা টিংটিংয়ে হাতটা ধরলেন, বললেন, 'কান্দে না লক্ষ্মী মেয়ে, তুমি তো লক্ষ্মী, এই তো আমাকে দুটো স্যালাইন দেবে, আমি কালই ফিরে আসব।'
খুকী বুড়ামার অপেক্ষায় দরজা ধরে অপেক্ষা করতে করতে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানেই সকালে সজাগ হয়। খুকীর খেয়াল রাখার কেউ নেই, ঘরে আরও দুজন অসুস্থ হয়েছে। তাদেরও হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তিন দিন পরে সবাই ফিরে আসে। বুড়ামা খাটিয়ায় চেপে, সাদা থানের ওপরে সাদা কাপড়ে ঢেকে। অন্য দুজন রিকশায়।
বুড়ামার মুখ ফ্যাকাশে, রক্তহীন। চোখ বোজা। হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। শীতল। খুকী হাত দিয়ে ধরেও নাড়াতে পারছে না। মানে ...!
তার প্রিয় নাতিরা চিৎকার করে কাঁদছে। তারা আরেকবার মাতৃহারা হলো। খুকী অভিমানভরে তাকিয়ে আছে বুড়ামার দিকে। আর কেউ খুকীকে দেখার জন্য কাঠের বাক্স গুছিয়ে সকাল সাতটার মুনীর লঞ্চে চেপে বসবে না। বুড়ামা কথা রাখেনি। তিনি ফিরে এসেছেন, কিন্তু আসলে আসেননি।
খুকী বড় হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ তার মনে হয়, পেছন থেকে বুড়ামা তাকে জড়িয়ে ধরছে, তার শীর্ণ লোলচর্ম হাত খুকীর হাতে রেখে, গাল খুকীর গালে ঠেকিয়ে বলছেন, 'কান্দে না খুকী ...!'
খুকী টের পায় বুড়ামার শরীর বরফের চেয়েও শীতল। খুকীর গাল থেকে হাত থেকে সেই শীতলতা প্রবাহিত হতে হতে হৃদয়ে গিয়ে স্থির হয়। খুকী সেই বরফশীতল হাত প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে। এতসব চলচ্চিত্রসম দৃশ্যপটের ভেতরে এই দৃশ্যই খুকীকে পৌঁছে দেয় অন্তিম সত্তায়।