আকাশে কি কেউ চুলো জ্বালায়ে থুলো! সেখানে মেঘ জমে না- বিষ্টি তো বহুত দূরের খবর! ঘামে ভিজে ওঠার আগেই আবার শুকিয়ে আসে গামছা, বাতাসে যেন ধানসেদ্ধ করা চুলোর আঁচ ...
আজ তেরো দিনের আষাঢ়। আয়াত আলীর বিকেলগুলো ঝাঁঝরা হয়ে যায় আ'লের ওপর দাঁড়িয়ে, আকাশের দিকে চেয়ে থেকে থেকে। পানির জন্যে অপেক্ষার, সাথে হতাশা মিলে ধুলোখেকো বাবলা গাছগুলোকে মারকুটে চেহারার একেকটা হনুমানের মতো করে তুলেছে। খালের তলায় বেঘত দেড়েকের ঘোলাপানি, কখন জোয়ার কখন ভাটি তার কবলা করা নেই। তাইতে চুমুক মারতে বাধ্য হওয়া বাছুরগুলোর পেট পাতলা। ঘুঁটে আঁটে না এমন গোবরে মাঠগুলো যেন পাগলা লোকের খেয়ে ওঠে যাওয়া ভাতের থালা- কোত্থাও কোনো ছিরি-ছন্দ নেই।
আয়াত আলী ঘরের দিকে মুখ করে। মাঠ পেরিয়ে গ্রামে ওঠার পথের দু'ধারে জেওল কচা, ক্ষুদিজামের একেকটা মরোমরো বিরিক্ষি- দূর থেকে দেখা যায়। পাতাগুলো ছাতাপড়া। গাছের গোড়ায় নাড়া পড়লে- চাষালোকের ওগরানো হুঁকোর পাতলা ধোঁয়ার মতন ধুলো উড়ে যায় আর নাড়া না পড়লে-বিষ্টি হওয়া এস্তেক পুরু হতে থাকে, যেন নতুন বিয়ে হওয়া উঠতি মেয়েলোকের কোমরে পড়া ভাঁজ!
জগ্‌ ডুমুরের গাছগুলো কিন্তু তখনো ধানের গোলা'র ভরসায় নিশ্চিন্ত চেয়ারম্যানের ভঙিমা নকল করে নড়ে- যদিও তার পুরুষ্ট পাতায় এলেকশন জেতা নিয়ে মৃদু সংশয়ের মতন ধুলোর পরত।
গাছেদের ভাষা নেই যদিও, তবু বৃষ্টি না হবার হতাশা কোথাও যেন গোপন থাকে না। আর হন্‌ হন্‌ বলে কেন, তা না জেনেই আয়াত আলী হন্‌ হন্‌ করেই বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে।
উঠোনে উঠে হাঁক মেরে সে বউকে ডেকে বলে- টুপিডা দেও দিন্‌ ...। পরপর তিন মেয়ের মা'টা এই চল্লিশ উজোনো বয়সে এখনো আলাই-বালাই হবার বিরক্তি গোপন না করে তেতো গলায় বড় মেয়েটাকে খেয়াল করে বলে ওঠে- তোর বাপের টুপিডা দে দিন্‌ লাইলি ...
আয়াত আলী ততক্ষণে তার শুকনো পুকুর ঘাটটা থেকে অজু করে ফিরে আসে। তার কপালের ভাঁজে ভাঁজে জেগে থাকে অজুতে ঠান্ডা পানি না পাবার হতাশা ... নমিনেশন না পাওয়া প্রার্থীর মতন। গেল বছরে বাছুরসহ গাভিন গাইটা মাঠ থেকে তখন ফিরে আসে। ও শিউলি, বাছুরডার গলায় দড়ি দিয়ে থো- মেজো মেয়েটাকে কথাটা বলে আয়াত আলী মসজিদের দিকে হেঁটে যায়। মেয়েটা তখন বাড়ির একমাত্র আড়ম্বর একটা দড়ির হ্যাঁদলায় দোল খাচ্ছিল, ছোট বোনটার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে। তার নাম আইনু- আইনুন্নাহার। যে জানে না লালজমিন-এ সাদা হাঁস আঁকা একটা জামা না থাকার হতাশা সে নিজের ভেতর কীভাবে বড় করে তুলছে। বাপ তার নাম আইনু রেখেছে কেননা, লাইলি, শিউলির পর আর কিছু সে মিলিয়ে আনতে পারেনি।
বাঁধাপড়া বাছুরটা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার নির্বোধ দুই চোখে রাত্রিভর মায়ের ওলানের কাছে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়েই তাকে যে অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে হবে- সেই
এক বছরের পুরোনো অভিজ্ঞতাটুকু- ভোররাত থেকে রেশন দোকানের সামনে কখন সকাল ৯টা বাজবে সেই অপেক্ষায় লাইনবাঁধা মানুষদের মতো জেগে থাকে। সেইরকম তারও সকালের অপেক্ষা। কেননা আধ কেজি দুধের তালাশে সকালবেলা আয়াত আলী গাই দুইতে বসবে। তারপরে তার দড়িমুক্তি- সেই সন্ধ্যে অব্দি।
নামাজ শেষ করে আয়াত আলী দোয়া করতে হাত তোলে, যদিও কী যেন এক ধরনের অজানা সংকীর্ণতায় একটা শুকনো চল্টাওঠা বিশাল প্রান্তর তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। তবে প্রান্তরটার ভেতরে তার নিজের সাড়ে তিন বিঘের ভুঁইটুকুন কখন বাদলাধারায় টম্বুর হয়ে উঠবে সেই আশা- ভোটে হারার হতাশার মতন চির-জাগরূক হয়ে থাকে। এই অচেনা স্বার্থপরতাটুকুসহ সে ধ্যান ধরে তবু বলতে থাকে-
ও মাবুদ পানি দেও, ও মাবুদ পানি দেও ...
আয়াত আলীর এখনকার এই দোয়া সুপারি গাছের মতন ডালপালাহীন লম্বা- একহারা। তার সাথে মিলে থাকে নিজের দাড়িগুলো বেহুদা রোদে আরো পেকে উঠবার অভিমান। একদল বক সারা বছর হেগে হেগে উঁচু শিরীষ গাছের তলায় নিচু আশ্‌-শ্যাওড়ার ঝোপটা যেমন সাদা করে তুলেছে, তার দাড়িগুলো এখন অকাজেই সেই রকম।
দিনের পরে দিন কাটে, আয়াত আলীর দোয়া তবু কবুল হয় না। বৃষ্টি আসে না। নিজের সাড়ে তিন বিঘে ভুঁই শুকিয়ে থাকে। এই জন্যেই বুঝি তার মোনাজাত গ্রাহ্য হয় না যে, সে তার দোয়াকে নিজের ভুঁইটুকুর থেকে বিস্তৃত করে তুলতে পারে না। যখন একটা এবং একাধিক প্রান্তর শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে! আয়াত আলী এসব বুঝতে পারে না, কেননা সে সাধারণ লোক। সে এবং তার গ্রামটা যে আকাশের বিবেচনায় আসে না তার কারণ- আকাশ তখন হয়তো মহাসমুদ্রকে নিয়ে ভাবাকূল, ভাবছে কেন মহাসমুদ্র বাষ্পের চালান দিতে ভুলে যাচ্ছে! আকাশের হয়তো তখন বায়ুপ্রবাহ নিয়েও বিরক্তি। শত শত গ্রামের শত শত আয়াত আলী হয়তো আকাশের বিবেচনায় এককণা ধূলির অধিক নয়, তাই-ই হয়তো তাদের দোয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে লম্বা হতে থাকে খরা আর সূর্যের নিচে বিছিয়ে যায় একটা প্রত্যাশাভঙ্গের বড় গল্প। যেখানে কেউই প্রধান চরিত্র নয়- কেবল খরা। যে গল্পে সূর্যের নামে প্রচুর গালাগাল, পরিব্যপ্ত খরার দায়-দেনা, বদনাম। সেখানে বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়েছে বৃষ্টি নামানোর লক্ষ্যে সূর্যের সারা দিনমানের কসরত- নিজেকে পুড়িয়ে যাবার আমলনামা। কিন্তু স্তুতি আর সুনাম করা হয়েছে সেই বৃষ্টির, যে বৃষ্টি আজও নামেনি। সেই মেঘের, যা আজও ঘনায়নি!
বৃষ্টি হলে এই হয়, ওই হয়- এইসব যেন মেঘের একদলীয় সংসদে পাস হওয়া এক সংশোধনশীল সংবিধান!
চেয়ারম্যান হলে বলতেই হয়, তাই তোজাম্মেল চেয়ারম্যান বলে- বিষ্টি হচ্ছে না তো কী! সময় হলিই হবেনে, এ আর কী এমন বড় কথা!
তার চৈতন্য তখন ভর্তি হয়ে থাকে, ছেলেকে ডোনেশন দিয়ে হলেও ডাক্তারি পড়ানোর খায়েশ। যদিও ছেলে বলেছে- আর পড়বো না আব্বা, ব্যবসা করব ধান-চালি'র, শহরের বড় বাজারে একটা আড়ত করে দেও।
তবু চেয়ারম্যানের মনে তখনও জাতে উঠবার দুশ্চিন্তা। যদিও তার ধানের গোলাগুলো তখনও খরার ফ্যারাগোরা সব বেড়া দিয়ে আটক করে রেখেছে, তবু কোথায় যেন সামনের খন্দে ধান না ফলার দুর্ভাবনা, যেটা চেয়ারম্যান তখনো আঁচ করতে পারে না যে, সেটা তার ভেতরে জন্মেছে, শহর এলাকায় এখনো বিশেষ বিবেচ্য হয়ে ওঠেনি- এমন খরার মতন- সেটা চাপা পড়া।
গ্রামীণ মসজিদগুলোর ওপর চড়াও হওয়া পল্লীবিদ্যুতের বিলের হাত থেকে নাজাত পেতে যুবক মুয়াজ্জিন নামাজশেষে পাওয়ারওয়ালা লাইটগুলো নিভিয়ে বারান্দায় একটা টিমটিমে জিরোওয়াট জ্বালিয়ে বসে থেকে এশার আজান হবার ওয়াক্তের অপেক্ষা করে। এ মাসে মুষ্টির চাল আর নগদের কালেকশন তেমন ভালো নয়। ব্যাংক ব্যালান্স বলতে গাঁয়ের নানান কোনায় জন্মানো ছ'টা নতুন গাছের ছ'টা দুমড়ো নারকেল। আড়তে নিলে যেগুলো একশ আশি টাকার বাংলাভাষায় অনুবাদ করা যাবে।
খানিকটা শূন্যমনে মুয়াজ্জিন কলেমার তসবি করে। অভ্যেস হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো চলতে থাকে ঠিকই, তবে একদানা থেকে আরেক দানায় যাওয়ার ফাঁকে একজোড়া শীর্ণ চোখ তার মনে পড়ে। তার বউটা পোয়াতি। না-শুকুরি এবং হতাশা মুসলমানের শরম নয়, দাওরা পাস মৌলভী তা জানে। এই খরাকালে, যখন বৃষ্টি নেই, তখনও এক ফোঁটা পানি তবুও কোথায় যেন টলটল করে!
ওইদিকে, তখনও শহরের লোকেরা এই গ্রাম্য খরার তেমন হদিশ করতে পারে না। কেননা তখনও ওয়াসার নলে পানির আকাল কোনো নোটিশ সেখানে সেঁটে দেয়নি। চিনেম্যানদের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মোটা মোটা পাইপ থেকে ওয়েল্ডিংয়ের ছিটকে আসা ঝলকানি- পানি নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তাকে একপাশে ঠেলে দাঁড় করিয়ে রাখে। অকাজের খবর কাগজগুলোতে পররাষ্ট্রিক সাফল্যের নানান খবর তখনও উপচে যায়। কৃষি ও বাণিজ্যের পাতার এক কোনায় যদিও ধান মরশুমের কোণঠাসা হওয়ার আট লাইনের একটা সম্ভাবনা উঁকি মারে, তবু বিনোদনের পাতায় একটা যৌথ প্রযোজনা ঝলমল করতে থাকে। শহরবাসী ভুলে থাকে যে, গ্রাম আর শহরের আকাশের মধ্যেখানে সীমানা পিলারের কোনো সারি বসানো নেই। যদিও শহরের রিকশাওয়ালারাও এখন এসএমসি'র এক প্যাকেট ওরস্যালাইন পকেটে রাখতে শিখে ফেলেছে! পাশ কেটে সাঁই করে বেরিয়ে যাওয়া সব করোলা, হ্যারিয়ার কিংবা স্পোর্টস মডেলগুলোর ভেতরের নিয়ন্ত্রিত আতপের ঝাপসা বাষ্প- গাড়ির কাচগুলোকে রিকশাওয়ালাদের দুর্ভাগ্যের চিত্রলেখের মতন ঘোলা করে রাখে, আর সকাল-সন্ধ্যায় প্রায় একসাথে দেওয়া মাইকের আজানে আজানে চাপা পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে থাকে সেই গ্রামীণ মসজিদের ছুটি না পাওয়া মুয়াজ্জিনের- হাইয়ালাল ফালা, হাইয়ালাল ফালা। কল্যাণের দিকে এসো, কল্যাণের দিকে এসো- বলে সে হয়তো ভুলোমনে তখন মেঘ ডাকতে থাকে।
যদিও তখন শহরে, মেয়েদের কলেজগুলোর আড়ে-আবডালে মেঘের মতন ছায়াপড়া সানগ্লাস পরা ছেলেদের ভিড় ঘন হয়। যুবক মুয়াজ্জিন সাহেবের মনে নওয়াব আলী চাচাকে আজান দিতে রাজি করিয়ে ছুটি নেওয়ার এরাদা। একটু বৃষ্টি হলে- সে জানে কমিটির দেল নরম হবে। তবে মেঘ-বৃষ্টি হোক বা নাহোক তার যে একটা ছেলে হবে আলট্রাসনোর রিপোর্ট ছাড়াই এটুকু নিশ্চিত হতে তার ভালো লাগে। মৌলভীর মনে পড়ে যায়, তার পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন খড়ম নির্মাতা এবং সেই যন্ত্রিপুরুষের চারপাশের সবাই খটখট শব্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। মৌলভী তার মেহরাবের সঙ্গে লাগানো এক দরোজার বাসকামরাটার ভেজানো দরোজায় তার ছুটি মঞ্জুরের খবরসহ পূর্বপুরুষের সেই খটখটির মতন সভাপতির খটখটির অপেক্ষায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। তার চারদিকে তখন তৃষ্ণার্ত ঝিঁঝিঁ ডেকে যায় একনাগাড়ে, কিন্তু দরোজায় কেউ খটখট করে না।
বর্ষা হলে লাগানোর কথা, বর্ষা নেই তবু নন্দ নাপিতের ভেতো ছেলেটা মসজিদের বাঁশের বেড়ার গোড়ায় ঝাপড়ে ওঠা গন্ধরাজ গাছটার একটা ছেঁটেফেলা ডাল নিজেদের চল্টাওঠা উঠোনের কোনায় নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেয়। আধঘটি জল ঢেলে তার গোড়াটা কাদা করে রাখে। ডালটা বেঁচে উঠে গাছ হতে পারবে কিনা- এখন এইই তার দুর্ভাবনার বিষয়। যদিও দুর্ভাবনা শব্দটা সে এখনো কোনোদিন শোনেনি। হাতের কাছে পানি না পেয়ে ছেলেটা দু'একদিন ডালটার গোড়ায় মুতে থোয়। সেই মানবিক ইউরিয়ার দায়ে কিনা কে জানে, ডালটা তার পৈতৃক পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে একটা কাঠির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একটা পাতার কুঁড়িও গজিয়ে তোলে না।
চেয়ারম্যান এবং দামি আর্দির পাঞ্জাবি পরে আজকাল ঘনঘন গ্রামে আসা হাদী মুন্সী, একই সরকারি দলের চাঁদাদাতা। মুন্সী এখন গাঁটের টাকায় গাঁয়ে তিনটে টিউবঅয়েল পুঁততে ব্যস্ত। চেয়ারম্যান সব বুঝতে পারে- এও বুঝতে পারে যে, এবারে নমিনেশনে তার দু'নো খরচা হবে। তার গেটের গোড়ার লম্বা নারকেল গাছটায় তখন একটা কাঠঠোকরা একনাগাড়ে ঠকাশ ঠকাশ করে ঠোকর মারতে থাকে। চেয়ারম্যান মনে মনে দোয়া করে- মুন্সী যেন টিউবঅয়েলে পানির লেয়ার না পায়।
দিনের পরে দিন যায়, যদিও একেকটা দিন এখন একেকটা বোঝার মতন। তার ওপরে এ বছরের আষাঢ় মাসটা বত্রিশ দিনে। সেই বত্রিশতম দিনে মানুষ যখন ছন্নছাড়া বোধ করতে থাকে, গ্রামের নালায় যখন কৈ উজোনোর কথা, তবু তখন নালাগুলোয় ধুলো ওড়ে। আষাড়ে দুপুর শেষে তবু সেদিন কষ্টেমষ্টে বিকেল হয় আর আশ্চর্যজনকভাবে চড়াও মেজাজের আকাশটার উত্তর-পশ্চিম কোনায় দেখা যায় মেঘের আভাস। রংটাও শ্যামলা। কোথা থেকে যেন বাতাস এসে যেখানে যত শুকনো পাতা ছিল তাতে নাড়া দেয়- ফাঁকা জায়গায় ঘূর্ণি লাগে।
গাঁয়ের সব মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সবাই পশ্চিমমুখো। তাদের চোখের সামনেই মেঘের শ্যামলা রং কালো হতে থাকে, একটা ঠান্ডা হাওয়া বয় কী বয় না!
এদিকে একটা ছোকরা, তার পোঁতা একটা গন্ধরাজের ডাল, একজন ছুটিপ্রত্যাশী মুয়াজ্জিন, একজন আয়াত আলী'র চৌচির ধানের ভুঁই, একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর ভোটে হারার ভয়, নতুন ফিকিরসহ একজন মুন্সী- তারা সবাই ভাবে, এইবার বুঝি বাদলায় ধুয়ে ফর্সা হবে সব, খরার কালশিটে।
মাঠের জিরজিরে গরুগুলো তখন আকাশের দিকে চেয়ে নাক কুঁচকিয়ে আবছা ঠান্ডাটুকুকে স্বাগত জানায়, আর সারাদিন পিঠে বসে থাকা ফিঙেগুলো কোন দিকে যেন উড়ে চলে যায়। বৃষ্টি তখন ঘনিয়ে এসেছে, কিন্তু সূর্য তখনো ডোবেনি।
বাংলাদেশের চিরকালের গল্পে এখানেই সমাপ্তি হবার কথা। কিন্তু এই ভূগোলে আজ কেন কে জানে- পূর্ব-দক্ষিণ কোনা থেকে একটা গরম ঝোড়ো হাওয়া এসে বর্গীদের মতো ঝাপিয়ে পড়ল কালোরং মেঘটুকুর ওপর। কুক্ষণে ভেসে গেল শ্যামলছায়া।
বিচ্ছিন্ন মেঘের ফোকর গলে আবার সূর্য দেখা দিলে, বিহ্বল মানুষগুলোর ব্যক্তিগত সব হতাশা গলে এক হয়ে গেল পুনরাবৃত্ত এক দীর্ঘজীবী খরায়।
তাদের সামনে তখন একরঙা একটা প্রান্তর।