আবু বকর কথাটা আমাদের বলতে পারে না। কথাটা বলে বসির উদ্দিন। তারা দু'জনেই গুলশান-বারিধারা এলাকায় রিকশা চালাত। কিছুদিন ধরে বসির উদ্দিন আর রিকশা চালায় না। সে সিএনজি অটোরিকশা চালাবে বলে ঠিক করেছে। না হলে গুলশানের কড়াইল বস্তি ছেড়ে মিরপুরের কোনো বস্তিতে চলে যাবে। সেখানে হয়তো রিকশাই চালাবে। এই নতুন জীবন-জীবিকার ট্রানজিট সময়ে তার খানিকটা অবসর ছিল। সে আমাদের অতিউৎসাহী ভাব-ভঙ্গির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে এবং ঘটনাটি বিস্তারিত বলে। আবু বকর নিজেও বসির উদ্দিনকে কথাটা বলেনি। এতই গোপনীয় আর শরমের বিষয় যে, আবুর বৌ জ্যোৎস্না তসলিমাকে বলেছিল। তখন তসলিমা বসির উদ্দিনকে বিষয়টি জানায়।
ঘটনার শুরু বারিধারায় রিকশা চালকদের লুঙ্গি পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর। বেশিরভাগ বাসিন্দার গাড়ি থাকায় অসুবিধায় পড়তে হয় না। অল্প সংখ্যক লোকের সঙ্গে সমস্যায় পড়ে ওই এলাকায় পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা। যারা আশপাশের শহর থেকে এসে হোস্টেলে বাস করছিল। আর সমস্যায় পড়ে স্বয়ং রিকশাওয়ালারা। তাদের মধ্যে যাদের জন্ম ঢাকায়, বেড়ে উঠেছে এখানে, তাদের কেউ কেউ আগে থেকেই রিকশা চালাত প্যান্ট পরে। বাকি সবাই জীবনে কোনোদিন প্যান্ট পরেনি। কিন্তু এই এলাকায় অনেক দিন ধরে রিকশা চালিয়ে আসছে, ভাড়াটাও বেশ ভালো পাওয়া যায়। এ রকম সমস্যা দেখা দিলে আবু বকর একদিন নিউমার্কেটে গিয়ে একটি প্যান্ট কিনে আনে। বসিরের বৌ তসলিমা বলে, আবু বকর যেদিন সকালে প্যান্ট পরে রিকশা নিয়ে বের হয় সেইদিন তাকে দেখে বস্তির ছেলেপেলে হাসি-তামাশা করেছিল। তারা আবু বকরকে কোনোদিন প্যান্ট পরতে দেখেনি। তাদের মনে হয়, আবু বকরের পা দুইখান সেইদিন যেন কেমন কইরা হাঁটে! মনে হয়, তার পা কিছু দিয়ে বান্ধা এবং সে চ্যাগায় চ্যাগায় হাঁটতেছে! এ নিয়ে সকালে হাসাহাসি হলেও বিকেল নাগাদ আবু বকরের বউ জ্যোৎস্না যখন জানতে পারে যে, বস্তির লুঙ্গি পরা রিকশাওয়ালাদের মধ্যে কেবল তার স্বামীই রিকশা নিয়ে বের হতে পেরেছে, তখন তার বেশ অহঙ্কার বোধ হয়। বহু বছর পর আবুকে তার আবার নায়ক মনে হয়েছিল। গল্প এই পর্যন্ত বলে বসির জানায়, তখন পর্যন্ত শরমিন্দা ঘটনা তামাত সে আসে নাই! এরপর বসিরের গলা এক ধাপ নেমে যায়। আমরা ধরে নিই তসলিমা যখন ঘটনাটা বলে তখন সে কিছুটা ফিসফিস গলায় বলেছিল। ঘটনা কোন প্রকৃতির তার ওপর নির্ভর করে বর্ণনাকারীর কণ্ঠের ওঠানামা এবং আবেগসহ অন্যান্য বিষয়। তখন শ্রোতাদেরও কিছু ভূমিকা নেওয়ার আছে। শ্রোতারাও পূর্ব অবস্থানে দেহ স্থির রাখতে পারে না। কিছুটা নড়েচড়ে ওঠে আর তাদের চোখে তখন এক্সপ্রেশনের পরিবর্তন ঘটে যায়। এ সময় বসিরের মুখে লাল আভা জেগে ওঠে। আমার তখন পর্যন্ত চেহারা তথৈবচ।
সন্ধ্যায় আবু বকর বসিরদের সঙ্গে বসেই চা খায়, গল্প করে। আজকের খ্যাপে যে তার একচেটিয়া লাভ হয়েছে, সে কথাও জানায়। এমনকি সে রাতের খাবার খেতে খেতে বৌ জ্যোৎস্নার সঙ্গে আগামী লাভের হিসাবও কষে ফেলে। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দেয় রাত আরও একটু গভীর হলে, যখন তারা বিছানায় যায়। খুশিতে গদগদ হয়ে জ্যোৎস্না নিজে থেকে উদ্যোগী এবং আবু বকরের লুঙ্গির ভেতর হাত দিয়ে তাকে জাগাতে চায়, তখন আবু চিৎকার করে ওঠে। জ্যোৎস্না প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারে না, এমন খুশির সময় সহবাসে তাদের কারও কোনোদিন আপত্তি ছিল না। অথচ আজ আবু বকর বৌকে সরিয়ে দেয়। জ্যোৎস্নার জোরাজুরিতে বিষয়টি খোলাসা হয়ে পড়ে। আবু বকর তখন লুঙ্গি উঁচিয়ে দুই ঊরুর মাংস ছিঁড়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখায়। জ্যোৎস্না দেখতে পায়, আবু বকরের দুই পায়ের ফাঁকে লাল লাল চাকা চাকা মাংস। প্যান্ট পরে রিকশা চালাতে গিয়ে জায়গাটার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবুর যন্ত্রণা বড় বেশি হলে জ্যোৎস্না ডাল রান্নার গোল চামচের মধ্যে দুই কোয়া রসুন ছেঁচে সরিষার তেলে ডুবিয়ে মোমবাতির আগুনে পোড়াতে থাকে। সারা বস্তিতে পোড়া রসুনের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সেই গন্ধের রহস্য অনুসন্ধানে তসলিমা বের হয় এবং গোপন বিষয়টি জেনে ফেলে।
আমরা লুঙ্গি বিষয়ক আন্দোলনের অংশ হিসেবে সার্ভে করতে গিয়ে আবু বকরের ঘটনা জানতে পারি। এসব রিকশাওয়ালা ভাসমান এবং অসংগঠিত। মূলত রাজধানীতে তাদের অধিকার অনেক কম। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করতে হবে- এ বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকে না। তাই আমরা এসব গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ি এবং আন্দোলনের প্রস্তুতিস্বরূপ আবু বকরের জন্য প্রথম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। তা হলো, তার জন্য এক টিউব নিওবাক্রিম ও একটি আন্ডারপ্যান্ট ক্রয় করি।
এরপর আমরা আমাদের কর্মসূচির আওতায় পাই বান্টিকে, যে বারিধারা অভিমুখে লুঙ্গি র‌্যালিতে অংশ নিয়েছিল। বলে, জীবনের প্রথম সেদিনই সে লুঙ্গি পরিধান করে। বান্টি জানায়, বাসায় তার দাদু নিয়মিত লুঙ্গি পরত, বাবা কদাচিৎ পরে। আর সে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টেই অভ্যস্ত। তাই বলে সে কখনও লুঙ্গিবিদ্বেষী ছিল না। বান্টি আরও জানায়, বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। অতঃপর সে আমাদের বাংলায় বিষয়টির ভাব সম্প্রসারণ করে বোঝায় লুঙ্গিতে বাঙালির সৌন্দর্য। আমরা বান্টির উৎসাহ-উদ্দীপনায় আশান্বিত হই এবং তাকে আমাদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিই। আর তখনই পরিচয় ঘটে বান্টির বান্ধবী সাজানার সঙ্গে, যার জীবনে বান্টি ছাড়াও নায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে শাহরুখ খান। সে বলে, আমি জানতাম না- লুঙ্গিই ওয়ান অব দ্য বেস্ট ড্রেস। শাহরুখের চেন্নাই এক্সেপ্রেসে 'লুঙ্গি ড্যান্স' দেখার পর আই ফিল ইট। এ প্রসঙ্গে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করলেন সাজানার মা, কর্নেল বারির ওয়াইফ। মিসেস বারির মতে, লুঙ্গি পরে অনেক বখাটে লোক রাস্তাঘাটে, এমনকি বাস টার্মিনালে বেশ অসভ্য ভঙ্গি প্রদর্শন করে। তার মন্তব্যের পর আমরা বান্টি ও সাজানাকে বাদ দিয়ে মিসেস বারিকে বোঝাতে থাকি, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা বিস্ম্ফোরণের সঙ্গে অ্যাটম বোমা আবিস্কারের কোনো সম্পর্ক নেই। আধুনিক পরমাণু চিকিৎসার ধরন-ধারণ এবং পৃথিবীতে এর প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক আলোচনা করতে করতে বোঝাতে সক্ষম হই অশালীনতার সঙ্গে লুঙ্গির কোনো সম্পর্ক নেই। এবং এই ব্যাখ্যায় তিনি খুশি হয়ে ঝিনুকের আবরণ থেকে বেরিয়ে মুক্তোর মতো হেসে ওঠেন। তার আবরণহীন কণ্ঠে আবেগ ভর করে। তিনি বলেন, আমার আব্বাজান তো সারাজীবন লুঙ্গিই পরতেন।
সন্ধ্যায় আমরা উত্তরা রেলগেটের কাছে চায়ের দোকানে বসে কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে এক বৈঠক করি। তখন আমাদের বন্ধু আলী আসগর জানায় লুঙ্গি বিষয়ক নতুন এক গল্প। এক মুক্তিযোদ্ধার জীবনে লুঙ্গি। আমরা ভেবেছিলাম, বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধার মতো তিনিও লুঙ্গি পরে যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং তখন কোনো অপারেশনে বিপত্তি ঘটে। কিন্তু আসগর যা বলে তা আমাদের মাথায় আসেনি।
১৯৭১ সালের মে মাস। মোলামেরডাঙ্গী গ্রামের ঘরামি জয়নালের কাজ নেই। দেশে গণ্ডগোল চললে কি মানুষ বাড়ি-ঘর বানায়? ভাঙা চাল পাল্টায়? জয়নাল অবশ্য নতুন কাজের কথা ফাইনাল করে ফেলেছে। সে রশির সিকান্দার মোল্লার সঙ্গে যশোর হয়ে বনগাঁ যাবে। তার মতে, চুপ কইরা বইসা থাকনের সময় তহন না। কিন্তু তার যেতে কিছুটা দেরি হয়, এই দিন সাতেক আর কি! বলে, জমিলা ফট কইরা হাজাম ডাইকা জিলুর খতনা দিয়া দিছে। পোলায় বায়না ধরছে, এইবার সে তপন পিনবে। নতুন তপন চাই তার। জয়নাল আরও জানায়, গ্রাম দেশে পোলারা সুন্নাতে খতনার গোছল দিয়া তপন মানে লুঙ্গি পিন্দে। পোলার জন্য সাত দিন দেরি হয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশীকে পান-সুপারি খাইয়ে নিমপাতা-হলুদ বাটা দিয়ে জিলুর গোসল দেওয়া হলো। জিলুর মা জমিলার নাকের নোলক বিক্রি করে সব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একখানা লাল ডোরার লুঙ্গি কেনা হয়। পোলা তার কী যে খুশি! সদ্য ঘা শুকানো নুনুতে যাতে ঘষা না লাগে হেইর লিগা লুঙ্গির সামনে উঁচু কইরা ধইরা সারাদিন উঠানময় হাঁটে। জয়নাল মন ভইরা দেখে নেয় জিলুরে, যদি যুদ্ধে যাইয়া না ফিরে! সেই রাতেই জয়নাল রওনা দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন করে যখন সে গ্রামে ফেরে, তখন সারা গ্রামের অনেক ওলট-পালট অবস্থা। রাস্তায় এর ওর সঙ্গে দেখা হলেও কেউ কথা বলে না। সবার চোখে কেমন করুণ চাহনি! জয়নাল আরও জোরে পা ফেলে ফেলে নিজের ভিটায় আসে। দেখে কিচ্ছু নাই। মাটিতে পোড়া দাগ। পাশের বাড়ির লোকজন জানায় কেমনে তার ভিটা পোড়ানো হলো। কিন্তু ঘর না, ঘরের বাতা না; জয়নাল কেবল খোঁজে জিলু আর জমিলারে। সবাই সব জানানোর পরও জয়নালের বিশ্বাস হয় না। সে দ্যাশ স্বাধীন কইরছে, তার জিলু আর জমিলা নাই! দ্যাশ দিয়া তাইলে অহন কী করব! তার তো পৃথিবী আন্ধার। সারা গ্রাম, ভিটার চারপাশে খুঁজে খুঁজে হয়রান। জিলুরে পায় না, জমিলারে পায় না। তয় সে বাড়ির পাশে মাইঠ্যালের কাদার মধ্যে খুঁজে পায় লাল ডোরাকাটা লুঙ্গি। তার জিলুর লুঙ্গিখানা আজও সে সযত্নে তুলে রেখেছে। মাঝেমধ্যে বের করে গন্ধ নেয়। না, জিলুর গন্ধ পায় না, কেবল মাটির শ্যাওলা পড়া গন্ধ। তাও শোঁকে, এইডা তার জিলুর তপন।
আলী আসগরের এই গল্প শুনে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। জিলুর বাবা মুক্তিযোদ্ধা জয়নালকে লুঙ্গি আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটা সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিই, লুঙ্গি বিষয়ে আমাদের জাতীয় জীবননির্ভর একখানা ডকুফিল্ম বানাব। এ বিষয়ে তথ্যনির্ভর গ্রন্থনা করে আমাদের সহযাত্রী আমেনা ফেরদৌস। সে লিখিত আকারে যে বর্ণনা তৈরি করে তা অনেকটা এ রকম-
একদা বঙ্গদেশের মানুষ সেলাইবিহীন পোশাক পরিধান করত। আবহাওয়া এবং সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয় যুক্ত হয়ে পোশাকের নির্ধারণ, বিবর্তন ঘটে। নীহাররঞ্জন রায় এবং রমেশচন্দ্র মজুমদার আমাদের পোশাক সম্পর্কে বলেছেন, বঙ্গের নারী ও পুরুষ- উভয়ই পরতেন একটি মাত্র বস্ত্র- শাড়ি অথবা ধুতি। সমাজের উঁচুতলার মানুষ আর নিম্নশ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই পোশাকের ঝুলের পার্থক্য থাকত। ইন্দো-মুসলিম যুগে পোশাকের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, এ যুগে সেলাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে। মুকুন্দরামে লুঙ্গির খোঁজ মেলে। ১৮৬০ সালে ঠাকুরবাড়ির জ্ঞানদা দেবী মেয়েদের পোশাকে ব্লাউজ প্রবর্তন করেন। তিনি ব্লাউজের হাতার আকার নিয়ে পরবর্তীতে...।
-যা, শালা। এসব কী লিখেছিস! লুঙ্গি কোথায়! সব জায়গায় ব্লাউজের বর্ণনা।
আমেনা ফেরদৌস ঠোঁট ওল্টালো- তোরা লেখ না... আমি পারব না।
আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মোটা ভারী গ্লাসের চশমা পরে মাসুদ। ও কথা বললে সব সময় আমরা একটু বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি। ওর ভারী গ্লাসের রিফলেক্টে সব সময় গবেষণালব্ধ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আভাস ভেসে ওঠে। আমরা তাই মাসুদের দিকে তাকিয়ে থাকি। ও বলে যায়- মূলত বাঙালি সেলাইবিহীন পোশাক পরত... যা ছোট আকারে লুঙ্গি আর বড় আকারে শাড়ি।
আমাদের মনে হয়, এভাবে হবে না। আমরা তখন সিদ্ধান্ত নিই মওলানা ভাসানীর কিছু মিছিলের ছবি জোগাড় করতে হবে। তিনিই সেই নেতা যিনি লুঙ্গি পরে মাঠে-ময়দানে এমনকি বিদেশেও ঘুরে বেড়িয়েছেন। একাত্তরের রণাঙ্গনের কিছু ছবি, যেখানে লুঙ্গি পরে কাঁধে বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যোদ্ধা। আর সেই ভয়ঙ্কর নির্মমতার ছবিও। যেখানে আমাদের জাতির পিতার রক্তাক্ত মৃতদেহ সিঁড়িতে পড়ে আছে, তার পরনেও লুঙ্গি।
আমেনা অং সান সু চির ছবি যুক্ত করতে চাইলে আপত্তি তোলা হয়। কেননা, ইতিমধ্যে সু চির মানবতাবাদিতার বিষয়টি আমাদের মধ্যে সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। শান্তির নোবেল বিষয়টিও একটি চূড়ান্ত বিতর্কিত বিষয় হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। এমনকি লুঙ্গি আন্দোলনের সঙ্গে ফরহাদ মজহারকে সম্পর্কিত করার বিষয়েও একমত হই না। বরং আমরা আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে কাব্য কামরুলকে যুক্ত করতে চাই। সে ইতিমধ্যে পুঁথিপাঠের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে এবং লুঙ্গি বিষয়ে একটি বিপ্লবী পুঁথি বেঁধেছে। জাতীয় পোশাক হিসেবে সে লুঙ্গির দাবিতে শাহবাগের মোড়, ছবির হাট, গুলশান থেকে সব টিভি চ্যানেলে তুলছে। আমরা প্রয়াত প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকেও স্মরণ করতে চাই। তিনিই প্রথম অ্যাসেম্বলিতে লুঙ্গিকে জাতীয় পোশাক করার দাবি জানিয়েছিলেন। মহাসম্মেলনে এসব কিছুর সুসমন্বয় করার জন্য একটা টিম গঠন করি এবং পরবর্তী কাজের নির্দেশনা দিয়ে মিটিং শেষ করা হয়।
যদিও বান্টিদের লুঙ্গি র‌্যালিসহ পরবর্তী কিছু আপত্তি ও দাবি তোলার পর হাইকোর্ট লুঙ্গি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রুল জারি করেছে। তবুও আমরা ভরসা পাই না। উচ্চবিত্ত আর পুঁজিপতিরা যে আমাদের আজন্ম শত্রু- সে বিষয়ে আমরা অবগত ছিলাম। তারা যে কোনো সময় দেশময় লুঙ্গি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে- তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। অতএব আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে, বেগবান করতে হবে। অবশেষে আমাদের অনুসন্ধান টিম লুঙ্গি আন্দোলনের অতীত ইতিহাসের সন্ধান পায়। যা প্রকৃত সার্বঅল্টার কণ্ঠস্বর বলে আমরা ধারণা করি। আর এ সন্ধান প্রবীণ শিক্ষক আবু নাসেরের কাছ থেকে মেলে। তিনি সরাসরি সেই লুঙ্গি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে পেয়ে আমাদের মহাসমাবেশ পূর্ণাঙ্গ রূপলাভ করবে। আমাদের সর্বশেষ সংযুক্তি ইতিহাস বক্তা আবু নাসের।
১৯৫৭ সালের কথা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফরিদপুর জেলার সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফরিদপুর জিলা স্কুলে সংঘটিত হয়েছিল লুঙ্গি আন্দোলন। এবার আমরা আবু নাসেরের গল্পে মজে যাই। তিনি বলেন, তখন ফরিদপুর জিলা স্কুলে দক্ষিণাঞ্চলের অনেকেই পড়তে আসত। শহরের ছেলেরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল গ্রামের ছেলেরা।
আবু নাসেরের বয়স আশি ঊর্ধ্ব। গল্প করার সময় তার মুখের নানা রকম বিবর্তন ঘটে। কখনও কখনও তিনি বেশ জোশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তখন তার চোখের তারা দেখে আমরা বুঝতে পারি। সোনালি স্মৃতির রোমন্থন। কখনও মিইয়ে পড়া গলায়, যেন কিছুটা ভুলে গেছেন। তিনি জানান, তাদের স্কুলের হেড াস্টার তখন কাজী সাহেব।
কাজী সাহেব- কথাটা শুনে আমাদের চোখে মানুষটির অবয়ব স্পষ্ট হয় না। কিন্তু তখন যে তার চোখের সামনে মূর্তিমান হেডমাস্টার কাজী সাহেব এসে দাঁড়ান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদেরও মাস্টারকে দেখার ইচ্ছা জাগে। আমরা তখন কাজী সাহেবের পূর্ণাঙ্গতা দাবি করি। তিনি বলেন, স্যারের পুরো নাম ছিল কাজী অম্বর আলী।
বেশ গর্বের সঙ্গে অম্বর আলী নামটা উচ্চারিত হলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠেন মধ্যবয়স্ক হেডমাস্টারের গাম্ভীর্যময় চেহারা। আবু নাসের তখন জানান, একদিন হেড স্যার ক্লাস তদারকিতে বেরিয়ে ক্লাস সেভেনের কিছু ছেলের পরনে লুঙ্গি দেখে ক্ষেপে যান।
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল জিলা স্কুলের সাবেক ছাত্র। তারা তখন নিজেদের ক্লাসরুমে চলে যায়। স্কাই ব্লু শার্ট আর নেভি ব্লু প্যান্টের মাঝে আবিস্কার করে কিছু লুঙ্গি পরিহিত সহপাঠী! কিন্তু আবু নাসের তরুণদের সে কথায় হেসে ওঠেন। - আরে না, তখনও তো আমাদের স্কুলের কোনো সুর্নিদিষ্ট স্কুল ড্রেস ঘোষিত হয়নি।
আমাদের তখন জানতে ইচ্ছে করে, তাহলে কেমন ছিল, সেদিনের সেই ড্রেসগুলো?
তিনি আমাদের জানান, তখন আমরা যারা নিচের ক্লাসে পড়তাম তারা সাধারণত হাফ প্যান্ট আর হাফ শার্ট পরে যেতাম। শার্টের ধরন তো আর এ সময়ের মতো ছিল না। সেই সময়ের কাটছাঁট। আর বড় ক্লাসে কেউ ফুল প্যান্ট, কেউ বা পাজামার সঙ্গেই শার্ট পরত। এসব সাবসিডিয়ারি বিষয়ের কৌতূহল ছেড়ে তিনি মূল গল্পে ফিরে যান। তিনি জানান, ক্লাস সেভেনের সেই সব ছাত্রকে ডেকে কাজী অম্বর আলী খুব বকাঝকা করলেন। আর সেই ক্ষিপ্ততা দেখে কোনো কোনো ছাত্র ভীষণ রেগে যায়। তারা বিকেলে হাইস্কুলের মাঠে মিটিং ডাকে। স্কুলে লুঙ্গি পরে আসা যাবে না- বিষয়টা তারা মেনে নিতে পারছিল না। তিনি আরও বলেন, আমিন ভাই আমাদের সঙ্গে করে মিটিংয়ে নিয়ে যান।
তখন আবু নাসের আমাদের কিছুটা ইতিহাসের পাঠদান করেন। তিনি জানান, ফরিদপুর জিলা স্কুলের পাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বাবা শ্রী ভগবানচন্দ্র বসু। একদা তিনি ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তিনি জানান, লুঙ্গি আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী আমিন ভাই যে ভবিষ্যতে নেতা হবেন- সে বিষয়ে তারা সেদিন বুঝতে পারেননি। আমিন ভাই পরবর্তী সময়ে সত্তরের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য হন। তিনি একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন। তার নেতৃত্বদানের শুরু সেই লুঙ্গি আন্দোলন থেকে। সহসা সে ইতিহাসে আমাদের জাতীয়তাবাদী মন উগ্র হয়ে ওঠে এবং আমরা সেই নেতার সন্ধান জানতে চাইলে আবু নাসের আমাদের খুব বেশি কিছু বলতে পারেন না। তিনি কেবল জানান, আমিন উদ্দিন একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিহত হন। আমাদের তখন আরও জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তিনি এর বেশি কিছু বলতে পারেন না। বরং তার চোখে তখন চকচক করে সোনালি অতীত। তিনি সেই স্বপ্নাবিষ্ট কণ্ঠে বলেন, সেদিনের মিটিংয়ে বহু লোকের সমাগম ঘটে। পরদিন সব ছাত্র এবং ক্লাস শিক্ষক লুঙ্গি পরে স্কুলে আসেন।
-তারপর?
-হেড স্যার অ্যাসেম্বলিতে এসে দাঁড়িয়ে সবার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন এবং শপথবাক্য শেষ হওয়ার আগেই কোনো কথা না বলে নিজের রুমে চলে যান।
- তাহলে আল্টিমেট সেদিন কী হলো?
এমন প্রশ্নে আবু নাসেরও অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকান। বলেন, কী আর হবে?
- না, মানে ফলাফল?
তিনি মনে মনে যেন স্মৃতি হাতড়াতে থাকেন। বলেন- না, তা তো ওখানেই শেষ। লুঙ্গি নিয়ে আর কোনো কথা হয় না। এবং আবার তার খুব কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়া ভঙ্গিতে বলে ওঠেন- কাজী অম্বর আলী স্যার চলে যাওয়ার পর আমাদের স্কুলে নতুন হেডমাস্টার এলেন মাকসুদ আলী। ইয়া বড় আলখাল্লা পরিহিত ভদ্রলোক, মাথায় টুপি। তিনি এসে অলিখিত ঘোষণা দিলেন- সবাইকে টুপি পরতে হবে।
আমরা দেখছি কাহিনী লুঙ্গি থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে। তবুও তার কথার মাঝে আমরা বাধা দিতে পারি না।
তিনি বলে চলেন। আমরা তখন নানা ঢঙের টুপি বানানো শুরু করলাম। কেউ কেউ মাথার ওপর ঈদের দ্বিতীয় দিনের চাঁদের আকৃতির বাঁকানো কাঁচির মতো মাথার ঠিক মাঝখানে টুপি বসাতে শুরু করি। জোহরের নামাজ সবাই একসঙ্গে পড়া বাধ্যতামূলক হয়ে গেলে একবার আমি হাফ প্যান্টের সঙ্গে টুপি পরেই নামাজ পড়েছিলাম।
আমাদের মধ্যে কেউ একজন বলে ওঠে- আসলে লুঙ্গি বিষয়টা নিয়ে...
তিনি তখন কারও কথা শোনার মতো অবস্থায় ছিলেন না। স্মৃতিতে ডুবে যেতে যেতে বলতে থাকেন- অ্যাসেম্বলির সময় কোরআন তেলাওয়াত ছাড়াও গজল গাওয়াতে লাগলেন। একবার স্যার লাইন থেকে আমাকে ডেকে বললেন, তুমি একটা গজল গাও।
আমি বললাম- আমি তো গজল জানি না। জানালাম, আমি সিনেমার গান গাইতে পারি।
তিনি আমাকে সিনেমার গানই শোনাতে বললেন। আমি যে গানটি গেয়েছিলাম, তা এখনও মনে আছে- শূন্যে ডানা মেলে পাখিরা উড়ে গেলে/নিঝুম চরাচরে তোমায় খুঁজে মরি...
আবু নাসের তার গল্প এবং গান শেষ করলে জানাই তার সেসব স্মৃতিময় কাহিনী আমাদের খুব ভালো লেগেছে। তবে কাজী অম্বর আলী আর আমিন উদ্দিনের লুঙ্গি আন্দোলন পর্যন্তই আমরা সম্মেলনে উপস্থাপন করতে চাই। তিনি আমাদের সম্মতি দিলে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। আমরা লুঙ্গিকে কেন জাতীয় পোশাক নয়- বিষয়ক সম্মেলন চূড়ান্ত করে ফেলি। তবে লুঙ্গি আন্দোলনের নেতা আমিন উদ্দিনের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা কেউ মাথা ঘামাই না। কেননা, অসুস্থ রাজনীতির প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। সুস্থ সামাজিক আন্দোলনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।