নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ শরণার্থীদের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করতে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমাদের সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, পশ্চিমা শাসকরা শরণার্থীদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
আবদুলরাজাক গুরনাহর জন্ম ১৯৪৮ সালে। তিনি জানজিবার দ্বীপে বড় হয়েছেন। সেটা এখন তানজানিয়ার অংশ। মাত্র আঠারো বছর বয়সে ১৯৬০-এর দিকে তিনি শরণার্থী হয়ে ইংল্যান্ডে আসেন। ১৯৮২ সালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও ঔপনিবেশিক সাহিত্য নিয়ে অধ্যাপনা করেন। আবদুলরাজাক গুরনাহ উপন্যাস লিখেছেন সর্বমোট সাতটি, আর বহুসংখ্যক একাডেমিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তার উপন্যাসগুলো মূলত শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা, বাস্তুহারা মানুষের জীবন আর ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। 'মেমোরি অব ডিপারচারস', 'পিলগ্রিমস ওয়ে', 'আফটারলাইভস' এবং বুকার পুরস্কার ফাইনালিস্ট 'প্যারাডাইস' তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। নোবেল পুরস্কার চালু হওয়ার পর গুরনাহ হলেন ষষ্ঠ আফ্রিকান, যিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন।
গুরনাহ বলেন, 'অভিবাসন শুধু আমার গল্প নয়, এটা আমাদের সময়ের ফেনোমেনন।'
৭২ বছর বয়সী গুরনাহ বলেন, তিনি যখন তার জন্মভূমি ছেড়ে এসেছেন তখন থেকে আজ পর্যন্ত অভিবাসীদের দুঃখবেদনা একটুও কমেনি।
তিনি বলেন, 'বিষয়টা এমন যে নতুন নতুন অভিবাসী আসছে আর সেই পুরোনো ওষুধই ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্রিকায় সেই আগের কুৎসিত আচরণ, ভুল ব্যবহার, সরকারের পক্ষ থেকে একই রকম উদাসীনতা।'
আবদুলরাজাক গুরনাহ কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তিনি এখন ব্রিটিশ নাগরিক, পশ্চিমা সরকারগুলোকে তিনি জোর দিয়ে বলছেন, অভিবাসন সমস্যা এমন কোনো সমস্যা নয় যে সেটার সমাধান হবে না। তিনি বলেন, 'এই লোকগুলো একদম শূন্য হাতে এখানে আসে না, তারা আসে যৌবন নিয়ে, শক্তি নিয়ে আর বেঁচে থাকার প্রবল ক্ষমতা নিয়ে।' (দ্য ডেইলি সাবাহ)
নোবেল পুরস্কারজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ অনেক জায়গায় তার লেখালেখি নিয়ে নানারকম সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি কী লিখতে চান, লেখার ভেতর দিয়ে কী বলতে চান, সবকিছুই সেসব আলোচনায় এসেছে। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরপরই নোবেল একাডেমি থেকে নোবেল পুরস্কার প্রচার বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথ ছোট্ট একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। অ্যাডাম যখন কথা বলছিলেন আবদুলরাজাকের সঙ্গে, তখন বিবিসি থেকে লেখকের কাছে ফোন এলো। নোবেল পুরস্কার কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথ লেখককে বললেন, 'এখন এমন একটা সময় যে সবাই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে। সবার আলোচনা আর প্রশ্নের মূল বিষয় থাকবে শরণার্থীদের ভাগ্য এবং সংস্কৃতি ও মহাদেশের মধ্যে বিশাল এক ভিন্নতা আর ব্যবধান নিয়ে।' আবার এটাও সত্য যে আমরা এখন শরণার্থীবিষয়ক বেশ জটিল একটা সময় পার করছি। আপনি আমাকে শুধু বলবেন যে সংস্কৃতির বিভাজনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: আমি মনে করি না এই বিভাজনজনিত সমস্যাটা স্থায়ী কিছু। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে লোকজন স্থানান্তরিত হবেই। আমি মনে করি, আফ্রিকা থেকে যে লোকগুলো ইউরোপে আসছে, এই ঘটনাটা আমাদের সময়ের নতুন ঘটনা। কিন্তু ইউরোপিয়ানরা যে পৃথিবীর নানা দেশে অনুপ্রবেশ করেছিল সেটা কিন্তু নতুন কোনো ঘটনা নয়, আমাদের কাছে সেই সব ঘটনার শত শত বছরের ইতিহাস আছে। আর যে লোকগুলো আফ্রিকার নানা দেশ থেকে আসে প্রথমত তারা অভাবের কারণেই আসে, তারপর আরও নানা কারণ থাকে কিন্তু তাদের কিছু দেওয়ার আছে। তারা একদম শূন্য হাতে এখানে আসে না। তাদের অনেকেই মেধাবী, সাহসী, উদ্যমী, শক্তিশালী। ফলে বিষয়টাকে আমরা অন্যভাবেও চিন্তা করতে পারি। ইউরোপ এমন কিছু লোককে ত্রাণ দিচ্ছে, যারা আসলে অভাবী কিন্তু একই সঙ্গে সেই লোকগুলো তোমাদের জন্য কিছু না কিছু অবদান রাখার ক্ষমতা রাখে।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনাকে ধন্যবাদ। আরেকটা প্রশ্ন, নোবেল পুরস্কার প্রতি বছর বিজ্ঞানী, শিল্পীদের এই পুরস্কার ঘোষণার দিনে একে অন্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেয়। বিজ্ঞানীরা তাদের কাজের বিষয়ে বলেন, আবিস্কারের ক্ষেত্রে তাদের আনন্দের কথা বলেন। আপনি যখন লিখেন তখন আপনিও কি তেমনটাই অনুভব করেন?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: আচ্ছা, আমি যখন লেখা শেষ করি তখন আমিও তেমন আনন্দ বোধ করি, হা হা হা। তবে এটা সত্য যে লেখালেখির ক্ষেত্রে বাধ্য করার মতো কিছু আছে। আপনি জানেন যে লেখককে যুগের পর যুগ লিখে যেতে হয়, চেষ্টা করে যেতে হয়। আপনি যদি কোনো কিছু অপছন্দ করেন তাহলে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকতে পারবেন না। লেখালেখিটা একই সঙ্গে আনন্দের, আবার একই সঙ্গে বেদনার।
আবদুলরাজাক গুরনাহ তার আরেকটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ফেবিনি রথ আর মারা হোলজেন্টেলের সঙ্গে। সেখানে নিজের লেখা আর অভিজ্ঞতার বিষয়ে একটা পরিচ্ছন্ন ধারণা দিয়েছেন আবদুলরাজাক গুরনাহ।
ফেবিনি রথ: বিশ্বসাহিত্য, ঔপনিবেশিক সাহিত্য, দক্ষিণ বিশ্বের সাহিত্য- এই ধরনের সাহিত্যের আখ্যাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এই ধরনের পরিচয় কি আপনার লেখালেখি বুঝতে বা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করতে সাহায্য করবে? আপনি নিজেকে কি এই রকম পরিচয় বহনকারী সাহিত্যিক মনে করেন?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: দেখুন, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে সাহিত্যকে এই ধরনের পরিচয় দেওয়া উপকারী। কোনো জ্ঞানগর্ভ অনুষ্ঠানে বা সাহিত্যের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় এই পরিচয়গুলো বেশ সহায়ক হয়ে থাকে। লোকজন এতে করে তাদের পছন্দের বিষয়টা দ্রুত নির্বাচন করতে পারে। আমি নিজে এই ধরনের আখ্যা দিয়ে আমার লেখাকে পরিচিত করতে চাই না। কারণ এই সব শিরোনাম কোনো সাংস্কৃতিক বিকাশে সহায়ক নয়।
ফেবিনি রথ: তাহলে আপনি কি নিজেকে বিশ্বসাহিত্যের বা ঔপনিবেশিক লেখক মনে করেন?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: আমি এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করব না। নিজেকে এমন কোনো বিশেষণের লেখক হিসেবেও কখনও পরিচয় দেব না। আমার নিজের নামের বাইরে আর কোনো আখ্যা দিয়ে আমার লেখক পরিচয় দেব কিনা সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত না। আমার মনে হয় কেউ আমাকে যদি জিজ্ঞেস করে আপনি কি তাদের একজন, আমি নিশ্চিত এর উত্তর হবে- না। এই রকম বিশেষণে আমি আখ্যায়িত হতে চাই না। এটা কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় প্রশ্ন হতে পারে, সে হয়তো এই প্রশ্ন করে আমাকে তার লেখার বোর্ডে পিন দিয়ে আটকে রাখবে এটা বলে যে তিনি একজন বিশ্বসাহিত্যিক বা ঔপনিবেশিক সাহিত্যিক।
মারা হোলজেন্টেল: যদি সমসাময়িক বিষয় থেকে প্রশ্ন করি- আপনার কি মনে হয় শরণার্থী সমস্যার কোনো পরিবর্তন হয়েছে? তথাকথিত দক্ষিণের দেশ থেকে লোকজন জার্মানিতে এসে আশ্রয় নিয়ে তারা জার্মানিকে পাল্টে দিচ্ছে। একইভাবে আরও অনেক দেশেও এই পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু শরণার্থী সমস্যার কোনো অগ্রগতি হয়েছে?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: আমি মনে করি না যে বিষয়গুলো সবসময় এভাবেই সমাধান করতে হবে। তবে এটা সত্য যে পরিবর্তন হচ্ছে। আপনারা যা কিছু মনে করেন না কেন, পরিবর্তন হচ্ছে। আরেকটা কথা বলি, ধরুন দশ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে এলো। এখন কার পরিবর্তন হবে সবচেয়ে বেশি? জার্মানির, নাকি দশ লাখ লোকের? আপনার এই প্রশ্নের উত্তর হলো এটাই। অবশ্য অন্য কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর ভিন্নতাও হতে পারে।
মারা হোলজেন্টেল: আপনি যখন লেখেন বা কোনো বই প্রকাশ করেন তখন আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী থাকে? আপনার কি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য থাকে নাকি আপনার গল্পগুলো মাথায় থাকে আর শুধু আপনি এমনিতেই সেগুলো বলে যান?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: কেউ যদি লেখালেখির উদ্দেশ্যের কথা বলে তাহলে বিষয়টা বেশ গুরুগম্ভীর শোনায়। কোনো মহৎ কিছু বলছি বা লিখছি এমন কিছু মাথায় না রেখে আমি শুধু সততা আর বিশ্বস্ততার সঙ্গে নিজের লেখাটা লিখি। তারপরও এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন, সেই বিষয়গুলো আমার লেখার ভেতর দিয়ে আবিস্কার করতে চাই।
মারা হোলজেন্টেল: আপনি সাহিত্যে দক্ষিণ বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কটাকে কীভাবে দেখেন?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: সাহিত্যে দক্ষিণ বিশ্বের সম্পর্কটা নতুন কিছু নয়। আমার গল্পগুলোর শুরুর দিক থেকে এই বিষয় নিয়ে আমি লিখেছি। এখনও সাম্প্রতিক সময়ে আমার একটা একাডেমিক কাজে এই বিষয় নিয়ে আমি লিখছি। এটা চলমান প্রক্রিয়া।
মারা হোলজেন্টেল: আপনার উপন্যাস 'বাই দ্য সি' লিখতে কতদিন সময় লেগেছিল? আমরা আপনার অন্যান্য কাজের বিষয়ে জানি। এই উপন্যাস লেখার প্রথম ধারণা থেকে শুরু করে এর বই আকারে প্রকাশ পর্যন্ত কেমন সময় লেগেছিল?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: উপন্যাসটা ২০০১-এ প্রকাশিত হয়েছিল। আমার মনে পড়ে ১৯৯৯-তে আমি উপন্যাসটা লিখে শেষ করেছিলাম। উপন্যাসটা লিখতে সময় লেগেছিল এক বছর। তারপর পাবলিশারের হ্যাঁ বলতে সময় লাগল এক বছর। ফলে আমি ধরে নিই যে এটা লিখতে আমার এক বছর লেগেছিল। তবে কখনও কখনও আমার এর চেয়ে আরও অনেক বেশি সময় লাগে কোনো কিছু দাঁড় করাতে। কারণ আমার মতো কেউ যখন ব্রাইটনে থাকে আর কেন্টারবিউরিতে চাকরি করে এবং তাকে প্রতিদিনই কাজের জায়গায় যাওয়া-আসা করতে হয়, তখন তার জন্য লেখার কাজটা একটু কঠিন হয়ে ওঠে। আর একটা লেখা শেষ করার পর সেই লেখাটাকে ফের পাঠ করা এবং সংশোধন করা, লেখার মতোই একটা দীর্ঘ কষ্টকর প্রক্রিয়া।
মারা হোলজেন্টেল: সর্বশেষ একটা কথা, গল্প লেখার বিষয়ে কোন বিষয়টা আপনার কৌতূহল বা আপনার লেখার রীতিকে প্রভাবিত করেছে?
আবদুলরাজাক গুরনাহ: একটা নির্দিষ্ট বয়সে আমি ইংল্যান্ড এসেছিলাম। যে বয়সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়াটাই বিপজ্জনক। নিজ বাড়ি আর দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে একজন অনাগত হিসেবে অন্য একটা দেশে নিজের পথ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। এই বিষয়টা আমার জীবন, আমার লেখাকে প্রভাবিত করেছে। আমি ভার্জিনিয়া উলফের মতো নই, যে দশ বছর বয়সেই জানত, সে একদিন বড় লেখক হবে। লোকজন যেভাবে কিছু না ভেবে নতুন কোনো খাতায় বা পৃষ্ঠায় লেখা শুরু করে আমিও সেভাবে লেখা শুরু করেছিলাম। তারপর লিখতে লিখতে মনে হলো, আমি এসব কী করছি! এভাবে লেখা শেষ করার পর আমার লেখা আর চিন্তাগুলো গোছাতে হয়েছিল। কারণ এটা শুধু সাধারণ লেখা নয়। এই কাজ করতে গিয়ে আপনাকে নিজের সঙ্গে কথা বলতেও হয়। তারপর একটা নির্দিষ্ট সময় এসে লেখাটা উপন্যাসের আকৃতি পায়। তারপর এই লেখাটা নিয়ে আপনাকে আরও কাজ করতে হয়। নিজেকে উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করতে হয়। তারপর একদিন আপনি পাবলিশার খুঁজতে শুরু করেন। তারপর আপনি একজন সত্যিকারের লেখক হয়ে উঠলেন।