নোবেল পুরস্কারের বিশ্বভ্রমণ এটিকে এবার পূর্ব আফ্রিকায় নিয়ে গেছে, এবং বড় কোনো পুরস্কার না পাওয়া, প্রায় আড়ালে চলে যাওয়া এক ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার, আবদুলরাজাক গুরনাহকে বেছে নিয়েছে। এ মুহূর্তে অন্তত আধা ডজন লেখক আছেন, যাদের লেখার জাদু সারা বিশ্বের অসংখ্য পাঠককে বিমোহিত করে রেখেছে, এবং যাদের নাম কয়েক বছর ধরে সম্ভাব্য নোবেল প্রাপকদের তালিকায় একটা স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তাদের বাদ দিয়ে গুরনাহকে কেন বেছে নেওয়া হলো, এই প্রশ্নও উঠেছে। একটা সম্ভাব্য উত্তর পাওয়া যেতে পারে ওই বিশ্বভ্রমণের ব্যাপারটা থেকে- চৌদ্দ বছর পর আফ্রিকার একজন লেখক এই পুরস্কারটি পেলেন। কিন্তু মূল কারণ হচ্ছে, যেমনটি নোবেল পুরস্কার কমিটি বলেছে, গুরনাহর সাহিত্যে উত্তর-উপনিবেশবাদী চিন্তার সক্রিয়তা এবং শরণার্থীদের নিয়ে তার হৃদয়গ্রাহী লেখালেখি। এর সঙ্গে যোগ করা যায় তার প্রকাশের বলিষ্ঠতা, ভাষার নিরাভরণ, অন্তরঙ্গ ব্যবহার। সে হিসেবে পছন্দটা ঠিকই আছে, বরং এই সময়ে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংকট সৃষ্টির মূলে যে দুই প্রধান জটিলতা- নতুন উপনিবেশবাদের বিস্তার ও ক্রমশ নির্মম হয়ে ওঠা, এবং শরণার্থীদের রকম ও সংখ্যাবৃদ্ধি। আরও কুড়ি-পঁচিশ বছরের মধ্যে রকমের তালিকায় যোগ হবে পরিবেশ-শরণার্থী। এমনিতেই পশ্চিম একটা নির্মম অবস্থানে চলে গেছে শরণার্থী প্রশ্নে। ইউরোপের অনেক দেশে শরণার্থীদের সমাবেশ উগ্র ডানপন্থার বিকাশ ঘটাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীবান্ধব এক প্রেসিডেন্টের প্রথম বছরটি মাত্র দশ মাসে গড়ালে- এর মধ্যেই এর দক্ষিণ সীমান্তে জড়ো হওয়া শরণার্থীদের যে নির্মমভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হলো, তাতে শরণার্থীদের বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্টই পাওয়া গেল।
আর নতুন উপনিবেশবাদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে এর পেছনে থাকা সেই আদি ও অকৃত্রিম অসুর, পুঁজিবাদের কথা, যা করোনাভাইরাসের মতো ক্রমাগত রূপ পাল্টায় এবং ভয়ংকর হয়ে ওঠে; এবং পশ্চিমের ক্ষমাহীন সামরিক-বৃহৎ শিল্পগত আঁতাতের আর পণ্যায়নের প্রবল ঢেউয়ের কথা, যা দুর্বল দেশগুলোকে সম্পদ আহরণের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। শুধু নতুন উপনিবেশের কথাই-বা কেন বলি, পুরোনো উপনিবেশ কি আমাদের ছেড়ে গেছে, আমরা কি উপনিবেশমুক্ত (উত্তর-উপনিবেশী পরিভাষায় 'ডিকলোনাইজড') হয়েছি? এই বাংলাদেশ তো একবার ডিকলোনাইজড হলো, কিন্তু ইংল্যান্ডের উপনিবেশী চুলা থেকে ফের পাকিস্তানি উপনিবেশের গরম তাওয়ায় তাকে তোলা হলো। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমরা আবার ডিকলোনাইজড হলাম। তাহলে আমাদের প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, শিক্ষা সব কেন রয়ে গেল উপনিবেশী মডেলের? এই সুবর্ণজয়ন্তীর বছরেও? আমাদের প্রান্তিক, দরিদ্র মানুষ, আমাদের নানান নৃজাতি, তারা কি ডিকলোনাইজড হলেন?
একটা দেশের ভূগোল উপনিবেশমুক্ত হতে পারে। কিন্তু মন? মনের উপনিবেশমুক্তি সহজ কথা নয়, সেটি সম্ভব করতে পারে রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্থানীয়তা; বাঙালিয়ানা, চাকমা-মারমা-মণিপুরিয়ানরা প্রকৃত অধিষ্ঠান। এই দখলদারিত্বের আর অধিকারহীনতার রাজনীতির যুগে, অপসংস্কৃতির এবং পণ্যায়নের প্রাবল্যের এবং পশ্চিমকে আদর্শ মেনে চলা করপোরেট সংস্কৃতির সময়ে মনদখলের লড়াইটা একতরফাই বটে। শিক্ষার কথা না হয় না-ই বললাম। বাজারমুখী শিক্ষা মনকে জাগায় না, নানান কর্তার মন জুগিয়ে চলাটাই বরং শেখায়।
পশ্চিমের ক্ষমতা এবং বাজার কাঠামোগুলো যে রকম মনদখলের দৌড়ে নেমেছে (চেক রিপাবলিকের এক লেখককে সেদিন আক্ষেপ করতে শুনলাম, প্যান্ডোরা পেপার্স-এ দুর্নীতিবাজদের তালিকার ওপর দিকেই নাম এলো যে প্রধানমন্ত্রীর, তাকেই কেন সাম্প্রতিক নির্বাচনে ২৭% মানুষ ভোট দিল? সে কি তরুণদের মনটাও দখল করে ফেলল?) এসবের বিপরীত স্রোতেও অবশ্য আছে কিছু সংগঠন, উদ্যোগ এবং চর্চা। যারা সাহিত্য চর্চা করেন, পড়েন, পড়ান তাদের সঙ্গে এই উল্টো স্রোতে সাঁতার কাটছে অনেক সংস্কৃতি সংগঠন, দুর্নীতি ও অপশাসনবিরোধী প্রতিষ্ঠান, চিন্তাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী- এ রকম অনেকে। হয়তো গুরনাহকে বেছে নিয়েছেন এ রকম কিছু মানুষ, এবং নিয়েছেন হয়তো বিশ্বের কাছে একটা বাণী পৌঁছে দিতে- এই লেখকটি যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন, সেই অবস্থানে শুভচিন্তার সব মানুষকে একদিন দাঁড়াতে হবে। সেই দিন দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে।
আবদুলরাজাক গুরনাহকে নিয়ে কোনো মন্তব্য অথবা তার সাহিত্যের বিশ্নেষণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ তার একটিমাত্র বই আমি পড়েছি, সেই প্যারাডাইস, যার কারণে নোবেলটা তিনি পেয়েছেন, এ রকমটা বলা হচ্ছে। একসময় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ক্লাসে আমি উত্তর-উপনিবেশী ও উত্তর-আধুনিক সাহিত্য পড়াতাম। বছর পনেরো আগে উত্তর-উপনিবেশী পাঠক্রমে আফ্রিকা ও এশিয়ার লেখকদের মধ্যে গুরনাহকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, সে বছর চিনুয়া আচিবিকে কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। এ উপন্যাসটি ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং বুকার পুরস্কারের হ্রস্ব তালিকায় চলে আসে, এ কারণেই সম্ভবত এটি পাঠ্যতালিকায় স্থান পেল। পড়াতে গেলে ভালো করে পড়ে নিতে হয়। সেভাবে প্যারাডাইস পড়েছি, কিন্তু সময়ের অভাবে তার অন্য কোনো বই আর পড়তে পারিনি। দু-এক ছোটগল্প পড়লাম নেট থেকে নামিয়ে। ব্যস। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল, বুকারটা গুরনাহ পেলেও পেতে পারতেন। খুব দরদ দিয়ে লেখা, চিত্রময়, সুন্দর ভাষা। চরিত্রগুলো টান টান রেখায় আঁকা। ছাত্রছাত্রীরাও বইটা পছন্দ করল। কিন্তু যে কারণে বইটি সবার প্রিয় হলো, তা গুরনাহর উত্তর-উপনিবেশী 'রাইটিং ব্যাক' বা লিখে জবাব দেওয়ার কারণে। গুরনাহর গল্পটি শুরু তানজানিয়ার এক ছোট শহর কাওয়াতে, ইউসুফ নামের এক হতভাগা চরিত্রের হাত ধরে এক সময় গল্পটি যায় ক্রমাগত পশ্চিমে, কঙ্গোতে। যেতে যেতে গল্পটি প্রচুর ডালপালা ছড়ায়, এবং দ্রুতই একে দেখতে হয় উত্তর-উপনিবেশী কাচের ভেতর দিয়ে, যেহেতু এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাফেলা ... যাতে ইউসুফও আছে ... যায় হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে। আর তখনই বইটির পাঠক নড়েচড়ে বসেন, তাদের মনে পড়ে যায় জোসেফ কনরাডের 'হার্ট অব ডার্কনেস' উপন্যাসের কথা, যেখানে বেলজিয়াম আর জার্মানির ব্যবসায়ীদের পাইকারি হারে হাতি (এবং মানুষ) শিকারের নির্দয় কাহিনি এবং সভ্যতার আলোর নিচে অন্ধকারের পাকাপাকি আসন গড়ার গল্পটা পাঠকের স্বস্তি কেড়ে নেয়। কনরাড ইউরোপের উপনিবেশী শাসনের এই অন্ধকার দিকটি তুলে ধরেছেন বলে প্রশংসা পেলেও চিনুয়া আচিবি তাকে 'রেসিস্ট' বা বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত করেছেন। দেখা গেল গুরনাহও জোরালোভাবে জার্মান (তথা ইউরোপীয়) উপনিবেশবাদের মুখোশ খুলে ফেললেন।
ইউসুফ অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে, কিন্তু তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো যখন বাবার দেনার দায়ে এক 'চাচা', আরব ব্যবসায়ী আজিজের কাছে সে বিক্রি হয়ে গেল। তারপর সে জগতের কঠিন থেকে কঠিনতর রাস্তায় নামল। পুরো গল্প অল্প কথায় বলা যাবে না, সেই কাজ আরেকদিনের জন্য তোলা থাক। তবে তিনটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়- প্রথমত, কনরাডকে গুরনাহ কোনো আক্রমণ না করেই চমৎকারভাবে দেখিয়ে দিলেন, উপনিবেশবাদের কাঠামো এমনই পরিব্যাপ্ত এবং চোরাগোপ্তা যে পশ্চিমের একজন সংবেদনশীল লেখকও তার আওতা থেকে খুব দূরে যেতে পারেন না; দ্বিতীয়ত, কনরাড লিখেছেন পশ্চিমা, সাদা মানুষের এলিট অবস্থান থেকে, তাতে ওপর এবং বাইরে থেকে দেখার বিষয়টা তাকে সীমাবদ্ধ করেছে; আর গুরনাহ বিষয়টা দেখছেন নিচ এবং ভেতর থেকে, সাবলটার্নের দৃষ্টিকোণ থেকে। কোনটা প্রকৃত, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এবং তৃতীয়ত, কনরাড যেখানে আফ্রিকাকে দেখান মোটা দাগে, অপরিচিত, ভয় ধরানো, অন্ধকার একটি মহাদেশ হিসেবে, গুরনাহ দেখান এক অন্তরঙ্গ, অনেক সময় আটপৌরে আলোয়, যাতে আফ্রিকার হূৎস্পন্দনটা ধরা পড়ে। গল্পের শেষে আরেক জায়গায় গুরনাহ আলো ফেলেন, এবং তা হচ্ছে উপনিবেশবাদের ফাঁদ যে পাতা ভুবনে, তা বোঝাবার জন্য। ইউসুফ একসময় তার ওপর ব্যবসায়ী আজিজের যে বিশ্বাস ছিল, তা ভাঙে, যার অনেক কারণ অবশ্য ছিল, কিন্তু লোকটা থেকে বাঁচতে সে আশ্রয় খোঁজে জার্মানদের কাছে। অর্থাৎ এক দাসত্ব থেকে মুক্তি মিললেও আরেক দাসত্ব তার থেকে গেল।
সে যা-ই হোক, গুরনাহ ইউসুফকে দেখিয়েছেন উভয় সংকটে পড়া এক মানুষ হিসেবে, যে নিজের জীবনের অনেকটাই হারিয়েছে, নিজের বলে যে একটা জায়গা ছিল তা হারিয়েছে, কিন্তু স্মৃতি ও সংগ্রামকে সঙ্গী করে নিজের 'স্বর্গে'র কাছে সে বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছে। গুরনাহ নিজেও জাঞ্জিবার ছেড়েছিলেন ১৯৬০-এর দশকে, জাঞ্জিবার বিপ্লবের পর। এরপর ইংল্যান্ড-নাইজেরিয়া হয়ে স্থিতি নিলেন ইংল্যান্ডে। শরণার্থী হিসেবে। এজন্য এদের জন্য তার দরদ। কেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছেন উত্তর-উপনিবেশবাদ বিষয়ে। তার পক্ষে তার লেখালেখিতে এ বিষয়টি গভীরভাবে তুলে ধরার একটা সুবিধা তো ওই প্যারাডাইস উপন্যাসেই দেখা গেছে। তার বাকি বইগুলোর দু'তিনটিও যদি পড়তে পারি, হয়তো বিষয়টা আরও পরিস্কার হবে। কিন্তু কবে পড়া হবে, আদৌ পড়া হবে কিনা, তা নিয়ে নিশ্চিত নই। অতএব গুরনাহকে বিদায় জানাই। অল্প কথায় উত্তর-উপনিবেশবাদের কয়েকটি বিষয়ের একটা চুম্বক বরং নির্মাণ করি।
উত্তর-উপনিবেশবাদের এবং উত্তর-আধুনিকবাদের 'উত্তর' কথাটিই গোলমেলে। উত্তর মানে পরবর্তী, স্বাধীনতা-উত্তর যেমন স্বাধীনতা পরবর্তী। কিন্তু এ দুই বর্ণনায় উত্তর কথাটি একদিকে যেমন পরবর্তী, (ভৌগোলিক উপনিবেশ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যেমন), অন্যদিকে সমান্তরাল। সমান্তরাল এই অর্থে যে, যখনই কোনো উপনিবেশের পত্তন হয়েছে, উপনিবেশী অনেক চিন্তা, চর্চা, মতবাদ শুরু হয়েছে, তখনই সেগুলোকে প্রশ্ন করার, চ্যালেঞ্জ করার, সমালোচনা করার এবং এগুলোর তৈরি আখ্যানের বিপরীতে প্রতি আখ্যান তৈরি করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই প্রতি আখ্যানগুলো, উপনিবেশকে বৈধতা দেওয়ার সব প্রয়াসের বিরুদ্ধে দেওয়া যুক্তিগুলো, উপনিবেশবাদের দ্বিত্বতাগুলো, মোটা দাগে এর নানা প্রবণতার ভেতরের অসারতাগুলো তুলে ধরার বিষয়টি উত্তর-উপনিবেশবাদের তত্ত্ব এবং কাজের পরিধি তৈরি করে দেয়। শেকসপিয়র তার টেম্পেস্ট নাটকটি যখন লেখেন, ইংরেজরা শুধু উত্তর-আমেরিকাতেই কলোনি গড়েছে, পুবে তার যাতায়াত শুরু হয়েছে অভিযাত্রী এবং ব্যবসায়ীর জাহাজে। কিন্তু নাটকটিতে তিনি উপনিবেশ স্থাপন থেকে শুরু করে স্বাধীন মানুষকে প্রজা বানানো, নানা ছলাকলায় তাকে শাসন ও শোষণ করে একে একে তার ভাষা, সংস্কৃতি, তার নিজস্বতা, পরিচয়, সক্রিয়তা এবং অখণ্ডতাকে বিনষ্ট করে নিজেকে তার প্রভুর আসনে বসিয়ে একজন উপনিবেশবাদী যেভাবে পুরো বিষয়টাকে বৈধও করেছে, তার একটা পূর্বাপর ছবি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রভু প্রসপেরো তার দখলদারিত্বের বৈধতা খোঁজে দাস ক্যালিবানকে অসভ্য, অসংস্কৃত, মানুষ নামের অযোগ্য- এইসব অপবাদ নিয়ে, যেন তাকে 'সভ্য' করার, তাকে শুদ্ধ সংস্কৃতি ও ভাষা শেখাবার দায়িত্বটা তার স্বর্গ-সমর্থিত। অথচ শেকসপিয়র এই অসভ্য, আধা-মানুষ বা মাছ, আধা-দানবের মুখে নাটকের অন্যতম সুন্দর কয়েকটি পঙ্‌ক্তি বসিয়ে, তার ওপর এক স্বপ্ন দৃশ্যের মহিমা ঢেলে বুঝিয়ে দিলেন, ওই সাদা-কালো, সভ্য-অসভ্য, সুন্দর-অসুন্দরের দ্বিত্বতা- যাকে এডওয়ার্ড সাইদ তার ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে প্রাচ্যবাদী চিন্তার সারাৎসার বলে অভিহিত করেছেন- উপনিবেশবাদীদের মুখোশের পেছনের মুখটার বীভৎস চেহারাকেই রূপায়িত করে।
যেখানেই অপশাসন, অত্যাচার, জোরদখল, সেখানেই প্রতিরোধ, সেখানেই ঘুরে দাঁড়ানো- এই কথাটা পশ্চিমেরই, এবং উপনিবেশবাদেরও। ক্যালিবান ঘুরে দাঁড়ায়, ইউসুফ ঘুরে দাঁড়ায়; ভারতীয়রা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বাঙালিরাও। এবং উপনিবেশবাদ যে রকম নানান রকম হয়- ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ভাষাগত, মনস্তাত্ত্বিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ... প্রতিরোধও হয় অনেক ধরনের। উপনিবেশবাদ পছন্দ করে সব উপনিবেশের মানুষ একই ভাষায় কথা বলবে, একই আচরণ করবে, একই ধরনের পণ্য কিনবে। তাতে শাসন করাটা সহজ নয়। এজন্য উপনিবেশবাদ স্থানীয়তার বিরুদ্ধে, বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে। এই মুহূর্তে গোলকায়নের নামে, নব্য-উদারবাদের নামে, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে নতুন উপনিবেশবাদ চলছে। ফলে প্রতিরোধও হচ্ছে ... সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক, ভাষিক, পরিবেশ-সক্রিয়তাকেন্দ্রিক। এ সবই অনিবার্য। ইংরেজি ভাষাকে ভারতীয় নানা ভাষায় শব্দে আকীর্ণ করে যে খিচুড়ি ইংরেজি তৈরি হলো, তা ছিল এক ভাষিক প্রতিরোধের সূত্রপাত। নজরুলের 'বিদ্রোহী'তে ছিল কবিতার অস্ত্র দিয়ে, হিন্দু-মুসলমানের ইতিহাস-মিথ থেকে শক্তি নিয়ে উপনিবেশের অহংকার ও বিভেদকামী চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। শরণার্থীদের তৈরি করেছে উপনিবেশবাদ। পরিবেশ-শরণার্থীদের জগতের পথে ঠেলে দেবে নানা নব্য-উপনিবেশবাদ। কিন্তু শরণার্থীদের যা সম্বল- স্মৃতি, টিকে থাকার শক্তি, নিজের সংস্কৃতিতে আস্থা রেখে বিরূপ বিশ্বে লড়ে যাওয়া, উপনিবেশবাদের সৃষ্ট ক্ষতগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া- সেসব একসময় দাবার চাল উল্টে দিতে পারে। কেন শরণার্থীরা বিপজ্জনক? কারণ উপনিবেশবাদ একসময় অপকর্মের এবং পাপের যে বীজ বুনেছিল, সেগুলোর কীট খাওয়া ফসল এখন তাদের জমিতে।
পশ্চিম এখন দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। পুবের দেশগুলো যত শক্তি পাবে, পশ্চিমের দুঃস্বপ্ন তত প্রবল হবে।
কিন্তু পুব যে পশ্চিমের রেখে যাওয়া উপনিবেশবাদ আত্তীকরণ করে নিজেই উপনিবেশী সেজে বসে আছে, তার কী হবে? অনেক দেশই, বস্তুত। নিজের অঞ্চলে, না হয় নিদেন পক্ষে, নিজের দেশে।
উত্তর-উপনিবেশবাদ একটা আয়না তুলে ধরে এসব দেশের সামনে। একটা আয়না আমাদের সামনেও আছে। সে আয়নাটা দেখতে চাইবে না ক্ষমতা, রাজনীতি, উপনিবেশী মডেলে চলা সব প্রতিষ্ঠান। সেই আয়না দেখবে গুরনাহর মতো আমাদের সাহিত্যিক-শিল্পীরা, সংস্কৃতিকর্মীরা, পরিবর্তনকামী তরুণেরা। সুইডিশ একাডেমির কেউ কেউ নিশ্চয় দেখেছেন, তাদের বড় আয়নাটা। সেজন্য হয়তো গুরনাহকে বেছে নিয়েছেন। এই নির্বাচনকে সাধুবাদ জানাই।