১৯৭১ সাল। আমাদের জাতীয় জীবনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় ওই বছরটিতে। এ অধ্যায়টি একরৈখিক ছিল না। বহুধা বিভক্ত, বহুরূপী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে মাতৃভূমিকে। এই একটি বছর যেন চোখের পলকে চলে গেল। পেছনে পড়ে রইল মানুষের কিছু স্মৃতি। এ স্মৃতি যেমন বেদনার, তেমনি গর্বেরও। অনেক স্মৃতি, অনেক কথা রয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্তরালে। বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে কিছু অজানা কথা। তেমনই কিছু তথ্য উঠে এসেছে 'অবরুদ্ধ ঢাকা ১৯৭১ : গোপন প্রতিরোধকারীদের সাক্ষাৎকার' বইটিতে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সুকুমার বিশ্বাস ও হাফিজুর রহমান। সম্পাদনা করেছেন রাশেদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থমালা সিরিজের অংশ হিসেবে ২০২১ সালে বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।
মুক্তিযুদ্ধ, যে রক্তাক্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে 'বাংলাদেশ' নামক স্বাধীন সত্তাটি বিকাশ লাভ করে- এটি শুধু '৭১-এর সালের বিষয় নয়। তারও অনেক আগে, বিশেষত ভাষা আন্দোলনের সময়কাল থেকেই এই বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি সামনে আসতে থাকে। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানই ছিল কফিনের শেষ পেরেক। এরপর ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া 'অপারেশন সার্চলাইট' নামক গণহত্যা চালানোর অভিযানটি ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানি সামরিক ফ্যাসিস্ট শাসকরা ঢাকাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। সাক্ষাৎকারমূলক বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এতে ইতিহাসের কোনো এক বাঁকে ব্যক্তির যে ভূমিকাটুকু ছিল, তা উঠে আসে। যে কথা হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। আলোচ্য বইটিও সে রকম এক আখ্যান, যেখানে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিবর্গের অজানা অনেক কথা উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বহু দল-মতের গ্রুপ গড়ে ওঠে। ঢাকা এবং এর বাইরে এমন অসংখ্য গোপন গ্রুপ ছিল, যাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যেমন যোগাযোগ ছিল, তেমনি তাদের মধ্যে দু-তিনটি গ্রুপ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ২ নম্বর সেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এর মধ্যে একটি গ্রুপ ছিল 'ঢাকা তথ্য গ্রুপ'।
দেখা গেছে, অনেকে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গা-ঢাকা দিয়ে থেকেছেন, আজ মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে বড় বড় পদ-পদবি হাতিয়ে নিয়েছেন। আবার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ সবসময় থাকেন, যারা ঐতিহাসিক ভূমিকার পরও নিভৃতচারী। সেই মানুষের কথা বলা, তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরার মতো গবেষক কিংবা লেখকের বড়ই অভাব। এ বইটিতে এমন সাতজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিরোধ সংগ্রামে গোপন সহায়তাকারী, আর দু'জন প্রত্যক্ষদর্শী। যেহেতু ঢাকা তথ্য গ্রুপ ছিল গোপন সহায়তাকারী গ্রুপ, তাই একজন আবার আরেকজনের তৎপরতা সম্পর্কে পুরোপুরি জানতেন না।
অপারেশন সার্চলাইট শুরুর সময় থেকেই এই গোপন সহায়তাকারীরা কবি-সাহিত্যিক, নেতা, রাজনৈতিক কর্মীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ও সুযোগ বুঝে নানা ছদ্মবেশে তাদের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেছেন। অবরুদ্ধ ঢাকায় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে সংবাদ ও তহবিল সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠিয়েছেন। এটি খুব কঠিন এবং দুঃসাধ্য কাজ। বইটিতে যে সাতজনের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, তারা হলেন- এম আর চৌধুরী, আনোয়ারুল আলম, স্যামসন এইচ চৌধুরী, জিয়াউল হক, জামিল চৌধুরী, শামসুন নাহার রহমান এবং হামিদা খানম।
এম আর চৌধুরী। তার সাক্ষাৎকার দিয়ে বইটি শুরু করা হয়েছে। তিনি ১৯৭১ সালে গোপনে ওষুধপত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠাতেন। তার আসল নাম মুজিবুর রহমান চৌধুরী। তার সঙ্গে ওষুধশিল্পের বিশিষ্ট ব্যক্তি স্যামসন এইচ চৌধুরীও যুক্ত ছিলেন। তারা দু'জনে মিলে ওষুধ সংগ্রহ করে জিয়াউল হক ও আনোয়ারুল আলমের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশের যুদ্ধ-উপদ্রুত অঞ্চলে পাঠাতেন। এসব ইতিহাসই এ বইয়ে উঠে এসেছে সুন্দর-সাবলীলভাবে।
ঢাকা তথ্য গ্রুপের অন্যতম সদস্য সিধু। তিনি ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্ত্রী শামসুন নাহার রহমান [রোজ] সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
বইটি পড়তে গিয়ে বারবার যে বিষয়টি নাড়া দিয়েছে, সেটি হলো- এই ব্যক্তিরা কেউ-ই তাদের জীবনের কথা বা ঘটনাবলি ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রাখেননি। তারা মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ওই ভূমিকাকে দায়িত্ব হিসেবেই মনে করেছেন। সাধারণের ইতিহাস এমন হয়। যে সাধারণের মাঝেই থাকে অসাধারণত্ব। জীবনের স্মৃতির ঝুলি থেকে হাতড়ে বেরিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
ধূসর স্মৃতিগুলো খুঁজে বের করতে না পারার দায়ও স্বীকার করেছেন; কিন্তু বইটি সম্পাদনার ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের বক্তব্যই রাখা হয়েছে। এখানে মৌলিক কোনো সম্পাদনা করা হয়নি। যেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ কারণে হয়তো দেখা যাবে, কখনও ঘটনার ধারাবাহিকতা খেই হারিয়ে ফেলেছে। সন-তারিখেরও কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা সহকারে এ বইটির বিশেষ ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আজ যেভাবে দলীয়-মতান্ধতা-অন্ধতা প্রভাব বিস্তার করেছে, সেখান থেকে একজন পাঠক মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন চিত্র পেতে পারেন। এটিই এ বইয়ের সার্থকতা।